আমীন আল রশীদ

বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েকটি ‘ব্ল্যাকহোল’ আছে। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তার অন্যতম। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। সেই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর ছিলেন জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ। ঘটনার পরপর প্রধান অভিযুক্ত জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। সামরিক আদালতে বিচারের মধ্য দিয়ে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসি দণ্ড দেওয়া হয়। এইসব কারণে প্রকৃত ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়নি। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতেই তাদেরকে দ্রুত সামরিক আদালতে বিচারের মধ্য দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়, এমন ধারণাও পোষণ করেন অনেকে।
জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন বীরউত্তম। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা একজন রাষ্ট্রনায়ককে যারা হত্যা করলেন, তারাও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। জিয়া হত্যার অভিযোগে সেনাবাহিনীর ৩১ জন অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে যে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাদেরও সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি।
এরকম বাস্তবতায়, ৪৫ বছর পরে সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাঁর এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে জিয়া হত্যার অমীমাংসিত রহস্যের জট খুলবে? কোনো নতুন মেরুকরণ তৈরি হবে? তবে জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় একজন গুরুত্বপূর্ণ আসামির গ্রেপ্তারের ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি বড় বাঁকবদলের ইঙ্গিত।
ঘটনা ঘটেছিল ৪৫ বছর আগে। এর অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর কতটা বিশ্বাসযোগ্য উত্তর জানা যাবে, সেটি নির্ভর করবে জিজ্ঞাসাবাদে মেজর মোজাফফর কতটুকু সত্য বলবেন আর কতটুকু গোপন করবেন তার ওপর। তবে তার দেওয়া তথ্য জিয়া হত্যার সময়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদে কর্মরত জীবিত অফিসারদের সঙ্গে ক্রসচেক করা হলে হয়তো সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হবে।
জিয়া হত্যা নিয়ে এ পর্যন্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ অন্যরা বইপত্র লিখেছেন। সেখানে একটি বিষয়ে সবাই মোটামুটি একই ইঙ্গিত দিয়েছেন। জিয়া হত্যার সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন এইচ এম এরশাদ। এরশাদের দুর্বল চরিত্রের কারণে জেনারেল মঞ্জুর তাকে পছন্দ করতেন না। এরশাদ ভাবছিলেন জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া গেলে তিনিই হবেন দেশের কর্তা। কিন্তু সেখানে বাধ সাধতে পারেন জেনারেল মঞ্জুর। অতএব ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার মতো জিয়াকে হত্যার পরে জেনারেল মঞ্জুরকেও হত্যা করে একটি পরিস্থিতি তৈরি করে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছেন। অর্থাৎ সবকিছুই ছিল মূলত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের ফসল। (লে. কর্নেল এম. এ হামিদ, তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, হাওলাদার প্রকাশনী/২০১৩, পৃ. ২৩৬)।
জিয়া হত্যার ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত আবুল মঞ্জুরকে ঘটনার প্রায় পরপরই হত্যা করা হলো, তিনি যে জিয়াকে খুন করতে চাননি, সেটি লিখছেন ওই সময়ে সেনাবাহিনীতে কর্মরত আরেক অফিসার মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) বীরবিক্রম। তিনি লিখেছেন, ‘মঞ্জুরকে অন্তরীণ অবস্থায় হত্যার কারণ হলো, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হলে জিয়া হত্যার ষড়যন্ত্রের আদ্যোপান্ত প্রকাশ পেয়ে যেত। আর তাকে হত্যা করা না হলে ভবিষ্যতে অনেকের স্বার্থসিদ্ধির পথ হতো কণ্টকময়।’
মইনুল হোসেনের ভাষ্য, ‘৩০ মে জিয়া হত্যার পর সেনাসদরে আমার সঙ্গে মঞ্জুরের ফোনে কথোপকথন থেকে আমি বুঝতে পারি তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই অধিনায়ক হিসেবে তাকে এই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছিল। বস্তুত জিয়া হত্যার পর থেকেই জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাদখলের পাঁয়তারা শুরু করেন। তৎকালীন কিছু-কিছু রাজনীতিবিদের আনাগোনাও শুরু হয়ে যায় সেনানিবাসে। আর এসব লোকের ক্ষমতার পথ কণ্টকহীন করতেই বলির পাঁঠা হতে হয় জেনারেল মঞ্জুরকে।’ (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য, মাওলা ব্রাদার্স/২০০০, পৃ. ১২৫)।
আরেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার কর্নেল (অব.) অলি আহমদও বলেন, জিয়া হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন এরশাদ। ২০১৫ সালের ২৯ মে রাজধানীতে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘জিয়া হত্যার দুই দিন আগে এরশাদ চট্টগ্রাম সফর করেন। জিয়াকে হত্যার পর এরশাদের নির্দেশে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহাবুব ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। কারণ তারা বেঁচে থাকলে মূল ষড়যন্ত্রকারীর নাম প্রকাশ পেত। শুধু তাই নয়, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে আরও যে সেনা অফিসারদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই জিয়ার হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।’ (প্রথম আলো, ৩০ মে ২০১৫)।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতে, জিয়া হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সবাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তাঁর বিশ্বাস, প্রকাশ্য আদালতে বিচার হলে অভিযুক্তরা ন্যায়বিচার পেতেন। তিনি আরও লিখেছেন, দলবদ্ধভাবে এতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এর পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, জিয়াউর রহমান, হত্যাকারী, নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি এবং দণ্ডিতদের সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন—যা তাঁর দৃষ্টিতে সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমান্বয়ে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। (মিজানুর রহমান চৌধুরী, রাজনীতির তিন কাল, অনন্যা, ২০০৩, পৃ. ১৯৭)
এরশাদ বরাবরই জিয়া হত্যার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জেনারেল মঞ্জুরই জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেছিলেন। এ নিয়ে সেনা বিদ্রোহ হয়েছিল। বিদ্রোহী সৈনিকরাই আবার মঞ্জুরকে হত্যা করেছেন। এরশাদ বলেন, ‘ওই সময় বিএনপির সাত্তার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি বিদ্রোহ দমনের জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বিদ্রোহ দমন করেছিলাম। এ জন্য তিনি আমাকে প্রশংসাপত্র পাঠিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি। সে সময় তো মঞ্জুর ও জিয়া হত্যার মামলার কথা ওঠেনি।’ (সমকাল, ০৫ মে ২০১৪)।
দীর্ঘদিন জিয়া ও মঞ্জুর হত্যা নিয়ে সেভাবে কথা হয়নি বা বিষয় দুটি ধামাচাপা দেওয়ার একটা চেষ্টা ছিল। কারা কেন একটি স্বাধীন দেশের একজন মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতিকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করলো? এই রহস্যও উন্মোচন করা প্রয়োজন। এই ঘটনার সঙ্গে কি দেশের বাইরেও বিদেশি কোনো পক্ষ জড়িত ছিল? জিয়া হত্যার অন্যতম আসামি মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘদিন ভারতে ‘জয় ব্যানার্জি’ ও ‘বিপ্লব সরকার’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে বসবাস করতেন। এই ঘটনার পেছনে ভারতের তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কি? আবার জিয়া হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের হত্যার পেছনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়ার কোনো বিদেশি চক্রান্ত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন একটি প্রশ্ন ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পরেও সামনে এসেছিল। সেই প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী অফিসার মেজর জেনারেল মঞ্জুরের কিছু মতবিরোধ ছিল। তার মধ্যে একটি বড় ইস্যু ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন প্রতিরোধ তথা সেখানে বাংলাদেশের বাঙালিদের বসতি স্থাপন (সেটেলমেন্ট) । পাহাড়ে বাঙালি বসতি স্থাপন ঠেকানো তথা সেখানে বাংলাদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে যারা নিজেদের স্বার্থপরিপন্থী মনে করেছে, সেটি হোক দেশের অভ্যন্তরে কিংবা দেশের বাইরে—তারাও জিয়ার হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না, সেই প্রশ্নেরও মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর এখন পর্যন্ত বেসামরিক আদালতে কোনো হত্যা মামলা হয়নি। কেন হয়নি তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পরিবারের তরফেই মামলা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তার চেয়ে বেশি জরুরি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন। সেই কমিশন গঠিত হতে পারে একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে। যে কমিশনে আইনজীবী, দুয়েকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং অপরাধবিজ্ঞানীকেও রাখা যেতে পারে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের তো বটেই।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার মেজর (অব.) মোজাফফরকে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার সুযোগ হতে পারে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অভিযানের আগে কর্মকর্তাদের কী বলা হয়েছিল? জিয়াকে হত্যা করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল? দ্বিতীয়ত, মেজর মোজাফফর যে ৪৫ বছর দেশে-বিদেশে পরিচয় আড়াল করে বসবাস করলেন, সেটি কাদের সহায়তায় সম্ভব হলো? কারা তাকে পালাতে, ভারতে থাকতে, বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করতে এবং পরে বাংলাদেশে ফিরতে সহায়তা করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা গেলেও হয়তো জিয়া হত্যার তদন্ত নতুন মোড় নিতে পারে। তবে তিনিও যে সব তথ্য জানেন, এমনটা নাও হতে পারে। আবার জিয়া হত্যার সঙ্গে যদি সত্যিই কোনো বিদেশি শক্তি জড়িত থাকে তাহলে শেষমেশ অমীমাংসিত রহস্যগুলোর জট কতটা খুলবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েকটি ‘ব্ল্যাকহোল’ আছে। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তার অন্যতম। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। সেই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর ছিলেন জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ। ঘটনার পরপর প্রধান অভিযুক্ত জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। সামরিক আদালতে বিচারের মধ্য দিয়ে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসি দণ্ড দেওয়া হয়। এইসব কারণে প্রকৃত ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়নি। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতেই তাদেরকে দ্রুত সামরিক আদালতে বিচারের মধ্য দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়, এমন ধারণাও পোষণ করেন অনেকে।
জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন বীরউত্তম। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা একজন রাষ্ট্রনায়ককে যারা হত্যা করলেন, তারাও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। জিয়া হত্যার অভিযোগে সেনাবাহিনীর ৩১ জন অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে যে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাদেরও সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি।
এরকম বাস্তবতায়, ৪৫ বছর পরে সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাঁর এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে জিয়া হত্যার অমীমাংসিত রহস্যের জট খুলবে? কোনো নতুন মেরুকরণ তৈরি হবে? তবে জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় একজন গুরুত্বপূর্ণ আসামির গ্রেপ্তারের ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি বড় বাঁকবদলের ইঙ্গিত।
ঘটনা ঘটেছিল ৪৫ বছর আগে। এর অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর কতটা বিশ্বাসযোগ্য উত্তর জানা যাবে, সেটি নির্ভর করবে জিজ্ঞাসাবাদে মেজর মোজাফফর কতটুকু সত্য বলবেন আর কতটুকু গোপন করবেন তার ওপর। তবে তার দেওয়া তথ্য জিয়া হত্যার সময়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদে কর্মরত জীবিত অফিসারদের সঙ্গে ক্রসচেক করা হলে হয়তো সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হবে।
জিয়া হত্যা নিয়ে এ পর্যন্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ অন্যরা বইপত্র লিখেছেন। সেখানে একটি বিষয়ে সবাই মোটামুটি একই ইঙ্গিত দিয়েছেন। জিয়া হত্যার সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন এইচ এম এরশাদ। এরশাদের দুর্বল চরিত্রের কারণে জেনারেল মঞ্জুর তাকে পছন্দ করতেন না। এরশাদ ভাবছিলেন জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া গেলে তিনিই হবেন দেশের কর্তা। কিন্তু সেখানে বাধ সাধতে পারেন জেনারেল মঞ্জুর। অতএব ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার মতো জিয়াকে হত্যার পরে জেনারেল মঞ্জুরকেও হত্যা করে একটি পরিস্থিতি তৈরি করে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছেন। অর্থাৎ সবকিছুই ছিল মূলত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের ফসল। (লে. কর্নেল এম. এ হামিদ, তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, হাওলাদার প্রকাশনী/২০১৩, পৃ. ২৩৬)।
জিয়া হত্যার ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত আবুল মঞ্জুরকে ঘটনার প্রায় পরপরই হত্যা করা হলো, তিনি যে জিয়াকে খুন করতে চাননি, সেটি লিখছেন ওই সময়ে সেনাবাহিনীতে কর্মরত আরেক অফিসার মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) বীরবিক্রম। তিনি লিখেছেন, ‘মঞ্জুরকে অন্তরীণ অবস্থায় হত্যার কারণ হলো, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হলে জিয়া হত্যার ষড়যন্ত্রের আদ্যোপান্ত প্রকাশ পেয়ে যেত। আর তাকে হত্যা করা না হলে ভবিষ্যতে অনেকের স্বার্থসিদ্ধির পথ হতো কণ্টকময়।’
মইনুল হোসেনের ভাষ্য, ‘৩০ মে জিয়া হত্যার পর সেনাসদরে আমার সঙ্গে মঞ্জুরের ফোনে কথোপকথন থেকে আমি বুঝতে পারি তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই অধিনায়ক হিসেবে তাকে এই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছিল। বস্তুত জিয়া হত্যার পর থেকেই জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাদখলের পাঁয়তারা শুরু করেন। তৎকালীন কিছু-কিছু রাজনীতিবিদের আনাগোনাও শুরু হয়ে যায় সেনানিবাসে। আর এসব লোকের ক্ষমতার পথ কণ্টকহীন করতেই বলির পাঁঠা হতে হয় জেনারেল মঞ্জুরকে।’ (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য, মাওলা ব্রাদার্স/২০০০, পৃ. ১২৫)।
আরেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার কর্নেল (অব.) অলি আহমদও বলেন, জিয়া হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন এরশাদ। ২০১৫ সালের ২৯ মে রাজধানীতে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘জিয়া হত্যার দুই দিন আগে এরশাদ চট্টগ্রাম সফর করেন। জিয়াকে হত্যার পর এরশাদের নির্দেশে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহাবুব ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। কারণ তারা বেঁচে থাকলে মূল ষড়যন্ত্রকারীর নাম প্রকাশ পেত। শুধু তাই নয়, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে আরও যে সেনা অফিসারদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই জিয়ার হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।’ (প্রথম আলো, ৩০ মে ২০১৫)।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতে, জিয়া হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সবাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তাঁর বিশ্বাস, প্রকাশ্য আদালতে বিচার হলে অভিযুক্তরা ন্যায়বিচার পেতেন। তিনি আরও লিখেছেন, দলবদ্ধভাবে এতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এর পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, জিয়াউর রহমান, হত্যাকারী, নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি এবং দণ্ডিতদের সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন—যা তাঁর দৃষ্টিতে সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমান্বয়ে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। (মিজানুর রহমান চৌধুরী, রাজনীতির তিন কাল, অনন্যা, ২০০৩, পৃ. ১৯৭)
এরশাদ বরাবরই জিয়া হত্যার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জেনারেল মঞ্জুরই জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেছিলেন। এ নিয়ে সেনা বিদ্রোহ হয়েছিল। বিদ্রোহী সৈনিকরাই আবার মঞ্জুরকে হত্যা করেছেন। এরশাদ বলেন, ‘ওই সময় বিএনপির সাত্তার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি বিদ্রোহ দমনের জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বিদ্রোহ দমন করেছিলাম। এ জন্য তিনি আমাকে প্রশংসাপত্র পাঠিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি। সে সময় তো মঞ্জুর ও জিয়া হত্যার মামলার কথা ওঠেনি।’ (সমকাল, ০৫ মে ২০১৪)।
দীর্ঘদিন জিয়া ও মঞ্জুর হত্যা নিয়ে সেভাবে কথা হয়নি বা বিষয় দুটি ধামাচাপা দেওয়ার একটা চেষ্টা ছিল। কারা কেন একটি স্বাধীন দেশের একজন মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতিকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করলো? এই রহস্যও উন্মোচন করা প্রয়োজন। এই ঘটনার সঙ্গে কি দেশের বাইরেও বিদেশি কোনো পক্ষ জড়িত ছিল? জিয়া হত্যার অন্যতম আসামি মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘদিন ভারতে ‘জয় ব্যানার্জি’ ও ‘বিপ্লব সরকার’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে বসবাস করতেন। এই ঘটনার পেছনে ভারতের তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কি? আবার জিয়া হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের হত্যার পেছনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়ার কোনো বিদেশি চক্রান্ত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন একটি প্রশ্ন ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পরেও সামনে এসেছিল। সেই প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী অফিসার মেজর জেনারেল মঞ্জুরের কিছু মতবিরোধ ছিল। তার মধ্যে একটি বড় ইস্যু ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন প্রতিরোধ তথা সেখানে বাংলাদেশের বাঙালিদের বসতি স্থাপন (সেটেলমেন্ট) । পাহাড়ে বাঙালি বসতি স্থাপন ঠেকানো তথা সেখানে বাংলাদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে যারা নিজেদের স্বার্থপরিপন্থী মনে করেছে, সেটি হোক দেশের অভ্যন্তরে কিংবা দেশের বাইরে—তারাও জিয়ার হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না, সেই প্রশ্নেরও মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর এখন পর্যন্ত বেসামরিক আদালতে কোনো হত্যা মামলা হয়নি। কেন হয়নি তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পরিবারের তরফেই মামলা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তার চেয়ে বেশি জরুরি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন। সেই কমিশন গঠিত হতে পারে একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে। যে কমিশনে আইনজীবী, দুয়েকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং অপরাধবিজ্ঞানীকেও রাখা যেতে পারে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের তো বটেই।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার মেজর (অব.) মোজাফফরকে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার সুযোগ হতে পারে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অভিযানের আগে কর্মকর্তাদের কী বলা হয়েছিল? জিয়াকে হত্যা করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল? দ্বিতীয়ত, মেজর মোজাফফর যে ৪৫ বছর দেশে-বিদেশে পরিচয় আড়াল করে বসবাস করলেন, সেটি কাদের সহায়তায় সম্ভব হলো? কারা তাকে পালাতে, ভারতে থাকতে, বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করতে এবং পরে বাংলাদেশে ফিরতে সহায়তা করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা গেলেও হয়তো জিয়া হত্যার তদন্ত নতুন মোড় নিতে পারে। তবে তিনিও যে সব তথ্য জানেন, এমনটা নাও হতে পারে। আবার জিয়া হত্যার সঙ্গে যদি সত্যিই কোনো বিদেশি শক্তি জড়িত থাকে তাহলে শেষমেশ অমীমাংসিত রহস্যগুলোর জট কতটা খুলবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক
.png)

বিএনপি সরকারের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র আন্তরিকতা ও সাফল্যের সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব পালনের যে বিবরণ দিয়েছেন, সে বিষয়ে কেউ শতভাগ একমত কিংবা ভিন্নমত হবেন না।
১২ ঘণ্টা আগে
গত ২০ বছরে পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিককালে, কেবল জুলাই মাসেই ১২০টি ভূমি ও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, পাহাড় ধসের এই ভয়াবহতা কেন বাড়ছে এবং এর দায় কার?
১৪ ঘণ্টা আগে
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন নির্বাচন কমিশন ও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৬ ঘণ্টা আগে
উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবন আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে। উপকূলীয় অঞ্চলে জ্বলোচ্ছাসের কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। লবণাক্ততা বেড়ে সুপেয় পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। কৃষিজমির পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে কমছে। বায়ুমান নিম্নগামী হওয়ায় মানুষের আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে।
১৯ ঘণ্টা আগে