দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন নজর যুক্তরাষ্ট্রের, কতটা চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৪২
ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ভরকেন্দ্র আটলান্টিক মহাসাগর থেকে স্থানান্তরিত হয়ে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই বিশাল ভৌগোলিক বিন্যাসের অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র হলো দক্ষিণ এশিয়া এবং এর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর।

একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই অঞ্চলকে কিছুটা প্রান্তিক বা আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হলেও, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি সুপারপাওয়ারদের ভূকৌশলগত প্রতিদ্বন্দিতার অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে চীনের উত্তরোত্তর অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান এবং তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর মাধ্যমে মহাসমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস; অন্যদিকে, বেইজিংয়ের এই প্রভাবকে প্রতিহত বা ‘কনটেইন’ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা অক্ষের জোরালো তৎপরতা। এই দুই মেরুর টানাপোড়েন দক্ষিণ এশিয়াকে এক গভীর ভূরাজনৈতিক দোলাচলে নিক্ষেপ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে এবং বঙ্গোপসাগরের শীর্ষে অবস্থিত বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থানই তার পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’—এই ডকট্রিনের ওপর ভিত্তি করে একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে আসছিল। কিন্তু বর্তমানে ওয়াশিংটনের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নীতির আমূল পরিবর্তন এবং চীনের সাথে বেইজিংয়ের কৌশলগত অংশীদারত্বের গভীরতা বৃদ্ধি—বাংলাদেশের এই চিরাচরিত ভারসাম্যকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও লজিস্টিক অংশীদারত্বের চাপ, অন্যদিকে চীনের সাথে ‘কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’-এর মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের কৌশলগত বন্ধন বাংলাদেশকে এক জটিল ‘জিরো-সাম গেম’ বা শূন্য-সমষ্টির খেলায় শামিল করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ‘ভারতের চশমা’ থেকে মার্কিন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিত

স্নায়ুযুদ্ধের অবসান-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ছিল ‘নিউ দিল্লি-কেন্দ্রিক’ বা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের পরিপূরক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিও-লিবারেল পরিভাষায় একে বলা চলে ‘সাব-কন্ট্রাক্টিং পলিসি’।

মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ স্বীকার করে নিয়ে তার মাধ্যমে এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে সামলানো এবং চীনের উত্থান ঠেকানো সম্ভব। এই নীতির কারণে বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত; বরং তারা ভারতের কৌশলগত স্বাচ্ছন্দ্যকে বিঘ্নিত না করার নীতি অনুসরণ করত।

কিন্তু গত এক দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত চীনের নৌ-সামরিক উপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক করিডরের বিস্তৃতি ওয়াশিংটনকে বাধ্য করেছে তার পুরনো ‘আঞ্চলিক সাব-কন্ট্রাক্টিং’ নীতি পুনর্বিবেচনা করতে। আমেরিকা এখন বুঝতে পেরেছে, এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভর করে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বহুমাত্রিক প্রভাব পুরোপুরি রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ভারতের নিজস্ব কিছু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি রয়েছে, যার ফলে অনেক সময় দিল্লি মার্কিন ব্লকের সাথে হুবহু একাত্ম হতে পারে না।

এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতকে বাইপাস করে কিংবা ভারতের সাথে সমান্তরালভাবে দক্ষিণ এশিয়াকে সরাসরি নিজের চোখে দেখতে শুরু করেছে। এই নতুন নীতির প্রধান হাতিয়ার হলো ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’। এই কৌশলের আওতায় ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সাথে সরাসরি রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে বদ্ধপরিকর। এর মূল কৌশলগত লক্ষ্য হলো: সরাসরি লজিস্টিক ও নিরাপত্তা প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, যাতে যেকোনো সংকটে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোকে চীনের ঋণ-ফাঁদ বা অতি-নির্ভরতা থেকে বের করে এনে মার্কিন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বলয়ে আস্থাশীল করে তোলা এবং ভারতের মধ্যস্থতা ছাড়াই এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত সরাসরি তদারকি ও প্রভাবিত করা। আমেরিকার এই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাদেশ এখন সরাসরি ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক রাডারে চলে এসেছে, যা ঢাকার ওপর মার্কিন প্রত্যাশা ও চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চীনের প্রভাব বলয় রোধে ওয়াশিংটনের কৌশল ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পায়রা বন্দর, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, কর্ণফুলী টানেল এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সম্পৃক্ততা বেইজিংকে বঙ্গোপসাগরের ভূকৌশলগত প্রবেশদ্বারে এনে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা তাত্ত্বিকদের মতে, চীনের এই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো তৈরির আড়ালে একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক বা নৌ-কৌশলগত উদ্দেশ্য (মুক্তামালা কৌশল) রয়েছে।

ওয়াশিংটনের এই চীন-বিরোধী তীব্র ভূরাজনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোগত বাস্তববাদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরাশক্তিগুলো যখন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তখন মাঝারি ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর এক ধরনের ‘অ্যাসাইমেট্রিক প্রেসার’ বা অসম চাপ তৈরি হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং চীনের পাল্টা ভূকৌশলগত চালের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। ‘ভারতের চশমা’ পরিহার করে আমেরিকার সরাসরি এই অঞ্চলে প্রবেশ এবং বেইজিংয়ের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘শেয়ার্ড ফিউচার’-এ উন্নীত হওয়া উভয় ঘটনাই প্রমাণ করে যে, বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিরা বাংলাদেশকে তাদের নিজস্ব কৌশলগত সমীকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বা জাতিসংঘে যখন ওয়াশিংটন এবং বেইজিং বিপরীতমুখী অবস্থান নেয় (যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ, দক্ষিণ চীন সাগর বা বৈশ্বিক মানবাধিকার ইস্যু), তখন বাংলাদেশকে যেকোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য প্রচ্ছন্ন চাপ দেওয়া হয়। আমেরিকা অনেক সময়ই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ায়। এই চাপগুলোর একটি বড় অংশই সরাসরি আদর্শিক নয়, বরং ঢাকাকে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক বলয় থেকে দূরে রাখার একটি কৌশলগত কৌশল।

তৈরি পোশাক খাতের জন্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মার্কিন কৌশলগত নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় না রাখলে এই বাণিজ্যিক সুবিধা বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলস্বরূপ, বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাড়াতে গেলেই ঢাকাকে ওয়াশিংটনের লাল চোখের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

২০২৬ সালের মার্কিন-বাংলাদেশ রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট এবং ঝুঁকির নতুন মাত্রা

নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কাল থেকে শুরু হওয়া এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের গুণগত পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এই সময়কালে বাংলাদেশের সাথে একাধিক নিরাপত্তা, লজিস্টিক ও কৌশলগত চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে জোরালো তাগিদ দিয়ে এসেছে। এই দীর্ঘ আলোচনার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন ও বাংলাদেশ প্রশাসনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ‘ইউএস-বাংলাদেশ রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট(এআরটি)’। আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তিটিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি বড় বাণিজ্যিক স্বস্তি (যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করলে শূন্য-শুল্ক সুবিধা এবং সামগ্রিক শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানো) মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তাঝুঁকি।

এই চুক্তিটি মূলত একটি ‘অসম চুক্তি’, যেখানে বাণিজ্য সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশকে সার্বভৌম ও ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আপস করতে হয়েছে। চুক্তিটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে ‘shall’ (বাধ্যতামূলক অর্থে) শব্দটি ১৩১ বার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মাত্র ৬ বার। এই আইনি কাঠামোটি বাংলাদেশের জন্য তীব্র নিরাপত্তাঝুঁকি ও ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি করছে।

সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে চীনা নির্ভরতা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল’-এর সিংহভাগজুড়েই রয়েছে চীনা সামরিক সরঞ্জামের আধিপত্য। সাবমেরিন, কর্ভেট, যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ট্যাংক এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবকিছুই বাংলাদেশ চীন থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে এবং সহজ শর্তে সংগ্রহ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে এই একক চীনা সামরিক নির্ভরতা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে এবং তাদের নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে।

২০২৬ সালের (এআরটি) চুক্তির অন্যতম বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো এর ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদে সরাসরি উল্লেখ রয়েছে যে, বাংলাদেশ তার সামরিক আধুনিকায়নে ‘যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ক্রয় বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা চালাবে’ এবং একই সাথে ‘নির্দিষ্ট কিছু দেশ’ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করবে।

এআরটি চুক্তির ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পর, বাংলাদেশ যদি তার সামরিক কৌশল ও সাশ্রয়ী নীতির অংশ হিসেবে চীন থেকে আরও বড় ধরনের বা কৌশলগত সামরিক সরঞ্জাম ও উচ্চপ্রযুক্তি (যেমন উন্নত রাডার বা মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম) কেনা অব্যাহত রাখে, তবে আমেরিকার তরফ থেকে নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভারসারিজ থ্রু স্যাঙ্কশনস অ্যাক্ট’ (সিএএটিএসএ) বা কাটসা নামক একটি অত্যন্ত কঠোর আইন রয়েছে। মূলত রাশিয়া, ইরান বা উত্তর কোরিয়ার সাথে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা লেনদেনের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হলেও, চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রযুক্তির বিস্তার রুখতেও ওয়াশিংটন এই আইনের পরিধি বাড়াতে পারে।

এমনকি সরাসরি কাটসা প্রয়োগ না করলেও, আমেরিকা অন্য কোনো উপায়ে যেমন হিউম্যান রাইটস বা ডেমোক্রেসি অ্যাক্টের আওতায় নির্দিষ্ট সামরিক কর্মকর্তা বা প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে এবং এআরটি চুক্তির বাণিজ্যিক সুবিধা একতরফাভাবে স্থগিত করতে পারে। যদি ওয়াশিংটন এই ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতের ওপর তার প্রভাব হবে মারাত্মক।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার সাথে বাধ্যতামূলক একাত্মতা

চুক্তির একটি সুনির্দিষ্ট ধারায় বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বৈশ্বিকভাবে কোনো দেশের ওপর বাণিজ্য বা সীমান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘পরিপূরক কড়াকড়ি বা নিষেধাজ্ঞা’ জারি করতে বাধ্য থাকবে। যদি অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান ইস্যুতে আমেরিকার সাথে চীনের বড় ধরনের সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধ শুরু হয়, তবে এই চুক্তির ফাঁদে পড়ে বাংলাদেশ বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় শামিল হতে আইনিভাবে বাধ্য থাকবে।

বেইজিংয়ের কাউন্টার-কৌশল ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’-এর সাথে বিরোধ

আমেরিকার এই ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক বেষ্টনী বা ‘ইনসার্কেলমেন্ট’ নীতি মোকাবিলায় চীনও তার নিজস্ব কাউন্টার-কৌশল বা পাল্টা চাল চালছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হলো ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর। এই সফরে দুদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’ হিসেবে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

চীনের কূটনৈতিক পরিভাষায় এই ‘শেয়ার্ড ফিউচার’ বা ‘ভাগাভাগি করা ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ হলো কোনো রাষ্ট্রের সাথে বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আদর্শিক ও কৌশলগত মেলবন্ধন। বিশ্বের মাত্র ২০টি দেশের সাথে চীনের এই ধরনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ ও চীন কেবল অর্থনৈতিক অংশীদারই নয়, বরং তারা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে একে অপরের দীর্ঘমেয়াদী এবং অবিচ্ছেদ্য সহযোগী।

এর মধ্যে অন্যতম হলো চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাবনা। এই করিডরটির মাধ্যমে চীন সরাসরি তার স্থলবেষ্টিত ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত করতে চায়। এটি বেইজিংয়ের জন্য মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি মোক্ষম উপায়। বাংলাদেশের জন্য এটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও, এটি সরাসরি মার্কিন অক্ষের ভূকৌশলগত রেডলাইনের ওপর আঘাত হানে। ২০২৬ সালের এই মার্কিন চুক্তিতে (এআরটি) স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ (যেমন চীন বা রাশিয়া)-এর সাথে নতুন কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা গভীর ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না। চীন ও মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের পরিকল্পনা রয়েছে, এই চুক্তির ফলে তা বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়বে। আমেরিকা এটিকে বেইজিংয়ের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে দেখবে এবং বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহারের চাপ দিতে পারে।

মার্কিন সামরিক লজিস্টিক চুক্তি ও বাংলাদেশের ভূকৌশলগত চ্যালেঞ্জ

এই বাণিজ্য চুক্তির সমান্তরালে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের কৌশলগত বন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহারের জন্য দীর্ঘদিনের প্রস্তাবিত অন্যান্য চুক্তিগুলো যেমন ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসিএসএ) এবং ‘জেনারেল সিকিউরিটি অফ মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (জিএসওএমআইএ) চূড়ান্ত করার চাপ বাড়িয়েছে।

জিএসওএমআইএ-এর অধীনে বাংলাদেশ যদি আমেরিকার সাথে সামরিক তথ্য শেয়ার করে, তবে বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। আবার এসিএসএ এর আওতায় মার্কিন নৌবাহিনী যদি বঙ্গোপসাগরে বা বাংলাদেশের কোনো বন্দরে রিফুয়েলিং বা মেরামতের সুবিধা পায়, তবে চীন এটিকে তার নিজের সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ অবরুদ্ধ করার মার্কিন ব্লকেডের অংশ হিসেবে দেখবে।

বাংলাদেশের বহুমাত্রিক ঝুঁকি ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নব্য-বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, পরাশক্তিদের প্রতিদ্বন্দিতা প্রায়শই একটি ‘জিরো-সাম গেম’-এ রূপ নেয়, যেখানে এক পক্ষের জয় অন্য পক্ষের নিশ্চিত পরাজয় হিসেবে গণ্য হয়। এই খেলায় বাংলাদেশের মতো ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। বাংলাদেশ যখন আমেরিকার সাথে এআরটি চুক্তি করে, তখন চীন ক্ষুব্ধ হয়; আবার যখন চীনের সাথে সম্পর্ককে ‘শেয়ার্ড ফিউচার’-এ রূপান্তর করে, তখন আমেরিকা রুষ্ট হয়। এই দ্বিমুখী টানাপোড়েন বাংলাদেশের সার্বভৌম নীতি নির্ধারণের জায়গাকে সংকুচিত করে ফেলছে। দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো এখন নিজস্ব প্রয়োজনের চেয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণ দ্বারা বেশি প্রভাবিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের এই বেইজিংঘেঁষা নীতি এবং একই সাথে ওয়াশিংটনের সাথে সামরিক দরকষাকষির জবাবে প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং দূরবর্তী আমেরিকা যৌথ বা এককভাবে তীব্র কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ভারতের কাছে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেক) নিরাপত্তা অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ যদি চীনের সাথে সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক করিডোর গড়ে তোলে, তবে নতুন দিল্লি এটিকে তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি বা ‘এনসার্কেলমেন্ট’ হিসেবে দেখবে। এর জবাবে ভারত বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত বাণিজ্য কঠোর করতে পারে, তিস্তা বা অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলিয়ে রাখতে পারে এবং ট্রানজিট সুবিধার ক্ষেত্রে নানাবিধ শর্ত আরোপ করতে পারে।

এছাড়া কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসিফিক ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় ভারত ও আমেরিকা যৌথভাবে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বেইজিংয়ের প্রভাব রুখতে তারা সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক আইসোলেশন বা একঘরে করার নীতি প্রয়োগ করতে পারে, যা এই অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে অত্যন্ত দুর্বল করে দেবে।

সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের কৌশলগত রোডম্যাপ

এই অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক গোলকধাঁধা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে অত্যন্ত পরিপক্ব, বাস্তবসম্মত এবং কৌশলগত দূরদর্শিতাসম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে। আবেগ বা সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ অনুসরণ করা অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য পরাশক্তিদের দ্বন্দ্ব থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ‘হেজিং’ বা ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল। বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট একটি ব্লকে (মার্কিন বা চীনা) সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে না দিয়ে, তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বণ্টন করে দিতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগের জন্য চীনের সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখা। তৈরি পোশাকের বাজার ধরে রাখা এবং সাউথ চায়না সি বা ইন্দো-প্যাসিফিকের নৌ-নিরাপত্তার বিষয়ে আমেরিকার সাথে সহযোগিতামূলক কিন্তু অহিংস অবস্থান বজায় রাখা।

কোনো চুক্তি বা যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করার সময় বাংলাদেশকে তার নিজস্ব ‘রেডলাইন’ বা সীমানা স্পষ্ট করতে হবে। আমেরিকার সাথে ২০২৬ সালের এআরটি চুক্তির যে বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, সেখানে দ্বিপাক্ষিক ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে এমন ব্যাখ্যামূলক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে যাতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চীনা উপাদানগুলোর গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন না হয়। একইভাবে, চীনের ‘শেয়ার্ড ফিউচার’ ডকট্রিনে অর্থনৈতিক উপাদানকে প্রধান্য দিয়ে সামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক জোটের রূপ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

এককভাবে আমেরিকা, ভারত বা চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশকে অন্যান্য আঞ্চলিক পরাশক্তি এবং জোটের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। জাপানের ‘বিগ-বি’ (বে অফ বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) প্রকল্পের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, যা চীন বা আমেরিকার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। আসিয়ানের সাথে অর্থনৈতিক একীভূতকরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে কৌশলগত বিনিয়োগের সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।

‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই নীতিকে কেবল কাগজে-কলমে না রেখে আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্রসীমা আইন এবং বহুপাক্ষিক ফোরামের (যেমন জাতিসংঘ বা ন্যাম) মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থানকে ও স্বার্থকে যৌক্তিকভাবে তুলে ধরতে হবে। পরাশক্তিদের দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ যে কেবলই একটি প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র নয়, বরং একটি স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সত্তা, তা প্রমাণ করতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং চীনের পাল্টা ভূকৌশলগত চালের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। ‘ভারতের চশমা’ পরিহার করে আমেরিকার সরাসরি এই অঞ্চলে প্রবেশ এবং বেইজিংয়ের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘শেয়ার্ড ফিউচার’-এ উন্নীত হওয়া উভয় ঘটনাই প্রমাণ করে যে, বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিরা বাংলাদেশকে তাদের নিজস্ব কৌশলগত সমীকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে। এই অবস্থান একদিকে যেমন বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সার্বভৌমত্বের ওপর এনে দিয়েছে নজিরবিহীন ঝুঁকি।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সম্পাদিত মার্কিন-বাংলাদেশ রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ঢাকাকে ওয়াশিংটনের এমন এক অর্থনৈতিক ও সামরিক শর্তের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলেছে, যার প্রতিটি পদক্ষেপ চীনের সাথে সম্পাদিত ‘শেয়ার্ড ফিউচার’ বা সর্বোচ্চ কৌশলগত অংশীদারিত্বের সরাসরি বিরোধী। এই চুক্তি দুই সুপারপাওয়ারের মাঝে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ থাকার সুযোগকে প্রায় বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই, দূরদর্শী এবং গতিশীল পররাষ্ট্রনীতিই হবে একমাত্র রক্ষাকবচ। বাংলাদেশকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভারসাম্যমূলক কূটনীতি বা হেজিং কৌশল বজায় রাখতে হবে, যেখানে জাতীয় স্বার্থই হবে একমাত্র কম্পাস। পরাশক্তিদের প্রতিদ্বন্দিতাকে নিজের অস্তিত্বের সংকট না বানিয়ে, বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এটিকে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের সুযোগ হিসেবে রূপান্তর করাই হবে সমকালীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

Ad 300x250

সম্পর্কিত