সরদার ফরিদ আহমদ

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮ বছর পূর্ণ হচ্ছে। দীর্ঘ এই যাত্রায় দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক। বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে। তবে সেই সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই। বরং একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে। তরুণরা কেন বিএনপি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতায় আসার পর এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ শুধু তার বর্তমান ভোটে নির্ধারিত হয় না। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় নতুন প্রজন্মের সমর্থনে। যে দল তরুণদের হারায়, সে দল হয়তো একটি নির্বাচন জিততে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
বিএনপির ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানকে তরুণরা পছন্দ করত। তার সততা, দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রনায়কোচিত ভাবমূর্তি তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল। তার রাজনৈতিক চিন্তায় ছিল নতুনত্ব। তিনি রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর কথা বলেছিলেন। ফলে একটি প্রজন্মের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস।
এরপর এলেন খালেদা জিয়া। তরুণদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আরও আবেগপূর্ণ। তার নেতৃত্বে ছাত্রদলের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা বিএনপির সঙ্গে তরুণদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পেছনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম, আপসহীনতা ও সংগ্রামী ভাবমূর্তি তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল।
খালেদা জিয়া শুধু দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না। অনেক তরুণের কাছে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক সাহসের প্রতীক। রাজপথে তার উপস্থিতি ছিল প্রেরণার উৎস। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার ভূমিকা তাকে একটি আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। এমনকি জুলাই বিপ্লবের তরুণদের মধ্যেও খালেদা জিয়ার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। কারণ তারা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে নিজেদের লড়াইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। তারেক রহমান দলের নেতৃত্বে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ বিএনপির সঙ্গে আগের মতো সংযুক্ত নয়।
বিশেষ করে জেন-জি। আরও নতুন প্রজন্ম, যাদের জেন-আলফা বলা হয়, তাদের সঙ্গেও বিএনপির সংযোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। এটি বিএনপির জন্য সতর্কবার্তা। কারণ জেন-জি রাজনীতি থেকে দূরে থাকা প্রজন্ম নয়। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে তারাই দেখিয়েছে, প্রয়োজনে তারা রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। জুলাই আন্দোলন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে। পরে তা পরিণত হয় বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে। শেষ পর্যন্ত হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। গবেষণাগুলোও দেখিয়েছে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন শুধু একটি নীতিগত দাবি নিয়ে ছিল না। এর মধ্যে ছিল মর্যাদা, অধিকার, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজ সাম্প্রতিক এক লেখায় জুলাইয়ের আন্দোলনকে শুধু একটি ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, এটি এমন এক গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল; যেখানে তরুণদের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি যুক্ত হয়। তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের সেই অভিজ্ঞতা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়।
এখানেই বিএনপির জন্য বড় শিক্ষা আছে। তরুণদের ছোট করে দেখলে চলবে না। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাদের ভাষা ভিন্ন। তাদের প্রত্যাশা ভিন্ন। তাদের রাজনীতির ধরনও ভিন্ন। তারা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা নেতা কী বলছেন, তার চেয়ে নেতা কী করছেন, সেটি বেশি দেখে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন করে। সমালোচনা করে। সংগঠিত হয়। প্রয়োজনে রাস্তায় নামে। এই প্রজন্মকে পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলে কাছে টানা কঠিন।
