ফরহাদ জাকারিয়া

এটা এখন অনেকেরই জানা, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ও সফল ব্যাংকটিতে চলমান সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানসহ নিয়োগ বাতিল হয়েছে পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য স্বাধীন পরিচালকদেরও। পর্ষদের সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে এবং ব্যাংকটিকে চাহিদামতো তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ সপ্তাহের শুরু থেকে ব্যাংকটিতে অনেকখানি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে লেনদেন।
কোনো ব্যাংকের ওপর আস্থা তখনই নষ্ট হতে শুরু করে, যখন প্রতিষ্ঠানটি চাহিদামতো তার গ্রাহককে অর্থ দিতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকে এ মাসের শুরু থেকে সেটিই শুরু হয়েছিল। পাঁচ-দশ হাজার টাকার চেক নিয়েও অনেককে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। ফাঁকা হয়ে পড়েছিল এটিএমও। এও ঠিক, একসঙ্গে বিপুল মানুষ টাকা তুলতে এলে বিশ্বের কোনো ব্যাংকেরই পক্ষে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইসলামী ব্যাংকে সেই পরিস্থিতিই শুরু হয়েছিল। এটাও বড় প্রশ্ন, এক সপ্তাহ কিংবা দশ দিনের মধ্যে কেন এত মানুষ একসঙ্গে টাকা তুলতে এসেছিল? কোনো ব্যাংকের প্রতি মানুষ যখন আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখনই এভাবে টাকা উত্তোলন করতে আসে। এতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ব্যাংকটি তখন শুধু নগদ টাকার অভাব নয়; চাপে পড়তে থাকে আরও নানা দিক থেকে।
ইসলামী ব্যাংকের এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হলো– পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে রাস্তায় যারা আন্দোলন শুরু করেছিল, তাদের দেওয়া বার্তাই গ্রহণযোগ্য হয়েছে ব্যাংকটির বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের কাছে। নইলে তারা একসঙ্গে আসতেন না টাকা ওঠাতে। অর্থাৎ আন্দোলনকারীরা এ বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, পরিচালনা পর্ষদে যে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটা সঠিক হয়নি।
গভর্নরও স্বীকার করেছেন, ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তড়িঘড়ি করে। কোনো ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের মতো পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত যে তাড়াহুড়া করে নেওয়া ঠিক নয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের জন্য যে খারাপ পরিস্থিতি দেখতে হতে পারে– এর মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হলো সেটিও। স্বভাবতই প্রত্যাশা থাকবে, আর্থিক খাতের আর কোনো প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।
ইসলামী ব্যাংক দেখভালের জন্য যাকে নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তিনি রোববারেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শুরুতেই এ বার্তা তিনিও দিতে চেয়েছেন, ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোই হবে মূল কাজ। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, ইসলামী ব্যাংকে মানুষ যেভাবে আস্থা নিয়ে আসত; ওই ঘটনার পর কি আবার সেই মনোভাব নিয়ে ফিরতে পারবে ব্যাংকটিতে? আর গ্রাহকরা যদি না ফেরে– দেশের সবচেয়ে সফল ব্যাংকটি কি উদ্ধার করতে পারবে হারানো আস্থা?
মনে রাখা জরুরি, মানুষ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখতে চায় না, যেখানে রাখলে তার মনে সেটি ফেরত পাওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে। আমানত চাহিদামতো সময়ে ও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ফেরত দিতে পারার কারণেই ইসলামী ব্যাংক হয়ে উঠেছিল মানুষের ‘আস্থার মিনার’। ব্যাংকটি বিপুলসংখ্যক মানুষের যেমন আস্থা অর্জন করতে পেরেছে; এ খাতে অন্তর্ভুক্ত দেশীয় আর কোনো প্রতিষ্ঠান কেন সেটা পারেনি, তাও বড় প্রশ্ন। অনেকে এ ক্ষেত্রে ব্যাংকটির উদ্যোক্তাদের বিশেষ পরিচয়ের বিষয় উল্লেখ করে থাকেন। তবে এটা ঠিক, শুধু বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের আস্থায় ‘সিস্টেমেটিক্যালি ইম্পরট্যান্ট’ ব্যাংক গড়ে ওঠে না। এটি তৈরি হয় সব শ্রেণী-পেশার মানুষের আস্থায়। ইসলামী ব্যাংক তা অর্জন করতে পেরেছিল এবং আস্থা গড়ে উঠেছিল প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রার পর থেকে ব্যাংকটিকে এতটা আস্থার সংকটে পড়তে হয়নি কখনও। তবে ২০১৭ সালে মালিকানা পরিবর্তনের পরও আস্থায় কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছিল এবং ২০২২ সালের নভেম্বরে ব্যাংকটির ঋণ কেলেঙ্কারি ব্যাপকভাবে মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়ার সময়েও তৈরি হয়েছিল অনাস্থা। তবে তা সামাল দেওয়া গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর সহায়তা জোগানোয়। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। কারণ, এবার আন্দোলন শুরু হয়েছিল গ্রাহকদের পক্ষ থেকে।
অন্যদিকে গ্রাহকদের একটি অংশ যখন আমানত উত্তোলন শুরু করে, ঠিক সেই সময়েই চট্টগ্রামভিত্তিক চাকরিচ্যুত গ্রুপটি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে ব্যাংকবিরোধী প্রচারে। ৯ জুন সংসদে বক্তব্য প্রদানের মধ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপারে সরকারের নেতিবাচক মনোভাবও হয়ে ওঠে স্পষ্ট। এতে সাধারণ গ্রাহকদের উল্লেখযোগ্য অংশ ধারণা পোষণ করতে থাকেন যে, ব্যাংকটি টাকা ফেরত দিতে না পারলে সরকারের পক্ষ থেকেও হয়তো সহযোগিতা মিলবে না। এ অবস্থায় কষ্টার্জিত আমানত তড়িঘড়ি করে তুলে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্পও ছিল না। পরদিন থেকে পরিস্থিতি চলেও যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
অস্থিরতা যখন চলমান; মূলধারার মিডিয়ার বাইরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদেরও একটি অংশ ছিলেন সক্রিয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ইস্যু যখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়, তা মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরিতে যোগ করে বাড়তি মাত্রা। এ ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছিল। এমন ক্ষেত্রে ফলাফল রাখা যায় না নিয়ন্ত্রণে। অংশীজনরা আচরণ করতে থাকে মর্জিমতো। গণতান্ত্রিক দেশে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিকৃত করে মনগড়া বক্তব্য প্রচার এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বিধিসম্মত কিনা, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। এ ইস্যুতে পদক্ষেপ নেওয়ার উদাহরণও আছে অতীতে। এটা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছোটখাটো ইস্যুও হয়ে উঠতে পারে বড় এবং তার অব্যবহিত ফল পড়তে পারে খাত সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানে।
কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যখন আস্থার সংকট তৈরি হয়, তখন গ্রাহকরা শুধু আমানত উত্তোলন করে না; ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কেরও বিচ্ছেদ ঘটে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক তারল্য সংকটে ব্যাংকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দীর্ঘদিন সুসম্পর্ক রাখা করপোরেটরাও। এ ধারা কতদিন অব্যাহত থাকবে, কে জানে! তাদের ফেরানো না গেলে নগদ টাকার চাপ সামলানো ব্যাংকটির পক্ষে কঠিন হবে বলেই মনে হয়। ব্যবসায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠান কিন্তু এমন অযাচিত বিপত্তি সহ্য করতে চায় না। তাই সম্পর্কের চেয়ে মুনাফার হিসাবটি তখন গুরুত্ব পায় সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থাপনায়। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নতুনভাবে গঠিত হলেও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অনেকেই যে ব্যাংকে ফিরতে দ্বিধান্বিত থাকবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে উভয় পক্ষের স্বার্থেই।
সাম্প্রতিক ঘটনায় স্বভাবতই মনোবল ভেঙে পড়েছিল কর্মীদেরও একটি অংশের। বস্তুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী, করপোরেট ও শুভাকাঙ্ক্ষী গ্রাহকদের আস্থায় ঘাটতি থাকলে নাজুক হয়ে পড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হয় না। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কি ভিন্ন হবে? এমন অনেক প্রশ্নই এখন উঠবে এবং উত্তর খোঁজার আগ্রহ থাকবে অনেকের। তবে মনে রাখা দরকার, সিস্টেমেটিক্যালি ইমপরট্যান্ট ব্যাংক হওয়ার কারণে এতে সমস্যা শুধু আর্থিক খাতে সীমিত থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্যান্য খাতে। বিশেষত রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে আমদানি দায় পরিশোধ কঠিন হয়ে উঠতে পারে ব্যাংকটির পক্ষে। অন্যদিকে টাকা জোগান দিতে না পারলে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে ব্যাংকটির ওপর নির্ভরশীল শিল্প কারখানাগুলোয়। এমন পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।
সাম্প্রতিক সংকটে ব্যাংকটি থেকে শুধু বিপুল আমানতই বেরিয়ে যায়নি; বরং বেরিয়ে গেছেন দীর্ঘদিন এই ব্যাংকে থাকা গ্রাহকদের উল্লেখযোগ্য অংশ। যে কোনো ব্যাংক থেকে বিপুল আমানত বেরিয়ে গেলে তার ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতা যারা রয়েছেন, তাদের নতুন অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রেও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। ইসলামী ব্যাংক থেকে গত কয়েক দিনে যে পরিমাণ আমানত বেরিয়ে গেছে, তাতে এর অব্যবহিত সংকটগুলো সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে হয়তো। প্রত্যাশা থাকবে, সেসব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে নীতি সহায়তা জোগাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
লেখার শেষে মনে জাগা স্বাভাবিক প্রশ্নটি তুলতে হয়। সার্বিকভাবে দেশের আর্থিক খাত রয়েছে নাজুক অবস্থায়। এ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মাথায় বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশীদার ব্যাংকটি ঘিরে এমন ‘এক্সপেরিমেন্ট’ কি জরুরি ছিল? আর্থিক খাতকে বেসামাল রেখে অন্যান্য খাতে কি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে? ব্যাংকটিতে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা ব্যবসায়িকভাবে যে ক্ষতির মুখে পড়বেন এবং তাতে অর্থনীতিতে যে ‘সমস্যার চক্র’ তৈরি হবে, তা আমরা সমাধান করব কীভাবে? নীতিনির্ধারকরা কি সম্ভাব্য এ সংকটগুলোর বিষয়ে ভেবেছেন?
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা

এটা এখন অনেকেরই জানা, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ও সফল ব্যাংকটিতে চলমান সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানসহ নিয়োগ বাতিল হয়েছে পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য স্বাধীন পরিচালকদেরও। পর্ষদের সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে এবং ব্যাংকটিকে চাহিদামতো তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ সপ্তাহের শুরু থেকে ব্যাংকটিতে অনেকখানি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে লেনদেন।
কোনো ব্যাংকের ওপর আস্থা তখনই নষ্ট হতে শুরু করে, যখন প্রতিষ্ঠানটি চাহিদামতো তার গ্রাহককে অর্থ দিতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকে এ মাসের শুরু থেকে সেটিই শুরু হয়েছিল। পাঁচ-দশ হাজার টাকার চেক নিয়েও অনেককে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। ফাঁকা হয়ে পড়েছিল এটিএমও। এও ঠিক, একসঙ্গে বিপুল মানুষ টাকা তুলতে এলে বিশ্বের কোনো ব্যাংকেরই পক্ষে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইসলামী ব্যাংকে সেই পরিস্থিতিই শুরু হয়েছিল। এটাও বড় প্রশ্ন, এক সপ্তাহ কিংবা দশ দিনের মধ্যে কেন এত মানুষ একসঙ্গে টাকা তুলতে এসেছিল? কোনো ব্যাংকের প্রতি মানুষ যখন আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখনই এভাবে টাকা উত্তোলন করতে আসে। এতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ব্যাংকটি তখন শুধু নগদ টাকার অভাব নয়; চাপে পড়তে থাকে আরও নানা দিক থেকে।
ইসলামী ব্যাংকের এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হলো– পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে রাস্তায় যারা আন্দোলন শুরু করেছিল, তাদের দেওয়া বার্তাই গ্রহণযোগ্য হয়েছে ব্যাংকটির বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের কাছে। নইলে তারা একসঙ্গে আসতেন না টাকা ওঠাতে। অর্থাৎ আন্দোলনকারীরা এ বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, পরিচালনা পর্ষদে যে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটা সঠিক হয়নি।
গভর্নরও স্বীকার করেছেন, ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তড়িঘড়ি করে। কোনো ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের মতো পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত যে তাড়াহুড়া করে নেওয়া ঠিক নয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের জন্য যে খারাপ পরিস্থিতি দেখতে হতে পারে– এর মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হলো সেটিও। স্বভাবতই প্রত্যাশা থাকবে, আর্থিক খাতের আর কোনো প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।
ইসলামী ব্যাংক দেখভালের জন্য যাকে নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তিনি রোববারেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শুরুতেই এ বার্তা তিনিও দিতে চেয়েছেন, ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোই হবে মূল কাজ। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, ইসলামী ব্যাংকে মানুষ যেভাবে আস্থা নিয়ে আসত; ওই ঘটনার পর কি আবার সেই মনোভাব নিয়ে ফিরতে পারবে ব্যাংকটিতে? আর গ্রাহকরা যদি না ফেরে– দেশের সবচেয়ে সফল ব্যাংকটি কি উদ্ধার করতে পারবে হারানো আস্থা?
মনে রাখা জরুরি, মানুষ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখতে চায় না, যেখানে রাখলে তার মনে সেটি ফেরত পাওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে। আমানত চাহিদামতো সময়ে ও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ফেরত দিতে পারার কারণেই ইসলামী ব্যাংক হয়ে উঠেছিল মানুষের ‘আস্থার মিনার’। ব্যাংকটি বিপুলসংখ্যক মানুষের যেমন আস্থা অর্জন করতে পেরেছে; এ খাতে অন্তর্ভুক্ত দেশীয় আর কোনো প্রতিষ্ঠান কেন সেটা পারেনি, তাও বড় প্রশ্ন। অনেকে এ ক্ষেত্রে ব্যাংকটির উদ্যোক্তাদের বিশেষ পরিচয়ের বিষয় উল্লেখ করে থাকেন। তবে এটা ঠিক, শুধু বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের আস্থায় ‘সিস্টেমেটিক্যালি ইম্পরট্যান্ট’ ব্যাংক গড়ে ওঠে না। এটি তৈরি হয় সব শ্রেণী-পেশার মানুষের আস্থায়। ইসলামী ব্যাংক তা অর্জন করতে পেরেছিল এবং আস্থা গড়ে উঠেছিল প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রার পর থেকে ব্যাংকটিকে এতটা আস্থার সংকটে পড়তে হয়নি কখনও। তবে ২০১৭ সালে মালিকানা পরিবর্তনের পরও আস্থায় কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছিল এবং ২০২২ সালের নভেম্বরে ব্যাংকটির ঋণ কেলেঙ্কারি ব্যাপকভাবে মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়ার সময়েও তৈরি হয়েছিল অনাস্থা। তবে তা সামাল দেওয়া গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর সহায়তা জোগানোয়। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। কারণ, এবার আন্দোলন শুরু হয়েছিল গ্রাহকদের পক্ষ থেকে।
অন্যদিকে গ্রাহকদের একটি অংশ যখন আমানত উত্তোলন শুরু করে, ঠিক সেই সময়েই চট্টগ্রামভিত্তিক চাকরিচ্যুত গ্রুপটি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে ব্যাংকবিরোধী প্রচারে। ৯ জুন সংসদে বক্তব্য প্রদানের মধ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপারে সরকারের নেতিবাচক মনোভাবও হয়ে ওঠে স্পষ্ট। এতে সাধারণ গ্রাহকদের উল্লেখযোগ্য অংশ ধারণা পোষণ করতে থাকেন যে, ব্যাংকটি টাকা ফেরত দিতে না পারলে সরকারের পক্ষ থেকেও হয়তো সহযোগিতা মিলবে না। এ অবস্থায় কষ্টার্জিত আমানত তড়িঘড়ি করে তুলে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্পও ছিল না। পরদিন থেকে পরিস্থিতি চলেও যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
অস্থিরতা যখন চলমান; মূলধারার মিডিয়ার বাইরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদেরও একটি অংশ ছিলেন সক্রিয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ইস্যু যখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়, তা মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরিতে যোগ করে বাড়তি মাত্রা। এ ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছিল। এমন ক্ষেত্রে ফলাফল রাখা যায় না নিয়ন্ত্রণে। অংশীজনরা আচরণ করতে থাকে মর্জিমতো। গণতান্ত্রিক দেশে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিকৃত করে মনগড়া বক্তব্য প্রচার এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বিধিসম্মত কিনা, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। এ ইস্যুতে পদক্ষেপ নেওয়ার উদাহরণও আছে অতীতে। এটা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছোটখাটো ইস্যুও হয়ে উঠতে পারে বড় এবং তার অব্যবহিত ফল পড়তে পারে খাত সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানে।
কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যখন আস্থার সংকট তৈরি হয়, তখন গ্রাহকরা শুধু আমানত উত্তোলন করে না; ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কেরও বিচ্ছেদ ঘটে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক তারল্য সংকটে ব্যাংকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দীর্ঘদিন সুসম্পর্ক রাখা করপোরেটরাও। এ ধারা কতদিন অব্যাহত থাকবে, কে জানে! তাদের ফেরানো না গেলে নগদ টাকার চাপ সামলানো ব্যাংকটির পক্ষে কঠিন হবে বলেই মনে হয়। ব্যবসায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠান কিন্তু এমন অযাচিত বিপত্তি সহ্য করতে চায় না। তাই সম্পর্কের চেয়ে মুনাফার হিসাবটি তখন গুরুত্ব পায় সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থাপনায়। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নতুনভাবে গঠিত হলেও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অনেকেই যে ব্যাংকে ফিরতে দ্বিধান্বিত থাকবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে উভয় পক্ষের স্বার্থেই।
সাম্প্রতিক ঘটনায় স্বভাবতই মনোবল ভেঙে পড়েছিল কর্মীদেরও একটি অংশের। বস্তুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী, করপোরেট ও শুভাকাঙ্ক্ষী গ্রাহকদের আস্থায় ঘাটতি থাকলে নাজুক হয়ে পড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হয় না। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কি ভিন্ন হবে? এমন অনেক প্রশ্নই এখন উঠবে এবং উত্তর খোঁজার আগ্রহ থাকবে অনেকের। তবে মনে রাখা দরকার, সিস্টেমেটিক্যালি ইমপরট্যান্ট ব্যাংক হওয়ার কারণে এতে সমস্যা শুধু আর্থিক খাতে সীমিত থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্যান্য খাতে। বিশেষত রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে আমদানি দায় পরিশোধ কঠিন হয়ে উঠতে পারে ব্যাংকটির পক্ষে। অন্যদিকে টাকা জোগান দিতে না পারলে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে ব্যাংকটির ওপর নির্ভরশীল শিল্প কারখানাগুলোয়। এমন পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।
সাম্প্রতিক সংকটে ব্যাংকটি থেকে শুধু বিপুল আমানতই বেরিয়ে যায়নি; বরং বেরিয়ে গেছেন দীর্ঘদিন এই ব্যাংকে থাকা গ্রাহকদের উল্লেখযোগ্য অংশ। যে কোনো ব্যাংক থেকে বিপুল আমানত বেরিয়ে গেলে তার ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতা যারা রয়েছেন, তাদের নতুন অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রেও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। ইসলামী ব্যাংক থেকে গত কয়েক দিনে যে পরিমাণ আমানত বেরিয়ে গেছে, তাতে এর অব্যবহিত সংকটগুলো সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে হয়তো। প্রত্যাশা থাকবে, সেসব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে নীতি সহায়তা জোগাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
লেখার শেষে মনে জাগা স্বাভাবিক প্রশ্নটি তুলতে হয়। সার্বিকভাবে দেশের আর্থিক খাত রয়েছে নাজুক অবস্থায়। এ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মাথায় বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশীদার ব্যাংকটি ঘিরে এমন ‘এক্সপেরিমেন্ট’ কি জরুরি ছিল? আর্থিক খাতকে বেসামাল রেখে অন্যান্য খাতে কি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে? ব্যাংকটিতে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা ব্যবসায়িকভাবে যে ক্ষতির মুখে পড়বেন এবং তাতে অর্থনীতিতে যে ‘সমস্যার চক্র’ তৈরি হবে, তা আমরা সমাধান করব কীভাবে? নীতিনির্ধারকরা কি সম্ভাব্য এ সংকটগুলোর বিষয়ে ভেবেছেন?
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি। ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিপক্ষকে দমন, নিগ্রহ এবং প্রতিশোধ গ্রহণের চক্র আমাদের রাজনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
১০ মিনিট আগে
একসময় মানুষ বিশ্বাস করত, ঈশ্বর সব দেখেন। এখন মানুষ জানে, গুগলও দেখে। পার্থক্য হলো, ঈশ্বর অন্তত আমাদের সার্চ হিস্ট্রি দিয়ে বিজ্ঞাপন বানাতেন না। স্কট গ্যালওয়ের ‘গুগল ইজ গড’ মন্তব্যটি তাই নিছক প্রযুক্তিপ্রেমী রসিকতা নয়। এটি আমাদের সময়ের এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্য।
২ ঘণ্টা আগে
আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যখন মানহানি আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় কারও সুনাম নষ্ট করতে হলে সংবাদপত্র, সম্পাদক, যাচাই-বাছাই এবং সময়ের প্রয়োজন হতো। আজ একটি টুইট, একটি বিকৃত স্ক্রিনশট, একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপ কিংবা একটি বেপরোয়া অভিযোগই যথেষ্ট।
৫ ঘণ্টা আগে
গ্রাম এখন আর সেই শান্ত, নির্ভার জায়গা নয়; বরং নানা সামাজিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট হলো মাদক—একটি নীরব, কিন্তু দ্রুত বিস্তারমান মহামারী, যা গ্রামীণ সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করছে।
৬ ঘণ্টা আগে