ড. মো. আবু সালেহ

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ভূ-অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি বর্তমানে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং এর সঙ্গে ভূখণ্ডগত ও কৌশলগতভাবে সংযুক্ত বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২৩ থেকে ২৬ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই সফরে চীনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (বিএমসিইসি) এর প্রস্তাব। বেইজিং এই ত্রিপক্ষীয় করিডোরকে তাদের বহুল আলোচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এর একটি অন্যতম উপ-আঞ্চলিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী।
এই করিডোরটি মূলত পূর্বে প্রস্তাবিত চারদেশীয় ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার’ (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের একটি পরিবর্তিত ও পুনর্গঠিত রূপ। ভারতের কৌশলগত অনীহা এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্প থেকে দিল্লির দূরত্ব বজায় রাখার নীতির কারণে (বিসিআইএম) করিডোরটি স্থবির হয়ে পড়েছিল। এর প্রেক্ষিতে বেইজিং ভারতকে বাদ দিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় “বিএমসিইসি” ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে, যা ২০২৬ সালের জুন মাসে তারেক রহমানের বেইজিং সফরে আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা হিসেবে গতি পায়।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (বিএমসিইসি) একটি বহুমুখী ও সমন্বিত অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক। এর মূল ভূ-অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড প্রদেশ কুনমিং থেকে শুরু করে মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত একটি ‘মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্টেশন নেটওয়ার্ক’ (সড়ক, রেল ও পাইপলাইন সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা) গড়ে তোলা।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোর ধারণক্ষমতা এবং আধুনিকায়নে বিনিয়োগের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে তার নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। এখানে অ-সামরিক উপাদান হিসেবে বাণিজ্য নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা হলো তার জ্বালানি আমদানির রুট। চীনের রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের পরিভাষায় এটি ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে পরিচিত। বর্তমানে চীনের আমদানিকৃত অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সংবেদনশীল মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছায়।
ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কোনো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক যুদ্ধ বা দক্ষিণ চীন সাগরে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত তৈরি হলে, শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলো এই মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এমনটা ঘটলে চীনের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়বে।
এই ‘মালাক্কা ডিলেমা’ থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়ার জন্য চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে সরাসরি এবং বিকল্প প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। প্রস্তাবিত (বিএমসিইসি) করিডোরটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড প্রদেশ কুনমিংকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এর ফলে চীন মালাক্কা প্রণালি সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় প্রবেশ করতে পারবে। এটি মিয়ানমারের রাখাইনে অবস্থিত চীনের অর্থায়নে নির্মিত কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সেখান থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করবে।
চীনের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, যা বেইজিংয়ের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই করিডোরের প্রয়োজনীয়তা কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ করবে, তখন দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশ কিছু শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে হবে। এই উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণ এবং সরাসরি আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপন করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশ হলো দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার একটি স্বাভাবিক ‘ভৌগোলিক সেতু’।
করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে এই ভৌগোলিক অবস্থানের প্রকৃত অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। বাংলাদেশ কেবল একটি দেশ হিসেবে নয়, বরং এই অঞ্চলের প্রধান ‘কানেক্টিভিটি ও লজিস্টিকস হাব’ হিসেবে আবির্ভূত হবে। এই করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য সরাসরি চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আসিয়ান ভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবে। এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের বাইরে চামড়া, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর এবং নবনির্মিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর-এর বাণিজ্যিক উপযোগিতা এই করিডোরের মাধ্যমে বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত হবে। চীন ও মিয়ানমারের বিশাল ট্রানজিট কার্গো হ্যান্ডলিং করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বার্ষিক বিলিয়ন ডলারের ট্রানজিট ও লজিস্টিকস রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন চালিকাশক্তি যোগ করবে।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের (বিএমসিইসি) এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। ২০১৭ সালের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পর থেকে প্রায় ১২ লক্ষাধিক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপের মুখোমুখি হয়েছে, তার একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এই ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডোরকে কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক রুট বা পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ না করে; বরং এটিকে দীর্ঘস্থায়ী রাখাইন সংকট সমাধানের একটি অন্যতম বড় কূটনৈতিক লিভারেজ বা দরকষাকষির কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিক অবকাশ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ফোকাসই থাকে রাখাইন রাজ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা। যদিও সার্বভৌম ও কূটনৈতিক প্রোটোকল অনুযায়ী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের প্রাতিষ্ঠানিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের (জান্তা প্রশাসন) সাথেই সব ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা, চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ পরিচালনা করে আসছে। তবে রাখাইনের বর্তমান মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতাটি প্রথাগত কূটনৈতিক কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ ভূখণ্ডের ওপর জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রায় বিলুপ্ত এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি' সেখানে একটি কার্যকর বেসামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই পরিবর্তিত যুদ্ধকালীন বাস্তবতায়, রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে চীনের অনানুষ্ঠানিক ও পর্দার অন্তরালের মধ্যস্থতা এবং রাখাইনের সব অভ্যন্তরীণ প্রধান অংশীজনদের মধ্যে একটি পরোক্ষ ও বাস্তবসম্মত বোঝাপড়া তৈরি হওয়া অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হতে হবে। বাংলাদেশ বেইজিংকে এটি অনুধাবন করাতে হবে যে, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা এবং টেকসই মানবিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ব্যতিরেকে সেখানে চীনের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা কখনোই চিরস্থায়ী হবে না। যুদ্ধাবস্থা বজায় থাকলে যেকোনো পরিকাঠামোই সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। সুতরাং, চীনের নিজস্ব ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থেই রাখাইন সংকটের একটি টেকসই রাজনৈতিক মীমাংসা প্রয়োজন, যার মূল স্তম্ভ হতে হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও নাগরিক অধিকারসংবলিত পুনর্বাসন।
যদি এই অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনা বা রোডম্যাপের সাথে রাখাইনের স্থানীয় নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক মানবিক নজরদারি এবং রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের বিষয়টি শর্তযুক্ত ও ইতিবাচকভাবে সংযুক্ত করা যায়, তবেই কেবল এই ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডোর একটি প্রকৃত 'উইন-উইন' বা সবার জন্য সমান্তরাল লাভজনক মডেলে রূপান্তর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। অন্যথায়, মাঠপর্যায়ের মানবিক সংকটকে উপেক্ষা করে কেবল পরিকাঠামো খাড়া করার প্রয়াস এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (বিএমসিইসি) এর মতো একটি মেগা-আঞ্চলিক পরিকাঠামো প্রকল্প কেবল সাধারণ বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে তিন দেশের জাতীয় অর্থনীতি, ভূ-কৌশল এবং সার্বভৌম নিরাপত্তার সুরক্ষাকে স্পর্শ করে। এই করিডোরটি প্রতিটি দেশের জন্য যেমন বিপুল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনি এর বিপরীতে তৈরি করতে পারে সম্ভাব্য গভীর কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঝুঁকি।
বাংলাদেশের জন্য প্রধান লাভ হলো এটি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ‘কানেক্টিভিটি হাব’-এ রূপান্তর করবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার "প্রাকৃতিক সেতু" বলা হলেও, এই করিডোরটি সেই ধারণার প্রথম বাস্তব ও বাণিজ্যিক রূপ দেবে। বাংলাদেশ একাধারে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ল্যান্ডলকড চীন এবং আসিয়ান অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে পরিণত হবে। চীন ও মিয়ানমারের বিশাল পরিমাণের কার্গো ও বাণিজ্যিক ট্রানজিট বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পরিবহনের ফলে ট্রানজিট ফি, পোর্ট হ্যান্ডলিং চার্জ, গুদামজাতকরণ এবং লজিস্টিকস খাত থেকে দেশীয় অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হবে। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের উপযোগিতা বৈশ্বিক মানে উন্নীত হবে।