এখানে বিএনপির সমস্যা শুধু প্রজন্মগত নয়। সমস্যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও। জুলাই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে। তারা চেয়েছে নতুন রাজনীতি। নতুন নেতৃত্ব। চেয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি চলমান গবেষণাও দেখাচ্ছে, জুলাই আন্দোলন থেকে একটি নতুন যুব রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছে। আন্দোলন থেকে সংগঠন, সংগঠন থেকে রাজনৈতিক দল -- এই রূপান্তর বাংলাদেশের প্রচলিত দলীয় রাজনীতির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বিএনপির কিছু নেতার আচরণ তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যখন জুলাইয়ের তরুণদের তুচ্ছ করে কথা বলা হয়, তাদের রাজনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়; তখন সমস্যা শুধু একটি বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তরুণরা সেটিকে নিজেদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে নেয়। আর এখানেই ক্ষোভ তৈরি হয়।
বিএনপির নেতাদের বুঝতে হবে, জুলাইয়ের তরুণদের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্নও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই। কারণ তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তাদের সঙ্গে তর্ক করা যাবে। সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু তাদের অবজ্ঞা করা যাবে না।
এখানে বিএনপির জন্য আরেকটি বড় সমস্যা ছাত্ররাজনীতি। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের জন্য স্বস্তির বার্তা দেয়নি। বরং ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ছাত্রদলের প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এটি শুধু ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রশ্ন নয়। বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নও। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শুধু ছাত্র রাজনীতির জায়গা নয়। এখান থেকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। যে দল ক্যাম্পাসে তরুণদের আস্থা হারায়, সেই দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে বিএনপির একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবা দরকার। তরুণরা কি ছাত্রদলকে নিজেদের সংগঠন মনে করে? নাকি তারা ছাত্রদলকে পুরোনো ধারার রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দেখে? এর সদুত্তর খুঁজতে হবে বিএনপিকেই। শুধু মিছিল বাড়িয়ে নয়। শুধু হল কমিটি দিয়ে নয়। শুধু পোস্টার, ব্যানার আর স্লোগান দিয়ে নয়। তরুণদের রাজনীতি বোঝার জন্য বিএনপিকে তরুণদের কাছেই যেতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের সঙ্গে বসতে হবে। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
তরুণদের রাজনৈতিক আকর্ষণের কেন্দ্র এখন আর শুধু রাজনৈতিক দল নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা আসে ইউটিউব থেকে। ফেসবুক থেকে। টিকটক থেকে। পডকাস্ট থেকে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে। তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি দেখে। বিশ্বের অন্য দেশের তরুণদের আন্দোলন দেখে। তারা তুলনা করে। তারা প্রশ্ন করে, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? এই প্রজন্মের কাছে শুধু ‘দেশপ্রেম’ শব্দটি যথেষ্ট নয়।
দেশপ্রেমের বাস্তব রূপ তারা দেখতে চায়। চাকরি চায়। যোগ্যতার মূল্য চায়। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র চায়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা চায়। ন্যায্য সুযোগ চায়। প্রশাসনে স্বচ্ছতা চায়।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চায় না। রয়টার্সের নির্বাচনী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের বড় অগ্রাধিকার ছিল চাকরি, স্বচ্ছ শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার।
এখানে বিএনপির জন্য মূল শিক্ষাটি পরিষ্কার। তরুণদের কাছে যেতে হলে তাদের বাস্তব সমস্যার কাছে যেতে হবে। শুধু তারুণ্যের কথা বললে হবে না। তাদের কর্মসংস্থানের কথা বলতে হবে। শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললে হবে না। তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা কীভাবে চাকরিতে রূপান্তরিত হবে, সেটি বলতে হবে। শুধু গণতন্ত্রের কথা বললে হবে না। দলের ভেতরে গণতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটিও দেখাতে হবে। শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে হবে না। দলের নেতাকর্মীদের আচরণেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
