দিল্লি ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬: গ্লোবাল সাউথ বনাম মধ্যপ্রাচ্য সংকট

স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভারতের নয়া দিল্লিতে গত ১৪–১৫ মে ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সম্প্রসারিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন, যা জোটের জন্য এক কঠিন ভূ-রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং পশ্চিমা একাধিপত্যের বিরুদ্ধে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উদীয়মান অর্থনীতির শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার যে মূল এজেন্ডা নিয়ে এই জোটের যাত্রা, দিল্লির রাজকীয় মঞ্চে তা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে মারাত্মক টানাপোড়েনের মুখে পড়ে।

গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রেশ টেনে ইরানের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রণক্ষেত্র থেকে সরাসরি দিল্লির মঞ্চে হাজির হয়ে ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ ও কড়া হুঁশিয়ারি দেন।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একদিকে মার্কিন ডলারের আধিপত্য রুখতে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ ও বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার মতো ভূ-অর্থনৈতিক এজেন্ডা, অন্যদিকে জোটের নতুন দুই সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার প্রচ্ছন্ন দ্বিপাক্ষিক ফাটল ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

এই জটিল সমীকরণের মধ্যে স্বাগতিক দেশ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত বন্ধুত্ব এবং অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব ধরে রাখার এক সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করেন, যেখানে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের ঐতিহ্যগত ‘দ্বি-রাষ্ট্র নীতি’ পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতায় ব্রিকসকে গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

একই সময়ে বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরের কারণে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র অনুপস্থিতি এবং তার পরিবর্তে রাষ্ট্রদূতের অংশগ্রহণ পরাশক্তিগুলোর সমান্তরাল কূটনীতির গভীরতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। সব মিলিয়ে, দিল্লির এই দুই দিনের স্নায়ুউত্তেজক অধিবেশন এটিই প্রমাণ করেছে যে, ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থে এক হওয়া ব্রিকস প্লাস-এর ভবিষ্যৎ পথরেখা এখন আর কেবল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর অর্থনৈতিক লক্ষ্য বনাম মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র আঞ্চলিক সংঘাতের এক জটিল ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে উপনীত হয়েছে।

রণক্ষেত্র থেকে দিল্লির মঞ্চ: আব্বাস আরাগচির আগমন ও তেহরানের বার্তা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের আবহে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনটি এক ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করেছে। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে এটিই ছিল তেহরানের কোনো শীর্ষ কূটনীতিকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক সফর, যার ফলে সবার নজর কাড়েন ইরানের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। দিল্লির মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি এই সংকটের জন্য সরাসরি ইসরায়েল এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের তীব্র ভাষায় কাঠগড়ায় তোলেন।

বিশেষ করে, যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গোপন সফরের তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনায় তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিকসের মঞ্চ থেকেই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতি তেহরানের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট, কড়া এবং আপসহীন বার্তা দেওয়া হয়। আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইরানের জনগণের সঙ্গে শত্রুতা একটি বোকা সিদ্ধান্ত। আর এর জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলানো সম্পূর্ণ ক্ষমার অযোগ্য। যারা ইসরায়েলের সঙ্গে যোগসাজশ করে অঞ্চলে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইছে, তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।’

এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়ার চাপ এড়াতে এবং নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্রিকসের মঞ্চকে একটি বড় কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। সব মিলিয়ে, রণক্ষেত্র থেকে দিল্লির মঞ্চে আরাগচির এই আগমন সম্মেলনটির মূল অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে ছাপিয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের তীব্রতাকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে উন্মোচিত করেছে।

ব্রিকসের ভেতরেই মধ্যপ্রাচ্যের ছায়া: জোটের কূটনৈতিক টানাপোড়েন

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্রিকস যখন ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর ও ইথিওপিয়াকে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেয়, তখন বিশ্বজুড়ে এটিকে গ্লোবাল সাউথের এক অভূতপূর্ব বিজয় এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক একাধিপত্যের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বিকল্প মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের মে মাসে এসে দিল্লির রাজকীয় কূটনৈতিক মঞ্চ অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কঠোরভাবে দেখিয়ে দিল যে, অর্থনৈতিক স্বার্থে গড়ে ওঠা এই জোটের ভেতরের ঐক্য কতটা ভঙ্গুর।

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের তীব্র আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এখন কেবল আর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ব্রিকসের মতো একটি বৈশ্বিক জোটের সংহতি ও লক্ষ্যকে সরাসরি বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। দিল্লির এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব দ্বিপাক্ষিক বৈরিতা ও যুদ্ধকালীন মেরুকরণ জোটের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে স্থবির করে তুলতে পারে, যা ব্রিকসের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।

সম্মেলনের মূল মঞ্চে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির কূটনৈতিক আক্রমণের প্রধান তীরটি ছিল মূলত তাদেরই প্রতিবেশী দেশ এবং ব্রিকসের নতুন অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে। দিল্লিতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই বৈরী ও অস্বস্তিকর মুখোমুখি অবস্থান জোটের ভেতরের গভীর ফাটল ও তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণকে বিশ্বমঞ্চে পুরোপুরি উন্মোচিত করেছে। এমনকি ইরানের প্রতিনিধি দল প্রকাশ্যেই অভিযোগ তুলেছে যে, ব্রিকসের একটি প্রভাবশালী প্রতিবেশী সদস্য দেশ পর্দার আড়ালে ইসরায়েলের পক্ষে নরম ভাষা ব্যবহারের জোরালো চেষ্টা চালিয়েছে এবং এর মাধ্যমে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সাধারণ যৌথ ঘোষণাপত্র পাসের প্রক্রিয়াকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। ভূ-অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যের স্বার্থে এক হওয়া একটি বৈশ্বিক জোটে এই ধরণের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও বিশ্বাসের অভাব আগামী দিনে ব্রিকসের যেকোনো ঐক্যবদ্ধ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

গ্লোবাল সাউথের মূল এজেন্ডা: ডি-ডলারাইজেশন ও আত্মরক্ষা

নয়া দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরেও ইরান এই জোটের মূল অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেদের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং ব্রিকসের মূল সাধারণ অধিবেশনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রণক্ষেত্রের প্রেক্ষাপট টেনে তার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় তেহরানের ‘বৈধ আত্মরক্ষার অধিকার’-এর বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন, যা মূলত চলমান মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক জোটের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান। ব্রিকসের এই বহুপাক্ষিক মঞ্চকে ব্যবহার করে ইরান বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিকভাবে কোনোভাবেই একঘরে নয়, বরং গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান ও প্রভাবশালী অর্থনীতিগুলোর সাথে কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা পুরোপুরি সক্ষম।

নিজেদের সামরিক অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি, আমেরিকার একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ওয়াশিংটনের একাধিপত্যবাদী ব্লকেড রাজনীতির তীব্রতম বিরোধিতা করে ইরান গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর দীর্ঘদিনের প্রধান দাবিটিকে আবারও ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসে। তেহরানের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য রুখে দিয়ে নিজস্ব আঞ্চলিক মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া তথা ‘ডি-ডলারাইজেশন’- এর পক্ষে অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা রাখেন আরাগচি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতা বজায় রাখতে এবং মার্কিন ব্যাংকিং সিস্টেম বা সুইফট নিষেধাজ্ঞার মারাত্মক প্রভাব এড়াতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার ইরানি আহ্বান মূলত জোটের দুই প্রধান পরাশক্তি রাশিয়া ও চীনের দীর্ঘদিনের ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থানের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরফলে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা দেশগুলোর জন্য ব্রিকস প্লাস কীভাবে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিরোধ মঞ্চ হয়ে উঠছে, দিল্লির এই অধিবেশনে ইরানের অবস্থান তা আরও একবার স্পষ্টভাবে প্রমাণ করল।

স্বাগতিক ভারতের ভারসাম্য নীতি ও মধ্যস্থতার সুযোগ

নয়া দিল্লিতে আয়োজিত ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ ও সভাপতি হিসেবে ভারতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুকৌশলী, দূরদর্শী এবং ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখা, অন্যদিকে ব্রিকস প্লাস ও গ্লোবাল সাউথের অবিসংবাদিত নেতৃত্ব নিজের হাতে ধরে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা—এই দুই বিপরীতমুখী সমীকরণকে মাথায় রেখেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করকে তার সূক্ষ্ম ও জটিল কূটনীতি পরিচালনা করতে হয়েছে। ভারতের মূল লক্ষ্য ছিল দিল্লির এই বহুপাক্ষিক মঞ্চকে কোনো একক দেশের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না দিয়ে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকারের বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ধরে রাখা।

সম্মেলনের মূল অধিবেশনে বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে লোহিত সাগরে লাগাতার সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সরবরাহ চেইনের মারাত্মক বিঘ্ন ঘটা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের বিপজ্জনক ঊর্ধ্বগতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের এই উত্তপ্ত আবহে ভারত তার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরাসরি দ্বি-রাষ্ট্র নীতির প্রতি তাদের অনড় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে জোরালো আহ্বান জানানো হয় যে, যুদ্ধবিগ্রহের কারণে গ্লোবাল সাউথের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে এবং বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্রিকস জোটকে একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে।

এই সমকালীন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে দিল্লির মঞ্চে একটি বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ অনুপস্থিতি সবার নজর কেড়েছে, যা ছিল চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র না থাকা। বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর ও দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত বৈঠক চলার কারণে ওয়াং ই দিল্লিতে আসতে পারেননি এবং তার পরিবর্তে ভারতে নিযুক্ত চীনের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সু ফেইহং এই সম্মেলনে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেন। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই সমান্তরাল ও বহুমাত্রিক কূটনীতি একদিকে যেমন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে তা দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও বেশি বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

নয়া দিল্লির ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক ব্রিকস সম্মেলন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গ্লোবাল সাউথ এখন আর কেবল অর্থনৈতিক ফোরাম বা তাত্ত্বিক আলোচনার মঞ্চ নয়, বরং তা সমকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের এক প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। চলমান তীব্র সংঘাতের আবহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির দিল্লি সফর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক টানাপোড়েন প্রমাণ করে যে, ভূ-রাজনৈতিক সংকটে থাকা দেশগুলো আন্তর্জাতিক একঘরে হওয়ার চাপ এড়াতে ব্রিকস প্লাস-এর মঞ্চকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

তবে জোটের এই সম্প্রসারণ যেমন একদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পশ্চিমা আধিপত্য ও ডলারের একচেটিয়া রাজত্ব রুখে দেওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারে, অন্যদিকে সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বিপাক্ষিক বৈরিতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো আঞ্চলিক যুদ্ধ জোটের মূল লক্ষ্যকে বারবার স্থবির করার ঝুঁকি তৈরি করছে। আগামী দিনগুলোতে ব্রিকস কতটুকু সফল হবে, তা নির্ভর করছে জোটের ভেতরকার এই গভীর রাজনৈতিক ফাটলগুলো মেরামত করে কীভাবে তারা নিজস্ব অর্থনৈতিক এজেন্ডা এবং ‘ডি-ডলারাইজেশন’-এর প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তার ওপর। এমতাবস্থায় ভারত ও চীনের মতো উদীয়মান পরাশক্তিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জোটের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক শত্রুতাকে সামাল দিয়ে একটি নতুন, বৈষম্যহীন এবং বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণে ব্রিকসের ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বকে ধরে রাখা।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত