শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

আটলান্টার স্টেডিয়ামে ১৫ জুন যখন কেপ ভার্দে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামল, পুরো ফুটবল দুনিয়ার চোখ ছিল আফ্রিকার সেই ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অভিষেকের দিকে। কিন্তু ঢাকার উত্তরার একটি কারখানার শ্রমিকরা সেদিন আলাদা এক অনুভূতি নিয়ে খেলাটা দেখেছিলেন। কারণ মাঠে দৌড়ানো প্রতিটি খেলোয়াড়ের গায়ে যে জার্সি, সেটা তাদেরই হাতে তৈরি। প্রতিটি জার্সির দাম ছিল আট ডলার।
এই একটি সংখ্যার মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পুরো সমস্যাটা আটকে আছে। বিশ্বকাপের মাঠে যে জার্সি, সেটাই ব্র্যান্ডের ট্যাগ লাগলে হয়ে যায় আশি থেকে এক শ ডলার। পার্থক্যটা কোথায়? একটা লোগোতে। অ্যাডিডাসের, নাইকির বা পুমার। বাংলাদেশের নয়।
বৈশ্বিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটসের হিসাবে ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্সির বৈশ্বিক বাজারের আকার ৮৩৯ কোটি মার্কিন ডলার। এই বাজারে বাংলাদেশের অংশ কত?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩৩টি কারখানা ১৮টি দেশে মোট ২৩ লাখ ৬৫ হাজার পিস পোশাক রপ্তানি করেছে। মূল্য প্রায় ৩৭ লাখ ডলার। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক শিল্পের মোট রপ্তানি পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই বিশাল শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বকাপের জার্সি বাজারে আমাদের উপস্থিতি প্রায় নগণ্য।
তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যাটা সক্ষমতার নয়, প্রযুক্তির। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল জার্সি তো সাধারণ কাপড়ে হয় না। অ্যাডিডাসের ক্লাইমাকুল, নাইকির ড্রাই-ফিট অ্যাডভান্স বা পুমার আল্ট্রাউইভের মতো বিশেষ ফেব্রিক দরকার। ঘাম শোষণ করে, গরমেও শীতল রাখে। এই কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। সেলাইয়ের দক্ষতা আছে, কিন্তু প্রযুক্তির আস্থাটা তৈরি হয়নি। আর সেই আস্থা না থাকলে বড় ব্র্যান্ডগুলো অর্ডার দেবে না।
অ্যাডিডাস সম্প্রতি বিশ্বকাপের পোশাক উৎপাদনকারী ৫৬টি কারখানার তালিকা প্রকাশ করেছে। পনেরোটি দেশের নাম আছে সেখানে। ভারত ও পাকিস্তানের তিনটি করে, কম্বোডিয়ার দশটি, চীনের তেরোটি কারখানা আছে। বাংলাদেশের একটিও নেই।
বাংলাদেশে পুমা, জ্যাকো ও কাপ্পার জন্য পোশাক তৈরি হয়। এই ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বকাপের জার্সিও সরবরাহ করছে। কিন্তু সেই জার্সির কার্যাদেশ বাংলাদেশে আসেনি। কারণ এখনো একটাই, কৃত্রিম তন্তুর উৎপাদনে আস্থার জায়গাটা তৈরি হয়নি। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে অবশ্য ছিলাম আমরা। চট্টগ্রামের দুটি কারখানা অ্যাডিডাসের জন্য ট্রাউজার, টি-শার্ট ও ট্র্যাকস্যুট সরবরাহ করেছিল। মোট প্রায় ৪৩ লাখ ডলারের পোশাক। তারপর থেকে আর এগোয়নি। সেটাই আসল প্রশ্ন।
রপ্তানির বাইরে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও বিশ্বকাপের প্রভাব স্পষ্ট। প্রতি চার বছরে একবার পুরো দেশ যেন একটা অস্থায়ী স্পোর্টস মার্কেটে পরিণত হয়। গুলিস্তান থেকে বসুন্ধরা সিটি, ফুটপাতের ভ্যানগাড়ি থেকে অনলাইন পেজ, সবখানে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জার্সি।
বসুন্ধরার গ্যালাক্সি স্পোর্টসের তথ্য বলছে, বিক্রি হওয়া পোশাকের ৬০ শতাংশই আর্জেন্টিনার জার্সি। ফ্রান্স, জাপান ও জার্মানির জার্সিরও ভালো চাহিদা। বেশিরভাগ ক্রেতার বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
বাংলাদেশ স্পোর্টস এক্সেসরিজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসেবে দেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বার্ষিক বাজার দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। বিশ্বকাপ মৌসুমে এটা কয়েকগুণ বাড়ে।
এবার আরেকটা বিষয় ঘটেছে। চীন থেকে আমদানিতে বিমানবন্দরে দেরি হওয়ায় অনেক আমদানিকারক সমস্যায় পড়েছেন। ফলে দেশীয় কারখানার জার্সি বাজারে জায়গা নিয়েছে। এটা একটা সুযোগ, তবে সাময়িক। চীনা পণ্যের শূন্যতাটা দীর্ঘস্থায়ী না হলে এই সুযোগ হাতছাড়া হবে।
টেলিভিশন বাজারেও একটা ঢেউ উঠেছে। এবারের বিশ্বকাপ ঈদুল আজহার কাছাকাছি হওয়ায় উৎসবের দুটো কারণ একসাথে মিলেছে। শুধু সাধারণ মডেল নয়, ইউএইচডি, কিউলেড ও ওলেড মডেলেও চাহিদা বেড়েছে। ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের হিসেব বলছে, এই মৌসুমে মোট টিভি বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছুঁতে পারে।
রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতেও রাতের ম্যাচ ঘিরে একটা পরিবর্তন চোখে পড়ছে। ধানমন্ডি বা উত্তরার কোনো ক্যাফেতে গেলে দেখা যাচ্ছে বড়পর্দায় খেলা দেখানো এখন একটা ব্যবসায়িক কৌশল হয়ে গেছে। গ্রুপ বুকিং বাড়ছে। রাতে ফুড ডেলিভারির চাহিদাও বেশি। এই খাতের বাড়তি আয় কম নয়।
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে নাটকীয় বিষয়টা ছিল সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপ দেখানোর জন্য দাবি করেছিল প্রায় ১৫১ কোটি টাকা। কর ও ভ্যাট যোগ করলে ২০০ কোটির কাছাকাছি। বিটিভির সারা বছরের বাজেটই ৩০০ কোটি টাকা। সেখানে এই দাবি মানা সম্ভব ছিল না।
শেষ পর্যন্ত বিটিভি, সময় টেলিভিশন ও টি-স্পোর্টস মিলে সরাসরি ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কিনেছে। চুক্তিমূল্য ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার, ভ্যাট ও আয়করসহ মোট প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। মধ্যস্বত্বভোগীর দাবির তুলনায় ৮৮ কোটি টাকা বাঁচানো গেছে।
এটা কি ছোট বিষয়? একদমই নয়। এই সিদ্ধান্তটা একটা নজির তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক যেকোনো সম্প্রচার চুক্তিতে মধ্যস্বত্বভোগী এড়িয়ে সরাসরি আলোচনা করলে কতটা সাশ্রয় সম্ভব, সেটা এবার বাস্তবে প্রমাণ হয়েছে। বিজ্ঞাপন ও সাব-লাইসেন্স বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগের টাকা উঠে আসার দাবিও করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান। গ্রামীণফোনের বায়োস্কোপ, বাংলালিংকের টফি ও মাই রবি অ্যাপে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ চালু হয়েছে। এটা টেলিকম খাতের জন্য একটা নতুন আয়ের মডেলের পরীক্ষা। ভবিষ্যতে এই মডেল আরও শক্তিশালী হবে।
সব যোগ করলে কত দাঁড়ায়? জার্সি ও ফ্যান পোশাক রপ্তানি থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। টিভি বাজারে সম্ভাব্য এক হাজার কোটি। ক্রীড়াসামগ্রীর দেশীয় বাজার দুই হাজার কোটি। ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন ও বিজ্ঞাপন রাজস্ব। রেস্তোরাঁ ও খাদ্য খাতের বাড়তি আয়। মোট পাঁচ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি যেতে পারে।
সংখ্যাটা শুনতে বড়। কিন্তু ফিফার মোট রাজস্বের প্রক্ষেপণ এগারো হাজার কোটি ডলারের পাশে রাখলে এই পাঁচ হাজার কোটি টাকা সত্যিই সামান্য। বৈশ্বিক বিশ্বকাপ অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশ কার্যত এক শতাংশেরও নিচে।
সমস্যাটা শুধু পোশাক শিল্পের নয়। পুরো কাঠামোটাই এমনভাবে তৈরি যে আমরা উৎপাদন করি, অন্যরা ব্র্যান্ড করে বেচে। মূল্য শৃঙ্খলের সবচেয়ে নিচের তলায় আমাদের অবস্থান। সেখান থেকে উঠতে হলে শুধু সেলাইয়ের দক্ষতা দিয়ে হবে না।
২০৩০ বিশ্বকাপ আসতে আর চার বছর। এই সময়ের মধ্যে কৃত্রিম তন্তু ও টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যারে বিনিয়োগ না বাড়ালে অফিশিয়াল জার্সির সরবরাহশৃঙ্খলে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। ফাতুল্লাহ অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যেটা বলেছেন সেটা ঠিকই আছে, ম্যানমেইড ফাইবারের বাজার বাড়ছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের জন্য কোনো জাতীয় পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়।
সম্প্রচার স্বত্বে এবার যে সরাসরি আলোচনার নজির তৈরি হয়েছে, সেই মানসিকতাটা পোশাক রপ্তানিতেও দরকার। বড় ব্র্যান্ডের সাথে সরাসরি অংশীদারিত্বের সুযোগ খোঁজা দরকার, মধ্যস্বত্বভোগীর উপর নির্ভরতা কমিয়ে।
চীনা পণ্যের অনুপস্থিতিতে এবার দেশীয় জার্সি বাজারে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটাকে স্থায়ী করতে হলে মানের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একটা বিশ্বকাপের সুবাদে অস্থায়ীভাবে বাজার পেলে সেটা টেকসই হয় না।
কেপ ভার্দের জার্সিতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ছিল। এটা ছোট করে দেখার কিছু নেই, কিন্তু এখানেই থেমে থাকলেও চলবে না। সেই লেবেলের পেছনে যে সম্ভাবনা আছে, সেটা আট ডলারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যের। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সিদ্ধান্তটা এখনই নিতে হবে। ২০৩০ আসার আগেই।

আটলান্টার স্টেডিয়ামে ১৫ জুন যখন কেপ ভার্দে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামল, পুরো ফুটবল দুনিয়ার চোখ ছিল আফ্রিকার সেই ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অভিষেকের দিকে। কিন্তু ঢাকার উত্তরার একটি কারখানার শ্রমিকরা সেদিন আলাদা এক অনুভূতি নিয়ে খেলাটা দেখেছিলেন। কারণ মাঠে দৌড়ানো প্রতিটি খেলোয়াড়ের গায়ে যে জার্সি, সেটা তাদেরই হাতে তৈরি। প্রতিটি জার্সির দাম ছিল আট ডলার।
এই একটি সংখ্যার মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পুরো সমস্যাটা আটকে আছে। বিশ্বকাপের মাঠে যে জার্সি, সেটাই ব্র্যান্ডের ট্যাগ লাগলে হয়ে যায় আশি থেকে এক শ ডলার। পার্থক্যটা কোথায়? একটা লোগোতে। অ্যাডিডাসের, নাইকির বা পুমার। বাংলাদেশের নয়।
বৈশ্বিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটসের হিসাবে ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্সির বৈশ্বিক বাজারের আকার ৮৩৯ কোটি মার্কিন ডলার। এই বাজারে বাংলাদেশের অংশ কত?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩৩টি কারখানা ১৮টি দেশে মোট ২৩ লাখ ৬৫ হাজার পিস পোশাক রপ্তানি করেছে। মূল্য প্রায় ৩৭ লাখ ডলার। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক শিল্পের মোট রপ্তানি পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই বিশাল শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বকাপের জার্সি বাজারে আমাদের উপস্থিতি প্রায় নগণ্য।
তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যাটা সক্ষমতার নয়, প্রযুক্তির। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল জার্সি তো সাধারণ কাপড়ে হয় না। অ্যাডিডাসের ক্লাইমাকুল, নাইকির ড্রাই-ফিট অ্যাডভান্স বা পুমার আল্ট্রাউইভের মতো বিশেষ ফেব্রিক দরকার। ঘাম শোষণ করে, গরমেও শীতল রাখে। এই কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। সেলাইয়ের দক্ষতা আছে, কিন্তু প্রযুক্তির আস্থাটা তৈরি হয়নি। আর সেই আস্থা না থাকলে বড় ব্র্যান্ডগুলো অর্ডার দেবে না।
অ্যাডিডাস সম্প্রতি বিশ্বকাপের পোশাক উৎপাদনকারী ৫৬টি কারখানার তালিকা প্রকাশ করেছে। পনেরোটি দেশের নাম আছে সেখানে। ভারত ও পাকিস্তানের তিনটি করে, কম্বোডিয়ার দশটি, চীনের তেরোটি কারখানা আছে। বাংলাদেশের একটিও নেই।
বাংলাদেশে পুমা, জ্যাকো ও কাপ্পার জন্য পোশাক তৈরি হয়। এই ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বকাপের জার্সিও সরবরাহ করছে। কিন্তু সেই জার্সির কার্যাদেশ বাংলাদেশে আসেনি। কারণ এখনো একটাই, কৃত্রিম তন্তুর উৎপাদনে আস্থার জায়গাটা তৈরি হয়নি। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে অবশ্য ছিলাম আমরা। চট্টগ্রামের দুটি কারখানা অ্যাডিডাসের জন্য ট্রাউজার, টি-শার্ট ও ট্র্যাকস্যুট সরবরাহ করেছিল। মোট প্রায় ৪৩ লাখ ডলারের পোশাক। তারপর থেকে আর এগোয়নি। সেটাই আসল প্রশ্ন।
রপ্তানির বাইরে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও বিশ্বকাপের প্রভাব স্পষ্ট। প্রতি চার বছরে একবার পুরো দেশ যেন একটা অস্থায়ী স্পোর্টস মার্কেটে পরিণত হয়। গুলিস্তান থেকে বসুন্ধরা সিটি, ফুটপাতের ভ্যানগাড়ি থেকে অনলাইন পেজ, সবখানে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জার্সি।
বসুন্ধরার গ্যালাক্সি স্পোর্টসের তথ্য বলছে, বিক্রি হওয়া পোশাকের ৬০ শতাংশই আর্জেন্টিনার জার্সি। ফ্রান্স, জাপান ও জার্মানির জার্সিরও ভালো চাহিদা। বেশিরভাগ ক্রেতার বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
বাংলাদেশ স্পোর্টস এক্সেসরিজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসেবে দেশের ক্রীড়াসামগ্রীর বার্ষিক বাজার দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। বিশ্বকাপ মৌসুমে এটা কয়েকগুণ বাড়ে।
এবার আরেকটা বিষয় ঘটেছে। চীন থেকে আমদানিতে বিমানবন্দরে দেরি হওয়ায় অনেক আমদানিকারক সমস্যায় পড়েছেন। ফলে দেশীয় কারখানার জার্সি বাজারে জায়গা নিয়েছে। এটা একটা সুযোগ, তবে সাময়িক। চীনা পণ্যের শূন্যতাটা দীর্ঘস্থায়ী না হলে এই সুযোগ হাতছাড়া হবে।
টেলিভিশন বাজারেও একটা ঢেউ উঠেছে। এবারের বিশ্বকাপ ঈদুল আজহার কাছাকাছি হওয়ায় উৎসবের দুটো কারণ একসাথে মিলেছে। শুধু সাধারণ মডেল নয়, ইউএইচডি, কিউলেড ও ওলেড মডেলেও চাহিদা বেড়েছে। ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের হিসেব বলছে, এই মৌসুমে মোট টিভি বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছুঁতে পারে।
রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতেও রাতের ম্যাচ ঘিরে একটা পরিবর্তন চোখে পড়ছে। ধানমন্ডি বা উত্তরার কোনো ক্যাফেতে গেলে দেখা যাচ্ছে বড়পর্দায় খেলা দেখানো এখন একটা ব্যবসায়িক কৌশল হয়ে গেছে। গ্রুপ বুকিং বাড়ছে। রাতে ফুড ডেলিভারির চাহিদাও বেশি। এই খাতের বাড়তি আয় কম নয়।
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে নাটকীয় বিষয়টা ছিল সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপ দেখানোর জন্য দাবি করেছিল প্রায় ১৫১ কোটি টাকা। কর ও ভ্যাট যোগ করলে ২০০ কোটির কাছাকাছি। বিটিভির সারা বছরের বাজেটই ৩০০ কোটি টাকা। সেখানে এই দাবি মানা সম্ভব ছিল না।
শেষ পর্যন্ত বিটিভি, সময় টেলিভিশন ও টি-স্পোর্টস মিলে সরাসরি ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কিনেছে। চুক্তিমূল্য ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার, ভ্যাট ও আয়করসহ মোট প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। মধ্যস্বত্বভোগীর দাবির তুলনায় ৮৮ কোটি টাকা বাঁচানো গেছে।
এটা কি ছোট বিষয়? একদমই নয়। এই সিদ্ধান্তটা একটা নজির তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক যেকোনো সম্প্রচার চুক্তিতে মধ্যস্বত্বভোগী এড়িয়ে সরাসরি আলোচনা করলে কতটা সাশ্রয় সম্ভব, সেটা এবার বাস্তবে প্রমাণ হয়েছে। বিজ্ঞাপন ও সাব-লাইসেন্স বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগের টাকা উঠে আসার দাবিও করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান। গ্রামীণফোনের বায়োস্কোপ, বাংলালিংকের টফি ও মাই রবি অ্যাপে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ চালু হয়েছে। এটা টেলিকম খাতের জন্য একটা নতুন আয়ের মডেলের পরীক্ষা। ভবিষ্যতে এই মডেল আরও শক্তিশালী হবে।
সব যোগ করলে কত দাঁড়ায়? জার্সি ও ফ্যান পোশাক রপ্তানি থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। টিভি বাজারে সম্ভাব্য এক হাজার কোটি। ক্রীড়াসামগ্রীর দেশীয় বাজার দুই হাজার কোটি। ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন ও বিজ্ঞাপন রাজস্ব। রেস্তোরাঁ ও খাদ্য খাতের বাড়তি আয়। মোট পাঁচ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি যেতে পারে।
সংখ্যাটা শুনতে বড়। কিন্তু ফিফার মোট রাজস্বের প্রক্ষেপণ এগারো হাজার কোটি ডলারের পাশে রাখলে এই পাঁচ হাজার কোটি টাকা সত্যিই সামান্য। বৈশ্বিক বিশ্বকাপ অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশ কার্যত এক শতাংশেরও নিচে।
সমস্যাটা শুধু পোশাক শিল্পের নয়। পুরো কাঠামোটাই এমনভাবে তৈরি যে আমরা উৎপাদন করি, অন্যরা ব্র্যান্ড করে বেচে। মূল্য শৃঙ্খলের সবচেয়ে নিচের তলায় আমাদের অবস্থান। সেখান থেকে উঠতে হলে শুধু সেলাইয়ের দক্ষতা দিয়ে হবে না।
২০৩০ বিশ্বকাপ আসতে আর চার বছর। এই সময়ের মধ্যে কৃত্রিম তন্তু ও টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যারে বিনিয়োগ না বাড়ালে অফিশিয়াল জার্সির সরবরাহশৃঙ্খলে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। ফাতুল্লাহ অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যেটা বলেছেন সেটা ঠিকই আছে, ম্যানমেইড ফাইবারের বাজার বাড়ছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের জন্য কোনো জাতীয় পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়।
সম্প্রচার স্বত্বে এবার যে সরাসরি আলোচনার নজির তৈরি হয়েছে, সেই মানসিকতাটা পোশাক রপ্তানিতেও দরকার। বড় ব্র্যান্ডের সাথে সরাসরি অংশীদারিত্বের সুযোগ খোঁজা দরকার, মধ্যস্বত্বভোগীর উপর নির্ভরতা কমিয়ে।
চীনা পণ্যের অনুপস্থিতিতে এবার দেশীয় জার্সি বাজারে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটাকে স্থায়ী করতে হলে মানের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একটা বিশ্বকাপের সুবাদে অস্থায়ীভাবে বাজার পেলে সেটা টেকসই হয় না।
কেপ ভার্দের জার্সিতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ছিল। এটা ছোট করে দেখার কিছু নেই, কিন্তু এখানেই থেমে থাকলেও চলবে না। সেই লেবেলের পেছনে যে সম্ভাবনা আছে, সেটা আট ডলারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যের। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সিদ্ধান্তটা এখনই নিতে হবে। ২০৩০ আসার আগেই।
.png)

বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের ইতিহাসে কিছু অঞ্চল বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র যেমন দেশের খাদ্য উৎপাদনের নতুন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তেমনি মধ্যাঞ্চলের মধুপুর গড় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফল উৎপাদন, পুষ্টি নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম জাতীয়
১৭ মিনিট আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর শেষে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন। মালয়েশিয়া সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা প্রতিক্রিয়া না থাকলেও চীন সফর নিয়ে দেশে এবং দেশের বাহিরে নানান জল্পনা-কল্পনা বিদ্যমান রয়েছে। এ সফর শুধু ‘সমর্থন’ ও ‘সমালোচনা’—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা সমীচীন হবে না।
১ ঘণ্টা আগে
বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরুর খবরে বিশেষত জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল হতে শুরু করায় এর আমদানিকারক হিসেবে বাংলাদেশও স্বস্তি বোধ করছে। ‘বাংলার জয়যাত্রা’ নামের জাহাজটি হরমুজ অতিক্রমের খবর উৎসাহের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। জাহাজটি অবশ্য স
১৫ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে এবার গভীর সমুদ্রের নীল জলরাশি। দীর্ঘদিনের পরিচিত হিমালয়ের উপত্যকা কিংবা কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখার আকাশসীমাকে ছাপিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সামরিক প্রতিযোগিতার মূল থিয়েটার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর।
১৯ ঘণ্টা আগে