খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা: তেহরানের জনসমুদ্র যেভাবে বদলে দিচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির চেনা সমীকরণ

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৭: ১৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে যে ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তার দীর্ঘ চার মাস পর অবশেষে শুরু হয়েছে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠান। গত ৩ জুলাই (শুক্রবার) থেকে তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন আচার শুরু হয়েছে, যা টানা সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় বিধিবিধান অনুযায়ী চলবে এবং আগামী ৯ জুলাই শেষ হবে।

এই দীর্ঘ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৪ জুলাই নাগাদ তেহরানের রাজপথ, ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা এবং এঙ্গেলাব স্কয়ার এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এই বিপুল জনস্রোত প্রমাণ করে, বাহ্যিক চাপ বা সামরিক আগ্রাসন দিয়ে একটি জাতির আদর্শিক প্রতিরোধকে দমানো যায় না। বিশ্বমঞ্চের প্রধান পরাশক্তি ও সৌদি আরবসহ ১০০টিরও বেশি দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিকদের এই বিশাল উপস্থিতি আজ ওয়াশিংটন ও তার সহযোগীদের এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

তেহরানের নজিরবিহীন প্রস্তুতি ও ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমুদ্র

তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা এবং এঙ্গেলাব স্কয়ারের বাইরে আজ লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন। এই ঐতিহাসিক সমাগমকে সামাল দিতে এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকার ও প্রতিরোধের ক্ষমতা বিশ্ববাসীর কাছে প্রদর্শন করতে ইরান সরকার যে পরিমাণ প্রস্তুতি নিয়েছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। বাসিজ (ইরানের আধাসামরিক বাহিনী)-এর তথ্যমতে, প্রায় ২ কোটি মানুষের সমাগমের বিশাল লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে দূর-দূরান্ত থেকে আগত শোকার্ত মানুষদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের জন্য ১৬টি ভ্রাম্যমাণ বেকারিসহ প্রায় ৫ কোটি রুটি তৈরির এক অভাবনীয় ও বিশাল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে দেশটি। পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশ থেকে আসা মানুষের থাকার সুবিধার জন্য ২০ হাজার ক্লাসরুমকে সাময়িক আবাসন হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সভাস্থল ও এর আশেপাশে ২,৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স এবং ২১টি হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক মোতায়েন রাখা হয়েছে। তেহরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্রাফিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সব ধরনের ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও জুলাইয়ের তীব্র গরম থেকে উপস্থিত জনতাকে বাঁচাতে মোসাল্লা কমপ্লেক্সের চত্বরে ৬ হাজারের বেশি পানির স্প্রিঙ্কলার বসানো হয়েছে।

নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জানাজার অনুষ্ঠানকে ঘিরে সব ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ-বৈদেশিক হুমকি এড়াতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলের আকাশপথ ও স্থলভাগে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে ১০০টি ড্রোন আকাশে উড্ডয়ন করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও লাখ লাখ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীগুলো সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।

একক মেরু ব্যবস্থা থেকে বহুমেরু বিশ্বের উদয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে একচ্ছত্র সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় ছিল, ভূ-রাজনৈতিক পরিভাষায় তাকে ‘প্যাক্স অ্যামেরিকানা’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই ছিল ওয়াশিংটনের ইচ্ছানুযায়ী বৈশ্বিক নিয়ম-নীতি এবং আন্তর্জাতিক অর্ডার নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা। তবে যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও মিত্ররা চার মাস আগে খামেনিকে হত্যার উল্লাসে মেতে উঠেছিল, আজ পরিস্থিতি এমন এক মোড় নিয়েছে যেখানে তাদের নিজেদেরই প্রথম সারির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে তেহরানের মাটিতে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক শেষকৃত্যানুষ্ঠান বিশ্ববাসীর সামনে সরাসরি সম্প্রচার করতে হচ্ছে।

ইরানের এই রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে পশ্চিমা কোনো দেশের কূটনৈতিক বা সরকারি কর্মকর্তাকে তেহরানের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো না হলেও বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সেখানে সশরীরে হাজির হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ থেকে শুরু করে পারমাণবিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর এই বিপুল উপস্থিতি প্রমাণ করে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে এখন ওয়াশিংটনের একক সিদ্ধান্তের দিন শেষ হয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক জোট ও রাষ্ট্রসমূহ নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক বেশি স্বাধীন এবং শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে।

আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও নতুন কূটনৈতিক মেরুকরণ

দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও কূটনৈতিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও এই বিদায় অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এল খেরেজির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনেছে। সৌদি আরব ছাড়াও কাতার, ইরাক, ইয়েমেন, ওমান এবং লেবানন আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছে। তবে কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো যেসকল দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় যেখানে ইরানের সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছিল, তারা এখনো কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে এখন পর্যন্ত বিশ্বনেতাদের যারা উপস্থিত হয়েছেন—পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি, ভারতের বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদল।

খামেনির এই রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শিয়া-সুন্নি মেরুকরণ এবং তেহরান-রিয়াদ ঐতিহাসিক বিরোধের চিরচেনা সমীকরণকে পেছনে ফেলে সৌদি আরবের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, অঞ্চলের দেশগুলো এখন মার্কিন মধ্যস্থতার বাইরে গিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অনেক বেশি স্বাবলম্বী।

বাংলাদেশের পক্ষে এই উচ্চপর্যায়ের শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি তেহরানে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং বাংলাদেশ ও ইরানের কয়েক শতকের সাংস্কৃতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। একই সাথে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সংঘাতের ৪০ দিনের মাথায় গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সাময়িক শান্তি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে স্পিকার গালিবাফের গঠনমূলক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন বাংলাদেশের স্পিকার। বর্তমানে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি আলোচনা চলছে, বাংলাদেশ তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে।

জানাজা ঘিরে নিরাপত্তা হুমকি ও লাল পতাকার প্রতিশোধের ডাক

বিশাল এই ঐতিহাসিক জনসমুদ্রের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইরানের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা বাহিনীর জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনিকে সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ প্রকাশ্য ‘হত্যার লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করার পর, সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে খামেনির ছেলে মুজতবা নিজে এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা থেকে বিরত থাকছেন। এই সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি জারি করে জানিয়েছে যে, এই জাতীয় শোকের সময়ে কেউ যদি ইরানের ওপর কোনো ধরনের আক্রমণের সামান্যতম চেষ্টা করে, তবে তাকে আগের চেয়ে আরও কঠোর, বিধ্বংসী ও কলঙ্কময় জবাব দেওয়া হবে। ইরান কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো বাহ্যিক শত্রু নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় থাকা কুর্দি, আরব ও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং দীর্ঘদিন ধরে নাশকতায় লিপ্ত নির্বাসিত বিরোধী সংগঠন মুজাহিদিন-ই-খালক এর পক্ষ থেকেও বড় ধরনের আত্মঘাতী হামলার আশঙ্কা করছে।

সার্বক্ষণিক এই চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মাঝেই তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ার এবং গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে সমবেত হওয়া লাখ লাখ শোকার্ত মানুষের হাতে দেখা গেছে রক্তিম লাল পতাকা—যা শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যে অন্যায় রক্তপাত এবং তার নির্মম প্রতিশোধের এক অবিকল্প ও ঐতিহ্যবাহী প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিদায় অনুষ্ঠানে জড়ো হওয়া এই বিশাল জনতা গভীর ক্ষোভে ফেটে পড়ে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ বলে মুহুর্মুহু স্লোগান দিচ্ছে এবং তাদের প্রিয় নেতা খামেনিকে নির্মমভাবে হত্যার উপযুক্ত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ইরান সরকারের প্রতি তীব্র দাবি জানাচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব তেহরানের গবেষকদের মতে, শোকার্ত জনতার তোলা এই লাল পতাকা খামেনির অনুসারীদের সেই অনমনীয় ও আপসহীন মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ, যা ইঙ্গিত দেয় যে সাম্রাজ্যবাদীরা যাকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তিনি আদর্শিকভাবে আরও বেশি অপরাজেয় হয়ে উঠেছেন। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকদের একাংশও এখন মনে করছেন যে, চার দশক ধরে ইরানের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্ত ভিত দেওয়া এই নেতাকে হারিয়ে ইরানিরা দমে যায়নি, বরং এই সংকটের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মৃত খামেনি আজ জীবিত খামেনির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী এক প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও খামেনির এই রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শিয়া-সুন্নি মেরুকরণ এবং তেহরান-রিয়াদ ঐতিহাসিক বিরোধের চিরচেনা সমীকরণকে পেছনে ফেলে সৌদি আরবের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, অঞ্চলের দেশগুলো এখন মার্কিন মধ্যস্থতার বাইরে গিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অনেক বেশি স্বাবলম্বী। ওয়াশিংটনের তীব্র চাপ ও ইসরায়েলের ইরান-বিরোধী জোট গঠনের নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সৌদির এই উপস্থিতি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একক আধিপত্যের পতনকে আরও ত্বরান্বিত করবে। এর ফলে রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াটি এক নতুন গতি পাবে, যা ইয়েমেন, সিরিয়া ও লেবাননের মতো দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংকটগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সাথে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব এবং আরব দেশগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে।

ইরানের এই চরম সংকটের মুহূর্তে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ ঢাকা-তেহরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথকে আরও সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক করে তুলবে। খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক দুই দেশের মধ্যকার শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বন্ধনকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। এই শোকসভায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিপ্রক্রিয়া ও সমঝোতা স্মারকে ঢাকার প্রকাশ্য কূটনৈতিক সমর্থন তেহরানের চোখে বাংলাদেশকে এক বিশ্বস্ত ও স্বাধীনচেতা বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিশেষ করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক করিডোরগুলোতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে একে অপরকে পারস্পরিক সমর্থন দেওয়ার যে অনানুষ্ঠানিক চর্চা রয়েছে, এই সফরের মাধ্যমে তা এক নতুন স্তরে উন্নীত হবে।

১৯৮৯ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার সময়ে খামেনি যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন থেকেই তিনি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে ইরানকে এক অপরাজেয় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের তেহরান প্রমাণ করলো, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কিংবা সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেও ইরানের সেই আদর্শিক ভিতকে উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। তেহরানের এই জনসমুদ্র ও বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি ওয়াশিংটনকে এই স্পষ্ট বার্তাই দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে কারো হাতে নেই; বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ নতুন এক মোড় নিয়েছে।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত