অর্থবছর এপ্রিল–মার্চ: দেরিতে হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

অর্থবছর এপ্রিল–মার্চে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। এই সিদ্ধান্ত এমন একটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি ঘটাল, যা দুঃখজনকভাবে গত চুয়ান্ন বছরে কখনোই যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। অর্থবছর ১ জুলাই–৩০ জুন থেকে সরে গিয়ে হচ্ছে ১ এপ্রিল–৩১ মার্চ হচ্ছে। ২০২৭-২৮ হবে নয় মাসের ক্রান্তিকালীন অর্থবছর (জুলাই–মার্চ)। পূর্ণাঙ্গ নতুন পঞ্জিকার সূচনা হবে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে।

সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বর্ষা—বৃষ্টির ভেতরে নির্মাণকাজ চালাতে গিয়ে কাজ দীর্ঘায়িত হয়, মান নষ্ট হয়, জনদুর্ভোগ বাড়ে। কারণটি সঠিক ও যুক্তিযুক্ত, তবে সম্পূর্ণ নয়। প্রকৃত যুক্তি আরও গভীরে। বাংলাদেশ এত বছর এমন একটি পরিকল্পনা-পঞ্জিকা চালিয়ে এসেছে, যার চারটি প্রান্তিক দেশের ভৌত, কৃষি, প্রশাসনিক ও পরিসংখ্যানগত বছরের সঙ্গে প্রায় বিপরীতমুখী। সেই বৈপরীত্যের মূল্য আমরা প্রতি বছরই শোধ করেছি নগদ অর্থে, নিম্নমানের কংক্রিটে এবং নাগরিকের ভোগান্তিতে।

১ জুলাই–৩০ জুন অর্থবছর ছিল উত্তরাধিকার, সিদ্ধান্ত নয়। বাংলাদেশ এটি বেছে নেয়নি; পেয়েছে। ঔপনিবেশিক ভারতের রাজস্ব প্রশাসন থেকে পাকিস্তান হয়ে এটি আমাদের হাতে এসেছে। সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদেও ‘অর্থবৎসর’ বলতে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বছরকেই বোঝানো হয়েছে। একই সংজ্ঞা রয়েছে ১৮৯৭ সালের সাধারণ ধারা আইনের ৩(২১) ধারায়।

লক্ষণীয়, বাংলাদেশের প্রথম বাজেট-মেয়াদ বারো মাসের ছিল না। ১৯৭২ সালের বাজেট বিধানাবলি আদেশ অনুযায়ী প্রথম বার্ষিক বাজেট বিবৃতি প্রস্তুত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৩০ জুন ১৯৭২ পর্যন্ত।

যে প্রশ্নটি ১৯৭২ সালে ওঠেনি, কিন্তু পরে দুই একবার উঠেও চাপা পড়ে গেছে, সেটি হচ্ছে, বছরের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বৃষ্টি যে দেশে জুন–সেপ্টেম্বরে ঝরে, সেখানে ভিন্ন বৃষ্টিপাত-চরিত্রের উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক রাজস্ব-সুবিধার কথা ভেবে গড়া একটি পঞ্জিকা আদৌ চলে কি না? চলে না। তার প্রমাণ চার দশক ধরে আইএমইডির মাসিক প্রতিবেদনেই পড়ে আছে।

আইএমইডির তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেবল জুন মাসেই বার্ষিক এডিপির ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং শেষ প্রান্তিকে ৪২ দশমিক ৫২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে; অথচ বছরের বাকি মাসগুলোয় সেই হার ছিল ২ থেকে ৫ শতাংশ। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, কাঠামোগত। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এগারো মাসে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৭৭,২০০ কোটি টাকা। মাসে গড়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। আর একা জুন মাসেই ২৯,৪০০ কোটি টাকা, স্বাভাবিক হারের চার গুণেরও বেশি।

