গণতন্ত্রের নতুন চ্যালেঞ্জ সক্রিয় নাগরিকত্ব

মাহমুদুল হাসান
মাহমুদুল হাসান

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ২০: ৫৪
ভোট গণতন্ত্রের শুরু হতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে সক্রিয় নাগরিকত্বের ওপর। স্ট্রিম গ্রাফিক

গণতন্ত্রকে অনেক সময় শুধু নির্বাচন ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ করা হয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তা শুধু ভোটের বাক্সে নয়, বরং নাগরিকরা কতটা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ ও ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারছেন, তার ওপর। এই কারণে সক্রিয় নাগরিকত্ব আজ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সে তুলনায় নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নাগরিক রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে এখনো সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার সম্পর্ক হিসেবে দেখেন। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক কেবল সুবিধাভোগী নন; তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম অংশীদ্বার।

সক্রিয় নাগরিকত্ব মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়। এর অর্থ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা দাবি, জনস্বার্থে তথ্য চাওয়া, নাগরিক পরামর্শ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া এবং নীতিনির্ধারণে নিজের মতামত প্রকাশ করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এই অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী নয়।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কথাই ধরা যাক। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনকে জনগণের সবচেয়ে কাছের সরকার বলা হলেও, অধিকাংশ নাগরিক জানেন না কীভাবে বাজেট প্রণয়ন হয়, কীভাবে উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন করা হয় বা কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র অনেক সময় সীমিত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। গণতন্ত্র তখন প্রতিনিধিত্বমূলক থাকলেও, অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠতে পারে না।

একইভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। নাগরিকরা সামাজিক মাধ্যমে মতপ্রকাশ করছেন, বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত গড়ে তুলছেন এবং দ্রুত সংগঠিত হতে পারছেন। কিন্তু ডিজিটাল পরিসরকে এখনো কার্যকর নাগরিক অংশগ্রহণের কাঠামোর সঙ্গে যথেষ্টভাবে যুক্ত করা যায়নি। সরকারের কাছে নাগরিকদের মতামত, অভিযোগ ও প্রস্তাব সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল নাগরিক প্ল্যাটফর্মের অভাব স্পষ্ট। ফলে অনলাইন ক্ষোভ অনেক সময় বাস্তব নীতি পরিবর্তনে রূপ নিচ্ছে।

এখানেই সক্রিয় নাগরিকত্বকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। নাগরিক শিক্ষা, তথ্য অধিকার ব্যবহারে উৎসাহ, স্থানীয় সরকারের উন্মুক্ত বাজেট ও গণশুনানি, ই-পিটিশন ব্যবস্থা এবং নাগরিক পরামর্শভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা সময়ের দাবি। উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন নাগরিকরা শুধু প্রকল্পের উপকারভোগী নয়, বরং পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নের অংশীদ্বার হবেন।

বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো– আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে নাগরিকরা কেবল ভোটার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নাকি যেখানে নাগরিকরা প্রতিদিনের শাসনব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদ্বার? কারণ, শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শক্তিশালী, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজ। ভোট গণতন্ত্রের শুরু হতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে সক্রিয় নাগরিকত্বের ওপর।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ তাই সংসদ ভবনে যতটা নির্ধারিত হবে, ততটাই নির্ধারিত হবে ইউনিয়ন পরিষদের উঠানে, পৌরসভার গণশুনানিতে, নাগরিক ফোরামের আলোচনা কিংবা সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত