গ্রাম থেকে বিশ্ববাজার: ওভিওপির সম্ভাবনা ও বাস্তবতার হিসাব

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম কিংবা নওগাঁর মৃৎশিল্প, অধিকাংশ কৃষক-উৎপাদকের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। পণ্য আছে, দক্ষ হাতও আছে, কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর কার্যকর পথ নেই। সেই পথ তৈরির লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নেতৃত্ব এবার সামনে এনেছে ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট বা ওভিওপি উদ্যোগ।

প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ১৪: ০৪
এআই জেনারেটেড ছবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক আমচাষির সঙ্গে কিছুদিন আগে কথা হয়েছিল। ফজলি আমের বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, আমের চাহিদা আছে, বিক্রিও হয়, কিন্তু ন্যায্য দামটা শেষ পর্যন্ত ঠিক করেন মধ্যস্বত্বভোগীরাই। নেই কোনো ভালো প্যাকেজিং, নেই নিজস্ব ব্র্যান্ড, ক্রেতার সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ নেই। মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখেছি, নওগাঁর মৃৎশিল্পী হোক কিংবা নাটোরের কাঁসাশিল্পী, অধিকাংশ মানুষের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। পণ্য আছে, দক্ষ হাতও আছে, কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর কার্যকর পথ নেই। সেই পথ তৈরির লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নেতৃত্ব এবার সামনে এনেছে ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট বা ওভিওপি উদ্যোগ।

বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অগ্রাধিকারে উঠে এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও সক্রিয়ভাবে মূলধারায় যুক্ত করার বিষয়টি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা, অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং রফতানিতে বৈচিত্র্য বাড়ানোর যে দিকনির্দেশনা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেওয়া হয়েছে, ওভিওপি উদ্যোগকে মূলত সেই ভাবনাগুলোর বাস্তব প্রয়োগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

৫২টি ব্যাংককে যুক্ত করে ১০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ এবং তিন বছরে ৬৮ হাজার গ্রামে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা, এই উদ্যোগটিকে কেবল একটি ঋণ কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার চাইছে গ্রামের অর্থনীতিকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে।

উদ্যোগটিকে স্বাগত জানানোর কারণ আছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের চেহারাটা কতটা নাজুক? প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসছে প্রায় ২০ লাখ নতুন মানুষ, অথচ ৮৪ শতাংশ কর্মী এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে আটকে আছেন। কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা ২০০০ সালের ১.১ থেকে নেমে এখন মাত্র ০.১২। রফতানির ৮২ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একটা খাতের ওপর এত বেশি নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ওভিওপি সেই কাঠামো বদলানোর একটি সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা।

প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসছে প্রায় ২০ লাখ নতুন মানুষ, অথচ ৮৪ শতাংশ কর্মী এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে আটকে আছেন। কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা ২০০০ সালের ১.১ থেকে নেমে এখন মাত্র ০.১২। রফতানির ৮২ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একটা খাতের ওপর এত বেশি নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ওভিওপি সেই কাঠামো বদলানোর একটি সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কোনো না কোনো পরিচিত বা সম্ভাবনাময় পণ্য রয়েছে। রাজশাহীর আম, টাঙ্গাইলের শাড়ি, কুমিল্লার খাদি, রংপুরের শতরঞ্জি, সিলেটের সাতকড়া, খুলনার চুইঝাল, ভোলার মহিষের দুধের দই, জামালপুরের ছানার পোলাও, বান্দরবানের পাহাড়ি আনারস কিংবা সাতক্ষীরার সন্দেশ তারই উদাহরণ। স্থানীয় পর্যায়ে এসব পণ্যের পরিচিতি থাকলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এখনো সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর তত্ত্বাবধানের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় খাতই বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ওভিওপি উদ্যোগের মাধ্যমে এসব পণ্যকে ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় এনে বৈশ্বিক বাজারে পরিচিত করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মসূচি সাতটি মূল স্তম্ভের ওপর গড়ে উঠেছে। প্রথমে ৬৪ জেলার বিখ্যাত পণ্য চিহ্নিত করে উৎপাদকদের ক্লাস্টারে সংগঠিত করা হবে। প্রতিটি ক্লাস্টারে অন্তত ৫০ জন উৎপাদক একই পণ্য নিয়ে কাজ করবেন। এরপর উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সরবরাহ ও রফতানিকে একসঙ্গে যুক্ত করে ভ্যালু চেইন তৈরি করা হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অর্থায়ন। জামানতের বদলে ভ্যালু চেইনভিত্তিক ঋণ দেওয়া হবে, যাতে জমি বা সম্পদ না থাকলেও গ্রামীণ উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে পারেন। এ জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ও ৫২টি ব্যাংক যুক্ত করা হয়েছে।

বাজার ও রফতানির জন্য ‘বাংলাদেশ ওভিওপি’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জিআই ট্যাগযুক্ত পণ্য যেমন রাজশাহীর আম বা জামদানি শাড়িকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে কর্মসূচি পরিচালনা, উৎপাদকদের প্রশিক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও থাকবে।

ডিজিটাল প্রযুক্তিকেও বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উৎপাদককে ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনা হবে। বিকল্প তথ্য দিয়ে ক্রেডিট স্কোর তৈরি হবে এবং কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের উৎস জানা যাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতার আস্থা বাড়বে।

কর্মসূচি তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে। প্রথম বছরে ক্লাস্টার নির্বাচন ও প্রাথমিক অর্থায়ন, দ্বিতীয় বছরে বাজার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ, আর তৃতীয় বছরে ৬৮ হাজার গ্রামে পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে। লক্ষ্য হলো এক কোটির বেশি উৎপাদক ও উদ্যোক্তাকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা।

তাহলে কি এই ধারণা সত্যিই কাজ করে? হ্যাঁ, করে। তবে সহজে নয়। জাপানের ওইতা প্রিফেকচার ১৯৭৯ সালে এই মডেল শুরু করেছিল। দুই দশকের ধারাবাহিক পরিশ্রমে মোট বিক্রয় ৩৩০ মিলিয়ন থেকে ১,৩০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। থাইল্যান্ড একই মডেলে ২০০১ সাল থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের মধ্যে রফতানি আয় শূন্য থেকে ৩০০ কোটি ডলারে নিয়ে গেছে। ভিয়েতনাম মান নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিয়ে কৃষি ও হস্তশিল্প পণ্যকে রফতানিযোগ্য করে তুলেছে। ইন্দোনেশিয়া ক্লাস্টার পদ্ধতিতে ছোট উৎপাদকদের একসঙ্গে বাজারে নিয়ে আসার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই প্রতিটি উদাহরণ বলছে একটাই কথা। ফল পেতে সময় লাগে, তাড়াহুড়ো করলে হোঁচট খেতে হয়।

তবে এখানে একটা সৎ প্রশ্ন করা দরকার। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সম্পর্ক কি এতদিন সুখের ছিল? উত্তরটা সহজ নয়। বছরের পর বছর ধরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংকের দরজায় গিয়ে ফিরে এসেছেন। জামানত নেই, নথিপত্র নেই, এই কারণ দেখিয়ে দরজা বন্ধ রাখার অভিযোগ পুরনো। গ্রামীণ ঋণ বিতরণে গড়িমসির অভিযোগ বহুবার উঠেছে, বহু তদন্তে সত্য বলে প্রমাণিতও হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনামূলক ঋণ কর্মসূচিগুলোতেও লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে বিতরণ হয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে। কৃষি ও এসএমই ঋণে ব্যাংকগুলোর অনীহার পেছনে শুধু নিয়মের সমস্যা নেই, মানসিকতারও সমস্যা আছে।

ওভিওপি সেই পুরনো কাঠামোর ভেতরেই কাজ করবে। তাই কাঠামোটা না বদলালে ফলাফল বদলাবে না। এই ধরনের ঋণ পদ্ধতি বাংলাদেশে নতুন ধরনের উদ্যোগ বলা যায়। কিন্তু এটি চালু করতে হলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মানসিকতা ও দক্ষতা দুটোই বদলাতে হবে। শুধু নির্দেশনা পাঠালে হবে না, মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ আরেকটি বড় প্রশ্ন। 'বাংলাদেশ ওভিওপি' ব্র্যান্ড একবার তৈরি হলে সেটি টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি ব্যাচে একই মান নিশ্চিত করতে হবে। থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্র্যান্ড তৈরির চেয়ে ব্র্যান্ড রক্ষা করা বেশি কঠিন। একটি নিম্নমানের চালান বাজারে গেলে পুরো ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। ভোলার মহিষের দুধের দই বা সাতক্ষীরার সন্দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে হলে ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট, প্যাকেজিং মান এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রক্রিয়াগুলো এখনো দেশে দীর্ঘ ও জটিল। সেটি ঠিক না হলে পণ্য তৈরি হবে, কিন্তু রফতানি হবে না।

আমার মতে, সময়সীমাটি নিয়েও একটু ভাবা দরকার। তিন বছরে ৬৮ হাজার গ্রামে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী। জাপানে ওইতার মডেল পূর্ণতা পেয়েছিল দুই দশকে। থাইল্যান্ডে পনেরো বছর লেগেছিল। বাস্তবে প্রথম বছরটি শুধু কাঠামো গোছাতেই কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাড়াহুড়ো করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ দেখাতে গেলে মানের বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বহুস্তরীয় তত্ত্বাবধানও একটি কাঠামোগত সমস্যা। এই প্রকল্পে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং আরও কয়েকটি সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এতগুলো সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঐতিহাসিকভাবে কঠিন। আন্তঃমন্ত্রণালয় একসাথে কাজ করলে সমন্বয়হীনতার ঝুঁকিও থাকে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমন্বয়ের ক্ষমতা না থাকলে এই প্রকল্প কাগজে সুন্দর থেকে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

সম্ভাবনার কথাও বলা দরকার। বাংলাদেশে রাজশাহীর সিল্ক, কুমিল্লার খাদি, খুলনার চুইঝালের মতো পণ্যের বাজার ইতিমধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে তৈরি হয়ে আছে। ওভিওপির কাঠামো দিয়ে এই এই বাজারগুলোকে আরও গোছানো ও বড় করা সম্ভব। বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে প্রচারক হিসেবে কাজে লাগানো গেলে বৈদেশিক বাজার তৈরি আরও সহজ হবে।

তাহলে চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে উতরানো সম্ভব? কিছু বাস্তব পথ আছে। প্রথমত, শুরুতে পাইলট পর্যায়ে মাত্র কয়েকটি জেলায় সীমিতসংখ্যক পণ্য নিয়ে শুরু করা উচিত। রাজশাহীর আম, রংপুরের শতরঞ্জি এবং সাতক্ষীরার সন্দেশ দিয়ে শুরু করলে ব্যবস্থাপনার চাপ কম থাকবে এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। দ্বিতীয়ত, পণ্য নির্বাচনে বাজারচাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঐতিহ্যবাহী হলেই পণ্যটি রফতানিযোগ্য, এমন নয়। বান্দরবানের পাহাড়ি আনারস বা ভোলার মহিষের দুধের দইয়ের আন্তর্জাতিক বাজারে সত্যিকারের চাহিদা আছে কিনা, সেটি আগে যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি এগ্রিগেটর প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ সরবরাহ শৃঙ্খলে কাজ করছে, তাদের অভিজ্ঞতা না লাগালে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এই প্রকল্পে মাঠের বাস্তবতা বোঝার ফাঁক থেকে যাবে।

ডিজিটাল অবকাঠামোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি উৎপাদককে ডিজিটাল পরিচয়পত্রের আওতায় আনা, কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের উৎস ট্র্যাক করা, বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেডিট স্কোরিং, এই ধারণাগুলো চমৎকার। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট কাভারেজ এখনো অসম। জামালপুরের একজন ছানার পোলাওয়ের কারিগর বা বান্দরবানের একজন আনারস চাষি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজের তথ্য দিতে এবং পরিচালনা করতে পারবেন কিনা, সেটি নিশ্চিত করতে হলে আগে ডিজিটাল সাক্ষরতার ব্যবধান কমাতে হবে।

সম্ভাবনার কথাও বলা দরকার। বাংলাদেশে রাজশাহীর সিল্ক, কুমিল্লার খাদি, খুলনার চুইঝালের মতো পণ্যের বাজার ইতিমধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে তৈরি হয়ে আছে। ওভিওপির কাঠামো দিয়ে এই এই বাজারগুলোকে আরও গোছানো ও বড় করা সম্ভব। বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে প্রচারক হিসেবে কাজে লাগানো গেলে বৈদেশিক বাজার তৈরি আরও সহজ হবে। বার্ষিক ওভিওপি মেলার আয়োজন করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সরাসরি উৎপাদকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। টিসিবি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওভিওপি পণ্য কেনার ব্যবস্থা করলে প্রাথমিক পর্যায়ে একটি নিশ্চিত বাজার তৈরি হবে, যা উৎপাদকদের আস্থা বাড়াবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সেই আমচাষির কথাটা আবার মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, সরকারি লোকজন আসে, আশ্বাস দিয়ে যায়, তারপর আর দেখা মেলে না। কিছুদিন পর আবার নতুন কেউ আসে, নতুন প্রতিশ্রুতি শোনায়। এই পুরোনো চক্র থেকে বের হতে হবে। ওভিওপির পরিকল্পনায় অর্থ বরাদ্দ আছে, ব্যাংকের অংশগ্রহণ আছে, ডিজিটাল কাঠামোর কথাও আছে। কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের কাজ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যকর সমন্বয়, ব্যাংক খাতের সক্রিয় সহযোগিতা এবং গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল অবকাঠামোর বিস্তার। এসব নিশ্চিত করা গেলে রাজশাহীর আম সত্যিকার অর্থেই একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে ভোলার মহিষের দুধের দই থেকে বান্দরবানের পাহাড়ি আনারস পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের পেছনে থাকা মানুষগুলো তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবেন।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

সম্পর্কিত