এখানে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো ক্ষমতা। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায়। এখন তা বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। সরকার যদি তরুণদের জন্য দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব কমতে পারে। এজন্য শুধু সরকারি কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। দলের ভেতরেও পরিবর্তন দরকার।
বিএনপিকে তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। ৪০-৫০ বছর বয়সী নেতাদের পাশে ২০-৩০ বছর বয়সী নেতৃত্বকে জায়গা দিতে হবে। তাদের শুধু মিছিলের সামনে দাঁড় করালে হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আনতে হবে। নীতি নির্ধারণে আনতে হবে। সংসদে আনতে হবে। দলের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে আনতে হবে। তরুণদের বলতে দিতে হবে। ভুল করার সুযোগও দিতে হবে। কারণ নেতৃত্ব শেখানো যায় না শুধু বক্তৃতা দিয়ে। দায়িত্ব দিয়ে নেতৃত্ব তৈরি করতে হয়।
ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও বড় সংস্কার প্রয়োজন হতে পারে। ক্যাম্পাস দখলের রাজনীতি থেকে ছাত্র রাজনীতিকে বের করতে হবে। হল নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি থেকে বের করতে হবে। প্রতিপক্ষকে মারার রাজনীতি থেকে বের করতে হবে। ছাত্র রাজনীতিকে ফিরিয়ে নিতে হবে শিক্ষা, গবেষণা, বিতর্ক, অধিকার ও জাতীয় নীতি নির্ধারণের আলোচনায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র যেন বলতে পারে, ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া নয়। বরং একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এটি করা সম্ভব হলে ছাত্রদল আবার আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপিকে তরুণদের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। তরুণরা শুধু ভোট দেওয়ার মানুষ নয়। তারা রাজনৈতিক অংশীদার। এ পার্থক্যটি বিএনপিকে বুঝতে হবে। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘আমরা নেতা, তোমরা কর্মী’ -- এই মানসিকতা কাজ করবে না। বরং বলতে হবে, ‘আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ব।’
রাজনীতির ভাষাও বদলাতে হবে। পুরোনো স্লোগান নতুন বাস্তবতায় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। নতুন রাজনৈতিক ভাষা দরকার। নতুন রাজনৈতিক কল্পনা দরকার। নতুন বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন স্বপ্ন দরকার। তবে তার অর্থ জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ছুড়ে ফেলা নয়। খালেদা জিয়ার সংগ্রাম ভুলে যাওয়া নয়। বরং সেই উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় ব্যাখ্যা করা।
জিয়ার সততা কীভাবে আজকের রাজনীতিতে প্রতিফলিত হবে? খালেদার আপসহীনতা কীভাবে আজকের দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানে রূপ নেবে? জিয়ার জাতীয়তাবাদ কীভাবে আজকের তরুণের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হবে? এসবের উত্তর বিএনপিকে দিতে হবে। তরুণদের কাছে ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাস একা তাদের ধরে রাখে না। তাদের ভবিষ্যৎও দেখাতে হয়। এটাই বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জুলাইয়ের তরুণরা রাজনীতি থেকে পালিয়ে যায়নি। বরং তারা রাজনীতির পুরোনো কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাদের ভোটের আচরণও একেবারে একমুখী ছিল না। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিকে ভোট দিয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশাও প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকরা এটিকে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি এবং তরুণদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেছেন।
অর্থাৎ সুযোগ এখনো আছে। বিএনপি চাইলে সেই সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু তার জন্য তরুণদের জয় করতে হবে। জোর করে নয়। ভয় দেখিয়ে নয়। পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভর করে নয়। বিশ্বাস দিয়ে। তরুণদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে, তারা শুধু ক্ষমতার দল নয়। তারা পরিবর্তনের দলও।
তারা শুধু অতীতের উত্তরাধিকার নয়। তারা ভবিষ্যতের স্বপ্নও।
৪৮ বছর পূর্তিতে বিএনপির জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘আমরা কতবার ক্ষমতায় এসেছি?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত, আগামী ২০ বছরের বাংলাদেশ কি আমাদের সঙ্গে আছে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে এখনই ভাবতে হবে। কারণ তরুণরা কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। আজ তারা একজনকে সমর্থন করে।
কাল অন্য কাউকে করতে পারে। তারা যুক্তি খোঁজে। তারা ফলাফল খোঁজে। তারা সম্মান চায়। তারা অংশীদারিত্ব চায়।
বিএনপিকে তাই তরুণদের কাছে শুধু ভোট চাইতে গেলে হবে না। তাদের ভবিষ্যতের অংশীদার হতে হবে। জিয়ার বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সময়ের তরুণদের স্বপ্নকে ধারণ করা। খালেদা জিয়ার বিএনপির শক্তি ছিল তার সময়ের তরুণদের রাজনৈতিক আবেগকে ধারণ করা। এখন তারেক রহমানের বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ -- আজকের তরুণদের ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা। কাজটি যদি বিএনপি করতে পারে, তাহলে তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব কমবে। আর যদি না পারে, তাহলে ক্ষমতায় থেকেও একটি প্রজন্মকে হারানোর ঝুঁকি থাকবে।
রাজনীতিতে ক্ষমতা পাওয়া কঠিন। কিন্তু একটি প্রজন্মের আস্থা পাওয়া আরও কঠিন। আর একবার সেই আস্থা হারালে তা ফিরে পাওয়া আরও কঠিন। বিএনপির সামনে তাই এখন শুধু সরকার পরিচালনার পরীক্ষা নয়। একটি প্রজন্মকে বোঝার পরীক্ষাও। এতে বিএনপি কীভাবে উত্তীর্ণ হবে, সেটিই দেখার বিষয়।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮ বছর পূর্ণ হচ্ছে। দীর্ঘ এই যাত্রায় দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক। বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে। তবে সেই সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই। বরং একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে। তরুণরা কেন বিএনপি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতায় আসার পর এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ শুধু তার বর্তমান ভোটে নির্ধারিত হয় না। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় নতুন প্রজন্মের সমর্থনে। যে দল তরুণদের হারায়, সে দল হয়তো একটি নির্বাচন জিততে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
বিএনপির ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানকে তরুণরা পছন্দ করত। তার সততা, দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রনায়কোচিত ভাবমূর্তি তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল। তার রাজনৈতিক চিন্তায় ছিল নতুনত্ব। তিনি রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর কথা বলেছিলেন। ফলে একটি প্রজন্মের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস।
এরপর এলেন খালেদা জিয়া। তরুণদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আরও আবেগপূর্ণ। তার নেতৃত্বে ছাত্রদলের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা বিএনপির সঙ্গে তরুণদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পেছনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম, আপসহীনতা ও সংগ্রামী ভাবমূর্তি তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল।
খালেদা জিয়া শুধু দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না। অনেক তরুণের কাছে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক সাহসের প্রতীক। রাজপথে তার উপস্থিতি ছিল প্রেরণার উৎস। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার ভূমিকা তাকে একটি আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। এমনকি জুলাই বিপ্লবের তরুণদের মধ্যেও খালেদা জিয়ার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। কারণ তারা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে নিজেদের লড়াইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। তারেক রহমান দলের নেতৃত্বে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ বিএনপির সঙ্গে আগের মতো সংযুক্ত নয়।
বিশেষ করে জেন-জি। আরও নতুন প্রজন্ম, যাদের জেন-আলফা বলা হয়, তাদের সঙ্গেও বিএনপির সংযোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। এটি বিএনপির জন্য সতর্কবার্তা। কারণ জেন-জি রাজনীতি থেকে দূরে থাকা প্রজন্ম নয়। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে তারাই দেখিয়েছে, প্রয়োজনে তারা রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। জুলাই আন্দোলন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে। পরে তা পরিণত হয় বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে। শেষ পর্যন্ত হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। গবেষণাগুলোও দেখিয়েছে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন শুধু একটি নীতিগত দাবি নিয়ে ছিল না। এর মধ্যে ছিল মর্যাদা, অধিকার, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজ সাম্প্রতিক এক লেখায় জুলাইয়ের আন্দোলনকে শুধু একটি ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, এটি এমন এক গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল; যেখানে তরুণদের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি যুক্ত হয়। তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের সেই অভিজ্ঞতা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়।
এখানেই বিএনপির জন্য বড় শিক্ষা আছে। তরুণদের ছোট করে দেখলে চলবে না। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাদের ভাষা ভিন্ন। তাদের প্রত্যাশা ভিন্ন। তাদের রাজনীতির ধরনও ভিন্ন। তারা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা নেতা কী বলছেন, তার চেয়ে নেতা কী করছেন, সেটি বেশি দেখে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন করে। সমালোচনা করে। সংগঠিত হয়। প্রয়োজনে রাস্তায় নামে। এই প্রজন্মকে পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলে কাছে টানা কঠিন।
এখানে বিএনপির সমস্যা শুধু প্রজন্মগত নয়। সমস্যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও। জুলাই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে। তারা চেয়েছে নতুন রাজনীতি। নতুন নেতৃত্ব। চেয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি চলমান গবেষণাও দেখাচ্ছে, জুলাই আন্দোলন থেকে একটি নতুন যুব রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছে। আন্দোলন থেকে সংগঠন, সংগঠন থেকে রাজনৈতিক দল -- এই রূপান্তর বাংলাদেশের প্রচলিত দলীয় রাজনীতির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বিএনপির কিছু নেতার আচরণ তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যখন জুলাইয়ের তরুণদের তুচ্ছ করে কথা বলা হয়, তাদের রাজনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়; তখন সমস্যা শুধু একটি বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তরুণরা সেটিকে নিজেদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে নেয়। আর এখানেই ক্ষোভ তৈরি হয়।
বিএনপির নেতাদের বুঝতে হবে, জুলাইয়ের তরুণদের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্নও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই। কারণ তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তাদের সঙ্গে তর্ক করা যাবে। সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু তাদের অবজ্ঞা করা যাবে না।
এখানে বিএনপির জন্য আরেকটি বড় সমস্যা ছাত্ররাজনীতি। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের জন্য স্বস্তির বার্তা দেয়নি। বরং ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ছাত্রদলের প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এটি শুধু ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রশ্ন নয়। বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নও। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শুধু ছাত্র রাজনীতির জায়গা নয়। এখান থেকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। যে দল ক্যাম্পাসে তরুণদের আস্থা হারায়, সেই দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে বিএনপির একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবা দরকার। তরুণরা কি ছাত্রদলকে নিজেদের সংগঠন মনে করে? নাকি তারা ছাত্রদলকে পুরোনো ধারার রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দেখে? এর সদুত্তর খুঁজতে হবে বিএনপিকেই। শুধু মিছিল বাড়িয়ে নয়। শুধু হল কমিটি দিয়ে নয়। শুধু পোস্টার, ব্যানার আর স্লোগান দিয়ে নয়। তরুণদের রাজনীতি বোঝার জন্য বিএনপিকে তরুণদের কাছেই যেতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের সঙ্গে বসতে হবে। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
তরুণদের রাজনৈতিক আকর্ষণের কেন্দ্র এখন আর শুধু রাজনৈতিক দল নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা আসে ইউটিউব থেকে। ফেসবুক থেকে। টিকটক থেকে। পডকাস্ট থেকে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে। তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি দেখে। বিশ্বের অন্য দেশের তরুণদের আন্দোলন দেখে। তারা তুলনা করে। তারা প্রশ্ন করে, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? এই প্রজন্মের কাছে শুধু ‘দেশপ্রেম’ শব্দটি যথেষ্ট নয়।
দেশপ্রেমের বাস্তব রূপ তারা দেখতে চায়। চাকরি চায়। যোগ্যতার মূল্য চায়। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র চায়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা চায়। ন্যায্য সুযোগ চায়। প্রশাসনে স্বচ্ছতা চায়।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চায় না। রয়টার্সের নির্বাচনী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের বড় অগ্রাধিকার ছিল চাকরি, স্বচ্ছ শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার।
এখানে বিএনপির জন্য মূল শিক্ষাটি পরিষ্কার। তরুণদের কাছে যেতে হলে তাদের বাস্তব সমস্যার কাছে যেতে হবে। শুধু তারুণ্যের কথা বললে হবে না। তাদের কর্মসংস্থানের কথা বলতে হবে। শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললে হবে না। তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা কীভাবে চাকরিতে রূপান্তরিত হবে, সেটি বলতে হবে। শুধু গণতন্ত্রের কথা বললে হবে না। দলের ভেতরে গণতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটিও দেখাতে হবে। শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে হবে না। দলের নেতাকর্মীদের আচরণেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
এখানে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো ক্ষমতা। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায়। এখন তা বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। সরকার যদি তরুণদের জন্য দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব কমতে পারে। এজন্য শুধু সরকারি কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। দলের ভেতরেও পরিবর্তন দরকার।
বিএনপিকে তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। ৪০-৫০ বছর বয়সী নেতাদের পাশে ২০-৩০ বছর বয়সী নেতৃত্বকে জায়গা দিতে হবে। তাদের শুধু মিছিলের সামনে দাঁড় করালে হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আনতে হবে। নীতি নির্ধারণে আনতে হবে। সংসদে আনতে হবে। দলের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে আনতে হবে। তরুণদের বলতে দিতে হবে। ভুল করার সুযোগও দিতে হবে। কারণ নেতৃত্ব শেখানো যায় না শুধু বক্তৃতা দিয়ে। দায়িত্ব দিয়ে নেতৃত্ব তৈরি করতে হয়।
ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও বড় সংস্কার প্রয়োজন হতে পারে। ক্যাম্পাস দখলের রাজনীতি থেকে ছাত্র রাজনীতিকে বের করতে হবে। হল নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি থেকে বের করতে হবে। প্রতিপক্ষকে মারার রাজনীতি থেকে বের করতে হবে। ছাত্র রাজনীতিকে ফিরিয়ে নিতে হবে শিক্ষা, গবেষণা, বিতর্ক, অধিকার ও জাতীয় নীতি নির্ধারণের আলোচনায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র যেন বলতে পারে, ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া নয়। বরং একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এটি করা সম্ভব হলে ছাত্রদল আবার আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপিকে তরুণদের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। তরুণরা শুধু ভোট দেওয়ার মানুষ নয়। তারা রাজনৈতিক অংশীদার। এ পার্থক্যটি বিএনপিকে বুঝতে হবে। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘আমরা নেতা, তোমরা কর্মী’ -- এই মানসিকতা কাজ করবে না। বরং বলতে হবে, ‘আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ব।’
রাজনীতির ভাষাও বদলাতে হবে। পুরোনো স্লোগান নতুন বাস্তবতায় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। নতুন রাজনৈতিক ভাষা দরকার। নতুন রাজনৈতিক কল্পনা দরকার। নতুন বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন স্বপ্ন দরকার। তবে তার অর্থ জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ছুড়ে ফেলা নয়। খালেদা জিয়ার সংগ্রাম ভুলে যাওয়া নয়। বরং সেই উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় ব্যাখ্যা করা।
জিয়ার সততা কীভাবে আজকের রাজনীতিতে প্রতিফলিত হবে? খালেদার আপসহীনতা কীভাবে আজকের দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানে রূপ নেবে? জিয়ার জাতীয়তাবাদ কীভাবে আজকের তরুণের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হবে? এসবের উত্তর বিএনপিকে দিতে হবে। তরুণদের কাছে ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাস একা তাদের ধরে রাখে না। তাদের ভবিষ্যৎও দেখাতে হয়। এটাই বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জুলাইয়ের তরুণরা রাজনীতি থেকে পালিয়ে যায়নি। বরং তারা রাজনীতির পুরোনো কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাদের ভোটের আচরণও একেবারে একমুখী ছিল না। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিকে ভোট দিয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশাও প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকরা এটিকে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি এবং তরুণদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেছেন।
অর্থাৎ সুযোগ এখনো আছে। বিএনপি চাইলে সেই সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু তার জন্য তরুণদের জয় করতে হবে। জোর করে নয়। ভয় দেখিয়ে নয়। পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভর করে নয়। বিশ্বাস দিয়ে। তরুণদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে, তারা শুধু ক্ষমতার দল নয়। তারা পরিবর্তনের দলও।
তারা শুধু অতীতের উত্তরাধিকার নয়। তারা ভবিষ্যতের স্বপ্নও।
৪৮ বছর পূর্তিতে বিএনপির জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘আমরা কতবার ক্ষমতায় এসেছি?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত, আগামী ২০ বছরের বাংলাদেশ কি আমাদের সঙ্গে আছে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে এখনই ভাবতে হবে। কারণ তরুণরা কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। আজ তারা একজনকে সমর্থন করে।
কাল অন্য কাউকে করতে পারে। তারা যুক্তি খোঁজে। তারা ফলাফল খোঁজে। তারা সম্মান চায়। তারা অংশীদারিত্ব চায়।
বিএনপিকে তাই তরুণদের কাছে শুধু ভোট চাইতে গেলে হবে না। তাদের ভবিষ্যতের অংশীদার হতে হবে। জিয়ার বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সময়ের তরুণদের স্বপ্নকে ধারণ করা। খালেদা জিয়ার বিএনপির শক্তি ছিল তার সময়ের তরুণদের রাজনৈতিক আবেগকে ধারণ করা। এখন তারেক রহমানের বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ -- আজকের তরুণদের ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা। কাজটি যদি বিএনপি করতে পারে, তাহলে তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব কমবে। আর যদি না পারে, তাহলে ক্ষমতায় থেকেও একটি প্রজন্মকে হারানোর ঝুঁকি থাকবে।
রাজনীতিতে ক্ষমতা পাওয়া কঠিন। কিন্তু একটি প্রজন্মের আস্থা পাওয়া আরও কঠিন। আর একবার সেই আস্থা হারালে তা ফিরে পাওয়া আরও কঠিন। বিএনপির সামনে তাই এখন শুধু সরকার পরিচালনার পরীক্ষা নয়। একটি প্রজন্মকে বোঝার পরীক্ষাও। এতে বিএনপি কীভাবে উত্তীর্ণ হবে, সেটিই দেখার বিষয়।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
.png)

যেকোনো সরকারি ই-মেইল থেকে কখনো কখনো দুই দেশের সম্পর্কের গোপন বার্তা বোঝা যায়। এ মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে পাঠানো একটি ই-মেইল তেমনই একটি ঘটনা ঘটায়। সেই ই-মেইলে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রতি সপ্তাহে যে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান হয়, তা এবার হবে না। কারণ হিসেবে জানানো হয়, বাংলাদে
৩২ মিনিট আগে-2d6530-720x405-cf1efb.webp)
গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কিংবা অনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা নতুন কোনো বিষয় না হলেও এই ধরনের অনৈতিক চর্চা একাডেমিক পরিসরে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আমরা সেই অনৈতিক চর্চা বারবার দেখতে পাই? বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে এবং বুঝতে হলে বাংলাদেশের একাডেমিক পরিসরে আমরা যে
১৯ ঘণ্টা আগে
ঘটনাটি পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটেছে বলে ভিডিওতে প্রতীয়মান হয়। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও কীভাবে কয়েকজন ব্যক্তি একজন নারীকে প্রকাশ্যে আঘাত করার সুযোগ পেলেন?
৩১ আগস্ট ২০২৬
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। সামরিক শক্তিমত্তা গড়ে ওঠে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দেশীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সমরাস্ত্র কেনাকাটায় বাংলাদেশ আ
৩০ আগস্ট ২০২৬