মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হুমায়ুন আজাদের কিশোর উপন্যাস ‘আব্বুকে মনে পড়ে’। যুদ্ধে পিতৃহীন হওয়া এক শিশুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা দেখি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের অনুভূতি, ত্যাগ ও স্বপ্নের এক মর্মস্পর্শী বয়ান। সরাসরি রণক্ষেত্র নয়; যুদ্ধের অভিঘাত শিশুর মনোজগতে কীভাবে অনুরণিত হয়, সেটিই হয়ে উঠেছে উপন্যাসের মূল ভাষ্য।
উপন্যাসের পাতা উল্টেই আমরা গভীর হাহাকারে নিমজ্জিত হই। শুরুতেই এক কিশোর তার আব্বুকে স্মরণ করে—‘কেমন করে কলিংবেল বাজায়, সে বেলে কেমন আওয়াজ ওঠে আর কতক্ষণ ধরে বাজে ওই ‘‘তোমার কাছে ফিরে এসেছি, তোমার কাছে ফিরে এসেছি’’ সুর, আমি তা কিচ্ছু জানি না।’
পুরো উপন্যাসটি ষোলো বছর বয়সী এক কিশোরের স্মৃতিচারণমূলক বয়ানে নির্মিত। মাত্র চার বছর বয়সে তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিই কাহিনির ভিত্তি।
‘কলিংবেল’ হয়ে উঠেছে আব্বুর ফিরে আসার প্রতীক। ‘তোমার কাছে ফিরে এসেছি’— কলিংবেলের এই কল্পিত সুর অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও তাৎপর্যপূর্ণ। বাবা ছিলেন এমন এক মানুষ—স্বপ্ন, সৌন্দর্য, স্নেহশীল, আদর্শবান আর মানবিকতার প্রতীক। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম সেই মানুষটিকে কেড়ে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে আব্বুর ‘না-ফেরার’ বেদনা শিশুটির জীবনে এক গভীর শূন্যতার জন্ম দেয়। স্বাধীনতা আসে, দেশ মুক্ত হয়, চারপাশ ভরে ওঠে বিজয়ের আনন্দে; কিন্তু শিশুটির ব্যক্তিগত জগৎ রয়ে যায় অপূর্ণ।
কিশোরটি আব্বুকে মনে করে, আবার মনে করতে পারে না। এই দ্বৈততা—‘মনে পড়ে’ এবং ‘মনে পড়ে না’—আসলে স্মৃতির ভঙ্গুরতা ও মানবমনের গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। যাকে পুরোপুরি মনে রাখা যায় না, তাকে হয়তো আরও বেশি করে অনুভব করা যায়। ফলে আব্বুর অনুপস্থিতিই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বাস্তব সত্য।
কোথাও না থেকেও সবখানেই আব্বুকে দেখতে পাওয়া—শিশুটির স্মৃতি, কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষার এক মিশ্র প্রতিচ্ছবি। বাস্তবে আব্বু নেই, কিন্তু মানসজগতে তিনি সর্বত্র আছেন—‘সব সময় শুধু আব্বুর মুখোমুখি হই। এ দরজা দিয়ে বেরোনোর সময় আব্বুর সামনে পড়ি। ওই দরজা দিয়ে বেরোনোর সময় আব্বুর সামনে পড়ি। ঘরে ঢোকার সময় সামনে পড়ি। বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়াই।’
যুদ্ধ সব সময় বীরত্বের গল্পের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া জীবনের ইতিহাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। এই উপন্যাসে শিশু বা কিশোরের চোখে দেখা যুদ্ধ গোলাগুলি বা রণকৌশল নয়; হারিয়ে যাওয়া আপনজন, পরিবারের অসহায়ত্ব এবং চিরকালীন শূন্যতা।
কিশোর-উপযোগী করে লেখা হলেও এই উপন্যাসের আবেদন সর্বজনীন। এ তো কেবল একটি যুদ্ধের গল্প নয়—আপনজন হারানোর গল্প, স্মৃতির গল্প, ভালোবাসার গল্প। যারা জীবনে কাউকে হারিয়েছে, অথবা কোনো সময়কে, কোনো স্বপ্নকে—এই উপন্যাসে তারা নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে।
আব্বুর মুখ, কথা বলার ধরন কিংবা চুল আঁচড়ানোর ভঙ্গি মনে করার চেষ্টা করে কিশোর; কিন্তু স্মৃতিগুলো কখনো স্পষ্ট হয়, কখনো ঝাপসা হয়ে যায়। এই অপূর্ণ স্মৃতিই তাকে আরও বেশি করে তাড়িত করে। জীবনের প্রতিটি ছোট্ট ঘটনার মধ্যেই সে খুঁজে ফেরে আব্বুকে।
মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে আব্বুর না-ফেরা কেবল একজন ব্যক্তির অনুপস্থিতি নয়, অসংখ্য মানুষের ত্যাগের প্রতীক। শিশুটির পিতা আমাদের সবার পিতা হয়ে ওঠেন। শিশুটির অনুভূতি আমাদের প্রত্যেকের অনুভূতি হয়ে ওঠে। শিশুটির প্রতিটি অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমরা একাত্ববোধ করি।
আব্বুকে সে খুব বেশি মনে করতে পারে না—কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি, কিছু ভাঙা অনুভূতি ছাড়া কিশোরের কাছে আব্বুর কোনো পূর্ণ অবয়ব নেই। অথচ এই অভাবই তার অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। শৈশবের সরল দৃষ্টিতে সে যুদ্ধকে দেখে ভয়, অনিশ্চয়তা আর আপনজনকে হারানোর অভিজ্ঞতায়।
যুদ্ধের কৌশল বা বীরত্বের জটিল বর্ণনা নেই; আছে আতঙ্কিত দিন, অচেনা পরিবেশ এবং আপনজন হারানোর শূন্যতা। এই নিরীহ দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধের নির্মমতা আরও তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শিশুটি যুদ্ধকে দেখছে ‘ভালো’ আর ‘খারাপ’, ‘সুন্দর’ আর ‘কুৎসিত’—এই সহজ মানদণ্ডে। তার কাছে মিলিটারিরা ‘দৈত্যের চেয়েও খারাপ’, আর আব্বু ও কাকুরা ‘সুন্দর’। উপন্যাস থেকে শিশুটির ভাষ্যে দেখা যাক—
‘মিলিটারিদের সাথে যুদ্ধ চলছে আব্বুদের। কাকুদের। ভয় লাগতো আমার। মিলিটারিরা তো দেখতে দৈত্যের চেয়েও খারাপ। আব্বুরা আর কাকুরা তো দেখতে সুন্দর। এতো খারাপদের সাথে এতো সুন্দরের যুদ্ধ সাজে? এতো খারাপদের সাথে এতো সুন্দর পারে? এতো সুন্দরের সাথে পারে এতো খারাপেরা?’
শিশুটির এই সরল, কিন্তু গভীর প্রশ্নগুলো যুদ্ধের নিষ্ঠুরতাকে আরও তীব্র করে তোলে। এ তো কেবল শিশুর প্রশ্ন নয়, আমাদের সবার প্রশ্ন। আমরা যখন অন্যায় ও সহিংসতার মুখোমুখি হই, তখন আমরাও কি ভাবি না—‘ভালো কি সত্যিই জিততে পারবে?’
হুমায়ুন আজাদ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সংবেদনশীলতা দিয়ে শিশুর বেদনা, একাকিত্ব এবং ভালোবাসাকে এমনভাবে প্রকাশ করেছেন; যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। ছোট ছোট বাক্য, স্মৃতিনির্ভর বর্ণনা এবং শিশুমনের সরল প্রকাশ—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি এক ধরনের নীরব, ধীর গতির আবেগ তৈরি করেছে। উপন্যাসের কলেবর ছোট হলেও, আবেগ ও তাৎপর্যের দিক থেকে পাঠকের মনে গভীর ও স্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করে।
উপন্যাসটিকে লেখক সুসংহত বিন্যাসে নির্মাণ করেছেন। অত্যন্ত সহজ, সংযত ও কাব্যিক ভাষায় কাহিনিকে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন। কাহিনির বিস্তার নয়, বরং অনুভূতির গভীরতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি মুহূর্ত নিখুঁতভাবে প্রতিভাত হয়েছে—যেখানে অল্প কথায় বড় বেদনা, অল্প বর্ণনায় গভীর শূন্যতা ফুটে উঠেছে। ফলে পাঠক কাহিনির বিস্তারে নয়, অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করে; এখানেই উপন্যাসটির তাৎপর্য।
কিশোরের সংবেদনশীলতা আমাদের আবেগতাড়িত করে। দরজার কলিংবেল বাজলেই তার মনে জেগে ওঠে আব্বুর প্রত্যাবর্তনের এক ক্ষীণ আশা। কিন্তু সেই আশা প্রতিবারই ভেঙে পড়ে নীরব বাস্তবতায়। এই প্রতীক্ষা, এই না-ফেরার বেদনা কিশোরের ভেতরে এক গভীর বিষাদের জন্ম দেয়; যা তাকে একদিকে নিঃসঙ্গ করে তোলে, অন্যদিকে মানসিকভাবে পরিণত করে। আরেকবার উপন্যাসের পাতায় চোখ বোলানো যাক—
‘শুধু কড়া নাড়ার শব্দ ওঠে। সকাল থেকে দুপুর থেকে সন্ধ্যা থেকে রাতভর কড়া নাড়ার শব্দ ওঠে। আব্বুর হাতে কড়া নাড়ার শব্দ। গিয়ে দেখি কেউ নেই। আমি চিৎকার ক’রে বলি, আম্মু, এতো কড়া নাড়ার শব্দ দরোজায়। তবু আব্বু আসে না কেনো?’
বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এক অনন্য দলিল ‘আব্বুকে মনে পড়ে’—যেখানে গুলির শব্দ নেই, আছে অন্তহীন প্রতীক্ষা ও শূন্যতা। যুদ্ধ শুধু জীবন কেড়ে নেয় না, মানুষের মানসিক স্থিতিও ভেঙে দেয়। তবে, হারিয়ে যাওয়া মানুষরা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না; তারা ফিরে আসে স্মৃতিতে, কল্পনায়, কড়া নাড়ার শব্দে।
এই উপন্যাসটি যেমন এক ছোট্ট কিশোরের আব্বুকে মনে করিয়ে দেয়, তেমনি নতুন প্রজন্মের পাঠকদের হুমায়ূন আজাদকেও মনে করিয়ে দেয়।