সুমন সুবহান

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত রাজনীতি সমান্তরাল চললেও বর্তমান ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে এই দুইয়ের সীমারেখা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ ইসরায়েলের ইতিহাসে যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার ক্ষত তৈরি করেছে, তাকেই এখন রাজনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করছেন নেতানিয়াহু। তার ঘোষিত ‘টোটাল ভিক্টরি’ বা ‘চূড়ান্ত বিজয়’ কেবল একটি সামরিক লক্ষ্য নয়, বরং দুর্নীতির মামলা ও সম্ভাব্য কারাদণ্ড থেকে বাঁচার এক নিপুণ আইনি ও রাজনৈতিক ঢাল। ৭ অক্টোবরের চরম ব্যর্থতার জন্য গঠিতব্য রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশনকে অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দিতে তিনি এক অন্তহীন যুদ্ধের পথে হাঁটছেন। কট্টর ডানপন্থী জোটের সমর্থন টিকিয়ে রাখা এবং বেনি গান্তজের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় সৃষ্ট নির্বাচনভীতি তাকে আরও আক্রমণাত্মক সমরকৌশলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জিম্মি মুক্তি বা শান্তি আলোচনার চেয়েও তার কাছে এখন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং গদি রক্ষা করা অধিকতর অগ্রাধিকার পাচ্ছে। নিজের বিচারিক সুরক্ষা ও ক্ষমতার আয়ু বাড়াতে তিনি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সমরনীতিকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দাবার ঘুঁটিতে পরিণত করেছেন। আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে তার এই একগুঁয়েমি প্রমাণ করে, যুদ্ধের ময়দানই এখন তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার শেষ দুর্গ। এমতাবস্থায় কঠোর অর্থনৈতিক বা সামরিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়া এই ‘স্বার্থান্বেষী যুদ্ধ’ থামানো এবং ইসরায়েলে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ফেরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ঘুষের মামলাগুলো বর্তমানে তার কাছে কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং এক অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার মসনদ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানেই সরাসরি বিচারিক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো, তাই তিনি যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করছেন। জরুরি অবস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি সুকৌশলে আইনি প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছেন, যা তাকে সাময়িক ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি প্রদান করছে। ইয়ার লাপিদ বা বেনি গান্তজের মতো বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে তার বিচারিক ছাড় পাওয়ার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে—এই শঙ্কা থেকেই তিনি যুদ্ধের তীব্রতা বজায় রাখছেন। কেবল দেশের ভেতরেই নয়, তুরস্কের আদালত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যে অভিযোগ উঠেছে, তা তাকে আরও কোণঠাসা করে ফেলেছে। এই বহুমুখী আইনি চাপ থেকে বাঁচতে তিনি রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। ফলে ইসরায়েলের যুদ্ধনীতি এখন আর কেবল জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং নেতানিয়াহুর কাঠগড়া এড়ানোর এক ব্যক্তিগত ঢাল মাত্র।
ইসরায়েলের বর্তমান মন্ত্রিসভা দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থী, যেখানে ইতামার বেন-গ্যভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচের মতো নেতারা যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা মানবিক ছাড়কে সরাসরি ‘সরকারের পতন’ হিসেবে গণ্য করেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখানে এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চাপে পিষ্ট—একদিকে বিশ্বনেতাদের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিরতির আহ্বান, অন্যদিকে নিজের জোটের অংশীদারদের ক্ষমতা থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রকাশ্য হুমকি।
এই রাজনৈতিক সমীকরণে জাতীয় নিরাপত্তা বা জিম্মিদের মুক্তির চেয়েও জোটের টিকে থাকা এবং ক্ষমতার সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করা এখন বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কট্টরপন্থীদের সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে নেতানিয়াহু রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছেন, যা মূলত একটি ‘কোয়ালিশন ব্ল্যাকমেইল’-এর প্রতিফলন। এই অস্থিতিশীল জোট রাজনীতির কারণেই ইসরায়েলের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো এখন আর সার্বভৌম নয়, বরং তা কট্টরপন্থী নেতাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেকোনো সামরিক বা গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা একটি দীর্ঘকালীন ও শক্তিশালী ঐতিহ্য। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন যে, যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই ৭ অক্টোবরের নজিরবিহীন ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত শুরু হবে এবং সরকার প্রধান হিসেবে এর চূড়ান্ত দায়ভার তার ওপরেই বর্তাবে। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে কৌশলে এড়িয়ে চলছেন, কারণ চলমান সংঘাতের মধ্যে কমিশন গঠন করা প্রায় অসম্ভব। তার ঘোষিত ‘টোটাল ভিক্টরি’ বা ‘চূড়ান্ত বিজয়’ আদতে এই অনিবার্য দায়বদ্ধতা থেকে বাঁচার এবং তদন্তের সময়সীমাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার একটি মোক্ষম হাতিয়ার। এই ভয় থেকেই তিনি এমন এক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন যা অর্জন করা দুঃসাধ্য, যাতে যুদ্ধের সমাপ্তি না ঘটে এবং তদন্তের মুখোমুখি হতে না হয়। মূলত ৭ অক্টোবরের সেই কালো অধ্যায়ের বিচারিক ছায়া থেকে বাঁচতেই তিনি রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথে পরিচালিত করছেন।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে, যেখানে সাধারণ নাগরিকরা ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতা ও নেতৃত্বের সংকটে ভুগছেন। এই পরিস্থিতিতে বেনি গান্তজ একজন ‘শান্ত ও পরিপক্ক’ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যার ফলে যেকোনো নিরপেক্ষ নির্বাচনে লিকুদ পার্টির ভরাডুবি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ১ নভেম্বর ২০২২ তারিখে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন ২০২৬ সালের অক্টোবরে হওয়ার কথা থাকলেও দেশটির বর্তমান অস্থিরতায় আগাম নির্বাচনের দাবি জোরালো হচ্ছে। ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৪-২৫ জুড়ে ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১২’ এবং ‘ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’ পরিচালিত জরিপগুলো বলছে, আজ নির্বাচন হলে বেনি গান্তজের নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। নেতানিয়াহু এই জনমত ও নির্বাচনী বিপর্যয় আঁচ করতে পেরেই যুদ্ধের অজুহাতে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কৌশলে পিছিয়ে দিচ্ছেন, কারণ ক্ষমতার পতন মানেই তার জন্য বিচারিক কাঠগড়া ও সম্ভাব্য কারাবাস। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যুদ্ধের ময়দানের বাস্তবতাকে নিজের গদি রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন যাতে ক্ষমতার পরিবর্তন না ঘটে। আসলে পরাজয় নিশ্চিত জেনেই তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছেন। এই নির্বাচনভীতিই এখন ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলের গতিপথ নির্ধারণ করছে।
পরিশেষে বলা যায়, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন একটি ‘জিরো-সাম গেম’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে ক্ষমতার বিচ্যুতি মানেই তার জন্য অনিবার্য কারাবাস। এই ব্যক্তিগত অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তিনি যে কেবল দেশের ভেতরে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছেন তা নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি আজ প্রায় মিত্রহীন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের সম্পর্কের ঐতিহাসিক অবনতি এখন স্পষ্ট, যার প্রতিফলন ঘটছে অস্ত্রের চালান স্থগিত এবং আকাশসীমা ও নৌ-বন্দর ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে হাঙ্গেরিতে নতুন সরকারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইউরোপে নেতানিয়াহুর শেষ শক্তিশালী মিত্রটিকেও কেড়ে নিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, কেবল মৌখিক নিন্দা বা কূটনৈতিক অনুরোধে এই একগুঁয়েমি ভাঙা সম্ভব নয়। যেহেতু তিনি রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে নিজের বিচারিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে ব্যবহার করছেন, তাই কঠোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়া তাকে যুদ্ধবিরতি বা নির্বাচনের পথে আনা অসম্ভব। বিশ্বনেতাদের বুঝতে হবে যে, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত স্বার্থের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তি পুনরুদ্ধারে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ ও কঠোর হস্তক্ষেপই এখন একমাত্র কার্যকর বিকল্প। এর অন্যথা হলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হবে অগণিত নিরীহ প্রাণ এবং বিশ্বব্যবস্থার দীর্ঘদিনের নৈতিক কাঠামো।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত রাজনীতি সমান্তরাল চললেও বর্তমান ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে এই দুইয়ের সীমারেখা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ ইসরায়েলের ইতিহাসে যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার ক্ষত তৈরি করেছে, তাকেই এখন রাজনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করছেন নেতানিয়াহু। তার ঘোষিত ‘টোটাল ভিক্টরি’ বা ‘চূড়ান্ত বিজয়’ কেবল একটি সামরিক লক্ষ্য নয়, বরং দুর্নীতির মামলা ও সম্ভাব্য কারাদণ্ড থেকে বাঁচার এক নিপুণ আইনি ও রাজনৈতিক ঢাল। ৭ অক্টোবরের চরম ব্যর্থতার জন্য গঠিতব্য রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশনকে অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দিতে তিনি এক অন্তহীন যুদ্ধের পথে হাঁটছেন। কট্টর ডানপন্থী জোটের সমর্থন টিকিয়ে রাখা এবং বেনি গান্তজের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় সৃষ্ট নির্বাচনভীতি তাকে আরও আক্রমণাত্মক সমরকৌশলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জিম্মি মুক্তি বা শান্তি আলোচনার চেয়েও তার কাছে এখন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং গদি রক্ষা করা অধিকতর অগ্রাধিকার পাচ্ছে। নিজের বিচারিক সুরক্ষা ও ক্ষমতার আয়ু বাড়াতে তিনি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সমরনীতিকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দাবার ঘুঁটিতে পরিণত করেছেন। আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে তার এই একগুঁয়েমি প্রমাণ করে, যুদ্ধের ময়দানই এখন তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার শেষ দুর্গ। এমতাবস্থায় কঠোর অর্থনৈতিক বা সামরিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়া এই ‘স্বার্থান্বেষী যুদ্ধ’ থামানো এবং ইসরায়েলে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ফেরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ঘুষের মামলাগুলো বর্তমানে তার কাছে কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং এক অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার মসনদ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানেই সরাসরি বিচারিক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো, তাই তিনি যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করছেন। জরুরি অবস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি সুকৌশলে আইনি প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছেন, যা তাকে সাময়িক ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি প্রদান করছে। ইয়ার লাপিদ বা বেনি গান্তজের মতো বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে তার বিচারিক ছাড় পাওয়ার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে—এই শঙ্কা থেকেই তিনি যুদ্ধের তীব্রতা বজায় রাখছেন। কেবল দেশের ভেতরেই নয়, তুরস্কের আদালত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যে অভিযোগ উঠেছে, তা তাকে আরও কোণঠাসা করে ফেলেছে। এই বহুমুখী আইনি চাপ থেকে বাঁচতে তিনি রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। ফলে ইসরায়েলের যুদ্ধনীতি এখন আর কেবল জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং নেতানিয়াহুর কাঠগড়া এড়ানোর এক ব্যক্তিগত ঢাল মাত্র।
ইসরায়েলের বর্তমান মন্ত্রিসভা দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থী, যেখানে ইতামার বেন-গ্যভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচের মতো নেতারা যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা মানবিক ছাড়কে সরাসরি ‘সরকারের পতন’ হিসেবে গণ্য করেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখানে এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চাপে পিষ্ট—একদিকে বিশ্বনেতাদের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিরতির আহ্বান, অন্যদিকে নিজের জোটের অংশীদারদের ক্ষমতা থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রকাশ্য হুমকি।
এই রাজনৈতিক সমীকরণে জাতীয় নিরাপত্তা বা জিম্মিদের মুক্তির চেয়েও জোটের টিকে থাকা এবং ক্ষমতার সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করা এখন বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কট্টরপন্থীদের সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে নেতানিয়াহু রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছেন, যা মূলত একটি ‘কোয়ালিশন ব্ল্যাকমেইল’-এর প্রতিফলন। এই অস্থিতিশীল জোট রাজনীতির কারণেই ইসরায়েলের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো এখন আর সার্বভৌম নয়, বরং তা কট্টরপন্থী নেতাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেকোনো সামরিক বা গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা একটি দীর্ঘকালীন ও শক্তিশালী ঐতিহ্য। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন যে, যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই ৭ অক্টোবরের নজিরবিহীন ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত শুরু হবে এবং সরকার প্রধান হিসেবে এর চূড়ান্ত দায়ভার তার ওপরেই বর্তাবে। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে কৌশলে এড়িয়ে চলছেন, কারণ চলমান সংঘাতের মধ্যে কমিশন গঠন করা প্রায় অসম্ভব। তার ঘোষিত ‘টোটাল ভিক্টরি’ বা ‘চূড়ান্ত বিজয়’ আদতে এই অনিবার্য দায়বদ্ধতা থেকে বাঁচার এবং তদন্তের সময়সীমাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার একটি মোক্ষম হাতিয়ার। এই ভয় থেকেই তিনি এমন এক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন যা অর্জন করা দুঃসাধ্য, যাতে যুদ্ধের সমাপ্তি না ঘটে এবং তদন্তের মুখোমুখি হতে না হয়। মূলত ৭ অক্টোবরের সেই কালো অধ্যায়ের বিচারিক ছায়া থেকে বাঁচতেই তিনি রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথে পরিচালিত করছেন।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে, যেখানে সাধারণ নাগরিকরা ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতা ও নেতৃত্বের সংকটে ভুগছেন। এই পরিস্থিতিতে বেনি গান্তজ একজন ‘শান্ত ও পরিপক্ক’ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যার ফলে যেকোনো নিরপেক্ষ নির্বাচনে লিকুদ পার্টির ভরাডুবি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ১ নভেম্বর ২০২২ তারিখে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন ২০২৬ সালের অক্টোবরে হওয়ার কথা থাকলেও দেশটির বর্তমান অস্থিরতায় আগাম নির্বাচনের দাবি জোরালো হচ্ছে। ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৪-২৫ জুড়ে ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১২’ এবং ‘ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’ পরিচালিত জরিপগুলো বলছে, আজ নির্বাচন হলে বেনি গান্তজের নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। নেতানিয়াহু এই জনমত ও নির্বাচনী বিপর্যয় আঁচ করতে পেরেই যুদ্ধের অজুহাতে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কৌশলে পিছিয়ে দিচ্ছেন, কারণ ক্ষমতার পতন মানেই তার জন্য বিচারিক কাঠগড়া ও সম্ভাব্য কারাবাস। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যুদ্ধের ময়দানের বাস্তবতাকে নিজের গদি রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন যাতে ক্ষমতার পরিবর্তন না ঘটে। আসলে পরাজয় নিশ্চিত জেনেই তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছেন। এই নির্বাচনভীতিই এখন ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলের গতিপথ নির্ধারণ করছে।
পরিশেষে বলা যায়, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন একটি ‘জিরো-সাম গেম’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে ক্ষমতার বিচ্যুতি মানেই তার জন্য অনিবার্য কারাবাস। এই ব্যক্তিগত অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তিনি যে কেবল দেশের ভেতরে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছেন তা নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি আজ প্রায় মিত্রহীন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের সম্পর্কের ঐতিহাসিক অবনতি এখন স্পষ্ট, যার প্রতিফলন ঘটছে অস্ত্রের চালান স্থগিত এবং আকাশসীমা ও নৌ-বন্দর ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে হাঙ্গেরিতে নতুন সরকারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইউরোপে নেতানিয়াহুর শেষ শক্তিশালী মিত্রটিকেও কেড়ে নিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, কেবল মৌখিক নিন্দা বা কূটনৈতিক অনুরোধে এই একগুঁয়েমি ভাঙা সম্ভব নয়। যেহেতু তিনি রাষ্ট্রীয় সমরকৌশলকে নিজের বিচারিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে ব্যবহার করছেন, তাই কঠোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়া তাকে যুদ্ধবিরতি বা নির্বাচনের পথে আনা অসম্ভব। বিশ্বনেতাদের বুঝতে হবে যে, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত স্বার্থের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তি পুনরুদ্ধারে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ ও কঠোর হস্তক্ষেপই এখন একমাত্র কার্যকর বিকল্প। এর অন্যথা হলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হবে অগণিত নিরীহ প্রাণ এবং বিশ্বব্যবস্থার দীর্ঘদিনের নৈতিক কাঠামো।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়েছে। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিপুল অর্থনৈতিক দায় এবং পরিবেশগত উদ্বেগের জায়গাগুলো রয়েই গেছে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি অবকাঠামো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
২ ঘণ্টা আগে
জ্বালানি বাণিজ্যের পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও ইরান এখন ওমান উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় নিয়মিত যৌথ নৌ-মহড়া পরিচালনা করছে। এই সামরিক সমন্বয় সরাসরি বার্তা দিচ্ছে যে, এই দেশগুলো তাদের জ্বালানি সরবরাহ পথ রক্ষায় এবং সামুদ্রিক অবরোধ মোকাবিলায় একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
১ দিন আগে
দেশে খুনের মতো গুরুতর সহিংস অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু কিছু রোমহর্ষক ঘটনা জনমনে ব্যাপক আলোড়ন ও ভীতির সঞ্চার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
১ দিন আগে
এশীয় হাতি নিয়ে বাংলাদেশে নানা দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। একের পর এক হাতি হত্যাকাণ্ড কিংবা অপঘাতে মৃত্যু। কিছুদিন আগে ছিল পালা হাতির চাঁদাবাজি ও হাতির ওপর মাহুতের নির্মম অত্যাচার নিয়ে তুমুল আলোচনা। তারপর ঘটল চট্টগ্রামের চুনতিতে ট্রেনের ধাক্কায় হাতির মৃত্যু।
২ দিন আগে