আনুশেহ আনাদিল

বাংলাদেশের জন্ম পাথর থেকে নয়; বাংলাদেশের জন্ম জলের গর্ভে। প্রতি বছর নদী এই ভূখণ্ডকে ভেঙে দেয়। আবার সেই নদীই নতুন পলি এনে নতুন ভূমি গড়ে তোলে। মানুষ আবার বীজ বোনে। আবার ঘর তোলে। আবার গান গায়। আবার ভালোবাসে। আবার নতুন করে জীবন শুরু করে।
এই পুনর্জন্মই বাংলাদেশের প্রথম পরিচয়।
বাংলাদেশের প্রকৃত সংস্কৃতির জন্ম কোনো প্রাসাদে নয়। কোনো সম্রাটের সিংহাসনে নয়। তার জন্ম ধানের ক্ষেতে, কাদামাটির গ্রামে, মাঝির বৈঠায়, জেলের জালে, কৃষকের ঘামে, বাউলের গানে এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের নিঃশ্বাসে। এই ভূখণ্ড পৃথিবীকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছে, যা আধুনিক সভ্যতা প্রায় ভুলে গেছে—প্রকৃতি আমাদের সম্পত্তি নয়, প্রকৃতি আমাদের শিক্ষক।
আমার কাছে এই সত্য কেবল আজকের বাংলাদেশের রাষ্ট্রসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমি যখন ‘বাংলাদেশ’ বলি, তখন আমি সমগ্র বাংলাকে বুঝি।
আমি দেখি আজকের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গকে—একই সভ্যতার দুই তীর হিসেবে। আমি দেখি একই নদীর দুই পাড়, একই ভাষার দুই উচ্চারণ, একই লোকসংস্কৃতি, একই গান, একই বর্ষা, একই পলি, একই স্মৃতি।
রাজনৈতিক ইতিহাস বাংলাকে বিভক্ত করেছে। কিন্তু নদীকে বিভক্ত করতে পারেনি। বর্ষাকে বিভক্ত করতে পারেনি। ভাষাকে বিভক্ত করতে পারেনি, পারেনি মানুষের স্মৃতিকে বিভক্ত করতে। রাষ্ট্রের সীমান্ত বদলাতে পারে, কিন্তু একটি সভ্যতার আত্মাকে ভাগ করা যায় না।
এই সত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক বনবিবি।
বনবিবি পৃথিবীর অন্যতম অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক। সুন্দরবনের লোককথায় তিনি একজন মুসলিম নারী, যার কাহিনির শিকড় সুফি ঐতিহ্যে প্রোথিত। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিনি হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। অনেক মুসলমান তাঁকে অরণ্যের রক্ষাকর্ত্রী সাধিকা হিসেবে সম্মান করেন, আবার বহু হিন্দু তাঁকে দেবীরূপে পূজা করেন। পৃথিবীতে এমন উদাহরণ খুবই বিরল।
এটাই বাংলার মহত্ত্ব। বাংলা কখনো প্রশ্ন করেনি—বনবিবি কোন ধর্মের? বাংলা তাঁকে মানুষের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে আপন করে নিয়েছে।
শত শত বছর ধরে মৌয়াল, জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবী মানুষ বনবিবির আশীর্বাদ নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছেন। তাঁরা অরণ্যে প্রবেশ করেন না জয় করার জন্য; প্রবেশ করেন বিনয়ের সঙ্গে সহাবস্থান করার জন্য।
বনবিবি শেখান—লোভ ধ্বংস ডেকে আনে, বিনয় জীবনকে রক্ষা করে, অরণ্যকে জয় করতে হয় না। অরণ্যকে সম্মান করতে হয়।
সুন্দরবনে প্রবেশ করলেই মানুষের সব পরিচয় ক্ষুদ্র হয়ে যায়। বাঘ তোমার ধর্ম জিজ্ঞাসা করে না, নদী তোমার ভাষা জিজ্ঞাসা করে না, ঘূর্ণিঝড় তোমার সম্পদ দেখে না। অরণ্য মাত্র একটি প্রশ্ন করে—তুমি কি শ্রদ্ধা নিয়ে এসেছ?
এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার হাজার বছরের প্রজ্ঞা। বাংলার শক্তি তার অস্ত্রে নয়, বাংলার শক্তি তার সহাবস্থানে।
এই ভূমি আমাদের শিখিয়েছে—নদী হত্যা করে মানুষ বাঁচে না। বন ধ্বংস করে কোনো সভ্যতা টিকে থাকে না। মাটি লুট করে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়; মানুষ প্রকৃতিরই অংশ।
এই বদ্বীপের মানুষ রাতের আকাশের তারা দেখে ঋতুর আগমন চিনতে শিখেছে। নদীর জোয়ার-ভাটার ভাষা বুঝতে শিখেছে। পাখির ডাক শুনে সময়ের পরিবর্তন অনুভব করতে শিখেছে। গাছের পাতায় ও শেকড়ে ওষুধ খুঁজে পেয়েছে। আর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মাঝেও জীবনকে ভালোবাসতে শিখেছে।
এই-ই বাংলার সভ্যতা। এখানে কবিতা শুধু সাহিত্য নয়—প্রতিরোধের ভাষা। গান শুধু বিনোদন নয়—প্রার্থনার ভাষা। নদী শুধু জল নয়—স্মৃতির ধারক। অরণ্য শুধু বৃক্ষের সমষ্টি নয়—এটি আত্মার আশ্রয়।
বাংলাদেশকে কেবল মানচিত্র দেখে বোঝা যায় না। বাংলাদেশকে বুঝতে হলে জানতে হবে নদীর ভাষা। শুনতে হবে সুন্দরবনের নীরবতা। অনুভব করতে হবে ধানের গন্ধ। ভিজতে হবে বর্ষার বৃষ্টিতে। শুনতে হবে বাউলের গান।
দেখতে হবে গ্রামের মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে। বুঝতে হবে বনবিবির শিক্ষা।
যতদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং বাংলার অগণিত নদী সাগরের দিকে বয়ে যাবে, যতদিন সুন্দরবনের নিঃশ্বাস এই পৃথিবীকে রক্ষা করবে, যতদিন বাংলার মানুষ প্রকৃতিকে শিক্ষক, প্রতিবেশীকে আপনজন এবং জীবনকে পবিত্র বলে মনে করবে—ততদিন বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্রের নাম হয়ে থাকবে না।
বাংলাদেশ হয়ে থাকবে সমগ্র বাংলার সেই চিরন্তন নদীজ সভ্যতার নাম—যেখানে মানুষ, প্রকৃতি এবং করুণার মিলনে যুগে যুগে ঈশ্বর মানবতার সঙ্গে কথা বলে এসেছেন।

বাংলাদেশের জন্ম পাথর থেকে নয়; বাংলাদেশের জন্ম জলের গর্ভে। প্রতি বছর নদী এই ভূখণ্ডকে ভেঙে দেয়। আবার সেই নদীই নতুন পলি এনে নতুন ভূমি গড়ে তোলে। মানুষ আবার বীজ বোনে। আবার ঘর তোলে। আবার গান গায়। আবার ভালোবাসে। আবার নতুন করে জীবন শুরু করে।
এই পুনর্জন্মই বাংলাদেশের প্রথম পরিচয়।
বাংলাদেশের প্রকৃত সংস্কৃতির জন্ম কোনো প্রাসাদে নয়। কোনো সম্রাটের সিংহাসনে নয়। তার জন্ম ধানের ক্ষেতে, কাদামাটির গ্রামে, মাঝির বৈঠায়, জেলের জালে, কৃষকের ঘামে, বাউলের গানে এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের নিঃশ্বাসে। এই ভূখণ্ড পৃথিবীকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছে, যা আধুনিক সভ্যতা প্রায় ভুলে গেছে—প্রকৃতি আমাদের সম্পত্তি নয়, প্রকৃতি আমাদের শিক্ষক।
আমার কাছে এই সত্য কেবল আজকের বাংলাদেশের রাষ্ট্রসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমি যখন ‘বাংলাদেশ’ বলি, তখন আমি সমগ্র বাংলাকে বুঝি।
আমি দেখি আজকের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গকে—একই সভ্যতার দুই তীর হিসেবে। আমি দেখি একই নদীর দুই পাড়, একই ভাষার দুই উচ্চারণ, একই লোকসংস্কৃতি, একই গান, একই বর্ষা, একই পলি, একই স্মৃতি।
রাজনৈতিক ইতিহাস বাংলাকে বিভক্ত করেছে। কিন্তু নদীকে বিভক্ত করতে পারেনি। বর্ষাকে বিভক্ত করতে পারেনি। ভাষাকে বিভক্ত করতে পারেনি, পারেনি মানুষের স্মৃতিকে বিভক্ত করতে। রাষ্ট্রের সীমান্ত বদলাতে পারে, কিন্তু একটি সভ্যতার আত্মাকে ভাগ করা যায় না।
এই সত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক বনবিবি।
বনবিবি পৃথিবীর অন্যতম অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক। সুন্দরবনের লোককথায় তিনি একজন মুসলিম নারী, যার কাহিনির শিকড় সুফি ঐতিহ্যে প্রোথিত। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিনি হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। অনেক মুসলমান তাঁকে অরণ্যের রক্ষাকর্ত্রী সাধিকা হিসেবে সম্মান করেন, আবার বহু হিন্দু তাঁকে দেবীরূপে পূজা করেন। পৃথিবীতে এমন উদাহরণ খুবই বিরল।
এটাই বাংলার মহত্ত্ব। বাংলা কখনো প্রশ্ন করেনি—বনবিবি কোন ধর্মের? বাংলা তাঁকে মানুষের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে আপন করে নিয়েছে।
শত শত বছর ধরে মৌয়াল, জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবী মানুষ বনবিবির আশীর্বাদ নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছেন। তাঁরা অরণ্যে প্রবেশ করেন না জয় করার জন্য; প্রবেশ করেন বিনয়ের সঙ্গে সহাবস্থান করার জন্য।
বনবিবি শেখান—লোভ ধ্বংস ডেকে আনে, বিনয় জীবনকে রক্ষা করে, অরণ্যকে জয় করতে হয় না। অরণ্যকে সম্মান করতে হয়।
সুন্দরবনে প্রবেশ করলেই মানুষের সব পরিচয় ক্ষুদ্র হয়ে যায়। বাঘ তোমার ধর্ম জিজ্ঞাসা করে না, নদী তোমার ভাষা জিজ্ঞাসা করে না, ঘূর্ণিঝড় তোমার সম্পদ দেখে না। অরণ্য মাত্র একটি প্রশ্ন করে—তুমি কি শ্রদ্ধা নিয়ে এসেছ?
এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার হাজার বছরের প্রজ্ঞা। বাংলার শক্তি তার অস্ত্রে নয়, বাংলার শক্তি তার সহাবস্থানে।
এই ভূমি আমাদের শিখিয়েছে—নদী হত্যা করে মানুষ বাঁচে না। বন ধ্বংস করে কোনো সভ্যতা টিকে থাকে না। মাটি লুট করে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়; মানুষ প্রকৃতিরই অংশ।
এই বদ্বীপের মানুষ রাতের আকাশের তারা দেখে ঋতুর আগমন চিনতে শিখেছে। নদীর জোয়ার-ভাটার ভাষা বুঝতে শিখেছে। পাখির ডাক শুনে সময়ের পরিবর্তন অনুভব করতে শিখেছে। গাছের পাতায় ও শেকড়ে ওষুধ খুঁজে পেয়েছে। আর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মাঝেও জীবনকে ভালোবাসতে শিখেছে।
এই-ই বাংলার সভ্যতা। এখানে কবিতা শুধু সাহিত্য নয়—প্রতিরোধের ভাষা। গান শুধু বিনোদন নয়—প্রার্থনার ভাষা। নদী শুধু জল নয়—স্মৃতির ধারক। অরণ্য শুধু বৃক্ষের সমষ্টি নয়—এটি আত্মার আশ্রয়।
বাংলাদেশকে কেবল মানচিত্র দেখে বোঝা যায় না। বাংলাদেশকে বুঝতে হলে জানতে হবে নদীর ভাষা। শুনতে হবে সুন্দরবনের নীরবতা। অনুভব করতে হবে ধানের গন্ধ। ভিজতে হবে বর্ষার বৃষ্টিতে। শুনতে হবে বাউলের গান।
দেখতে হবে গ্রামের মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে। বুঝতে হবে বনবিবির শিক্ষা।
যতদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং বাংলার অগণিত নদী সাগরের দিকে বয়ে যাবে, যতদিন সুন্দরবনের নিঃশ্বাস এই পৃথিবীকে রক্ষা করবে, যতদিন বাংলার মানুষ প্রকৃতিকে শিক্ষক, প্রতিবেশীকে আপনজন এবং জীবনকে পবিত্র বলে মনে করবে—ততদিন বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্রের নাম হয়ে থাকবে না।
বাংলাদেশ হয়ে থাকবে সমগ্র বাংলার সেই চিরন্তন নদীজ সভ্যতার নাম—যেখানে মানুষ, প্রকৃতি এবং করুণার মিলনে যুগে যুগে ঈশ্বর মানবতার সঙ্গে কথা বলে এসেছেন।
.png)

বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়নি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তাতে সত্যতা থাকলেও ভোক্তাসাধারণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ রয়ে গেছে বলতে হবে। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চমাত্রার মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণকে। এর চেয়ে নিচে রয়েছে মজুরি বৃদ্ধির হার।
১৫ মিনিট আগে
বাংলাদেশের একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ঐতিহ্য আছে। আমরা বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছি। আঞ্চলিক বিরোধে সংযম দেখিয়েছি। কিন্তু সামনের কৌশলগত পরিবেশ হয়তো এই ভারসাম্যকে আরও সুপরিকল্পিত রূপ দেওয়ার দাবি জানাবে।
৩ ঘণ্টা আগে
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ভূ-অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি বর্তমানে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
৮ ঘণ্টা আগে
ড. সাহাব এনাম খান; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, নিরাপত্তা নীতি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর নিয়মিত স
১০ ঘণ্টা আগে