রাজীব নন্দী

শ্যামবর্ণ, অতিসাধারণ ধুতিপাঞ্জাবি পরা এক কবি। তাঁর নতমুখী চাহনি আর লাজুক স্বভাব, আটাশ-উনত্রিশ বছরের যুবক জীবনানন্দ দাশ। মহাকালের পথে হাজার বছর ধরে যিনি পথ হেঁটেছিলেন ‘সিংহল সমুদ্র’ হয়ে ‘অন্ধকারে মালয় সাগর’ ঘুরে ‘বিদর্ভ নগর’ দিয়ে। শেষে ক্লান্ত শরীর ও মন নিয়ে নাটোরে ‘চেক-ইন’ করলেন- ‘সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’
সময় পাল্টেছে। জীবনানন্দ-যুগ নাই। জীবনের সেই স্থবির আনন্দও আর নাই। জীবন এখন গতিশীল। জীবনের নানাবিধ উত্তেজনায় আমাদের ‘পৈশাচিক আনন্দ’। সেই মুখোমুখি বসিবার পৃথিবী কি এখনো অবশিষ্ট আছে? নাকি আমরা প্রবেশ করেছি এমন এক যুগে, যেখানে মানুষ আর মানুষকে নয়—স্ক্রিনকে মুখোমুখি বসে দেখে? আমরা এখন পোস্ট-হিউম্যান বাস্তবতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। মোবাইল ফোন আর কেবল যোগাযোগের যন্ত্র নয়; এটি এখন মানুষের দ্বিতীয় সত্তা, একধরনের ‘ডিজিটাল এক্সটেনশন অব সেলফ’। প্রযুক্তি তাত্ত্বিক শেরি টার্কল যেমন বলেন, মানুষ এখন “এলোন টুগেদার”- একসঙ্গে থেকেও বিচ্ছিন্ন।
বাংলার মাঠঘাট, কাশবন, হিজল-অশ্বত্থের ছায়াঘেরা প্রকৃতি ধীরে ধীরে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে। কোকিলের কুহুতানকে প্রতিস্থাপন করেছে নোটিফিকেশনের শব্দ। সন্ধ্যার আড্ডা চলে গেছে নিউজফিডে, আর সম্পর্কের উষ্ণতা মাপা হচ্ছে ‘সিন’, ‘রিঅ্যাক্ট’ ও ‘ভিউ’-এর সংখ্যায়। বনলতা সেন থেকে শুরু করে স্মৃতির মলয়-বাতাস- সবকিছু এখন ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সিমুলেশন। বাস্তবের চেয়ে উপস্থাপনাই হয়ে উঠেছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সময়টা খেয়ে ফেলে নোটিফিকেশন। মানুষ এখন আর ঘড়ি দেখে না, বরং ঘড়িই মানুষকে দেখে রাখে- কত কদম হাঁটল, কতক্ষণ ঘুমাল, কখন মন খারাপ হলো! প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, তবে সেই সহজ জীবনটাকে উপভোগ করার সময়টুকুই কে যেন চুরি করে নিয়েছে।
এমন এক বিচিত্র সভ্যতায় আমরা বাস করছি, যেখানে মানুষ ওয়াশরুমেও ফোন ছাড়া যেতে ভয় পায়, কিন্তু নিজের চিন্তার ভেতরে ঢুকতে ভয় পায় আরও বেশি। আগে মানুষ সময় কাটাতে গল্প করত, এখন গল্প এড়িয়ে সময় কাটায়। একসময় ‘ধ্যানমগ্ন’ ছিল সাধকদের গুণ, এখন ‘অনলাইন’ থাকাই মানুষের সাধনা। ফেসবুকে সবাই সুখী, ইনস্টাগ্রামে সবাই সুন্দর, লিংকডইনে সবাই সফল- শুধু বাস্তব জীবনে দেখা যায়, সবাই ক্লান্ত। এই ক্লান্তির নামই হয়তো ডিজিটাল আসক্তি- যেখানে মানুষ সারাদিন সংযুক্ত থেকেও নিজের জীবন থেকে লগআউট হয়ে যাচ্ছে।
ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ বোদ্রিয়ার যে “হাইপাররিয়েলিটি”-র কথা বলেছিলেন, আজকের ডিজিটাল সমাজ যেন তারই বাস্তব সংস্করণ। এখানে বাস্তবতার চেয়ে বাস্তবের প্রতিরূপ বেশি শক্তিশালী। একজন মানুষ কেমন- তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সে অনলাইনে কেমন দেখাচ্ছে। ফলে আমরা ধীরে ধীরে জীবন যাপন করছি না; বরং জীবনকে ক্রমাগত সম্প্রচার করছি। সকালের নাস্তা থেকে গভীর বিষণ্ণতা- সবকিছুই এখন কনটেন্ট।
মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ তত্ত্ব আজ আরও জটিল রূপ নিয়েছে। বিশ্ব এখন কেবল গ্রাম নয়, বরং ‘ডেটা কলোনি’। আমরা ভাবছি প্রযুক্তি ব্যবহার করছি; অথচ প্রযুক্তিই আমাদের মনোযোগ, অভ্যাস ও আচরণকে পরিচালনা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা ও অ্যালগরিদমিক সাজেশন এমনভাবে আমাদের ঘিরে ফেলেছে যে মানুষ এখন নিজের পছন্দকেও স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে। ইউভাল নোয়াহ হারারি যাকে বলেন- “হ্যাকেবল হিউম্যান”। অর্থাৎ মানুষের আবেগ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা- সবই এখন ডেটায় পরিণত হচ্ছে।
এই নতুন বাস্তবতায় মানুষের মনোযোগ সবচেয়ে বড় পণ্য। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের সময় নয়, আমাদের মনস্তত্ত্ব কিনে নিচ্ছে। ফলে আমরা এক ধরনের “ডোপামিন অর্থনীতি”-র মধ্যে বসবাস করছি। রিলস, শর্ট ভিডিও, অন্তহীন স্ক্রল- সবকিছু এমনভাবে নির্মিত যে মানুষ থামতে না পারে। যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় এটি “অ্যাটেনশন ইকোনমি”-র যুগ, যেখানে প্রতিটি নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।
তাই আজকের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, অথচ গভীরভাবে একা। বন্ধুত্ব বেড়েছে, কিন্তু বন্ধু কমেছে। হাজার ফলোয়ারের মাঝেও ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা তীব্রতর হয়েছে। মানুষ এখন আর নিজের ভেতরে একা থাকতে পারে না; নীরবতা সহ্য করার ক্ষমতাও কমে গেছে। অফলাইনে কয়েক ঘণ্টা থাকলেই মনে হয়- পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় যার নাম ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা ও নৈতিকতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউনেসকো থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করেছে- প্রযুক্তি কেবল সুবিধা নয়, এটি মনোযোগ, স্মৃতি ও মানবিক সম্পর্কের কাঠামোকেও বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাই নতুন প্রশ্ন উঠছে- মানুষ কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি প্রযুক্তিই মানুষের অভ্যাস ও চিন্তাকে নির্ধারণ করবে?
তবে প্রযুক্তিকে অস্বীকার করাও সমাধান নয়। ইতিহাসের প্রতিটি শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রাকে পাল্টে দিয়েছে। মার্কস যেমন উৎপাদনযন্ত্রের মালিকানার প্রশ্ন তুলেছিলেন, আজকের পৃথিবীতে সেই প্রশ্ন নতুনভাবে ফিরে এসেছে- ডেটা ও অ্যালগরিদমের মালিক কে? মানুষ কি নিজের মনোযোগ ও ব্যক্তিসত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে? নাকি অদৃশ্য ডিজিটাল কাঠামো তাকে পরিচালিত করবে?
সুতরাং প্রয়োজন প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়, বরং প্রযুক্তিসচেতনতা। প্রয়োজন ‘ডিজিটাল ব্যালান্স’। কারণ যন্ত্র মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছিল; মানুষকে যন্ত্রের উপনিবেশ বানানোর জন্য নয়। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না। না হলে মানুষ ধীরে ধীরে ব্যবহারকারী থেকে পণ্যে পরিণত হবে। প্রযুক্তির ইতিহাস মিলিয়ে দেখলে দেখি, তাই তো! মুখোমুখি বসে বিশ্রম্ভালাপের সময় নেই, কিন্তু ভার্চুয়াল সময় অবারিত। ডিজিটাল যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই যে, সে এখন একই সঙ্গে পাঁচটি স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকতে পারে- কিন্তু নিজের সঙ্গে বা অপরের মুখোমুখি পাঁচ মিনিটও বসতে পারে না। হাতে স্মার্টফোন, কানে ইয়ারবাড, সামনে ল্যাপটপ, দেয়ালে স্মার্ট টিভি, কবজিতে স্মার্টওয়াচ- অথচ ‘সময়’ নেই! যেমনটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘সময়ের সমুদ্রে আছি, কিন্তু একমুহূর্ত সময় নেই।’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জাভা-যাত্রীর পত্র’ ভ্রমণকাহিনিতে এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন। ১৯২৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও বালি দ্বীপ ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ যখন এই কথাটি লেখেন, তখন তিনি জাহাজে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলেন। সমুদ্রযাত্রার সময় চারদিকে শুধু জলরাশি আর অনন্ত আকাশ ছাড়া কোনো জাগতিক কোলাহল থাকে না। ফলে অখণ্ড অবসর থাকার কারণে রূপক অর্থে সেখানে যেন ‘সময়ের সমুদ্র’ বিরাজ করছিল। কিন্তু অন্যদিকে, কবিগুরু সাধারণ কোনো পর্যটক ছিলেন না। জাহাজে বসেই তাঁকে অনবরত সাহিত্যচর্চা, শান্তিনিকেতনের জরুরি কাজকর্ম, চিঠিপত্র লেখা এবং আসন্ন ভ্রমণের নানাবিধ প্রস্তুতি নিতে হচ্ছিল। এই আপাত বৈপরীত্য বা কূটাভাস বা প্যারাডক্স বোঝাতেই তিনি রসিকতা করে লিখেছিলেন যে, বাহ্যিকভাবে তিনি অফুরন্ত সময়ের সমুদ্রে ভাসছেন, অথচ তাঁর নিজের কাজ ও সৃষ্টির ব্যস্ততার কারণে একটি মুহূর্তও অপচয় করার মতো ‘সময় নেই’।
রবীন্দ্রনাথের “সময়ের সমুদ্রে আছি, কিন্তু একমুহূর্ত সময় নেই” প্যারাডক্সটির সাথে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার একটি গভীর দার্শনিক মিল রয়েছে। দুটি সৃষ্টিই মূলত মানুষের বাহ্যিক ব্যস্ততা এবং ভেতরের অনন্ত সময়ের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথ যখন উক্তিটি করেন, তখন তিনি ভৌগোলিক সমুদ্রের ওপর ভাসছিলেন—যেখানে চারদিকে শুধুই অন্তহীন জলরাশি আর অনন্ত অবসর। অন্যদিকে, জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কবিতায় লিখছেন, “চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন”। রবীন্দ্রনাথ বাহ্যিক সমুদ্রের শান্ত পরিবেশে থেকেও ভেতরের সৃষ্টির তাগিদে ব্যস্ত ছিলেন। আর জীবনানন্দের পথিক জীবনের উত্তাল সমুদ্রের অন্তহীন কোলাহল ও অস্তিত্বের সংগ্রামে হাবুডুবু খেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের কাছে অফুরন্ত সময় থাকা সত্ত্বেও নিজের কাজের চাপে যেন একটি মুহূর্তও অপচয় করার মতো ছিল না। জীবনানন্দের পথিকও একইভাবে ইতিহাসের এক বিশাল কালখণ্ডের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছেন—“হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে”। পথিকের সামনেও সময়ের কোনো অভাব নেই, বিপুল মহাকাল বিস্তৃত। কিন্তু সেই অফুরন্ত মহাকালের ভেতরেও তাঁর নিজের জন্য কোনো শান্তি ছিল না, যতক্ষণ না নাটোরের বনলতা সেন তাঁকে ‘দু-দণ্ড শান্তি’ দিচ্ছেন। অর্থাৎ, বিপুল সময়ের মাঝেও প্রকৃত ‘নিজের সময়’ বা শান্তিময় মুহূর্তটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও দুর্লভ—এটাই দুই কবির প্যারাডক্স।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে দেখা যায়, বাহ্যিক কোলাহলহীন সমুদ্রে থাকলেও তাঁর মনের ভেতরে শান্তিনিকতনের হিসাব-নিকাশ ও সাহিত্য তৈরির এক বিশাল ‘লেনদেন’ চলছিল। জীবনানন্দ যেন এই প্যারাডক্সেরই একটি চূড়ান্ত মুক্তি দেখিয়েছেন তাঁর কবিতার শেষ স্তবকে। তিনি লিখেছেন, “সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।” দিনের শেষে যখন সমস্ত জাগতিক ব্যস্ততা ও লেনদেন ফুরিয়ে যায়, ঠিক তখনই মানুষ সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তির দেখা পায়। রবীন্দ্রনাথ যে সৃষ্টির তাড়নায় ‘একমুহূর্ত সময় নেই’ বলছিলেন, জীবনানন্দের পথিক বনলতা সেনের মুখোমুখি বসে সেই সমস্ত জাগতিক তাড়না থেকে মুক্তি পেয়ে অবশেষে এক পরম ও নিরেট শান্তিতে প্রবেশ করেন।
‘ডিজিটাল আসক্তির ডোপামিন অর্থনীতি’ এবং ‘অনলাইন সিমুলেশন থিওরি’ —এই দুইয়ের আলোকেও জীবন-রবি’র চিরন্তন প্যারাডক্স এক নতুন ও মারাত্মক মাত্রায় রূপ নেয়। আজকের ভার্চুয়াল বিশ্বে আমরা প্রত্যেকেই যেন এক অন্তহীন তথ্যের সমুদ্রে নিমজ্জিত, যেখানে ‘স্ক্রল’ বা নোটিফিকেশনের প্রতিটি ক্লিকে আমাদের মস্তিস্কে ক্ষণস্থায়ী আনন্দের রাসায়নিক ‘ডোপামিন’ নিঃসৃত হচ্ছে। এই ডোপামিন অর্থনীতি আমাদের মনকে এমন এক কৃত্রিম সিমুলেশনে আটকে রাখছে, যেখানে আমরা ভাবি আমরা পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান ও যোগাযোগের মহাসমুদ্রে আছি। কিন্তু বাস্তবে এই ডোপামিনের মোহে পড়ে মানুষ তার আসল জীবন, গভীর চিন্তা এবং নিজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৃত সময়টুকু সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলছে। ইন্টারনেটের এই মায়াবী সিমুলেশনে অফুরন্ত কন্টেন্ট ও বিনোদনের সমুদ্র থাকা সত্ত্বেও, মানুষ তার মনোযোগের তীব্র সংকটে ভুগছে—ফলে তার হাতে নিজের আত্মিক বা মানসিক বিকাশের জন্য সত্যিকার অর্থে ‘একমুহূর্তও সময় নেই’।
লেখার শেষে ফিরে যাই আবার কবি জীবনানন্দ দাশের কাছে। মোবাইল-উত্তর যুগে বনলতা সেনকে খুঁজতে অযথা গলধঘর্ম হতে হতেন কী তিনি? ‘গুগল ম্যাপ’ আছে তো! প্রযুক্তির প্রকোপে হয়তো কবি লিখতেন- ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন।’

শ্যামবর্ণ, অতিসাধারণ ধুতিপাঞ্জাবি পরা এক কবি। তাঁর নতমুখী চাহনি আর লাজুক স্বভাব, আটাশ-উনত্রিশ বছরের যুবক জীবনানন্দ দাশ। মহাকালের পথে হাজার বছর ধরে যিনি পথ হেঁটেছিলেন ‘সিংহল সমুদ্র’ হয়ে ‘অন্ধকারে মালয় সাগর’ ঘুরে ‘বিদর্ভ নগর’ দিয়ে। শেষে ক্লান্ত শরীর ও মন নিয়ে নাটোরে ‘চেক-ইন’ করলেন- ‘সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’
সময় পাল্টেছে। জীবনানন্দ-যুগ নাই। জীবনের সেই স্থবির আনন্দও আর নাই। জীবন এখন গতিশীল। জীবনের নানাবিধ উত্তেজনায় আমাদের ‘পৈশাচিক আনন্দ’। সেই মুখোমুখি বসিবার পৃথিবী কি এখনো অবশিষ্ট আছে? নাকি আমরা প্রবেশ করেছি এমন এক যুগে, যেখানে মানুষ আর মানুষকে নয়—স্ক্রিনকে মুখোমুখি বসে দেখে? আমরা এখন পোস্ট-হিউম্যান বাস্তবতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। মোবাইল ফোন আর কেবল যোগাযোগের যন্ত্র নয়; এটি এখন মানুষের দ্বিতীয় সত্তা, একধরনের ‘ডিজিটাল এক্সটেনশন অব সেলফ’। প্রযুক্তি তাত্ত্বিক শেরি টার্কল যেমন বলেন, মানুষ এখন “এলোন টুগেদার”- একসঙ্গে থেকেও বিচ্ছিন্ন।
বাংলার মাঠঘাট, কাশবন, হিজল-অশ্বত্থের ছায়াঘেরা প্রকৃতি ধীরে ধীরে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে। কোকিলের কুহুতানকে প্রতিস্থাপন করেছে নোটিফিকেশনের শব্দ। সন্ধ্যার আড্ডা চলে গেছে নিউজফিডে, আর সম্পর্কের উষ্ণতা মাপা হচ্ছে ‘সিন’, ‘রিঅ্যাক্ট’ ও ‘ভিউ’-এর সংখ্যায়। বনলতা সেন থেকে শুরু করে স্মৃতির মলয়-বাতাস- সবকিছু এখন ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সিমুলেশন। বাস্তবের চেয়ে উপস্থাপনাই হয়ে উঠেছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সময়টা খেয়ে ফেলে নোটিফিকেশন। মানুষ এখন আর ঘড়ি দেখে না, বরং ঘড়িই মানুষকে দেখে রাখে- কত কদম হাঁটল, কতক্ষণ ঘুমাল, কখন মন খারাপ হলো! প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, তবে সেই সহজ জীবনটাকে উপভোগ করার সময়টুকুই কে যেন চুরি করে নিয়েছে।
এমন এক বিচিত্র সভ্যতায় আমরা বাস করছি, যেখানে মানুষ ওয়াশরুমেও ফোন ছাড়া যেতে ভয় পায়, কিন্তু নিজের চিন্তার ভেতরে ঢুকতে ভয় পায় আরও বেশি। আগে মানুষ সময় কাটাতে গল্প করত, এখন গল্প এড়িয়ে সময় কাটায়। একসময় ‘ধ্যানমগ্ন’ ছিল সাধকদের গুণ, এখন ‘অনলাইন’ থাকাই মানুষের সাধনা। ফেসবুকে সবাই সুখী, ইনস্টাগ্রামে সবাই সুন্দর, লিংকডইনে সবাই সফল- শুধু বাস্তব জীবনে দেখা যায়, সবাই ক্লান্ত। এই ক্লান্তির নামই হয়তো ডিজিটাল আসক্তি- যেখানে মানুষ সারাদিন সংযুক্ত থেকেও নিজের জীবন থেকে লগআউট হয়ে যাচ্ছে।
ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ বোদ্রিয়ার যে “হাইপাররিয়েলিটি”-র কথা বলেছিলেন, আজকের ডিজিটাল সমাজ যেন তারই বাস্তব সংস্করণ। এখানে বাস্তবতার চেয়ে বাস্তবের প্রতিরূপ বেশি শক্তিশালী। একজন মানুষ কেমন- তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সে অনলাইনে কেমন দেখাচ্ছে। ফলে আমরা ধীরে ধীরে জীবন যাপন করছি না; বরং জীবনকে ক্রমাগত সম্প্রচার করছি। সকালের নাস্তা থেকে গভীর বিষণ্ণতা- সবকিছুই এখন কনটেন্ট।
মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ তত্ত্ব আজ আরও জটিল রূপ নিয়েছে। বিশ্ব এখন কেবল গ্রাম নয়, বরং ‘ডেটা কলোনি’। আমরা ভাবছি প্রযুক্তি ব্যবহার করছি; অথচ প্রযুক্তিই আমাদের মনোযোগ, অভ্যাস ও আচরণকে পরিচালনা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা ও অ্যালগরিদমিক সাজেশন এমনভাবে আমাদের ঘিরে ফেলেছে যে মানুষ এখন নিজের পছন্দকেও স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে। ইউভাল নোয়াহ হারারি যাকে বলেন- “হ্যাকেবল হিউম্যান”। অর্থাৎ মানুষের আবেগ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা- সবই এখন ডেটায় পরিণত হচ্ছে।
এই নতুন বাস্তবতায় মানুষের মনোযোগ সবচেয়ে বড় পণ্য। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের সময় নয়, আমাদের মনস্তত্ত্ব কিনে নিচ্ছে। ফলে আমরা এক ধরনের “ডোপামিন অর্থনীতি”-র মধ্যে বসবাস করছি। রিলস, শর্ট ভিডিও, অন্তহীন স্ক্রল- সবকিছু এমনভাবে নির্মিত যে মানুষ থামতে না পারে। যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় এটি “অ্যাটেনশন ইকোনমি”-র যুগ, যেখানে প্রতিটি নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।
তাই আজকের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, অথচ গভীরভাবে একা। বন্ধুত্ব বেড়েছে, কিন্তু বন্ধু কমেছে। হাজার ফলোয়ারের মাঝেও ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা তীব্রতর হয়েছে। মানুষ এখন আর নিজের ভেতরে একা থাকতে পারে না; নীরবতা সহ্য করার ক্ষমতাও কমে গেছে। অফলাইনে কয়েক ঘণ্টা থাকলেই মনে হয়- পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় যার নাম ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা ও নৈতিকতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউনেসকো থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করেছে- প্রযুক্তি কেবল সুবিধা নয়, এটি মনোযোগ, স্মৃতি ও মানবিক সম্পর্কের কাঠামোকেও বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাই নতুন প্রশ্ন উঠছে- মানুষ কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি প্রযুক্তিই মানুষের অভ্যাস ও চিন্তাকে নির্ধারণ করবে?
তবে প্রযুক্তিকে অস্বীকার করাও সমাধান নয়। ইতিহাসের প্রতিটি শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রাকে পাল্টে দিয়েছে। মার্কস যেমন উৎপাদনযন্ত্রের মালিকানার প্রশ্ন তুলেছিলেন, আজকের পৃথিবীতে সেই প্রশ্ন নতুনভাবে ফিরে এসেছে- ডেটা ও অ্যালগরিদমের মালিক কে? মানুষ কি নিজের মনোযোগ ও ব্যক্তিসত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে? নাকি অদৃশ্য ডিজিটাল কাঠামো তাকে পরিচালিত করবে?
সুতরাং প্রয়োজন প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়, বরং প্রযুক্তিসচেতনতা। প্রয়োজন ‘ডিজিটাল ব্যালান্স’। কারণ যন্ত্র মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছিল; মানুষকে যন্ত্রের উপনিবেশ বানানোর জন্য নয়। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না। না হলে মানুষ ধীরে ধীরে ব্যবহারকারী থেকে পণ্যে পরিণত হবে। প্রযুক্তির ইতিহাস মিলিয়ে দেখলে দেখি, তাই তো! মুখোমুখি বসে বিশ্রম্ভালাপের সময় নেই, কিন্তু ভার্চুয়াল সময় অবারিত। ডিজিটাল যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই যে, সে এখন একই সঙ্গে পাঁচটি স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকতে পারে- কিন্তু নিজের সঙ্গে বা অপরের মুখোমুখি পাঁচ মিনিটও বসতে পারে না। হাতে স্মার্টফোন, কানে ইয়ারবাড, সামনে ল্যাপটপ, দেয়ালে স্মার্ট টিভি, কবজিতে স্মার্টওয়াচ- অথচ ‘সময়’ নেই! যেমনটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘সময়ের সমুদ্রে আছি, কিন্তু একমুহূর্ত সময় নেই।’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জাভা-যাত্রীর পত্র’ ভ্রমণকাহিনিতে এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন। ১৯২৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও বালি দ্বীপ ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ যখন এই কথাটি লেখেন, তখন তিনি জাহাজে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলেন। সমুদ্রযাত্রার সময় চারদিকে শুধু জলরাশি আর অনন্ত আকাশ ছাড়া কোনো জাগতিক কোলাহল থাকে না। ফলে অখণ্ড অবসর থাকার কারণে রূপক অর্থে সেখানে যেন ‘সময়ের সমুদ্র’ বিরাজ করছিল। কিন্তু অন্যদিকে, কবিগুরু সাধারণ কোনো পর্যটক ছিলেন না। জাহাজে বসেই তাঁকে অনবরত সাহিত্যচর্চা, শান্তিনিকেতনের জরুরি কাজকর্ম, চিঠিপত্র লেখা এবং আসন্ন ভ্রমণের নানাবিধ প্রস্তুতি নিতে হচ্ছিল। এই আপাত বৈপরীত্য বা কূটাভাস বা প্যারাডক্স বোঝাতেই তিনি রসিকতা করে লিখেছিলেন যে, বাহ্যিকভাবে তিনি অফুরন্ত সময়ের সমুদ্রে ভাসছেন, অথচ তাঁর নিজের কাজ ও সৃষ্টির ব্যস্ততার কারণে একটি মুহূর্তও অপচয় করার মতো ‘সময় নেই’।
রবীন্দ্রনাথের “সময়ের সমুদ্রে আছি, কিন্তু একমুহূর্ত সময় নেই” প্যারাডক্সটির সাথে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার একটি গভীর দার্শনিক মিল রয়েছে। দুটি সৃষ্টিই মূলত মানুষের বাহ্যিক ব্যস্ততা এবং ভেতরের অনন্ত সময়ের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথ যখন উক্তিটি করেন, তখন তিনি ভৌগোলিক সমুদ্রের ওপর ভাসছিলেন—যেখানে চারদিকে শুধুই অন্তহীন জলরাশি আর অনন্ত অবসর। অন্যদিকে, জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কবিতায় লিখছেন, “চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন”। রবীন্দ্রনাথ বাহ্যিক সমুদ্রের শান্ত পরিবেশে থেকেও ভেতরের সৃষ্টির তাগিদে ব্যস্ত ছিলেন। আর জীবনানন্দের পথিক জীবনের উত্তাল সমুদ্রের অন্তহীন কোলাহল ও অস্তিত্বের সংগ্রামে হাবুডুবু খেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের কাছে অফুরন্ত সময় থাকা সত্ত্বেও নিজের কাজের চাপে যেন একটি মুহূর্তও অপচয় করার মতো ছিল না। জীবনানন্দের পথিকও একইভাবে ইতিহাসের এক বিশাল কালখণ্ডের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছেন—“হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে”। পথিকের সামনেও সময়ের কোনো অভাব নেই, বিপুল মহাকাল বিস্তৃত। কিন্তু সেই অফুরন্ত মহাকালের ভেতরেও তাঁর নিজের জন্য কোনো শান্তি ছিল না, যতক্ষণ না নাটোরের বনলতা সেন তাঁকে ‘দু-দণ্ড শান্তি’ দিচ্ছেন। অর্থাৎ, বিপুল সময়ের মাঝেও প্রকৃত ‘নিজের সময়’ বা শান্তিময় মুহূর্তটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও দুর্লভ—এটাই দুই কবির প্যারাডক্স।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে দেখা যায়, বাহ্যিক কোলাহলহীন সমুদ্রে থাকলেও তাঁর মনের ভেতরে শান্তিনিকতনের হিসাব-নিকাশ ও সাহিত্য তৈরির এক বিশাল ‘লেনদেন’ চলছিল। জীবনানন্দ যেন এই প্যারাডক্সেরই একটি চূড়ান্ত মুক্তি দেখিয়েছেন তাঁর কবিতার শেষ স্তবকে। তিনি লিখেছেন, “সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।” দিনের শেষে যখন সমস্ত জাগতিক ব্যস্ততা ও লেনদেন ফুরিয়ে যায়, ঠিক তখনই মানুষ সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তির দেখা পায়। রবীন্দ্রনাথ যে সৃষ্টির তাড়নায় ‘একমুহূর্ত সময় নেই’ বলছিলেন, জীবনানন্দের পথিক বনলতা সেনের মুখোমুখি বসে সেই সমস্ত জাগতিক তাড়না থেকে মুক্তি পেয়ে অবশেষে এক পরম ও নিরেট শান্তিতে প্রবেশ করেন।
‘ডিজিটাল আসক্তির ডোপামিন অর্থনীতি’ এবং ‘অনলাইন সিমুলেশন থিওরি’ —এই দুইয়ের আলোকেও জীবন-রবি’র চিরন্তন প্যারাডক্স এক নতুন ও মারাত্মক মাত্রায় রূপ নেয়। আজকের ভার্চুয়াল বিশ্বে আমরা প্রত্যেকেই যেন এক অন্তহীন তথ্যের সমুদ্রে নিমজ্জিত, যেখানে ‘স্ক্রল’ বা নোটিফিকেশনের প্রতিটি ক্লিকে আমাদের মস্তিস্কে ক্ষণস্থায়ী আনন্দের রাসায়নিক ‘ডোপামিন’ নিঃসৃত হচ্ছে। এই ডোপামিন অর্থনীতি আমাদের মনকে এমন এক কৃত্রিম সিমুলেশনে আটকে রাখছে, যেখানে আমরা ভাবি আমরা পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান ও যোগাযোগের মহাসমুদ্রে আছি। কিন্তু বাস্তবে এই ডোপামিনের মোহে পড়ে মানুষ তার আসল জীবন, গভীর চিন্তা এবং নিজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৃত সময়টুকু সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলছে। ইন্টারনেটের এই মায়াবী সিমুলেশনে অফুরন্ত কন্টেন্ট ও বিনোদনের সমুদ্র থাকা সত্ত্বেও, মানুষ তার মনোযোগের তীব্র সংকটে ভুগছে—ফলে তার হাতে নিজের আত্মিক বা মানসিক বিকাশের জন্য সত্যিকার অর্থে ‘একমুহূর্তও সময় নেই’।
লেখার শেষে ফিরে যাই আবার কবি জীবনানন্দ দাশের কাছে। মোবাইল-উত্তর যুগে বনলতা সেনকে খুঁজতে অযথা গলধঘর্ম হতে হতেন কী তিনি? ‘গুগল ম্যাপ’ আছে তো! প্রযুক্তির প্রকোপে হয়তো কবি লিখতেন- ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন।’
.png)

জঙ্গি ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের অস্বীকারের সংস্কৃতি যেমন আছে। প্রতিপক্ষ দমনে জঙ্গি কার্ড ব্যবহারের অভিযোগও বেশ পুরোনো। এরকম সব কারণে কখনোই প্রকৃত অর্থে জঙ্গি নির্মূল করা যায়নি। বরং জঙ্গিরা নানা ফর্মে সমাজের নানা পরিসরে মিশেছিল। এখনও আছে। কেউ একদিনে জঙ্গি হয়ে ওঠে
২ ঘণ্টা আগে
চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যদি মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতা বাড়ানো হয়, তবে তা শুধু স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বড়। এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে যেকোনো মুসলিম দেশ বাইরের শত্রুর অবৈধ হামলার শিকার হলে সাহায্য পায়।
৩ ঘণ্টা আগে
মাত্র ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোনো সরকারকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে এই সময়ের অগ্রাধিকার, মানসিকতা ও কাজের ধরন থেকে ভবিষ্যৎ পথচলা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসন, এরপর দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বিএনপির ক্ষ
৮ ঘণ্টা আগে
তারেক রহমানের সরকার নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে বাসে নারীদের হয়রানি, অস্বস্তি ও অনিরাপত্তার অভিজ্ঞতা খুবই বাস্তব। তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
১৮ আগস্ট ২০২৬