মাহমুদ হোসেন

গত ৫ আগস্ট, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর সন্ধ্যায়, নয়াদিল্লিতে বসে দণ্ডিত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন, ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। একই সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভাষা ছিল কঠোর। সেই কাঠিন্য আবেগের নয়, আইনের।
প্রশ্নটি জটিল নয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন পলাতক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজধানীতে আশ্রয় নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন কি না; আর প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে পাঠানো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ বছরের পর বছর নিরুত্তর রাখা যায় কি না। দুই প্রশ্নেই বাংলাদেশের অবস্থান আইনসম্মত। প্রতিবেশীর মুখে যখন শোনা যায়, আমরা একই আকাশ ও বাতাসের অংশীদার, তখন শুষ্ক মৌসুমে অভিন্ন নদীর পানি আটকে রেখে ভরা বর্ষায় তা ছেড়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতার পাশে এই নীরবতা আরও বেশি বাজে।
সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো শেখ হাসিনাকে “নির্বাসিত রাজনীতিক” হিসেবে উপস্থাপন করা। আইনের চোখে তাঁর পরিচয় ভিন্ন। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আদালতের ভাষ্য স্পষ্ট— উসকানি, নির্দেশ প্রদান এবং প্রতিরোধে ব্যর্থতা—তিন ধারাতেই তাঁর দায় প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশ কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাইছে না; চাইছে একজন পলাতক দণ্ডিত আসামিকে। দণ্ডিত ব্যক্তি সীমান্ত পেরোলেই দণ্ড অকার্যকর হয়ে যায় না। কাজেই এই দাবি ব্যতিক্রমী নয়—দাবিটি না করাই হতো অস্বাভাবিক। তিনি আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ অগ্রাহ্য করেছেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে ভিনদেশে বসে রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট বলা আর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তা প্রমাণ করা এক জিনিস নয়।
যাঁরা জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে অতিরঞ্জন বলতে চান, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর সত্য হলো—হিসাবটি বাংলাদেশ সরকারের নয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের অনুসন্ধান প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ পর্যন্ত হতে পারে; তাঁদের ১২ থেকে ১৩ শতাংশই শিশু। একই প্রতিবেদন পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ৪৪ জন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর তথ্যও লিপিবদ্ধ করেছে। নথিটি একপক্ষীয় নয়—সেটিই তার শক্তি। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক একে বলেছেন ক্ষমতা ধরে রাখার সুপরিকল্পিত ও সুসমন্বিত কৌশল। আর এই তদন্ত দল এসেছিল বাংলাদেশেরই আমন্ত্রণে। যে রাষ্ট্র নিজের বিরুদ্ধেও তদন্তের ঝুঁকি নেয়, তার নথিকে প্রচারপত্র বলা কঠিন।
জুলাইকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাছে জমা পড়েছে সহস্রাধিক অভিযোগ। তিন শতাধিক মানুষ আজও নিখোঁজ। কমিশন গুমকে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় কমান্ড-কাঠামোয় পরিচালিত একটি ব্যবস্থা হিসেবে; আয়নাঘর তার স্থাপত্যিক প্রমাণ। এই ধারাবাহিকতাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যর্পণ আইনে অপরাধের ‘রাজনৈতিক চরিত্র’ নির্ধারিত হয় অপরাধের প্রকৃতি দিয়ে, উদ্দেশ্য দিয়ে নয়। দেড় দশকের সুসংগঠিত দমননীতির পরিণতি হিসেবে দেখলে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ যুক্তিটি নিজেই ভেঙে পড়ে।
এই শাসনামলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সম্ভবত রক্তপাতের নয়, লুণ্ঠনের। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাবে, দেড় দশকে দেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। বছরে গড়ে পৌনে দুই লাখ কোটি। অঙ্কটি বহু বছরের সমগ্র বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির চেয়েও বড়। অর্থাৎ প্রতিবছর একটি গোটা এডিপি দেশ থেকে উবে গেছে। ব্যাংকিং খাতে এর চেহারা আরও নগ্ন। বিএফআইইউর কেস স্টাডি অনুযায়ী একটি মাত্র শিল্পগোষ্ঠী দশটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে নিয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে জামানত ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। খেলাপি ঋণ গত সেপ্টেম্বরে উঠেছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়। এটি মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তদন্ত সংস্থা ও সংসদ—তিনটিই তখন ছিল ঋণগ্রহীতাদের দখলে।
অথচ বয়ানটি ছিল উন্নয়নের। শ্বেতপত্র সেই বয়ানের কাঠামোটিই ভেঙে দিয়েছে। কোভিড ও দুর্যোগের বছরেও প্রবৃদ্ধির হার থেকেছে অস্বাভাবিক উঁচু, যা পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভব। মূল্যস্ফীতির উপাত্ত প্রকাশের আগে ‘সমন্বয়’ হতো মন্ত্রীর দপ্তরে; ঘোষিত মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৮৪ ডলারের বিপরীতে প্রকৃত সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২ হাজার ২০০। বিনিয়োগ স্থবির, কর-জিডিপি অনুপাত অনড়, কর্মসংস্থান নিম্নমুখী, অথচ প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী। এই স্ববিরোধের ব্যাখ্যা একটিই। সেটি হচ্ছে, উপাত্ত। প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে ২০২৪ সালেই। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে আসে ২০ বিলিয়নের ঘরে আর মূল্যস্ফীতির বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ পরিবারের রান্নাঘরে। পাচারের বিল পরিশোধ করেছে জনগণ।
এখানেই প্রত্যর্পণের সঙ্গে অর্থনীতির যোগ। পাচার করা অর্থকে বিদেশে চিরস্থায়ী করাই ছিল নকশার অংশ। একাধিক দেশের নাগরিকত্ব, অফশোর ট্রাস্ট, স্তরে স্তরে আড়াল। ফল হাতেনাতে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ খেলাপিদের কাছে পাওনার এক শতাংশও গত বছর নগদে আদায় হয়নি। বিদেশি আদালত সম্পদ অবমুক্ত করার আগে দেখে, অনুরোধকারী রাষ্ট্র কতটা ধারাবাহিক ও কার্যকর। যে রাষ্ট্র মূল অভিযুক্তকেই আদালতে হাজির করতে পারে না, তার সম্পদ পুনরুদ্ধারের আবেদনও দুর্বল থেকে যায়। প্রত্যর্পণ তাই কেবল ফৌজদারি বিচারের প্রশ্ন নয়, লুণ্ঠিত সম্পদ ফেরানোরও পূর্বশর্ত।
আইনি ভিত্তির দিক থেকেও বাংলাদেশ দুর্বল নয়। ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ও ২০১৬ সালে সংশোধিত ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উভয় দেশে ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ প্রত্যর্পণযোগ্য। হত্যা, গুম ও নির্যাতন দুই দেশেই ফৌজদারি অপরাধ। ২০১৬ সালের সংশোধনী প্রাথমিক সাক্ষ্য উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতাই তুলে দিয়েছে। উপযুক্ত আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাই যথেষ্ট। উল্লেখ্য, এই শিথিলকরণ হয়েছিল শেখ হাসিনার নিজের সরকারের সম্মতিতে। আর চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক অপরাধে প্রত্যর্পণ অস্বীকারের সুযোগ রাখলেও হত্যা, অপহরণ ও সন্ত্রাসসংশ্লিষ্ট অপরাধকে স্পষ্টভাবে সেই ব্যতিক্রমের বাইরে রেখেছে।
সবচেয়ে জোরালো যুক্তিটি পারস্পরিকতার। এই চুক্তির অধীনেই ২০১৫ সালে বাংলাদেশ উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। ২০২০ সালে ভারত শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত পলাতকদের ঢাকায় ফেরত পাঠিয়েছে। চুক্তিটি কাজ করেছে এবং একাধিকবার ভারতের অনুকূলেই করেছে। এখন উল্টো দিকে এসে সেটিকে নিষ্ক্রিয় রাখলে চুক্তিটির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতে ভারতের নিজের অনুরোধগুলোর নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
কূটনীতিতে শক্ত অবস্থান তখনই টেকে, যখন প্রতিপক্ষের সেরা যুক্তিটিরও জবাব তৈরি থাকে। দিল্লির হাতে দুটি যুক্তি আছে। এক, অনুপস্থিতিতে বিচার। অ্যামনেস্টি ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দুটোই বলেছে, অভিযুক্তরা নিজেদের পছন্দের আইনজীবীর প্রতিনিধিত্ব পাননি। দুই, মৃত্যুদণ্ড। আন্তর্জাতিক চর্চায় দণ্ড কার্যকর না করার নিশ্চয়তা ছাড়া রাষ্ট্রগুলো সাধারণত কাউকে হস্তান্তর করে না।
এর জবাব পাল্টা-অভিযোগ নয়, প্রক্রিয়াগত নিশ্চয়তা। বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে থেকেই আপিলের পূর্ণ অধিকার ও হাজির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ লিখিতভাবে নিশ্চিত করতে পারে, অভিযুক্তকে নিজের পছন্দের কৌঁসুলি নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে, বিচারকক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দিতে পারে এবং সর্বোচ্চ আদালতের পর্যালোচনা ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ন রেখে দণ্ড কার্যকরের প্রশ্নে কূটনৈতিক নিশ্চয়তার কাঠামো বিবেচনায় রাখতে পারে। এগুলো ছাড় নয়, কৌশল। কারণ এতে অন্য পক্ষের হাতে থাকা একমাত্র সম্মানজনক অজুহাতটি নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রশ্নটি তখন আর ‘বিচার কি ন্যায্য হবে’ থাকে না; প্রশ্নটি দাঁড়ায়—একটি বন্ধুরাষ্ট্র কি নিজের সইকৃত চুক্তি মানবে?
করণীয়ও জটিল নয়। দাবিটিকে দলীয় নয়, রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে ধরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে সংসদে ঐকমত্যের প্রস্তাব দিতে হবে, যাতে সরকার বদলালেও অবস্থান না বদলায়। প্রতিটি অনুরোধ নোট ভারবাল, রায়ের অনুলিপি ও পরোয়ানাসহ পাঠাতে হবে এবং নিয়মিত বিরতিতে পুনরাবৃত্তি করতে হবে। নীরবতাকে যেন সম্মতি ধরে নেওয়া না যায়। প্রত্যর্পণ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের ফাইল দুটিকে গাঁথতে হবে একই আইনি বয়ানে এবং বিষয়টি তুলতে হবে বহু পক্ষীয় পরিসরেও, যাতে এটি আন্তর্জাতিক জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আর অভ্যন্তরীণ বিচারিক মান রক্ষা করতে হবে নিখুঁতভাবে।
একটি রাষ্ট্র তখনই সার্বভৌম, যখন তার আদালতের রায় সীমান্তে এসে থেমে যায় না। জুলাই-আগস্টে যাঁরা সন্তান হারিয়েছেন, যাঁদের অনেকের বয়স আঠারোও পেরোয়নি, তাঁদের কাছে এই দাবি প্রতিশোধের নয়, স্বীকৃতির। বছরে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা যে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে, সেই দেশের করদাতার কাছে এটি হিসাব চাওয়ার অধিকার। আর যে আমানত ১৪ শতাংশ জামানতের বিপরীতে অন্যের বিদেশি সম্পত্তিতে রূপ নিয়েছে, সেই আমানতকারীর কাছে এটি ন্যূনতম ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন।
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশের জবাব সহজ এবং আইনসম্মত—ফিরুন, আদালতের কাঠগড়ায়। দণ্ডিত ব্যক্তির দেশে ফেরার একটিই বৈধ পথ থাকে, আর সেটি রাজনৈতিক মঞ্চ নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই বিবৃতি তাই রাষ্ট্রের নিজের নাগরিকদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির পুনর্ঘোষণা। এই অবস্থান থেকে সরে আসার সুযোগ নেই।
লেখক: ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট

গত ৫ আগস্ট, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর সন্ধ্যায়, নয়াদিল্লিতে বসে দণ্ডিত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন, ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। একই সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভাষা ছিল কঠোর। সেই কাঠিন্য আবেগের নয়, আইনের।
প্রশ্নটি জটিল নয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন পলাতক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজধানীতে আশ্রয় নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন কি না; আর প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে পাঠানো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ বছরের পর বছর নিরুত্তর রাখা যায় কি না। দুই প্রশ্নেই বাংলাদেশের অবস্থান আইনসম্মত। প্রতিবেশীর মুখে যখন শোনা যায়, আমরা একই আকাশ ও বাতাসের অংশীদার, তখন শুষ্ক মৌসুমে অভিন্ন নদীর পানি আটকে রেখে ভরা বর্ষায় তা ছেড়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতার পাশে এই নীরবতা আরও বেশি বাজে।
সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো শেখ হাসিনাকে “নির্বাসিত রাজনীতিক” হিসেবে উপস্থাপন করা। আইনের চোখে তাঁর পরিচয় ভিন্ন। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আদালতের ভাষ্য স্পষ্ট— উসকানি, নির্দেশ প্রদান এবং প্রতিরোধে ব্যর্থতা—তিন ধারাতেই তাঁর দায় প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশ কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাইছে না; চাইছে একজন পলাতক দণ্ডিত আসামিকে। দণ্ডিত ব্যক্তি সীমান্ত পেরোলেই দণ্ড অকার্যকর হয়ে যায় না। কাজেই এই দাবি ব্যতিক্রমী নয়—দাবিটি না করাই হতো অস্বাভাবিক। তিনি আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ অগ্রাহ্য করেছেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে ভিনদেশে বসে রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট বলা আর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তা প্রমাণ করা এক জিনিস নয়।
যাঁরা জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে অতিরঞ্জন বলতে চান, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর সত্য হলো—হিসাবটি বাংলাদেশ সরকারের নয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের অনুসন্ধান প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ পর্যন্ত হতে পারে; তাঁদের ১২ থেকে ১৩ শতাংশই শিশু। একই প্রতিবেদন পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ৪৪ জন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর তথ্যও লিপিবদ্ধ করেছে। নথিটি একপক্ষীয় নয়—সেটিই তার শক্তি। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক একে বলেছেন ক্ষমতা ধরে রাখার সুপরিকল্পিত ও সুসমন্বিত কৌশল। আর এই তদন্ত দল এসেছিল বাংলাদেশেরই আমন্ত্রণে। যে রাষ্ট্র নিজের বিরুদ্ধেও তদন্তের ঝুঁকি নেয়, তার নথিকে প্রচারপত্র বলা কঠিন।
জুলাইকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাছে জমা পড়েছে সহস্রাধিক অভিযোগ। তিন শতাধিক মানুষ আজও নিখোঁজ। কমিশন গুমকে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় কমান্ড-কাঠামোয় পরিচালিত একটি ব্যবস্থা হিসেবে; আয়নাঘর তার স্থাপত্যিক প্রমাণ। এই ধারাবাহিকতাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যর্পণ আইনে অপরাধের ‘রাজনৈতিক চরিত্র’ নির্ধারিত হয় অপরাধের প্রকৃতি দিয়ে, উদ্দেশ্য দিয়ে নয়। দেড় দশকের সুসংগঠিত দমননীতির পরিণতি হিসেবে দেখলে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ যুক্তিটি নিজেই ভেঙে পড়ে।
এই শাসনামলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সম্ভবত রক্তপাতের নয়, লুণ্ঠনের। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাবে, দেড় দশকে দেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। বছরে গড়ে পৌনে দুই লাখ কোটি। অঙ্কটি বহু বছরের সমগ্র বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির চেয়েও বড়। অর্থাৎ প্রতিবছর একটি গোটা এডিপি দেশ থেকে উবে গেছে। ব্যাংকিং খাতে এর চেহারা আরও নগ্ন। বিএফআইইউর কেস স্টাডি অনুযায়ী একটি মাত্র শিল্পগোষ্ঠী দশটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে নিয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে জামানত ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। খেলাপি ঋণ গত সেপ্টেম্বরে উঠেছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়। এটি মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তদন্ত সংস্থা ও সংসদ—তিনটিই তখন ছিল ঋণগ্রহীতাদের দখলে।
অথচ বয়ানটি ছিল উন্নয়নের। শ্বেতপত্র সেই বয়ানের কাঠামোটিই ভেঙে দিয়েছে। কোভিড ও দুর্যোগের বছরেও প্রবৃদ্ধির হার থেকেছে অস্বাভাবিক উঁচু, যা পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভব। মূল্যস্ফীতির উপাত্ত প্রকাশের আগে ‘সমন্বয়’ হতো মন্ত্রীর দপ্তরে; ঘোষিত মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৮৪ ডলারের বিপরীতে প্রকৃত সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২ হাজার ২০০। বিনিয়োগ স্থবির, কর-জিডিপি অনুপাত অনড়, কর্মসংস্থান নিম্নমুখী, অথচ প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী। এই স্ববিরোধের ব্যাখ্যা একটিই। সেটি হচ্ছে, উপাত্ত। প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে ২০২৪ সালেই। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে আসে ২০ বিলিয়নের ঘরে আর মূল্যস্ফীতির বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ পরিবারের রান্নাঘরে। পাচারের বিল পরিশোধ করেছে জনগণ।
এখানেই প্রত্যর্পণের সঙ্গে অর্থনীতির যোগ। পাচার করা অর্থকে বিদেশে চিরস্থায়ী করাই ছিল নকশার অংশ। একাধিক দেশের নাগরিকত্ব, অফশোর ট্রাস্ট, স্তরে স্তরে আড়াল। ফল হাতেনাতে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ খেলাপিদের কাছে পাওনার এক শতাংশও গত বছর নগদে আদায় হয়নি। বিদেশি আদালত সম্পদ অবমুক্ত করার আগে দেখে, অনুরোধকারী রাষ্ট্র কতটা ধারাবাহিক ও কার্যকর। যে রাষ্ট্র মূল অভিযুক্তকেই আদালতে হাজির করতে পারে না, তার সম্পদ পুনরুদ্ধারের আবেদনও দুর্বল থেকে যায়। প্রত্যর্পণ তাই কেবল ফৌজদারি বিচারের প্রশ্ন নয়, লুণ্ঠিত সম্পদ ফেরানোরও পূর্বশর্ত।
আইনি ভিত্তির দিক থেকেও বাংলাদেশ দুর্বল নয়। ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ও ২০১৬ সালে সংশোধিত ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উভয় দেশে ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ প্রত্যর্পণযোগ্য। হত্যা, গুম ও নির্যাতন দুই দেশেই ফৌজদারি অপরাধ। ২০১৬ সালের সংশোধনী প্রাথমিক সাক্ষ্য উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতাই তুলে দিয়েছে। উপযুক্ত আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাই যথেষ্ট। উল্লেখ্য, এই শিথিলকরণ হয়েছিল শেখ হাসিনার নিজের সরকারের সম্মতিতে। আর চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক অপরাধে প্রত্যর্পণ অস্বীকারের সুযোগ রাখলেও হত্যা, অপহরণ ও সন্ত্রাসসংশ্লিষ্ট অপরাধকে স্পষ্টভাবে সেই ব্যতিক্রমের বাইরে রেখেছে।
সবচেয়ে জোরালো যুক্তিটি পারস্পরিকতার। এই চুক্তির অধীনেই ২০১৫ সালে বাংলাদেশ উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। ২০২০ সালে ভারত শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত পলাতকদের ঢাকায় ফেরত পাঠিয়েছে। চুক্তিটি কাজ করেছে এবং একাধিকবার ভারতের অনুকূলেই করেছে। এখন উল্টো দিকে এসে সেটিকে নিষ্ক্রিয় রাখলে চুক্তিটির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতে ভারতের নিজের অনুরোধগুলোর নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
কূটনীতিতে শক্ত অবস্থান তখনই টেকে, যখন প্রতিপক্ষের সেরা যুক্তিটিরও জবাব তৈরি থাকে। দিল্লির হাতে দুটি যুক্তি আছে। এক, অনুপস্থিতিতে বিচার। অ্যামনেস্টি ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দুটোই বলেছে, অভিযুক্তরা নিজেদের পছন্দের আইনজীবীর প্রতিনিধিত্ব পাননি। দুই, মৃত্যুদণ্ড। আন্তর্জাতিক চর্চায় দণ্ড কার্যকর না করার নিশ্চয়তা ছাড়া রাষ্ট্রগুলো সাধারণত কাউকে হস্তান্তর করে না।
এর জবাব পাল্টা-অভিযোগ নয়, প্রক্রিয়াগত নিশ্চয়তা। বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে থেকেই আপিলের পূর্ণ অধিকার ও হাজির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ লিখিতভাবে নিশ্চিত করতে পারে, অভিযুক্তকে নিজের পছন্দের কৌঁসুলি নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে, বিচারকক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দিতে পারে এবং সর্বোচ্চ আদালতের পর্যালোচনা ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ন রেখে দণ্ড কার্যকরের প্রশ্নে কূটনৈতিক নিশ্চয়তার কাঠামো বিবেচনায় রাখতে পারে। এগুলো ছাড় নয়, কৌশল। কারণ এতে অন্য পক্ষের হাতে থাকা একমাত্র সম্মানজনক অজুহাতটি নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রশ্নটি তখন আর ‘বিচার কি ন্যায্য হবে’ থাকে না; প্রশ্নটি দাঁড়ায়—একটি বন্ধুরাষ্ট্র কি নিজের সইকৃত চুক্তি মানবে?
করণীয়ও জটিল নয়। দাবিটিকে দলীয় নয়, রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে ধরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে সংসদে ঐকমত্যের প্রস্তাব দিতে হবে, যাতে সরকার বদলালেও অবস্থান না বদলায়। প্রতিটি অনুরোধ নোট ভারবাল, রায়ের অনুলিপি ও পরোয়ানাসহ পাঠাতে হবে এবং নিয়মিত বিরতিতে পুনরাবৃত্তি করতে হবে। নীরবতাকে যেন সম্মতি ধরে নেওয়া না যায়। প্রত্যর্পণ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের ফাইল দুটিকে গাঁথতে হবে একই আইনি বয়ানে এবং বিষয়টি তুলতে হবে বহু পক্ষীয় পরিসরেও, যাতে এটি আন্তর্জাতিক জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আর অভ্যন্তরীণ বিচারিক মান রক্ষা করতে হবে নিখুঁতভাবে।
একটি রাষ্ট্র তখনই সার্বভৌম, যখন তার আদালতের রায় সীমান্তে এসে থেমে যায় না। জুলাই-আগস্টে যাঁরা সন্তান হারিয়েছেন, যাঁদের অনেকের বয়স আঠারোও পেরোয়নি, তাঁদের কাছে এই দাবি প্রতিশোধের নয়, স্বীকৃতির। বছরে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা যে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে, সেই দেশের করদাতার কাছে এটি হিসাব চাওয়ার অধিকার। আর যে আমানত ১৪ শতাংশ জামানতের বিপরীতে অন্যের বিদেশি সম্পত্তিতে রূপ নিয়েছে, সেই আমানতকারীর কাছে এটি ন্যূনতম ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন।
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশের জবাব সহজ এবং আইনসম্মত—ফিরুন, আদালতের কাঠগড়ায়। দণ্ডিত ব্যক্তির দেশে ফেরার একটিই বৈধ পথ থাকে, আর সেটি রাজনৈতিক মঞ্চ নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই বিবৃতি তাই রাষ্ট্রের নিজের নাগরিকদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির পুনর্ঘোষণা। এই অবস্থান থেকে সরে আসার সুযোগ নেই।
লেখক: ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট
.png)

দুই বছর আগে ৫ আগস্ট ক্ষমতা থেকে ন্যাক্কারজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। সেই দিনটিকে সামনে রেখে নয়াদিল্লিতে তিনি আয়োজন করেছিলেন ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন করে অস্বস্তি যুক্ত হয়েছে।
৩২ মিনিট আগে‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য বিতর্কিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবকে নতুন নাম ও কাঠামোয় পুনর্গঠন। এর আগে বাহিনীটির নাম বদলে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ রাখার কথা শোনা গিয়েছিল।
১৭ ঘণ্টা আগে
কোনো জাতির ইতিহাস কেবল ঘটনাবলির ধারাবিবরণী নয়; তা জাতীয় চেতনা, আত্মপরিচয়, গণসংগ্রামের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যের নির্ভরযোগ্য দলিল। বিশেষ করে গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা জাতীয় সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি।
১ দিন আগে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি বড় দুর্বলতা হলো এই সম্পর্কটি দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক বা "রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র" সম্পর্কের ভিত্তির চেয়ে অনেক বেশি "সরকার থেকে সরকার" অথবা নির্দিষ্ট "রাজনৈতিক দল কেন্দ্রিক" কাঠামোর ওপর গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক নীতিতে কোনো টেকসই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দুই দেশের...
০৭ আগস্ট ২০২৬