এই করিডোর দেশীয় শিল্প খাতের জন্য, বিশেষ করে ওষুধ, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে কম খরচে এবং দ্রুততম সময়ে কাঁচামাল আমদানির পথ সুগম করবে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নতুন করে চীনা ও আন্তর্জাতিক যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে, যা আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতাকে অনেক শক্তিশালী করবে।
তবে এর বিপরীত দিকে সম্ভাব্য বড় ঝুঁকি হলো চীনের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এমনিতেই বেইজিংয়ের দিকে ব্যাপক ঝুঁকে রয়েছে। করিডোর খোলার ফলে যদি চীনা পণ্যের একমুখী প্রবাহ তৈরি হয়, তবে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে এবং বাণিজ্য ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে। মেগা প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চীন থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড এবং পরিশোধের শর্তাবলি যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা না যায়, তবে ২০২৬ পরবর্তী বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে তা বড় ধরনের তারল্য সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের মূল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত তার উপকূলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে সীমাবদ্ধ। এই করিডোরের মাধ্যমে চীনের ল্যান্ডলকড এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে। চীনের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-কৌশলগত লাভ হলো মার্কিন বলয়ের কৌশলগত চাপ উপেক্ষা করে ভারত মহাসাগরে নিজের অর্থনৈতিক ও লজিস্টিকস উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এটি বেইজিংয়ের সামগ্রিক এশীয় বাণিজ্যের স্থায়িত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এছাড়া মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চীনের অভ্যন্তরে নির্মিত জ্বালানি পাইপলাইনগুলোর সর্বোত্তম বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই ত্রিপক্ষীয় সংযোগটি চীনের জন্য নিখুঁত অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
অন্যদিকে, চীনের জন্য বড় ঝুঁকি হলো মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং রাখাইনের চরম অস্থিতিশীলতার কারণে এই করিডোরে চীনের করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ভৌত পরিকাঠামো যেকোনো সময় নাশকতার শিকার বা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
মিয়ানমারের জন্য লাভ হলো চলমান অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে উত্তরণ। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং চরম গৃহযুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের জাতীয় অর্থনীতি বর্তমানে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। এই করিডোরটি মিয়ানমারের জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মূল ধারায় পুনরায় যুক্ত হওয়ার একমাত্র লাইফলাইন হতে পারে। চীনের অর্থায়নে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল ও রাখাইনে যে নতুন রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে, তা যুদ্ধবিধ্বস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটাবে।
মিয়ানমারের জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অর্থনৈতিকভাবে বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত বা একক নির্ভরশীলতা ।
এর ফলে নেপিডোর নীতি-নির্ধারণী স্বাধীনতা খর্ব হতে পারে এবং দেশটি চীনের একটি অর্থনৈতিক উপ-রাজ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। রাখাইন অঞ্চলের ওপর দিয়ে এই করিডোর যাওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও শিথিল হতে পারে। কারণ, এই পরিকাঠামো থেকে উৎপন্ন রাজস্ব ও লজিস্টিকস ক্ষমতার হিস্যা নিয়ে জান্তা সরকার এবং রাখাইনের ডি ফ্যাক্টো নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মি এর মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সংঘাত ও আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই নতুন মাত্রা রূপ নিতে পারে, যা মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাকে দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এই করিডোর পরিকল্পনা কেবল তিনটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের লড়াইয়ের ক্ষেত্র। নয়াদিল্লি এই অঞ্চলে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা মুক্তা মালার নীতি নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত। ভারতের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ হলো, এই করিডোরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চীনের একচ্ছত্র সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য তৈরি হতে পারে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করবে। ভারত এই ত্রিপক্ষীয় করিডোরকে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) এর মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব প্রতিহত করা। ওয়াশিংটন এই অর্থনৈতিক করিডোরকে বেইজিংয়ের ভূ-অর্থনৈতিক সম্প্রসারণবাদ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকে ঋণের জালে জড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখতে পারে। বিবিসি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলসীমায় চীনের এই প্রবেশাধিকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর বিপরীতে মিত্রদের নিয়ে পাল্টা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা জোট শক্তিশালী করছে।
এই তীব্র ত্রিভুজাকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেইজিং, নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। কোনো একটি পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি মস্ত বড় পরীক্ষা। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ রক্ষা করা।
বাংলাদেশ কীভাবে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ অক্ষুণ্ন রেখে এবং ২০২৬-এ ব্রিকস প্লাস (বিআরআইসিএস+) জোটে জোরালো অংশীদারত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে উভয় সংকট সামাল দিতে পারে, তার জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। সেগুলো হলো; বাংলাদেশকে চীনকে স্পষ্ট বোঝাতে হবে যে, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ছাড়া (বিএমসিইসি) এর অর্থনৈতিক করিডোর সফল করা অসম্ভব।
আর তাই, চীনকে অবশ্যই রাখাইনের স্থিতিশীলতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। চীনের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। ঋণের শর্তাবলী, সুদের হার এবং পরিশোধের সময়সীমা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে যাতে কোনোভাবেই ঋণ-ফাঁদের ঝুঁকি তৈরি না হয়। এই করিডোরে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে, যাতে কোনো একটি ব্লকের ওপর একক নির্ভরতা তৈরি না হয়।
পরিশেষে বলা যায়, রাখাইনের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই অর্থনৈতিক করিডোরের সাফল্য গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশ যদি অত্যন্ত দূরদর্শী এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি প্রদর্শন করতে পারে, তবে ভূ-রাজনীতির এই নতুন সমীকরণকে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন সোপান হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, যা প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান বাস্তবায়নে এক অনন্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ভূ-অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি বর্তমানে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং এর সঙ্গে ভূখণ্ডগত ও কৌশলগতভাবে সংযুক্ত বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২৩ থেকে ২৬ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই সফরে চীনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (বিএমসিইসি) এর প্রস্তাব। বেইজিং এই ত্রিপক্ষীয় করিডোরকে তাদের বহুল আলোচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এর একটি অন্যতম উপ-আঞ্চলিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী।
এই করিডোরটি মূলত পূর্বে প্রস্তাবিত চারদেশীয় ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার’ (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের একটি পরিবর্তিত ও পুনর্গঠিত রূপ। ভারতের কৌশলগত অনীহা এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্প থেকে দিল্লির দূরত্ব বজায় রাখার নীতির কারণে (বিসিআইএম) করিডোরটি স্থবির হয়ে পড়েছিল। এর প্রেক্ষিতে বেইজিং ভারতকে বাদ দিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় “বিএমসিইসি” ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে, যা ২০২৬ সালের জুন মাসে তারেক রহমানের বেইজিং সফরে আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা হিসেবে গতি পায়।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (বিএমসিইসি) একটি বহুমুখী ও সমন্বিত অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক। এর মূল ভূ-অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড প্রদেশ কুনমিং থেকে শুরু করে মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত একটি ‘মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্টেশন নেটওয়ার্ক’ (সড়ক, রেল ও পাইপলাইন সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা) গড়ে তোলা।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোর ধারণক্ষমতা এবং আধুনিকায়নে বিনিয়োগের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে তার নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। এখানে অ-সামরিক উপাদান হিসেবে বাণিজ্য নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা হলো তার জ্বালানি আমদানির রুট। চীনের রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের পরিভাষায় এটি ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে পরিচিত। বর্তমানে চীনের আমদানিকৃত অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সংবেদনশীল মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছায়।
ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কোনো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক যুদ্ধ বা দক্ষিণ চীন সাগরে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত তৈরি হলে, শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলো এই মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এমনটা ঘটলে চীনের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়বে।
এই ‘মালাক্কা ডিলেমা’ থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়ার জন্য চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে সরাসরি এবং বিকল্প প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। প্রস্তাবিত (বিএমসিইসি) করিডোরটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড প্রদেশ কুনমিংকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এর ফলে চীন মালাক্কা প্রণালি সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় প্রবেশ করতে পারবে। এটি মিয়ানমারের রাখাইনে অবস্থিত চীনের অর্থায়নে নির্মিত কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সেখান থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করবে।
চীনের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, যা বেইজিংয়ের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই করিডোরের প্রয়োজনীয়তা কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ করবে, তখন দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশ কিছু শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে হবে। এই উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণ এবং সরাসরি আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপন করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশ হলো দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার একটি স্বাভাবিক ‘ভৌগোলিক সেতু’।
করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে এই ভৌগোলিক অবস্থানের প্রকৃত অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। বাংলাদেশ কেবল একটি দেশ হিসেবে নয়, বরং এই অঞ্চলের প্রধান ‘কানেক্টিভিটি ও লজিস্টিকস হাব’ হিসেবে আবির্ভূত হবে। এই করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য সরাসরি চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আসিয়ান ভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবে। এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের বাইরে চামড়া, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর এবং নবনির্মিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর-এর বাণিজ্যিক উপযোগিতা এই করিডোরের মাধ্যমে বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত হবে। চীন ও মিয়ানমারের বিশাল ট্রানজিট কার্গো হ্যান্ডলিং করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বার্ষিক বিলিয়ন ডলারের ট্রানজিট ও লজিস্টিকস রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন চালিকাশক্তি যোগ করবে।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের (বিএমসিইসি) এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। ২০১৭ সালের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পর থেকে প্রায় ১২ লক্ষাধিক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপের মুখোমুখি হয়েছে, তার একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এই ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডোরকে কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক রুট বা পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ না করে; বরং এটিকে দীর্ঘস্থায়ী রাখাইন সংকট সমাধানের একটি অন্যতম বড় কূটনৈতিক লিভারেজ বা দরকষাকষির কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিক অবকাশ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ফোকাসই থাকে রাখাইন রাজ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা। যদিও সার্বভৌম ও কূটনৈতিক প্রোটোকল অনুযায়ী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের প্রাতিষ্ঠানিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের (জান্তা প্রশাসন) সাথেই সব ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা, চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ পরিচালনা করে আসছে। তবে রাখাইনের বর্তমান মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতাটি প্রথাগত কূটনৈতিক কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ ভূখণ্ডের ওপর জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রায় বিলুপ্ত এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি' সেখানে একটি কার্যকর বেসামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই পরিবর্তিত যুদ্ধকালীন বাস্তবতায়, রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে চীনের অনানুষ্ঠানিক ও পর্দার অন্তরালের মধ্যস্থতা এবং রাখাইনের সব অভ্যন্তরীণ প্রধান অংশীজনদের মধ্যে একটি পরোক্ষ ও বাস্তবসম্মত বোঝাপড়া তৈরি হওয়া অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হতে হবে। বাংলাদেশ বেইজিংকে এটি অনুধাবন করাতে হবে যে, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা এবং টেকসই মানবিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ব্যতিরেকে সেখানে চীনের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা কখনোই চিরস্থায়ী হবে না। যুদ্ধাবস্থা বজায় থাকলে যেকোনো পরিকাঠামোই সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। সুতরাং, চীনের নিজস্ব ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থেই রাখাইন সংকটের একটি টেকসই রাজনৈতিক মীমাংসা প্রয়োজন, যার মূল স্তম্ভ হতে হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও নাগরিক অধিকারসংবলিত পুনর্বাসন।
যদি এই অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনা বা রোডম্যাপের সাথে রাখাইনের স্থানীয় নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক মানবিক নজরদারি এবং রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের বিষয়টি শর্তযুক্ত ও ইতিবাচকভাবে সংযুক্ত করা যায়, তবেই কেবল এই ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডোর একটি প্রকৃত 'উইন-উইন' বা সবার জন্য সমান্তরাল লাভজনক মডেলে রূপান্তর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। অন্যথায়, মাঠপর্যায়ের মানবিক সংকটকে উপেক্ষা করে কেবল পরিকাঠামো খাড়া করার প্রয়াস এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (বিএমসিইসি) এর মতো একটি মেগা-আঞ্চলিক পরিকাঠামো প্রকল্প কেবল সাধারণ বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে তিন দেশের জাতীয় অর্থনীতি, ভূ-কৌশল এবং সার্বভৌম নিরাপত্তার সুরক্ষাকে স্পর্শ করে। এই করিডোরটি প্রতিটি দেশের জন্য যেমন বিপুল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনি এর বিপরীতে তৈরি করতে পারে সম্ভাব্য গভীর কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঝুঁকি।
বাংলাদেশের জন্য প্রধান লাভ হলো এটি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ‘কানেক্টিভিটি হাব’-এ রূপান্তর করবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার "প্রাকৃতিক সেতু" বলা হলেও, এই করিডোরটি সেই ধারণার প্রথম বাস্তব ও বাণিজ্যিক রূপ দেবে। বাংলাদেশ একাধারে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ল্যান্ডলকড চীন এবং আসিয়ান অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে পরিণত হবে। চীন ও মিয়ানমারের বিশাল পরিমাণের কার্গো ও বাণিজ্যিক ট্রানজিট বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পরিবহনের ফলে ট্রানজিট ফি, পোর্ট হ্যান্ডলিং চার্জ, গুদামজাতকরণ এবং লজিস্টিকস খাত থেকে দেশীয় অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হবে। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের উপযোগিতা বৈশ্বিক মানে উন্নীত হবে।
এই করিডোর দেশীয় শিল্প খাতের জন্য, বিশেষ করে ওষুধ, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে কম খরচে এবং দ্রুততম সময়ে কাঁচামাল আমদানির পথ সুগম করবে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নতুন করে চীনা ও আন্তর্জাতিক যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে, যা আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতাকে অনেক শক্তিশালী করবে।
তবে এর বিপরীত দিকে সম্ভাব্য বড় ঝুঁকি হলো চীনের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এমনিতেই বেইজিংয়ের দিকে ব্যাপক ঝুঁকে রয়েছে। করিডোর খোলার ফলে যদি চীনা পণ্যের একমুখী প্রবাহ তৈরি হয়, তবে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে এবং বাণিজ্য ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে। মেগা প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চীন থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড এবং পরিশোধের শর্তাবলি যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা না যায়, তবে ২০২৬ পরবর্তী বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে তা বড় ধরনের তারল্য সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের মূল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত তার উপকূলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে সীমাবদ্ধ। এই করিডোরের মাধ্যমে চীনের ল্যান্ডলকড এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে। চীনের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-কৌশলগত লাভ হলো মার্কিন বলয়ের কৌশলগত চাপ উপেক্ষা করে ভারত মহাসাগরে নিজের অর্থনৈতিক ও লজিস্টিকস উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এটি বেইজিংয়ের সামগ্রিক এশীয় বাণিজ্যের স্থায়িত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এছাড়া মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চীনের অভ্যন্তরে নির্মিত জ্বালানি পাইপলাইনগুলোর সর্বোত্তম বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই ত্রিপক্ষীয় সংযোগটি চীনের জন্য নিখুঁত অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
অন্যদিকে, চীনের জন্য বড় ঝুঁকি হলো মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং রাখাইনের চরম অস্থিতিশীলতার কারণে এই করিডোরে চীনের করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ভৌত পরিকাঠামো যেকোনো সময় নাশকতার শিকার বা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
মিয়ানমারের জন্য লাভ হলো চলমান অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে উত্তরণ। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং চরম গৃহযুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের জাতীয় অর্থনীতি বর্তমানে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। এই করিডোরটি মিয়ানমারের জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মূল ধারায় পুনরায় যুক্ত হওয়ার একমাত্র লাইফলাইন হতে পারে। চীনের অর্থায়নে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল ও রাখাইনে যে নতুন রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে, তা যুদ্ধবিধ্বস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটাবে।
মিয়ানমারের জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অর্থনৈতিকভাবে বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত বা একক নির্ভরশীলতা ।
এর ফলে নেপিডোর নীতি-নির্ধারণী স্বাধীনতা খর্ব হতে পারে এবং দেশটি চীনের একটি অর্থনৈতিক উপ-রাজ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। রাখাইন অঞ্চলের ওপর দিয়ে এই করিডোর যাওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও শিথিল হতে পারে। কারণ, এই পরিকাঠামো থেকে উৎপন্ন রাজস্ব ও লজিস্টিকস ক্ষমতার হিস্যা নিয়ে জান্তা সরকার এবং রাখাইনের ডি ফ্যাক্টো নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মি এর মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সংঘাত ও আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই নতুন মাত্রা রূপ নিতে পারে, যা মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাকে দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এই করিডোর পরিকল্পনা কেবল তিনটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের লড়াইয়ের ক্ষেত্র। নয়াদিল্লি এই অঞ্চলে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা মুক্তা মালার নীতি নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত। ভারতের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ হলো, এই করিডোরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চীনের একচ্ছত্র সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য তৈরি হতে পারে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করবে। ভারত এই ত্রিপক্ষীয় করিডোরকে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) এর মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব প্রতিহত করা। ওয়াশিংটন এই অর্থনৈতিক করিডোরকে বেইজিংয়ের ভূ-অর্থনৈতিক সম্প্রসারণবাদ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকে ঋণের জালে জড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখতে পারে। বিবিসি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলসীমায় চীনের এই প্রবেশাধিকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর বিপরীতে মিত্রদের নিয়ে পাল্টা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা জোট শক্তিশালী করছে।
এই তীব্র ত্রিভুজাকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেইজিং, নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। কোনো একটি পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি মস্ত বড় পরীক্ষা। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ রক্ষা করা।
বাংলাদেশ কীভাবে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ অক্ষুণ্ন রেখে এবং ২০২৬-এ ব্রিকস প্লাস (বিআরআইসিএস+) জোটে জোরালো অংশীদারত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে উভয় সংকট সামাল দিতে পারে, তার জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। সেগুলো হলো; বাংলাদেশকে চীনকে স্পষ্ট বোঝাতে হবে যে, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ছাড়া (বিএমসিইসি) এর অর্থনৈতিক করিডোর সফল করা অসম্ভব।
আর তাই, চীনকে অবশ্যই রাখাইনের স্থিতিশীলতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। চীনের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। ঋণের শর্তাবলী, সুদের হার এবং পরিশোধের সময়সীমা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে যাতে কোনোভাবেই ঋণ-ফাঁদের ঝুঁকি তৈরি না হয়। এই করিডোরে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে, যাতে কোনো একটি ব্লকের ওপর একক নির্ভরতা তৈরি না হয়।
পরিশেষে বলা যায়, রাখাইনের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই অর্থনৈতিক করিডোরের সাফল্য গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশ যদি অত্যন্ত দূরদর্শী এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি প্রদর্শন করতে পারে, তবে ভূ-রাজনীতির এই নতুন সমীকরণকে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন সোপান হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, যা প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান বাস্তবায়নে এক অনন্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
.png)

ড. সাহাব এনাম খান; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, নিরাপত্তা নীতি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর নিয়মিত স
৪ ঘণ্টা আগে
নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর কোথায় হবে, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল। তারেক রহমানের সরকার অবশ্য শুরু থেকে বলছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এটি তাঁর দলের নির্বাচনী প্রচারণায়ও ব্যবহৃত হয়েছে। জনগণেরও প্রত্যাশা, সরকার সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে বিশ
১৭ ঘণ্টা আগে
ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন; বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)-এর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান। সংস্থাটির ইতিহাসে আমলাদের বাইরে তিনিই প্রথম শিক্ষাবিদ প্রধান নির্বাহী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক।
২০ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড-সম্পর্কিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। গত মাসে একই কমিশন আবারও অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে, ইসরায়েলি পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য হলো, গাজার
২১ ঘণ্টা আগে