মন্ত্রিসভার এই নতুন সিদ্ধান্তটি মূলত একসঙ্গে তিনটি কাজ করবে। রাজস্ব আদায়ের সময়সীমা এবং বর্ষাকালের মধ্যে প্রতিবছরের সংঘাত থামাবে; বছর শেষে কাজ ও খরচের অনিবার্য ঢলকে বছরের সবচেয়ে শুকনো ও কাজ করার জন্য উপযুক্ত সময়ে সরিয়ে আনবে; এবং বাজেট তৈরির সময়টাকে এমন এক সময়ে নিয়ে যাবে, যখন সরকার সত্যিই জানতে পারবে যে, সদ্য শেষ হওয়া বছরটিতে আসলে কী ঘটেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর চিত্র মোটেও উন্নত নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার এডিপির ৯ মাসে বাস্তবায়ন দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশে। এটি পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ পরের অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে প্রাথমিক সম্মতি দেওয়া হয়েছে। এ থেকে দুটি সিদ্ধান্তে আসা যায়। প্রথমত, সমস্যাটি অর্থ ব্যয়ের নয়, বাস্তবায়নের উপযুক্ত সময়ের। দ্বিতীয়ত, সেই সময়ের জানালাটি পঞ্জিকার ভুল জায়গায় বসানো।

অপচয় একটিমাত্র খাতে সীমাবদ্ধ নয়; অন্তত আটটি পথ ধরে তা জমা হয়।

এক. মাঠেই মান নষ্ট: বৃষ্টিতে বিছানো বিটুমিন বাঁধে না, ভেজা মাটিতে কাঙ্ক্ষিত ঘনত্ব আসে না, বর্ষণের মধ্যে ঢালা কংক্রিটের শক্তি কমে যায়।

দুই. পুনঃকাজ ও সম্পদের আয়ুক্ষয়: জুনে তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা খারাপ মানের রাস্তাগুলো বারবার মেরামত করতে হয়। এর ফলে আগামী দশ বছর ধরে রাস্তা মেরামতের যে বিশাল বোঝা তৈরি হয়, তা ভবিষ্যতের বাজেট থেকেই নীরবে চলে যায়।

তিন. দরপত্রে বর্ষা-ঝুঁকির প্রিমিয়াম: মে-জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্ত থাকলে, ঠিকাদাররা খারাপ আবহাওয়া এবং অল্প সময়ে তাড়াহুড়ো করে কাজ করার বাড়তি খরচটুকু আগে থেকেই তাদের বাজেটে বা দরে যুক্ত করে নেন।

চার. চাহিদার ধাক্কায় দর বৃদ্ধি: অর্থবছর শেষের মাস জুনে একসঙ্গে অনেক কাজ শেষ করার তাড়া থাকে। এতে রড, সিমেন্ট, বিটুমিনের দাম ও যন্ত্রপাতির ভাড়া বেড়ে যায়। তড়িঘড়ি করে বাজেট খরচের এই প্রতিযোগিতায় নেমে সরকার মূলত নিজের বাজারের জিনিস নিজেই বেশি দামে কেনে।

পাঁচ. বিল-তোলার সংস্কৃতি: কাজ শেষ করার চেয়ে টাকা তুলে নেওয়াই যখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন নানা ফাঁকফোকর তৈরি হয়। যেমন, অগ্রিম টাকা তোলা, অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা লুকিয়ে রাখা, অর্ধেক কাজ করেই পুরো কাজের সনদ দেওয়া এবং অর্থবছর শেষের ঠিক আগমুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে কাজের বাড়তি খরচের অনুমোদন নেওয়া।

ছয়. খণ্ডিত নগদ প্রবাহ ও ঋণ ব্যয়: বছরের শেষ এক মাসেই (জুনে) যখন বাজেটের ২২ শতাংশ খরচ করা হয়, তখন সরকারকে বাধ্য হয়ে একসঙ্গে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিতে হয়। এর ফলে ব্যাংক বা মুদ্রাবাজারে হঠাৎ বড় ধরনের চাপ পড়ে এবং সার্বিকভাবে ঋণ নেওয়ার খরচ বা সুদ বেড়ে যায়।

সাত. বৈদেশিক সহায়তার ধীর ছাড়: কাজের ধীরগতির কারণে সময়মতো ঋণের টাকা ব্যবহার করা যায় না। ফলে অনুমোদিত ঋণের যে টাকা অব্যবহৃত পড়ে থাকে, তার ওপর সরকারকে ‘কমিটমেন্ট চার্জ’ বা একধরনের জরিমানা গুনতে হয়।

আট. নাগরিকের অদৃশ্য খরচ: আগস্টে খোঁড়া রাস্তা, বর্ষার মুখে কাটা ড্রেন, জলাবদ্ধতা ও হারানো কর্মঘণ্টা। এসবের কোনোটিই হিসাবের খাতায় ওঠে না।

এবার একটি নির্দেশক হিসাব দেওয়া যাক। ধরা যাক এডিপির আকার ২ লাখ কোটি টাকা। ঐতিহাসিক বণ্টন অনুযায়ী এর প্রায় ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে এবং সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। এই ব্যয়ে দক্ষতাজনিত ক্ষতি যদি মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশও ধরি (পুনঃকাজ, আয়ুক্ষয়, আবহাওয়া প্রিমিয়াম এবং সনদের বিপরীতে অপ্রাপ্ত মূল্য), তাহলে বছরে ৪ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার মূল্য ধ্বংস হয়। এটি পঞ্চবার্ষিক মেয়াদে ২০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা। হিসাবটি নিঃসন্দেহে অনুমাননির্ভর। তবে অসামঞ্জস্যটি হচ্ছে, প্রকৃত ক্ষতি আমার ধরা নিম্নসীমার অর্ধেক হলেও বার্ষিক সাশ্রয় পঞ্জিকা বদলের এককালীন খরচকে ছাড়িয়ে যায়।

কোনো কোনো মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে—এপ্রিল–মার্চই কেন? জানুয়ারি–ডিসেম্বর নয় কেন? আসল প্রশ্নটি ‘জুলাই–জুন বনাম এপ্রিল–মার্চ’ নয়। প্রশ্নটি হলো, বিকল্পগুলোর মধ্যে সেরা কোনটি। গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ছিল পঞ্জিকাবর্ষ জানুয়ারি–ডিসেম্বর; যা আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান, আইএফআরএস প্রতিবেদন এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিসেম্বর সমাপনীর সঙ্গে মিলত। কিন্তু পঞ্জিকাবর্ষ সমস্যার অর্ধেক সমাধান করে। এপ্রিল–মার্চ করে পুরোটা। কারণ জানুয়ারি–ডিসেম্বর হলে বছরের শেষ প্রান্তিক পড়ত অক্টোবর–ডিসেম্বরে। সেটি শুষ্ক ও উৎপাদনশীল সময়, সেই অর্থে ভালোই। কিন্তু বছরের প্রথম প্রান্তিক হতো জানুয়ারি–মার্চ। অর্থাৎ বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো নির্মাণকালটি পড়ত ঠিক তখন, যখন বাজেট সবে অনুমোদিত, বরাদ্দ সবে জারি, ক্রয়পরিকল্পনা সবে প্রস্তুত—কিছুই দরপত্রে যায়নি। প্রতি বছর সেরা তিনটি মাস এভাবেই নষ্ট হতো।

এপ্রিল–মার্চে ক্রমটি মেলে জলবায়ুর সঙ্গে। এপ্রিল–জুন বরাদ্দ, ক্রয় ও প্রাথমিক কাজের সময়। জুলাই–সেপ্টেম্বর বর্ষায় নকশা চূড়ান্তকরণ, ভূমি অধিগ্রহণ, জরিপ, প্রি-ফ্যাব্রিকেশন ও দরপত্র মূল্যায়নের সময়। অক্টোবর–ডিসেম্বর হচ্ছে পূর্ণ মোবিলাইজেশনের সময়। আর জানুয়ারি–মার্চ শুষ্কতম প্রান্তিকে সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন ও বছর শেষের চাপ নেওয়ার সময়।

সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বর্ষা—বৃষ্টির ভেতরে নির্মাণকাজ চালাতে গিয়ে কাজ দীর্ঘায়িত হয়, মান নষ্ট হয়, জনদুর্ভোগ বাড়ে। কারণটি সঠিক ও যুক্তিযুক্ত, তবে সম্পূর্ণ নয়। প্রকৃত যুক্তি আরও গভীরে।

এখানেই মূল কথাটি, এবং তা স্পষ্ট করে বলা দরকার। বছর শেষের তাড়াহুড়ো আদেশ দিয়ে বিলোপ করা যায় না। তবে তাকে এমন মাসে সরিয়ে নেওয়া যায় যখন কংক্রিট জমাট বাঁধে। বার্ষিক বরাদ্দভিত্তিক প্রতিটি ব্যবস্থাতেই বছরান্তে ব্যয়ের গতি বাড়ে। বাস্তবসম্মত নীতিলক্ষ্য তাই তাড়াহুড়ো বিলোপ করা নয়, তাকে ভেজা প্রান্তিক থেকে শুষ্ক প্রান্তিকে সরিয়ে আনা।

অর্থবছর পরিবর্তনের পক্ষে বেশ কিছু জোরালো যুক্তি আছে। নতুন নিয়মে ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে বাজেট চূড়ান্ত হবে। তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে আগের ৯ মাসের (তিন প্রান্তিক) আসল আয়-ব্যয়ের হিসাব, ডিসেম্বর পর্যন্ত তৈরি করা ছয় মাসের জাতীয় হিসাব এবং পুরো বছরের বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সের প্রকৃত তথ্য থাকবে। বর্তমানে বাজেট তৈরি হয় এপ্রিল-মে মাসে। অথচ তখনো বছরের সবচেয়ে বেশি খরচের মাসটি (জুন) পারই হয় না। তাই বর্তমান বাজেট মূলত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নয়, অনুমান মাত্র। এর পাশাপাশি নতুন নিয়মের সঙ্গে বোরো ধান ওঠার মৌসুম এবং পয়লা বৈশাখের একটা দারুণ মিল থাকবে। আমাদের দেশে ব্যবসায়ীদের হালখাতা এমনিতেই এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে হয়। তাই এই হিসাবের মিল থাকাটা মোটেও ছোট কোনো বিষয় নয়।

প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। জাপান ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এপ্রিল থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তাদের অর্থবছর হিসাব করে আসছে। এটি তারা নিজেদের সিদ্ধান্তেই করেছে। জাপানেও বছর শেষে মার্চ মাসে প্রচুর নির্মাণকাজের চাপ তৈরি হয়, যা নিয়ে সেখানে বেশ হাসাহাসিও হয়। তবে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, এই কাজের চাপটা আসে বসন্তের শুরুতে, যখন আবহাওয়া বেশ শুকনো থাকে। জাপান কাজের এই তাড়াহুড়ো পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু তারা এমন একটা সময় বেছে নিয়েছে যখন এই তাড়াহুড়োর কারণে ক্ষতি সবচেয়ে কম হয়। কানাডাতেও বছর শেষে কেনাকাটার একটা হিড়িক পড়ে যায়, যাকে তারা ‘মার্চ ম্যাডনেস’ বলে। এই সমস্যা সমাধানে কানাডা একাধিক বছরের জন্য বাজেট বরাদ্দ, অব্যবহৃত টাকা পরের বছর ব্যবহারের সামান্য সুযোগ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে কেনাকাটার নিয়ম চালু করেছে। এর মানে হলো, শুধু তারিখ বদলালেই হবে না, নিয়মনীতিরও পরিবর্তন করতে হবে।

যুক্তরাজ্য, হংকং, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকা—এই চারটি দেশেরই অর্থবছর শুরু হয় এপ্রিলে এবং শেষ হয় মার্চে। আর তাদের বাজেট দেওয়া হয় ফেব্রুয়ারিতে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে আমাদের বেশ মিল রয়েছে। বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে খরচ, কাজের সীমিত সক্ষমতা, ফেব্রুয়ারিতে বাজেট ঘোষণা এবং অক্টোবরে মাঝামাঝি সময়ের বাজেট নীতি প্রকাশ করা—এসব দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা আমাদের জন্য এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের একটি দারুণ আদর্শ মডেল হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং এটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। তাদের অর্থবছরও আগে এপ্রিল-মার্চেই ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে বর্ষাকালের অজুহাত দেখিয়ে তারা অর্থবছর পরিবর্তন করে অক্টোবর-সেপ্টেম্বর করে। এর ফলাফল ভালো হয়নি। মাঝখানের সময়টাতে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি হয়, করদাতারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন এবং পুরোনো হিসাবের ওপর ভিত্তি করে বাজেট তৈরি করতে হয়। বাধ্য হয়ে ২০২২ সালে তারা আগের সিদ্ধান্তে ফিরে যায় এবং আবারও এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু করে। মাঝখানের সময়টা মেলাতে তারা ছয় মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট দেয়। মাত্র চার বছরের মধ্যে তারা দুবার পুরো ব্যবস্থাটি পরিবর্তন করে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষাটি একদম পরিষ্কার। অর্থবছর বদলাতে যে খরচ ও ঝামেলা পোহাতে হয়, তা এককালীন। কিন্তু দুবার বদলাতে গেলে সেই ক্ষতি দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাই আগামী ৫০ বছরের কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত একবারেই এবং চূড়ান্তভাবে নিতে হবে।

পরিবর্তনের এই অন্তর্বর্তী বা ক্রান্তিকালীন সময়ের পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হয়, তারও প্রমাণ রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ২০০১ সালে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর বাদ দিয়ে জানুয়ারি-ডিসেম্বর (ক্যালেন্ডার বছর) পঞ্জিকা গ্রহণ করে। এই পরিবর্তনের মাঝে সামঞ্জস্য আনতে তারা ২০০০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাসের একটি বাজেট তৈরি করেছিল। কাঠামোগতভাবে এটি আমাদের প্রস্তাবিত ২০২৭-২৮ সালের পরিকল্পনার হুবহু অনুরূপ। আয়ারল্যান্ডও ২০০১ সালে একই রকম নয় মাসের একটি করবর্ষ ব্যবহার করেছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৬ সালে এই পরিবর্তনের সময় তিন মাসের একটি ‘ট্রানজিশনাল কোয়ার্টার’ বা অন্তর্বর্তী প্রান্তিক ব্যবহার করেছিল। তাই নয় মাসের একটি খণ্ডিত বছর তৈরি করা কোনো নতুন আবিষ্কার নয়। এটি একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি এবং এর সুবিধা-অসুবিধা দুটোই সবার জানা।

মন্ত্রিসভা খুব সঠিকভাবেই এই বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। এই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), লেজিসলেটিভ ও অর্থ বিভাগ একসঙ্গে কাজ করবে। এই কমিটির কাজের তালিকায় অন্তত পাঁচটি বিষয় থাকা অত্যাবশ্যক:

আইনি ভিত্তি: আমাদের সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। এটি কোনো শেষ মুহূর্তের কাজ নয়, শুরুতেই এটি সেরে ফেলতে হবে। এরপর ‘সাধারণ ধারা আইন ১৮৯৭’-এর ৩(২১) ধারা, ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯’, এবং ‘সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬ ও বিধিমালা ২০০৮’। এসব আইনেই বছর শেষের তারিখ ‘৩০ জুন’ লেখা আছে, সেগুলোর সবই সংশোধন করতে হবে।

কর ব্যবস্থা: বেসরকারি খাতের জন্য এই অর্থবছর পরিবর্তন সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে কর ব্যবস্থার ওপর। ‘আয়কর আইন ২০২৩’-এ এই নয় মাসের খণ্ডিত আয়বর্ষের জন্য পরিষ্কার নিয়মকানুন থাকতে হবে। সম্পদের মূল্যহ্রাসের (অবচয়) আনুপাতিক হিসাব, টার্নওভারের ওপর ভিত্তি করে ন্যূনতম কর, অগ্রিম করের কিস্তি নতুন করে সাজানো, খণ্ডিত বছরে হওয়া লোকসান এবং হিসাব না হওয়া অবচয় পরের বছরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকতে হবে। নতুন করবর্ষের নাম কী হবে, তা-ও ঠিক করতে হবে। যাতে কোনো করদাতাকে দুবার কর দিতে না হয় বা কোনো কর হিসাব থেকে বাদ না পড়ে। ‘ভ্যাট আইন ২০১২’-এর বার্ষিক সীমা এবং টার্নওভার করের ক্ষেত্রেও একই রকম স্পষ্টতা প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতকে বাধ্য করা যাবে না: দেশের বেশির ভাগ কোম্পানি তাদের হিসাব বছর শেষ করে ৩০ জুন। অন্যদিকে ব্যাংক, বিমা এবং তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হিসাব শেষ করে ৩১ ডিসেম্বর। সরকারের অর্থবছর আর করদাতার আয়কর দেওয়ার বছর এক জিনিস নয়। এনবিআরের উচিত করদাতাদের ৩১ মার্চে হিসাব শেষ করার সুযোগ দেওয়া, তবে কোনোভাবেই বাধ্য করা যাবে না। বাধ্য করা হলে ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে অযথাই বিশাল খরচের বোঝা চাপবে।

পদ্ধতি ও পরিসংখ্যানের হিসাব: সরকারি হিসাবের সফটওয়্যার আইবাস++ (iBAS++), হিসাবের কাঠামো, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) মাসিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারি হিসাব এবং সরকারি কেনাকাটার ওয়েবসাইট ই-জিপি—এগুলোর সবকিছুই নতুন নিয়মে সাজাতে হবে। আর ২০২৮ সালের এপ্রিল আসার আগেই পুরো ব্যবস্থাটির পূর্ণ মহড়া দিয়ে পরীক্ষা করে নিতে হবে। নয় মাসের খণ্ডিত বছরের কারণে জাতীয় হিসাবের অনুপাতগুলো ভেঙে যাবে। যেমন: জিডিপির তুলনায় রাজস্ব, ঘাটতি বা এডিপির হিসাব আর আগের মতো মিলবে না। তাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) এখনই কথা দিতে হবে যে, এই অন্তর্বর্তী সময়ে এবং এর পরবর্তী অন্তত তিন বছর তারা নয় মাসের হিসাবের পাশাপাশি ১২ মাসের একটি আনুপাতিক হিসাবও প্রকাশ করবে।

পরিকল্পনা, চুক্তি ও উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বয়: পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়কাল, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো (এমটিবিএফ), চলমান প্রকল্পগুলোর লক্ষ্যমাত্রা, ঠিকাদারদের চুক্তির সময় বাড়ানো এবং বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড় ও প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সূচি—এই সবকিছুই সংশোধন করতে হবে। এমনকি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই নতুন নিয়মের আওতায় আনতে হবে।

এখানে একটি কথা খুব পরিষ্কার করে বলা দরকার। তা না হলে ২০২৯ সালে এসে এই নতুন ব্যবস্থাটিই আবার বদনামের শিকার হবে। অর্থবছর জুন থেকে মার্চে সরিয়ে আনলেই বছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে টাকা খরচের প্রবণতা, দেরি করে প্রকল্প পাস হওয়া, প্রকল্প পরিচালকদের কর্মস্থলে না থাকা বা কেনাকাটার দুর্বল ব্যবস্থা—এসব রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে না। এসব সমস্যার আসল কারণ হলো আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। যেমন, একেবারে শেষ কিস্তিতে টাকা ছাড় করা; ‘টাকা খরচ করো, নইলে ফেরত যাবে’—এই ধরনের বাজেটের নিয়ম (যা আসলে টাকা বাঁচাতে নিরুৎসাহিত করে); একাধিক দায়িত্বের ভারে ক্লান্ত প্রকল্প পরিচালক; যে পরিমাণ কাজ করার সামর্থ্য আছে তার চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বড় উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) তৈরি করা; এবং কাজের মান যাচাই না করে শুধু কত শতাংশ টাকা খরচ হলো তা মাপার অপসংস্কৃতি।

সবকিছু ঠিকঠাকভাবে করা গেলে, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো চালুর পর এটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার। এটি এতটাই উপকারী হবে যে, প্রথম পূর্ণাঙ্গ বছরেই এটি নিজের খরচ তুলে আনবে। আর যদি অবহেলা করা হয়, তবে এটি কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলানোর একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল অদলবদল হয়েই থেকে যাবে।

সিপিডিসহ অর্থনীতি বিশ্লেষকরা ঠিক এই কথাগুলোই বলছেন। তবে এর মানে এই নয় যে, অর্থবছর বদলানোর এই উদ্যোগটি শুধুই লোকদেখানো। এর মানে হলো, তারিখ বদলানোটা খুব জরুরি, তবে শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি মূলধন প্রকল্পগুলোতে বহুবর্ষী বরাদ্দ রাখতে হবে এবং অব্যবহৃত টাকা পরের বছর ব্যবহারের সীমিত সুযোগ দিতে হবে। প্রকল্প পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন সার্বক্ষণিক প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। কেনাকাটার তালিকা অনুযায়ী প্রথম প্রান্তিকেই (তিন মাস) অগ্রিম টাকা ছাড় করতে হবে। গত তিন বছরে কতটুকু কাজ করার সামর্থ্য প্রমাণিত হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে বাস্তবসম্মত এডিপি বানাতে হবে। আইএমইডি-কে শুধু আর্থিক অগ্রগতির হিসাব নয়, কাজের মান ঠিক আছে কি না, তারও স্বাধীন নিরীক্ষা প্রকাশ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বছরের শেষ প্রান্তিকে নতুন কোনো প্রকল্প পাস করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ, শেষ প্রান্তিক হলো কাজ শেষ করার সময়, নতুন কাজ শুরু করার জন্য নয়।

যে পরিবর্তনটি অনেক আগেই হওয়ার কথা ছিল, আজ তার পক্ষে যুক্তি দেওয়াটা বেশ কঠিন কাজ। কারণ, পুরোনো নিয়মের কারণে হওয়া ক্ষতিগুলো আমাদের স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে, সেগুলোকে এখন আর ক্ষতি বলেই মনে হয় না। বাংলাদেশ গত ৫০ বছর ধরে দেখে আসছে, জুন মাসে তার নির্মাণকাজ পানিতে ডুবে যায়। আর এটাকে সবাই শুধু ‘আবহাওয়া’ বলে মেনে নিয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে, ওটা আবহাওয়া ছিল না, ওটা ছিল ভুল নীতি।

মন্ত্রিসভার এই নতুন সিদ্ধান্তটি মূলত একসঙ্গে তিনটি কাজ করবে। রাজস্ব আদায়ের সময়সীমা এবং বর্ষাকালের মধ্যে প্রতিবছরের সংঘাত থামাবে; বছর শেষে কাজ ও খরচের অনিবার্য ঢলকে বছরের সবচেয়ে শুকনো ও কাজ করার জন্য উপযুক্ত সময়ে সরিয়ে আনবে; এবং বাজেট তৈরির সময়টাকে এমন এক সময়ে নিয়ে যাবে, যখন সরকার সত্যিই জানতে পারবে যে, সদ্য শেষ হওয়া বছরটিতে আসলে কী ঘটেছে।

পরিবর্তনের এই অন্তর্বর্তীকালীন নকশাটিও বেশ যুক্তিসংগত এবং পরীক্ষিত। ঝুঁকি যা কিছু আছে, তার পুরোটাই নির্ভর করছে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার ওপর। সাংবিধানিক সংশোধনী, করের নিয়ম, আইবাস++, পরিসংখ্যানের হিসাব ঠিক রাখা এবং সিদ্ধান্তটি একবারেই নেওয়ার শৃঙ্খলা—এগুলোই এখন মূল কাজ। সবকিছু ঠিকঠাকভাবে করা গেলে, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো চালুর পর এটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার। এটি এতটাই উপকারী হবে যে, প্রথম পূর্ণাঙ্গ বছরেই এটি নিজের খরচ তুলে আনবে। আর যদি অবহেলা করা হয়, তবে এটি কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলানোর একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল অদলবদল হয়েই থেকে যাবে।

সিদ্ধান্তটি সঠিক। আগামী কুড়ি মাস ঠিক করে দেবে, সিদ্ধান্তটি সার্থক হলো কি না।

  • মাহমুদ হোসেন: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট

*(মতামত লেখকের নিজস্ব)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

অর্থবছর এপ্রিল–মার্চ: দেরিতে হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত