গণমাধ্যমের প্রতি হুমকি: আক্রান্ত হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিন

রাহাত মিনহাজ
রাহাত মিনহাজ

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৬: ০০
স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর। কেন্দ্রীয় দিল্লির জনপথ রোড ধরে চলছিলাম লোধি গার্ডেন এস্টেটের এক কনফারেন্স ভেন্যুর দিকে। গাড়িতে আমার সঙ্গী ছিলেন নেপালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম অধিকারকর্মী নম্রতা শর্মা। গণমাধ্যমের টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে ইউনেস্কোর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক এক কনফারেন্সে যোগ দিতে আরও অনেকের সঙ্গে আমি ও নম্রতা আমন্ত্রিত ছিলাম। যাত্রাপথে নম্রতা শর্মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কান্তিপুর ভবন পোড়ানোর কথা।

একটু মনে করিয়ে দিই, নেপালে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের সময় ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ব্যক্তি মালিকানাধীন কান্তিপুর মিডিয়া গ্রুপের ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় পুড়ে গিয়েছিল মিডিয়া গ্রুপটির কান্তিপুর টেলিভিশন, রেডিও কান্তিপুর ও দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের অফিস।

উল্লেখ করা যেতে পারে দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট নেপালের প্রধান সংবাদপত্র। নম্রতা শর্মা জানিয়েছিলেন, ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কান্তিপুর নেপালের প্রধান মিডিয়া কোম্পানি। আর এই কোম্পানির মূল ভবনটি আকস্মিকভাবে পোড়ানো হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি—যা একটা অগ্নিগর্ভ সময়ে কার্যকর করা হয়েছে মাত্র।

সংক্ষিপ্ত সেই যাত্রাপথে নম্রতাকে জানিয়েছিলাম, বাংলাদেশেও এমন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি গণমাধ্যমকে টার্গেট করে অনলাইন ও অফলাইনে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। নম্রতাকে বলেছিলাম, হয়তো আগামী ২-১ বছরের মধ্যে বাংলাদেশেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ সংঘাত-সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কাজ বেশ সংক্রামক।

কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পর ঢাকায় ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি বড় সমাবেশ করা হয়েছিল। যে সমাবেশের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ন্যাক্কারজনকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রধান। শুধু নারী হওয়ার কারণে তাঁকে ওই সমাবেশের আশপাশে যেতে দেওয়া হয়নি। এরপর হেনস্তা করা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসুক—একান্ত ব্যক্তিগত কারণে তা চাননি ওই সংবাদকর্মী।

না ২-১ বছর লাগেনি। পরের মাসেই, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরে বাংলাদেশে প্রথম সারির দুটো গণমাধ্যম অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাগ্যগুণে প্রাণে বেঁচেছেন সংবাদকর্মীরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী কেউ কিচ্ছু করেনি। পরদিন সকালে দিনের প্রথম কলটি আমার কাছে আসে কাঠমাণ্ডু থেকে। নম্রতা শর্মা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক পালাবদলের সময় দক্ষিণ এশিয়ায় খুব সম্ভবত নতুন এক মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকির পরিবেশ এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। আর এর ফলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা হরণকারী এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বিনাশকারী চরিত্রে স্থায়ী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে কট্টরপন্থীরা।

২০২৪ সালের পালাবদলের পর বাংলাদেশে দেশ গড়ার নতুন আশাবাদ যেমন তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি দেখা দিয়েছে কিছু নতুন শঙ্কা—যা বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতা, নারী স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার, আদিবাসী, বাউল, সাধক ও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সার্বজনীন অধিকার, সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নানা বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। এই পরিস্থিতি রীতিমতো ভীতিকর।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পর ঢাকায় ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি বড় সমাবেশ করা হয়েছিল। যে সমাবেশের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ন্যাক্কারজনকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রধান। শুধু নারী হওয়ার কারণে তাঁকে ওই সমাবেশের আশপাশে যেতে দেওয়া হয়নি। এরপর হেনস্তা করা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসুক—একান্ত ব্যক্তিগত কারণে তা চাননি ওই সংবাদকর্মী।

এছাড়া রাজনৈতিক কর্মী, পুলিশের হামলা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র তো আছেই। একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যায়, পালাবদলের পরবর্তী সময়ে কিছুটা শিথিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যে যার স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন পক্ষ সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। সারাবিশ্বের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ফরাসি অলাভজনক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস তাঁদের প্রতিবেদনে (২০২৬) বাংলাদেশ অংশে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বেশিরভাগ অপরাধ থাকে বিচারের বাইরে। যে কারণে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকরা বাংলাদেশে বরাবরই লক্ষ্যবস্তু।

যদি কোনো অতি প্রতিক্রিয়াশীল ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমটিকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ঘৃণা ছড়িয়ে ধ্বংসাত্মক কোন কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকে সে বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। অনলাইনে কড়া নজরদারিও দরকার। সংবাদ মাধ্যমটির অফিসেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাস সাম্প্রদায়িকতার কালিমায় কলঙ্কিত হলেও এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মভীরু ও শান্তিকামী। যদিও এর মধ্যে একটি অংশ আছে অতি প্রতিক্রিয়াশীল ও উগ্রবাদী। এদের কারণে অতীতে ভারত, বাংলাদেশ ও এমনকি পাকিস্তানের বহু শান্তিকামী মানুষকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় সাদা ও কালো কাপড়ের কালেমা পতাকায় বাংলাদেশের বহু মহাসড়ক ও শহর-বন্দরের রাস্তা ছেয়ে ফেলা হয়েছে। সাধারণ বিবেচনায় পবিত্র কালেমা খচিত পতাকায় কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু এই পতাকা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ইতিহাসে অতি উগ্রবাদী, সন্ত্রাসবাদী কিছু গোষ্ঠী ও দল ব্যবহার করেছে। নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে এই পতাকা হাতে ধর্মের বিকৃত ও উগ্র বয়ান উপস্থাপন করেছে। ফলে এই পতাকার প্রতি বিশ্বের নানাপ্রান্তের শান্তিকামী মানুষের ভীতি ও ট্রমা রয়েছে। যে কারণে এই পতাকাগুলোর ব্যবহার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন কট্টর মুসলিম দেশেও নিষিদ্ধ। বিধি-নিষেধ রয়েছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই—এমনকি পাকিস্তানের মতো দেশেও।

এমন প্রেক্ষাপটে দেশের কিছু দায়িত্বশীল গণমাধ্যম বাংলাদেশে এ ধরনের পতাকার প্রকাশ্য প্রদর্শন ও পতাকাকেন্দ্রিক উন্মাদনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। এতে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশিদের নিয়ে ভুল বার্তা যাচ্ছে কি না—সেটিও যথাযথভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে সংবাদমাধ্যমগুলো।

মনে রাখা প্রয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৫০ লক্ষের বেশি বাঙালি কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো রেমিটেন্সে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে। তাই বাংলাদেশিদের নিয়ে কিংবা প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে কোনো ভুল ও ভীতিকর বার্তা গেলে মূল ক্ষতিটি হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। আর এটি নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ক্ষতি।

কালেমা খচিত সাদা ও কালো পতাকা নিয়ে নতুন ধারার অনলাইন গণমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’ গত ২৩ ও ২৪শে জুন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে, যার শিরোনাম ছিল 'সাদা-কালো পতাকার নেপথ্যে কারা?’ প্রতিবেদনটিতে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে এই পতাকার নেপথ্যের চরিত্র ও পতাকা টাঙানোর প্রভাব নিয়ে। কিন্তু এরপর সংবাদমাধ্যমটির প্রতি হুমকি আসতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমটির তরফ থেকে জানানো হয়েছে, টেলিফোনে সরাসরি ও অনলাইন পরিসরে সংবাদমাধ্যমটির প্রতি বিষোদগার ছড়ানো হচ্ছে। সরাসরি হত্যার হুমকি ও অফিস জ্বালিয়ে দেওয়াসহ লাগামহীন গালাগালি ক্রমেই একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে সংবাদমাধ্যমটির কর্মীদের জন্য। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে কলাবাগান থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পুলিশের তরফ থেকে করা হয়েছে আশ্বস্ত।

বাংলাদেশের একজন অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা থাকবে, বাংলাদেশ পুলিশ এই হুমকিগুলোকে যথাযথভাবে আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। যদি কোনো অতি প্রতিক্রিয়াশীল ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমটিকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ঘৃণা ছড়িয়ে ধ্বংসাত্মক কোন কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকে সে বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। অনলাইনে কড়া নজরদারিও দরকার। সংবাদ মাধ্যমটির অফিসেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।

রাজনৈতিক আনুগত্য, ক্ষমতাসীন সরকারের তোষণ, পেশাগত অদক্ষতা, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো, দুর্বল রাষ্ট্রীয় আইনি সহযোগিতাসহ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা কম নয়। কিন্তু তারপরও নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে দেশের সংবাদমাধ্যম সমাজে জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে কণ্ঠহীনের কণ্ঠস্বর হিসেবে। নানা ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এমন বাস্তবতায় গণমাধ্যমের উপর নতুন করে কোনো ধ্বংসাত্মক হামলা দেশের জন্য ভীতিকর ফল বয়ে আনতে পারে, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

বাংলাদেশে নতুন করে কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার আগে, কোনো সংবাদমাধ্যমের অফিস আক্রান্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সেই প্রত্যাশা রইলো। আশা রাখছি, তারেক রহমানের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে।

রাহাত মিনহাজ, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত