চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী: বিনিয়োগের আশা, ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ

স্ট্রিম গ্রাফিক

চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিটি ঐতিহাসিক। আমরা সেই ষাটের দশকের থেকে দেখে আসছি চীন বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের চীনের সমাজ ও উন্নয়নকে দেখানোর জন্য নিয়ে যেতেন। এখানে যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের নাম রয়েছে তেমনি রয়েছে মাওলানা ভাসানীর নামও। তবে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হওয়ার পরে তার সাথে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে মূলত জিয়াউর রহমানের হাত ধরে।

জিয়াউর রহমান প্রথম চীন ভ্রমণ করেন ১৯৭৭ সালের জানুয়ারির ২ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত। তিনি তখন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এটিই প্রথম চীনের সাথে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের অন্যতম প্রধান একটি রাষ্ট্রীয় সফর। সেই সফরে তিনি চীনের সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। চীনের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা তাঁকে অভিভূত করেছিল এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা ছিল। তিনি উন্নয়নমুখী সম্পর্ক গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

এই প্রেক্ষাপটে কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের একটি বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর নীতিতে প্রতিফলিত হয়, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান কূটনৈতিক সম্পর্ককে সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার দিকে নজর দিয়েছেন। পরে খালেদা জিয়া ৯ বার চীন ভ্রমণ করেন। এমনই একটি প্রেক্ষাপট থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এখন চীন সফর করছেন।

কেমন হতে পারে বাংলাদেশের চীননীতি

বাংলাদেশের বর্তমান চীননীতি কেমন হতে পারে তার একটি দিক নির্দেশনা জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে পাওয়া যায়। পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল রাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রায়ই ক্ষমতার অসম কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, যেখানে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং সার্বভৌম সমতার নীতি প্রাধান্য পায়; হেজেমনি বা একতরফা ক্ষমতার আধিপত্য সেখানে মুখ্য নিয়ামক ছিল না। ঠিক এমনই একটি দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জন্য এখন জরুরি কেননা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যেকোনো সময়ের চেয়েই ক্রমাগত জটিল হয়ে হয়ে উঠছে। এর সাথে রয়েছে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বহুমাত্রিক কূটনৈতিক রূপ।

এমন একটি জটিল প্রেক্ষাপটে আমাদের পররাষ্ট্রচিন্তায় ভারসাম্য রক্ষা হবে একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। আমাদের এমন একটি নীতি অনুসরণ করতে হবে যাতে কোনো বিশেষ দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়। আবার ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় সাধনের দিকটিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তবে বর্তমান সময়ে আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। সেটি হলো—এখনকার সময়ের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও দুর্ভেদ্য। বিশেষ করে অতি সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধাবস্থা চীন ও রাশিয়ার অবস্থানকে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। বাংলাদেশকে এই জটিল সমীকরণ মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে একটি কৌশলগত কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে তা একটি প্রভাবশালী অ্যাক্টর হিসেবে চিহ্নিত করছে। প্রতিবেশি দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে তাও একভাবে নির্ভর করছে বাংলাদেশের এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির সাথে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ধারণা বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক—বিশেষ করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য।

বিনিয়োগবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে প্রধান লক্ষ্য

এমন একটি বাস্তবতায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী এখন চীন ভ্রমণ করছেন। স্বভাবতই আমাদের দেশের সবার মধ্যে একটি বিশাল প্রত্যাশার পারদ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই সফরকে আমাদের বাস্তবতার আলোকে চিহ্নিত করতে হবে যে আমরা কতটা সফলভাবে চীনের সাথে কূটনৈতিক দর কষাঘষি করতে পারি। তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি একটা দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে দূরে ছিল, তাই তাদের নতুন করে চীনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ফলে বর্তমান সফরেই অনেক কিছু পেয়ে যাবে, এ ধরনের প্রত্যাশা না করে বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের দিকে নজর দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা চীনা সমাজ ব্যবস্থার একটি অন্যতম ভিত্তি হলো পারষ্পরিক বন্ধুত্বের সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করা।

আমরা যদি চীনের সাথে বাংলাদেশের বিগত ১৫ বছরের ইতিহাস দেখি তাহলে দেখতে পাই, এই সময়ে চীন বাংলাদেশের একটি অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কই অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল।

বছরের পর বছর পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতার পরে এখন সাউথ-সাউথ সহযোগিতার নামে আমরা যেন আবার আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোর হেজেমনির বলয়ে ঢুকে যাচ্ছি। আমাদের এখন থেকেই সেই হেজেমনির বলয় ভাঙতে হবে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে প্রায় ৭০০ চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত আছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই স্থানীয় পর্যায়ে লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে বলে বাংলাদেশের বর্তমান চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন মন্তব্য করেছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় যেন আরও নতুন বিনিয়োগ আমরা আকর্ষণ করতে পারি এবং চীনা প্রযুক্তির একটি টেকসই স্থানান্তর বাংলাদেশে করতে পারি সে বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে এবং বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে সে প্রযুক্তি নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করে নিজেদের শিল্পায়নে মনোনিবেশ করতে পারে।

এখানে বলে রাখা ভালো, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার একটি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে, যা চীনের সাথে বাংলাদেশকে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেবে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কতগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হবে। যেমন: এমন প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান কীভাবে বৃদ্ধি পাবে, রপ্তানির পরিমাণ কী হবে, স্থানীয় শিল্প এখানে কীভাবে যুক্ত হবে, এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর হবে কি না।

বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও চীনের বাজারে পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার বাস্তবায়ন

চীনের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কও বেশ পুরনো। তবে তাকে একভাবে একপাক্ষিকই বলা যায় যেখানে বাংলাদেশ মূলত চীন থেকে আমদানী করে থাকে। চীনকে ঘিরে একটি আমদানি নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখানে গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই, চীনের সাথে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার এবং আমাদের বর্তমান রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারের অনেক নিচে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ চীনের বাজারে পণ্য রপ্তানির শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও তার ন্যূনতম সুবিধাও বাংলাদেশ নিতে পারছে না। ফলে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি।

এ বিষয়টি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ আমাদের অনেক খাত রয়েছে যেখান থেকে রপ্তানির মাধ্যমে একটি বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। অর্থনীতিবিদদের ধারণা থেকে জানা যায়, খুব শিগগিরই চীনে রপ্তানীর আকার এক বিলিয়নে রূপান্তরিত করা সম্ভব। রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পারলে চীনের শ্রমবাজারেও ধীরে ধীরে আমাদের প্রবেশ করা সহজ হবে অন্তত ব্যবসায়িক পরিসরে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেই হবে না, এর সাথে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে পণ্যমান, ব্র্যান্ডিং ও সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের পরে যদি এ বিষয়ে আরও কিছু ইতিবাচক আলোচনা ও তার ফলাফল পাওয়া যায় তাহলে বাংলাদেশ নিশ্চিত করেই অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে।

শিক্ষা ও উদ্ভাবনী খাতে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বৃদ্ধি

চীনের শিক্ষা খাতের একটি চলমান বৈশিষ্ট্য হলো তাদের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রচেষ্টায় ক্রমাগত প্রসারে কাজ করে যাওয়া। যে কারণে আমরা দেখি আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে চীনের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। যে অভিজ্ঞতার বিনিময় আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্যে একটি বড় প্রভাবক হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, অধিকাংশ পশ্চিমা দেশে শিক্ষা খরচ আকাশচুম্বী, সেখানে চীনে খরচ তুলনামূলকভাবে কম। তাই শিক্ষা খাতে চীনের সাথে যত বেশি যৌথতা গড়ে তোলা যায় ততই আমাদের মৌলিক জ্ঞান উৎপাদনের জন্যে সহায়ক হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবনী শিক্ষার প্রবল ঘাটতি দেখা যায়।

বিশেষ করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির (কাটিং এজ প্রযুক্তি) মতো বিষয় যেমন এআই এর প্রযুক্তিগত বিষয়ে চীনের সহায়তা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা অভিজ্ঞতায় এক অনন্যতা নিয়ে আসবে। এছাড়াও শিক্ষা বিনিময়ের মাধ্যমে যৌথ ডিগ্রি পরিচালনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও অনুমোদন প্রয়োজন। এর জন্য আরও দরকার আমাদের শিক্ষা খাতের এই বিষয়ক অগ্রাধিকার গড়ে তোলা।

আমরা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শিক্ষা বিষয়ক নানা আলোচনায় কারিগরি শিক্ষার প্রতি জোর দেওয়ার একটা প্রবণতা দেখছি। তবে কারিগরি শিক্ষাকে যেভাবে বিগত সময়ে নিচু করে দেখার প্রবণতা ছিল, তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কেননা এই শিক্ষাকে দেখতে হবে আমাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষতার উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে। আমরা এ প্রসঙ্গে চীনের লুবান ওয়ার্কশপের কথা বলতে পারি যেখানে তারা স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতার উন্নয়নের জন্যে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় ঘটায়।

লুবান ওয়ার্কশপ হলো চীনের একটি আন্তর্জাতিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সহযোগিতা কর্মসূচি যা বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন দক্ষতা এবং শিল্পভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া। স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রেক্ষাপটে যদি এর বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারিগরি শিক্ষার বিস্তারের জন্যে আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এ বিষয়ে যদি আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হয় তাহলেও আমরা অবাক হব না।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় চীন আমাদের যেভাবে সহায়তা করতে পারে

রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, চীন রোহিঙ্গা সংকটে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। রোহিঙ্গা সংকটে এখন প্রত্যাবসনের অনিশ্চয়তা এবং রোহিঙ্গাদের প্রতিদিনকার ব্যবস্থাপনার তহবিলের সংকটগুলোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য। ইতিমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি, বাংলাদেশের ওপর সাম্প্রতিক বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়ের মধ্য দিয়ে তাদের জন্য কক্সবাজারের স্থাপিত শরণার্থী শিবিরের পরিধি বা আয়তন বৃদ্ধি করার প্রস্তাব এসেছে; যা বাংলাদেশের মতো একটি ছোট দেশের জন্য বিশেষ করে ওই অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর আরও বেশি চাপ তৈরি করবে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচিত হবে বিগত সময়ে বাংলাদেশ মিয়ানমার ও চীনের সাথে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়টিকে আবারও সক্রিয় করা।

এখানে চীন বেশ কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তার একটি হলো, চীন এবং মায়ানমারের মধ্যকার গভীর অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক। যার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই, সাম্প্রতিক সময়ে চীন-মিয়ানমারের একটি যৌথ বিবৃতিতে। যেখানে তারা একে অন্যের সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছে। সে জায়গা থেকে মিয়ানমারের সাথে সমঝোতার জন্য চীন একটি সহায়ক দেশ হিসেবে কাজ করতে পারে। কেননা আশা করা যায়, মিয়ানমার চীনের মাধ্যমে আলোচনার প্রচেষ্টাকে বাতিল করে দেবে না—তাঁদের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্কের কারণে। এটা আমরা হয়তো পশ্চিমা কোনো দেশের কাছ থেকে পাব না। এই পরিপ্রেক্ষিতে চীনকে আমাদের হয়ে কথা বলার মতো সংবেদনশীল করাই হবে আমাদের কূটনৈতিক সাফল্য।

আমরা চীনকে কেন্দ্র করে যদি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করতে পারি তাহলে হয়তো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনার জন্য যে চলমান সংকট—বিশেষ করে তহবিলের সংকটের যথাযথ সমাধানে আসতে পারব। এর মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের জন্য গ্রহণযোগ্য চাপও তৈরি করা যাবে।

আমরা যদি চীনের সাথে বাংলাদেশের বিগত ১৫ বছরের ইতিহাস দেখি তাহলে দেখতে পাই, এই সময়ে চীন বাংলাদেশের একটি অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কই অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল।

এ প্রসঙ্গে আমরা বিভিন্ন সময়ে ‘বার্ডেন শেয়ারিং’-এর ধারণার কথা পশ্চিমা দেশগুলোর মুখে শুনে আসছি। কিন্তু কখনোই রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ কোন ‘বার্ডেন শেয়ারিং’-এর বিষয় দেখতে পাইনি। ফলে আমরা যদি আন্তর্জাতিক পরিসরে জোটবদ্ধভাবে এই সংকটকে তুলে ধরতে পারি তাহলে হয়তো কিছুটা সুফল বের করে নিয়ে আসতে পারব।

ইতিমধ্যেই আমরা প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর থেকে জানতে পেরেছি যে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়ে যথাযথ সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে। ফলে এই সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আঞ্চলিক শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে জোটবদ্ধ না হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা প্রত্যাশা করব প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান চীন সফরে রোহিঙ্গা সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে থাকবে এবং আমরা ইতিবাচক ফলাফল দেখব।

একক দেশের প্রতি নির্ভরশীলতা কমানো ও ঋণের ফাঁদ এড়ানো

পাশাপাশি মনে রাখতে হবে কোনো একটি দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেন গড়ে না ওঠে। তাই বর্তমান সরকারকে মাথায় রাখতে হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেন স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ এবং উন্নয়নমুখী থাকে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও ইতিবাচক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

চীনের সাথে সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে যেন তাঁদের সাথে সম্পর্কগুলো যেন কেবলই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হেজেমনির ভিত্তিতে গড়ে না ওঠে। আমরা জানি, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর পশ্চিমা বিশ্বের দেশ, অর্থাৎ গ্লোবাল নর্থ-এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হেজেমনির প্রভাব যখন প্রকটভাবে দৃশ্যমান, তেমন একটি বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো দুর্বল দেশের পক্ষে এই সমঝোতা করা অতটা সহজ না।

এই সম্পর্কগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূলত একপাক্ষিক। নব্য-উদারনৈতিক ব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই হেজেমনিক সম্পর্ক। এমন একটি অবস্থায়, নিজ দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা আমাদের থাকতে হবে। ক্রমগত নির্ভরশীলতা ও হেজেমনিক সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশকে আরও সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনো ‘উন্নয়নের ফাঁদে’ বা নব্য-মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্দ্রে গুন্দার ফ্রাঙ্কের ভাষায় ‘অনুন্নয়নের উন্নয়ন’-এর পরিস্থিতিতে না পড়ে। চীনের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখে তার বাস্তবায়ন করতে হবে। চীনা বিশেষজ্ঞরাও এই বিষয়টি মানেন যে একেকটি দেশের উন্নয়নের প্রেক্ষাপট একেক রকম হবে, যা তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে প্রোথিত। এতে করে উন্নয়ন বাস্তবায়ন টেকসই হবে এবং বাংলাদেশও কার্যকরভাবে ‘উন্নয়নের ফাঁদ’-এর ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে পারবে।

এ প্রসঙ্গে আমরা আন্তর্জাতিক ঋণের প্রসঙ্গও নিয়ে আসতে পারি। ঋণের চেয়ে আমাদের নজর রাখতে হবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকে—যে বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে আরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। বিগত সময়ের মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের বোঁঝা আমাদের একটি লম্বা সময় ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। এর মধ্যে এমন সব প্রকল্প রয়েছে বিনিয়োগ ও ঋণের তুলনায় তার সুফলের মাত্রা অনেক কম। এমন প্রকল্প যেন বেছে নেওয়া না হয় সেটিও বাংলাদেশকে মাথায় রাখতে হবে।

বছরের পর বছর পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতার পরে এখন সাউথ-সাউথ সহযোগিতার নামে আমরা যেন আবার আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোর হেজেমনির বলয়ে ঢুকে যাচ্ছি। আমাদের এখন থেকেই সেই হেজেমনির বলয় ভাঙতে হবে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।

উন্নয়ন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যদি নিজ দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি না হয় তাহলে যুগ যুগ ধরে আমাদের অন্য দেশের আজ্ঞাবহ হয়েই থাকতে হবে। সেটা আমরা কোনোভাবেই চাই না। যে বিষয়গুলোতে আমাদের ঘাটতি রয়েছে সেই বিষয়গুলোতে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আমাদের বৈদেশিক সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু সেটি যেন স্থায়ী একটি ব্যবস্থা না হয়। বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভিত গড়ে তোলার পদক্ষেপের দিকে নজর রাখতে হবে। কেবল রাস্তা, সেতু, টানেল, বন্দর নির্মাণই উন্নয়ন নয়।

অনন্তকাল ধরে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকলে নিজদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে না। বিখ্যাত চীনা প্রবাদের মতো আমাদেরও মাথায় রাখতে হবে যে ‘সহায়তা নয়, সক্ষমতা’—খাদ্য প্রদানের পরিবর্তে খাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহের দক্ষতা অর্জনই প্রকৃত ক্ষমতায়নের ভিত্তি হতে হবে। তাই চীনের সাথে আমাদের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিকনীতি নির্ধারণে সমতা, মর্যাদা ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মধ্য দিয়ে একটি উন্নয়নমুখী সম্পর্ক তৈরির বিষয়গুলো আমাদের চিন্তায় ও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

  • বুলবুল সিদ্দিকী: নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত