সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর। সেই সম্পর্ক যদি বুলেট আর ব্যারিকেডের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তবে বনও বাঁচবে না, বনজীবীও বাঁচবে না। আমিনুর রহমানের মৃত্যু আমাদের সেই কঠিন সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাসের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায় শুরু করা।
মুজাহিদুল ইসলাম

সুন্দরবন কেবল ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এক বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস। এই বনের কাদামাটি, জল আর বৃক্ষরাজির সঙ্গে যাদের নিত্য বসবাস, সেই বাওয়ালি, মৌয়াল আর জেলেদের কাছে সুন্দরবন একাধারে জীবিকার আধার ও কঠিন প্রতিপক্ষ। বাঘের ভয়, কুমিরের হানা আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সঙ্গী করেই তাদের জীবন চলে। কিন্তু বনজীবীদের এই কঠিন জীবনে যখন বনরক্ষকদের বুলেট প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তখন বন ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয়দের মধ্যকার আস্থার ভিত পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বনবিভাগের কর্মকর্তার গুলিতে জেলে আমিনুর রহমান গাজীর নিহত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী সহিংসতা এই আস্থাহীনতারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন।
ঘটনাটি সরল চোখে একটি দুর্ঘটনা বা ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মনে হতে পারে। বনবিভাগের ভাষ্যমতে, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের অভিযান চলছিল; কাদের গুলিতে ওই জেলের মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে, নিহত জেলের সহকর্মীদের অভিযোগ স্পষ্ট—কাঁকড়া আহরণের সময় বনরক্ষীদের থামার সংকেত পেয়ে নৌকা থামাতে সামান্য দেরি হওয়ায় নলিয়ান স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরাসরি গুলি চালান। এই পরস্পরবিরোধী ভাষ্যের মাঝে যে সত্যটি প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো বনজীবী ও বনরক্ষকদের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে কতটা ভঙ্গুর ও সাংঘর্ষিক। একটি বুলেট কেবল আমিনুর রহমানের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, তা বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেকার ন্যূনতম বিশ্বাসের সম্পর্ককেও ছিন্নভিন্ন করেছে।
এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিক্ষুব্ধ জনতার বনবিভাগের অফিসে হামলা, ভাঙচুর করেছে; একইসঙ্গে কর্মীদের ওপর মারধরের ঘটনা ঘটেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এই সহিংসতা একদিনে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা আর অবিচারের বহিঃপ্রকাশ। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বক্তব্যে সেই ক্ষোভের আঁচ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, “জলদস্যুরা সুন্দরবনজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও বনবিভাগ বা কোস্টগার্ড তাদের টিকিটি ছুঁতে পারছে না। অথচ নিরীহ জেলেদের ওপর গুলি চালিয়ে লাখ লাখ বনজীবীর মনে ভীতি ছড়ানো হচ্ছে।”
এখানে কিছু তথ্য ও প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে সরকারিভাবে 'দস্যুমুক্ত' ঘোষণা করা হলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ, এখনও বনদস্যুরা বনে অবাধে বিচরণ করছে এবং জেলে-মৌয়ালদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা আদায় করছে। বনের ভেতরে এখনো প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় বিষ দিয়ে মাছ শিকার, অবৈধভাবে কাঠ পাচার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের মতো অপরাধ চলছে। যারা বনের প্রকৃত শত্রু—অর্থাৎ সংঘবদ্ধ চোরাশিকারি বা প্রভাবশালী দখলদার—তাদের বিরুদ্ধে বনবিভাগের তৎপরতা প্রায়শই নিষ্ক্রিয় থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে বনে যাওয়া সাধারণ জেলে বা মৌয়ালদের সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি কঠোর হস্তে দমন করা হয়।
বর্তমানে সুন্দরবনের মোট আয়তনের প্রায় ৫২ শতাংশ এলাকাকে 'অভয়ারণ্য' ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে সাধারণের প্রবেশ ও সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং পেটের দায়ে অনেক জেলেই বাধ্য হয়ে এসব এলাকায় প্রবেশ করেন। ‘দুর্বলের ওপর শৌর্য প্রদর্শন’-এর এই নীতিই বনবিভাগকে সাধারণ মানুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
বন সংরক্ষণের জন্য কঠোর আইন এবং তার প্রয়োগ অবশ্যই জরুরি। কেননা সুন্দরবনের মতো একটি বিশ্ব ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) এবং এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ বা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আইন প্রয়োগের পদ্ধতিটি কী হবে?
বনরক্ষকদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয়েছে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য, সংঘবদ্ধ সশস্ত্র দস্যুদের মোকাবিলা করার জন্য; নিরস্ত্র জেলেদের গুলি করার জন্য নয়। একটি স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের কাজ হওয়া উচিত বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির (যেমন: ড্রোন, জিপিএস ট্র্যাকিং) সাহায্যে অপরাধ দমন করা, বুলেটের জোরে নয়। সামান্য দেরির কারণে গুলি চালানোর মতো ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল অপেশাদার আচরণ নয়, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সুস্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ।
এই ঘটনা বন ব্যবস্থাপনার গভীর পদ্ধতিগত সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে। যুগ যুগ ধরে বনজীবী সম্প্রদায় তাদের প্রথাগত জ্ঞান দিয়ে এই বনকে চিনেছে এবং এর সাথে এক ধরনের টেকসই সহাবস্থান তৈরি করেছে। আধুনিক বন ব্যবস্থাপনার উচিত ছিল এই জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি সুরক্ষা মডেল তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বনজীবীদের ‘বহিরাগত’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। যখন বনরক্ষকরা স্থানীয়দের শত্রু ভাবা শুরু করেন এবং স্থানীয়রা বনরক্ষকদের অত্যাচারী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন, তখন বন সংরক্ষণ সহযোগিতার বদলে একটি নীরব যুদ্ধের রূপ নেয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কয়েকটি গঠনমূলক ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
প্রথমত, আমিনুর রহমান হত্যার ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। যদি কোনো বন কর্মকর্তা বা কর্মী এই ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন, তবে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নিহতের পরিবারকে ন্যায়বিচার দেওয়ার পাশাপাশি বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর মনে আস্থা ফেরানোর এটিই প্রথম শর্ত।
দ্বিতীয়ত, বনবিভাগের কর্মীদের জন্য সংবেদনশীলতা, মানবাধিকার এবং ‘ডি-এসকেলেশন’ (উত্তেজনা প্রশমন) সংক্রান্ত আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কখন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে করা যাবে (রুলস অব এনগেজমেন্ট), সে সম্পর্কে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও তার শতভাগ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
তৃতীয়ত, বন ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ‘কো-ম্যানেজমেন্ট’ বা সহ-ব্যবস্থাপনার আদলে ‘কমিউনিটি পেট্রোলিং’ বা যৌথ টহলের মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে পারস্পরিক আস্থা বাড়বে এবং বন সুরক্ষায় স্থানীয়দের দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। এর পাশাপাশি, অভয়ারণ্য সম্প্রসারণের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া বনজীবীদের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রসার ঘটাতে হবে।
সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর। সেই সম্পর্ক যদি বুলেট আর ব্যারিকেডের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তবে বনও বাঁচবে না, বনজীবীও বাঁচবে না। আমিনুর রহমানের মৃত্যু আমাদের সেই কঠিন সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাসের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায় শুরু করা। নইলে এমন আরও অনেক বুলেট সুন্দরবনের পরিবেশ ও স্থানীয় সমাজ কাঠামোকে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে, যা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য হতে পারে না।
মুজাহিদুল ইসলাম: সংবাদকর্মী

সুন্দরবন কেবল ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এক বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস। এই বনের কাদামাটি, জল আর বৃক্ষরাজির সঙ্গে যাদের নিত্য বসবাস, সেই বাওয়ালি, মৌয়াল আর জেলেদের কাছে সুন্দরবন একাধারে জীবিকার আধার ও কঠিন প্রতিপক্ষ। বাঘের ভয়, কুমিরের হানা আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সঙ্গী করেই তাদের জীবন চলে। কিন্তু বনজীবীদের এই কঠিন জীবনে যখন বনরক্ষকদের বুলেট প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তখন বন ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয়দের মধ্যকার আস্থার ভিত পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বনবিভাগের কর্মকর্তার গুলিতে জেলে আমিনুর রহমান গাজীর নিহত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী সহিংসতা এই আস্থাহীনতারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন।
ঘটনাটি সরল চোখে একটি দুর্ঘটনা বা ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মনে হতে পারে। বনবিভাগের ভাষ্যমতে, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের অভিযান চলছিল; কাদের গুলিতে ওই জেলের মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে, নিহত জেলের সহকর্মীদের অভিযোগ স্পষ্ট—কাঁকড়া আহরণের সময় বনরক্ষীদের থামার সংকেত পেয়ে নৌকা থামাতে সামান্য দেরি হওয়ায় নলিয়ান স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরাসরি গুলি চালান। এই পরস্পরবিরোধী ভাষ্যের মাঝে যে সত্যটি প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো বনজীবী ও বনরক্ষকদের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে কতটা ভঙ্গুর ও সাংঘর্ষিক। একটি বুলেট কেবল আমিনুর রহমানের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, তা বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেকার ন্যূনতম বিশ্বাসের সম্পর্ককেও ছিন্নভিন্ন করেছে।
এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিক্ষুব্ধ জনতার বনবিভাগের অফিসে হামলা, ভাঙচুর করেছে; একইসঙ্গে কর্মীদের ওপর মারধরের ঘটনা ঘটেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এই সহিংসতা একদিনে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা আর অবিচারের বহিঃপ্রকাশ। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বক্তব্যে সেই ক্ষোভের আঁচ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, “জলদস্যুরা সুন্দরবনজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও বনবিভাগ বা কোস্টগার্ড তাদের টিকিটি ছুঁতে পারছে না। অথচ নিরীহ জেলেদের ওপর গুলি চালিয়ে লাখ লাখ বনজীবীর মনে ভীতি ছড়ানো হচ্ছে।”
এখানে কিছু তথ্য ও প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে সরকারিভাবে 'দস্যুমুক্ত' ঘোষণা করা হলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ, এখনও বনদস্যুরা বনে অবাধে বিচরণ করছে এবং জেলে-মৌয়ালদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা আদায় করছে। বনের ভেতরে এখনো প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় বিষ দিয়ে মাছ শিকার, অবৈধভাবে কাঠ পাচার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের মতো অপরাধ চলছে। যারা বনের প্রকৃত শত্রু—অর্থাৎ সংঘবদ্ধ চোরাশিকারি বা প্রভাবশালী দখলদার—তাদের বিরুদ্ধে বনবিভাগের তৎপরতা প্রায়শই নিষ্ক্রিয় থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে বনে যাওয়া সাধারণ জেলে বা মৌয়ালদের সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি কঠোর হস্তে দমন করা হয়।
বর্তমানে সুন্দরবনের মোট আয়তনের প্রায় ৫২ শতাংশ এলাকাকে 'অভয়ারণ্য' ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে সাধারণের প্রবেশ ও সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং পেটের দায়ে অনেক জেলেই বাধ্য হয়ে এসব এলাকায় প্রবেশ করেন। ‘দুর্বলের ওপর শৌর্য প্রদর্শন’-এর এই নীতিই বনবিভাগকে সাধারণ মানুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
বন সংরক্ষণের জন্য কঠোর আইন এবং তার প্রয়োগ অবশ্যই জরুরি। কেননা সুন্দরবনের মতো একটি বিশ্ব ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) এবং এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ বা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আইন প্রয়োগের পদ্ধতিটি কী হবে?
বনরক্ষকদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয়েছে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য, সংঘবদ্ধ সশস্ত্র দস্যুদের মোকাবিলা করার জন্য; নিরস্ত্র জেলেদের গুলি করার জন্য নয়। একটি স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের কাজ হওয়া উচিত বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির (যেমন: ড্রোন, জিপিএস ট্র্যাকিং) সাহায্যে অপরাধ দমন করা, বুলেটের জোরে নয়। সামান্য দেরির কারণে গুলি চালানোর মতো ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল অপেশাদার আচরণ নয়, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সুস্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ।
এই ঘটনা বন ব্যবস্থাপনার গভীর পদ্ধতিগত সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে। যুগ যুগ ধরে বনজীবী সম্প্রদায় তাদের প্রথাগত জ্ঞান দিয়ে এই বনকে চিনেছে এবং এর সাথে এক ধরনের টেকসই সহাবস্থান তৈরি করেছে। আধুনিক বন ব্যবস্থাপনার উচিত ছিল এই জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি সুরক্ষা মডেল তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বনজীবীদের ‘বহিরাগত’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। যখন বনরক্ষকরা স্থানীয়দের শত্রু ভাবা শুরু করেন এবং স্থানীয়রা বনরক্ষকদের অত্যাচারী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন, তখন বন সংরক্ষণ সহযোগিতার বদলে একটি নীরব যুদ্ধের রূপ নেয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কয়েকটি গঠনমূলক ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
প্রথমত, আমিনুর রহমান হত্যার ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। যদি কোনো বন কর্মকর্তা বা কর্মী এই ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন, তবে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নিহতের পরিবারকে ন্যায়বিচার দেওয়ার পাশাপাশি বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর মনে আস্থা ফেরানোর এটিই প্রথম শর্ত।
দ্বিতীয়ত, বনবিভাগের কর্মীদের জন্য সংবেদনশীলতা, মানবাধিকার এবং ‘ডি-এসকেলেশন’ (উত্তেজনা প্রশমন) সংক্রান্ত আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কখন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে করা যাবে (রুলস অব এনগেজমেন্ট), সে সম্পর্কে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও তার শতভাগ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
তৃতীয়ত, বন ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ‘কো-ম্যানেজমেন্ট’ বা সহ-ব্যবস্থাপনার আদলে ‘কমিউনিটি পেট্রোলিং’ বা যৌথ টহলের মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে পারস্পরিক আস্থা বাড়বে এবং বন সুরক্ষায় স্থানীয়দের দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। এর পাশাপাশি, অভয়ারণ্য সম্প্রসারণের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া বনজীবীদের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রসার ঘটাতে হবে।
সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর। সেই সম্পর্ক যদি বুলেট আর ব্যারিকেডের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তবে বনও বাঁচবে না, বনজীবীও বাঁচবে না। আমিনুর রহমানের মৃত্যু আমাদের সেই কঠিন সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাসের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায় শুরু করা। নইলে এমন আরও অনেক বুলেট সুন্দরবনের পরিবেশ ও স্থানীয় সমাজ কাঠামোকে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে, যা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য হতে পারে না।
মুজাহিদুল ইসলাম: সংবাদকর্মী

দেশের অধিকাংশ কৃষক-উৎপাদকের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। পণ্য আছে, দক্ষ হাতও আছে, কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর কার্যকর পথ নেই। সেই পথ তৈরির লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নেতৃত্ব এবার সামনে এনেছে ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট বা ওভিওপি উদ্যোগ।
৩ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে (১২-১৫ মে) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনটি কেবল গত বছরের দক্ষিণ কোরিয়া চুক্তির ধারাবাহিকতা ছিল না, বরং তা ছিল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নাটকীয় ভ
৪ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কালটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যেখানে ইসরায়েল-আমেরিকার সরাসরি ইরান অভিমুখে সামরিক অভিযান বিশ্বব্যবস্থাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
১ দিন আগে
চুক্তিতে একটি সুস্পষ্ট ‘এক্সিট ক্লজ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে মাত্র ৬০ দিনের নোটিশে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভবিষ্যৎ কোনো সংসদকে এই চুক্তির বেড়াজালে বেঁধে রাখেনি।
১ দিন আগে