আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনকে ঐতিহাসিক নির্বাচন মনে করা হচ্ছে, কারণ, জেনজি প্রজন্মের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম ভোট।
জেনজিরা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেড় যুগ ধরে জেঁকে বসা এক স্বৈরশাসককে হটিয়ে দিয়েছে। ফলে, তরুণরা চায়, গণঅভ্যুত্থানের পর এক নতুন বাংলাদেশ গড়তে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ভারতে পলায়নের দৃশ্য এবং তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে বিক্ষোভকারীদের ঢুকে পড়ার দৃশ্য সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান হওয়ায় অনেকেই খুশি হয়েছেন। কারণ তাঁর শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ছিল কারচুপিতে ভরা।
হাসিনাকে হটানোর আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী মির্জা শাকিল সিএনএনকে বলেন, ‘এই বিপ্লব দেখিয়েছে জেনজি কী করতে পারে।’
তবে হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ যাদের হাতে যেতে পারে, তারা জেনজি বিপ্লবী নয়। বরং এমন নেতাদের হাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা যেতে যাচ্ছে, যাদের একজনের বয়স ৬০ বছর, আরেকজনের বয়স ৬৭ বছর।
গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সাদমান মুজতবা রাফিদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে লিঙ্গ, জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে। আমরা নীতিগত পরিবর্তন ও সংস্কার আশা করেছিলাম, কিন্তু বাস্তবতা আমাদের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে।’
হাসিনার পতনের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্য থেকে। সরকার সেই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয় এবং লাখ লাখ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের আগুন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। আর তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, হাসিনার শাসনের অবসান হতে চলেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতা তাঁর সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ে, যার ফলে হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান।
গত নভেম্বর মাসে ঢাকার একটি আদালত এই সহিংসতার ঘটনায় হাসিনার ভূমিকার জন্য তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, এই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়, যদিও হাসিনার দাবি, তিনি নির্দোষ। তাঁর দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে দলটি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
হাসিনা ও তাঁর দলের অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি সুবিধা করে দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি)। দলের নেতা তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার ছেলে, ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফিরে এসেছেন। এবারের নির্বাচনে তিনি এগিয়ে আছেন বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।
আরেক পুরোনো শক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। হাসিনার শাসনামলে দলটি দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল। তাঁরাও আবার রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।
অন্যদিকে, ছাত্র আন্দোলনের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাংলাদেশের বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে নিজেদের জায়গা করে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে তাঁরা জামায়াতে ইসলামী সঙ্গে জোট করার ঘোষণা দিলে অনেকেই বিস্মিত হয়।
লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমি হোসেন সিএনএনকে বলেন, এই জোট আংশিকভাবে নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে, কারণ সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকলে সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছুটা সুরক্ষা মেলে।
এরই মধ্যে প্রার্থী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংস হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতি অনেক ছাত্র আন্দোলনকারীকে আশাহত করেছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নাজিফা জান্নাত বলেন, ‘এনসিপি সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যে দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই, তাদের সঙ্গে জোট করা আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’
নাজিফা একে ‘লজ্জাজনক ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেন।
তবুও বৃহস্পতিবারের ভোটকে অনেকেই এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে করছেন। ঢাকার রাস্তায় মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠার পাশাপাশি নতুন কিছুর প্রত্যাশাও রয়েছে।