
পবিত্র গঙ্গার জলধারাকে স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন মির্জা গালিব। কিন্তু আজ বেঁচে থাকলে তাঁকে হয়তো গঙ্গার ওপরে কবিতা লিখতেই দেওয়া হতো না। কারণ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, গঙ্গা কেবলমাত্র হিন্দুদেরই নদী, কেবল একটি সম্প্রদায়েরই উপাস্য দেবী।
পশ্চিমবঙ্গে আমরা হয়তো অনেকেই খেয়াল করিনি মাত্র কিছুদিন আগে কী হয়েছে বেনারসে। পুলিশ ১৪ জন মুসলিম যুবককে গ্রেপ্তার করেছেন, কারণ তারা গঙ্গায় নৌকো ভ্রমণ করতে করতে ইফতার সেরেছিল। সেই ইফতারের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরেই ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যুব মোর্চার বেনারস শাখার সভাপতি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ধর্মীয় স্থান অপবিত্র করার অভিযোগ থেকে শুরু করে জলদূষণ, আমিষ খাবার গ্রহণ এবং খাবারের অবশিষ্টাংশ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। পরে যুক্ত করা হয় চাঁদাবাজির অভিযোগও। পুলিশ অত্যন্ত দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে। বারাণসীর আদালত অতি দ্রুত এদের জামিন না দিয়ে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠায়। অনেকেই ইতিমধ্যেই বলেছেন যে, গঙ্গায় একটি সাধারণ নৌকা বিহারকেই অপরাধ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে এবং সারবত্তাহীন কয়েকটি অভিযোগকে জোর করে সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে।
এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, গঙ্গা হিন্দুদের কাছে একটি অত্যন্ত পবিত্র নদী। কিন্তু একইসঙ্গে গঙ্গা সব ভারতবাসীরও। কেবল একটি সম্প্রদায় এই নদীর ওপর অধিকার কায়েম করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত পুরাণ তো পুরাণই। ভূগোল এবং বিজ্ঞান কিন্তু বলছে যে, প্রায় ২,৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা নদীতে গড়ে প্রায় ৫২৫ কিউবিক মিটার জল প্রবাহিত হয়। বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও তুষারপাত থেকে উৎপন্ন জল মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত অববাহিকা থেকে এই জলধারা গঙ্গায় এসে মিশে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত পৌঁছায়।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে এই নদীকে বহন করতে হয় বিপুলমাত্রার দূষণ। গঙ্গার তীরে অবস্থিত ২৯টি প্রথম শ্রেণির শহর (যেখানে জনসংখ্যা এক লাখ বা তার বেশি), ২৩টি দ্বিতীয় শ্রেণির শহর (জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ) এবং আরও ৪৮টি শহরাঞ্চল (জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার বা তার কাছাকাছি) থেকে নির্গত দূষিত জল সরাসরি গঙ্গায় এসে পড়ে। প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মানুষের বসবাস গঙ্গার দুই তীর জুড়ে—নগর, গ্রাম, জনপদ, শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে বিপুল এই জনবসতির দৈনন্দিন বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের জলও নিরবচ্ছিন্নভাবে নদীতে মিশে চলেছে। এর পাশাপাশি শ্মশানঘাটে দাহক্রিয়ার পর অবশিষ্ট দেহাবশেষ, মৃত পশুপাখির দেহ, উৎসবের সময়ে প্রতিমা নিরঞ্জন এবং ব্যবহৃত ফুলও গঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হয়।
এই সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিকজাত বর্জ্যের ক্রমবর্ধমান সঞ্চয়। বহু পৌরসভা গঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় এই বর্জ্য ফেলে রাখে, যা বর্ষাকালে বৃষ্টির জলে ভেসে গিয়ে শেষ পর্যন্ত গঙ্গার স্রোতেই মিশে যায়।
বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত একাধিক সমীক্ষার তথ্য থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, গঙ্গা দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী মানুষের উৎপন্ন বর্জ্য—মোট দূষণের প্রায় ৮০ শতাংশ এর থেকেই সৃষ্টি। বাকি অংশের জন্য দায়ী শিল্পকারখানার বর্জ্য, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, বিভিন্ন কঠিন বর্জ্য, এবং নদীতে ভেসে আসা মানুষ ও পশুপাখির মৃতদেহ। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার অবস্থা তো ভয়াবহ।
একটি সমীক্ষা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার জলে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই জলে মানবমলের উপস্থিতির মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০০ মিলিলিটার জলে ১,০০০-এর বেশি কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া থাকলে তা আর নিরাপদ বলে গণ্য হয় না।
প্রশ্ন হলো, গঙ্গা দূষণের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নিয়েছে দেশের কেন্দ্র সরকার? নমামি গঙ্গা প্রজেক্ট চলেছে রমরম করে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রশ্ন ওঠে, খাবারের অবশিষ্টাংশ নদীতে ফেলে দেওয়া যদি অপরাধ হয়, তাহলে নদীতে দাহক্রিয়ার পর অবশিষ্ট দেহাবশেষ ফেলে দেওয়া কিংবা প্রতিমা বিসর্জনই বা অপরাধ হবে না কেন? প্রতিমার কাঠামো এবং সাজসরঞ্জাম গঙ্গা থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হলেও প্রতিমার গায়ের রং মিশে গঙ্গার জলের যে-ক্ষতি হয়, তা অপরিমেয়। মানুষের দেহাবশেষও গঙ্গার ক্ষতি করে বিস্তর।
গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করা এবং তার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার দাবিতে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও আইআইটি কানপুরের প্রাক্তন অধ্যাপক জি. ডি. আগরওয়াল, যিনি সন্ন্যাস গ্রহণের পর স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ নামে পরিচিত হন। তাঁর দাবিগুলি নিয়ে তিনি টানা ১১১ দিন অনশন চালিয়ে যান। অবশেষে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর, ৮৬ বছর বয়সে, হরিদ্বারে অনশনরত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে ঋষিকেশের এইমসে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। গঙ্গা বাঁচাতে একজন সন্ন্যাসীর অনশন নিয়েও কিন্তু কেন্দ্র সরকারের কোনো হেলদোল ছিল না। মোদ্দা কথাটি হলো, গঙ্গার বুকে কয়েকজন মুসলিম যুবক ইফতার সারায় প্রশাসন যতখানি তৎপর হয়ে উঠেছে তার কণামাত্র তৎপরতা অন্যান্য ঘটনায় দেখালে আজ গঙ্গার দূষণ এমন মাত্রাছাড়া জায়গায় গিয়ে পৌঁছাত না।
ঘটনাটি ঘটেছে বেনারস শহরে। কোন বেনারস? যে-বেনারস চিরকাল বহু ধর্মের, বহু জাতির মানুষের মিলন ক্ষেত্র হয়ে থেকেছে। শান্তির খোঁজে এই বেনারসেই একসময়ে এসে হাজির হয়েছিলেন মির্জা গালিব। বেনারসকে তিনি বলেছিলেন ‘হিন্দুদের কাবা’। শত প্রলোভন সত্ত্বেও ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান কখনও বেনারস ছাড়া আর অন্য কোনো শহরকে তাঁর স্থায়ী বাসভূমি বলে ভাবতেই পারেননি। সেই বেনারস শহরেই যদি গঙ্গার অতীত ঐতিহ্যকে ভুলে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের সঙ্গেই কেবল এই নদীটিকে যুক্ত করা হয় তাহলে তা কেবল ভারতীয় সংস্কৃতির ঔদার্যের বিরুদ্ধেই এক সংকীর্ণ অবস্থান নেয় না, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির সঙ্গে গঙ্গাকে যুক্ত করার এক হীন অপচেষ্টাকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
তাই ভারতীয় সংস্কৃতি, বেনারস এবং গঙ্গার ঐতিহ্যকে প্রকৃত সম্মান জানাতে মানবাধিকার সংগঠন গুলির উচিত যে-মুসলিম যুবকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের মুক্তির দাবিতে উপযুক্ত আন্দোলন গড়ে তোলা।
মতামত লেখকের নিজস্ব
.png)

পুরাকালে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির এক মহাদুর্যোগপূর্ণ রাতে যমুনার দুই পাড়ে জন্ম নেয় দুই ভিন্ন মায়ের দুই সন্তান—কৃষ্ণ ও যোগমায়া। মথুরার কারাগারে দেবকীর কোলে শ্রীকৃষ্ণ, আর ওপারে গোকুলে যশোদার ঘরে যোগমায়া। আজ তাঁদের জন্মদিন।
২০ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর ধারণায় আবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান। তাই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে আলোচিত– বাংলাদেশে
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বায়োগ্যাস প্লান্ট—বর্জ্যকে প্রথমে শক্তিতে এবং শেষ পর্যন্ত খাবারে রূপান্তর করার এক অসাধারণ প্রক্রিয়া। একইসঙ্গে এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মৎস্য চাষ, প্রাণিসম্পদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে এক সুতোয় গেঁথেছে।
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে। আর সেখানেই নতুন অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—যা বেতন বৃদ্ধির দুর্নীতিবিরোধী যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে দিতে পারে।
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