ব্যক্তির সামর্থ্যভিত্তিক কর কাঠামো সময়ের দাবি

জাহিরুল ইসলাম
জাহিরুল ইসলাম

স্ট্রিম গ্রাফিক

ব্যক্তি শ্রেণির কর নির্ধারণে যে কাঠামো বিদ্যমান, তাতে আয়কে গুরুত্ব দেওয়া হলেও করদাতার দায়িত্ব ও সামর্থ্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোয় একজন চাকরিজীবী যে আয় করেন, সেটা শুধু তিনি নিজের সঞ্চয় ও পরিভোগে ব্যয় করেন না; তাকে ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয় উপার্জনে অক্ষম পরিবারের অন্য সদস্যদের। নির্ভরশীল সদস্য হতে পারেন শিশু কিংবা বৃদ্ধ। পরিবার ভেদে সংখ্যাটাও ভিন্ন।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পরিবার সংখ্যা প্রায় চার কোটি। এর মধ্যে কত পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মাত্র একজন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য নেই। তবে সবশেষ জনশুমারিতে জানা যায়, মোট জনসংখ্যার ৩৭ দশমিক ২১ শতাংশ মানুষ চাকরিতে নিয়োজিত। চাকরি ছাড়াও অবশ্য নানা উপায়ে আয় করে মানুষ। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ পরিবারেই আয় নির্ভরতা এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক। অনেক পরিবারেই উপার্জনহীন সদস্যরা পান না সামাজিক সুরক্ষার আওতায় কোনো রকম সরকারি সহায়তা। তাই উপার্জন আর সামাজিক সুরক্ষাহীন সদস্যদের দায়িত্ব না নিয়ে উপায় থাকে না পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির। আর কোনো পরিবারে আয়ক্ষম ব্যক্তি একাধিক থাকলেও ব্যক্তির কর নির্ধারণে তার কোনো প্রভাব থাকে না। অর্থাৎ আয়ক্ষম একজন ব্যক্তিকে পরিবারের দায়িত্ব কতটা নিতে হয়– বিদ্যমান ব্যক্তি শ্রেণির কর নির্ধারণে সে বিবেচনা একেবারেই উপেক্ষিত।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন, খাদ্য ও নিত্যপণ্যসহ সব ক্ষেত্রে অব্যাহত রয়েছে মূল্যস্ফীতি। নিকট অতীতে এর হার ৮-৯ শতাংশে সীমিত থাকলেও বিশ্লেষকদের অভিমত, যে কোনো সময় এটি পৌঁছতে পারে দুই অংকে। এ পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন খাওয়া-পরার ব্যয় মেটাতেই নাভিশ্বাস উঠছে অনেক মধ্যবিত্তের। এছাড়াও আছে শিক্ষা ও চিকিৎসা বাবদ ব্যয়। নিকট অতীতে এসব ক্ষেত্রেও খরচ কী পরিমাণ বেড়েছে, তা কারও অজানা নয়। সব মিলিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সব সদস্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে কিছু সঞ্চয় তো দূরের কথা– কোনো জরুরি পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তা সামলাতে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে ঋণের জন্য অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়। এ অবস্থায় তাকে এ চিন্তাও করতে হয় যে, অর্থবছর শেষে আয় অনুযায়ী পরিশোধ করতে হবে কর; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে দাখিল করতে হবে আয়কর রিটার্ন।

বস্তুত ব্যক্তি ও অব্যক্তি করদাতার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, ব্যক্তির কর গণনা করা হয় তার আয়ের ভিত্তিতে; এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মীকে বেতন দেওয়া হয় উৎসে কর কেটে রেখে। অন্যদিকে অব্যক্তি শ্রেণিকে কর প্রদান করতে হয় তার আনুষঙ্গিক সব ব্যয় নির্বাহের পর। এজন্য অব্যক্তি করদাতাদের ব্যালেন্সশিটে দেখা যায় খরচের দীর্ঘ তালিকা। অর্থাৎ তারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য খরচের দীর্ঘ তালিকা তুলে দিয়ে আয় কম দেখানোর সুযোগ পান এবং এ সুযোগ নিয়ে থাকেন অনেকেই। একইভাবে ব্যক্তিরও অসংখ্য খরচ এবং নানাবিধ পারিবারিক ও সামাজিক দায় থাকলেও সেটি দেখিয়ে কর অবকাশ নেওয়ার সুযোগ বিদ্যমান কাঠামোয় নেই। নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগ করে রেয়াত নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ব্যক্তির জন্য সেখানেও রাখা হয়েছে কিছু শর্ত। অর্থাৎ বিদ্যমান কাঠামোয় কর কর্তন কিংবা বাড়তি বিনিয়োগ করে রেয়াত নেওয়া– ব্যক্তির জন্য বাড়তি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে যা ঘটে তা হলো, সামর্থ্য থাকলেও অপেক্ষাকৃত কম কর পরিশোধ করছেন অব্যক্তি শ্রেণির করদাতারা; আর যথাযথ নিয়মে কর পরিশোধের জন্য ব্যক্তি শ্রেণির অনেককে হতে হচ্ছে ঋণগ্রস্ত।

নাগরিকদের কাছ থেকে কর আহরণ করা হয় মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ, উন্নয়ন ব্যয় সংকুলন ও জনসাধারণের জন্য কল্যাণমুখী কার্যক্রমের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে। কিন্তু আমাদের দেশে নাগরিক সুবিধা জোগানোর বিদ্যমান যে পদ্ধতি, তা অনেকটাই দুর্বল। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি জানে না, সে যথাযথভাবে কর পরিশোধ করলে কী সুবিধা পাবে রাষ্ট্রের কাছে। ব্যক্তি করদাতার মধ্যে যখন এমন উপলব্ধি তৈরি হয় যে, যথাযথভাবে কর পরিশোধ না করলেও তার জন্য সুযোগের কোনো কমবেশি হয় না; তখন তার মধ্যে বেড়ে ওঠে ফাঁকির প্রবণতা। অন্যদিকে অব্যক্তি শ্রেণির অনেকে চেষ্টায় থাকে বিদ্যমান আইনের ফাঁক-ফোকরের সুযোগ নিয়ে যথাসম্ভব কর পরিহার করতে। এ প্রবণতা দেখা যায় প্রতিষ্ঠানের আয় আর কর প্রদানের সামর্থ্য বাড়লেও। বলা অত্যুক্তি হবে না, করদাতাদের এমন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব কেবল সরকারি পর্যায়ে নাগরিক সুবিধার আওতা বৃদ্ধি এবং সেবা প্রদানের পদ্ধতি উন্নয়নের মাধ্যমে। আর ব্যক্তির কর নির্ধারণে তার সামর্থ্যকে বিবেচনায় নেওয়া হলে এটা আরও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে যথাযথ পরিমাণ কর প্রদানে উৎসাহ জোগাবে বলেই মনে হয়।

বস্তুত ব্যক্তি ও অব্যক্তি করদাতার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, ব্যক্তির কর গণনা করা হয় তার আয়ের ভিত্তিতে; এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মীকে বেতন দেওয়া হয় উৎসে কর কেটে রেখে। অন্যদিকে অব্যক্তি শ্রেণিকে কর প্রদান করতে হয় তার আনুষঙ্গিক সব ব্যয় নির্বাহের পর। এজন্য অব্যক্তি করদাতাদের ব্যালেন্সশিটে দেখা যায় খরচের দীর্ঘ তালিকা। অর্থাৎ তারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য খরচের দীর্ঘ তালিকা তুলে দিয়ে আয় কম দেখানোর সুযোগ পান এবং এ সুযোগ নিয়ে থাকেন অনেকেই।

দেখা যাচ্ছে, বিদায়ী বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল; অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসেও তার অনেকটাই অর্জন করা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের অভিমত, আরও বিস্তৃত করতে হবে করের জাল। তবে সেক্ষেত্রে ভেবে দেখতে হবে, একজন ব্যক্তিকে যে পরিমাণ কর পরিশোধ করতে হচ্ছে– সেটা তার আয় ও পারিবারিক দায়িত্বের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ। কর যখন ব্যক্তির পারিবারিক দায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তখন সেটা তার কাছে বোঝা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব মূলত জনসাধারণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু আর্থিক কারণে আমাদের রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব নিতে পারছে না অনেক ক্ষেত্রে। এ অবস্থায় মৌলিক চাহিদানির্ভর দায়িত্বগুলো নিতে হয় পরিবারের আয়ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে। মোটামুটি সব পরিবারের বাস্তবতা একই। এজন্য ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতাদের জন্য কাঠামোটা নির্ধারণ করতে হবে এমনভাবে, যেন সেখানে কর গণনায় তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি এবং তাদের জন্য যে পরিমাণ খরচ করতে হয়, সেটা থাকে বিবেচনায়। কর গণনার ক্ষেত্রে ব্যক্তির এইসব ‘বাস্তবতা’ বিবেচনায় নেওয়া হলে কর পরিশোধে উৎসাহ বাড়বে; সহজ হবে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা।

সামর্থ্যভিত্তিক কর কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ব্যক্তির সঠিক আয় ও সম্পদের তথ্যভাণ্ডার। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে একজন ব্যক্তি কী পরিমাণ আয় করেন এবং তার ব্যয়ের খাত কী কী, সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রাপ্তি কঠিন নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যদি ব্যক্তির আয়, ব্যয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক দায় বিশ্লেষণ করে একটি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারে, তাহলে সামর্থ্যভিত্তিক করকাঠামো তৈরি কিছুটা হলেও সহজ হবে। এছাড়া করমুক্ত আয়সীমা আর করহার নির্ধারণেও বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ ব্যক্তির অর্থনৈতিক সংকট বাড়িয়ে তোলে। যে ব্যক্তি তার এবং পরিবারের সদস্যদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খান, তার ওপর করের বাড়তি চাপ আরোপ কি ন্যায়সঙ্গত? সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের আলোচনা যখন চলমান, তখন এ প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। মনে রাখা জরুরি, একটি সামর্থ্যভিত্তিক কর কাঠামো গড়ে তুলতে হলে বাড়াতে হবে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। জনগণ তখনই যথাযথ কর দিতে আগ্রহী হবে, যখন তারা দেখবে– কর দিয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন। যদি করের অর্থ অপচয়, দুর্নীতি বা অকার্যকর প্রকল্পে ব্যয় হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে কর প্রদানে অনীহা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই সামর্থ্যভিত্তিক কর কাঠামো তৈরির পাশাপাশি জনসাধারণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

উন্নয়নশীল অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নীত হতে চায় উন্নত অর্থনীতিতে। এ ধারায় এগিয়ে যেতে শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; একটি ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। ব্যক্তির সামর্থ্যভিত্তিক কর ব্যবস্থা হতে পারে সেই কাঠামো নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে, যখন উন্নয়নের ভার বণ্টিত হয় ন্যায্যভাবে। তাই সময়ের দাবি এমন একটি করব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সেটা বোঝা হবে না ব্যক্তির কাছে। বরং সামর্থ্যের ভিত্তিতে কর পরিশোধ করে মানুষ এগিয়ে নেবে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রাকে।

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত