হামের আকস্মিক প্রকোপ কেন আর কী করা যায়

লেখা:
লেখা:
মো. সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ২৬
এআই জেনারেটেড ছবি

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হঠাৎ করেই হামের প্রকোপ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পত্রপত্রিকা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। হাম মূলত বায়ুবাহিত অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। দীর্ঘ একটা সময় ধরে দেশে এই রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এই সংক্রামক ব্যাধির এমন প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর হার আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

কেন এই হঠাৎ প্রাদুর্ভাব?

আমরা একটি বিষয় নিয়ে গর্ববোধ করতাম, আর তা হলো আমাদের সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই প্রোগ্রাম। এই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে বাধ্যতামূলকভাবে মিজেলস বা হামের টিকা দেওয়া হয়। এই ভ্যাকসিনটি অত্যন্ত কার্যকর হওয়ার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে দেশে হামের প্রকোপ ছিল না বললেই চলে। তাহলে এই সময়ে এসে হঠাৎ রোগটি কেন বেড়ে গেল? এর পেছনে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে বলে আমি মনে করি।

প্রথমত, আমাদের টিকাদান কর্মসূচিতে কোথাও কোনো বড় ধরনের শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে। যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে, তারা হয়তো ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ ঠিকমতো পায়নি। হতে পারে একটি ডোজ দেওয়া হয়েছে, আরেকটি বাদ পড়েছে, অথবা কোনো ডোজই তারা পায়নি। বিশেষ করে কিছু দুর্গম গ্রাম এলাকা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল বা শহরের বস্তি এলাকাগুলোতে এই প্রবণতা বেশি। এসব এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবে অনেক শিশুই টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, একটি বড় কারণ হতে পারে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব। গত কয়েক বছর আগে আমরা যখন কোভিডের চরম পর্যায় পার করছিলাম, তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই সময়ে সরকার, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কেবল কোভিড। ফলে অনেক বাবা-মা তাদের শিশুদের নিয়মিত টিকা দিতে হাসপাতাল বা টিকাদান কেন্দ্রে যাননি। ওই সময়ে যে শিশুগুলো টিকাদান থেকে বাদ পড়েছিল, তারাই এই সংক্রমণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

তৃতীয়ত, ভ্যাকসিনের গুণগত মান ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভ্যাকসিনের সংকট তৈরি হয়েছে বা পর্যাপ্ত টিকা কেনা হয়নি। যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। এছাড়া, গ্রাম পর্যায়ে টিকা পৌঁছানো পর্যন্ত যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তা সংরক্ষণ করতে হয়। সেখানে কোনো ত্রুটি থাকলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। কার্যকারিতা হারানো টিকা দিলে তা শিশুদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে না।

শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো কী?

হাম হলে যে শিশুমৃত্যু অবধারিত, বিষয়টি তেমন নয়। তবে বর্তমানে যে শিশুগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ হচ্ছে বা যারা মারা যাচ্ছে, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম আগে থেকেই মারাত্মকভাবে দুর্বল। একটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পেছনে অপুষ্টি বা শরীরে বাসা বেঁধে থাকা অন্য কোনো রোগ বড় ভূমিকা পালন করে।

হামের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং সম্পূর্ণ কার্যকর কোনো চিকিৎসা এখনও আমাদের জানা নেই। তাই যে কোনো উপসর্গ দেখা গেলেই দ্রুত তার চিকিৎসা নিতে হবে। কেবল সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদারকরণ এবং সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতাই পারে আমাদের শিশুদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে।

হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে খুব সহজেই ১২-১৮ জনের মাঝে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাম মূলত শ্বাসতন্ত্র বা রেসপিরেটরি সিস্টেমকে আক্রমণ করে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসের আক্রমণে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন কমে যায়, তখন সেকেন্ডারি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। ইনফেকশন হিসেবে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঘটে এবং ত্বক, চোখ বা শরীরের অন্যান্য অংশে সংক্রমণ দেখা যায়। হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ হলো নিউমোনিয়া। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এর ফলে শিশুর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং একপর্যায়ে শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এছাড়াও ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিস এর মত রোগেও শিশু সহজে আক্রান্ত হতে পারে এবং এগুলোও মৃত্যু ঘটাতে পারে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও আসন্ন ঝুঁকি

এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি কি মহামারির দিকে যাচ্ছে? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে যদি বলি, "আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই", তবে তা হয়তো পুরোপুরি সঠিক বলা হবে না। কারণ, যে রোগটি আমাদের দেশে এন্ডেমিক বা স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল, তা এখন আউটব্রেক বা অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের দিকে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা বা হেলথকেয়ার সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা। হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় সাধারণ হাসপাতালের যেকোনো ওয়ার্ডে এই রোগীদের রেখে চিকিৎসা করানো উচিৎ নয়। একজন ক্যান্সার, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগীর পাশে যদি একজন হামের রোগীকে রাখা হয়, তবে ওই সাধারণ রোগীরাও দ্রুত সংক্রমিত হতে পারেন। এর জন্য কোভিডের মতোই বিশেষায়িত আইসোলেশন ওয়ার্ড বা সংক্রামক ব্যাধির রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে এ ধরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কী করা উচিত

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে অতি দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, কেন শিশুদের হাম হচ্ছে তার মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ভ্যাকসিনের অভাব, কোল্ড চেইন নষ্ট হওয়া নাকি শিশুদের ড্রপ আউট হওয়া—কোনটি প্রধান কারণ, তা নিরূপণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশে যদি পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না থাকে, তবে জরুরি ভিত্তিতে তা আমদানি করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনতে হবে।

পাশাপাশি, সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলার জন্য প্রতিটি সরকারি ও বড় বেসরকারি হাসপাতালে আগে থেকেই বিশেষায়িত ওয়ার্ড বা আইসোলেশন ইউনিট প্রস্তুত রাখতে হবে। কোভিডের সময় আমরা যেমন দেখেছি যে রোগী আছে কিন্তু শয্যা নেই। হামের ক্ষেত্রেও যেন সেই একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ

যাদের বাড়িতে ছোট শিশু রয়েছে, এই মুহূর্তে তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো—অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন। শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ, যেমন: জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং চামড়ায় র‍্যাশ বা লালচে দাগ দেখা দিলে কালক্ষেপণ করবেন না। দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যাবে, নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তত কমে যাবে।

পরিবারের কোনো এক শিশুর হাম হলে তাকে অন্যান্য শিশু ও সুস্থ সদস্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে যাতে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে। আর যেহেতু এটি একটি বায়ুবাহিত রেসপিরেটরি ইনফেকশন, তাই যেসব জায়গায় মানুষের ভিড় বেশি সেসব স্থানে চলাচলের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে। এমনকি মাস্ক ব্যবহারের অভ্যাসও চালু করা যেতে পারে।

হামের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং সম্পূর্ণ কার্যকর কোনো চিকিৎসা এখনও আমাদের জানা নেই। তাই যে কোনো উপসর্গ দেখা গেলেই দ্রুত তার চিকিৎসা নিতে হবে। কেবল সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদারকরণ এবং সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতাই পারে আমাদের শিশুদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে। আসুন, আতঙ্কিত না হয়ে আমরা সবাই মিলে সচেতনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সভাপতি

সম্পর্কিত