ফাহমিদুল হকের কলাম/অবদমিত সমাজ, গোপনীয়তা ও সামাজিক মাধ্যমে বিচারের বিকার

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৪৪
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়—যেমন ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা গোপনীয় তথ্য ফাঁস করে দিয়ে সামাজিকভাবে হয়রানি করার একটি ভয়ংকর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে ভিক্টিম বা ভুক্তভোগীরা একধরনের অনলাইনভিত্তিক ‘সোশ্যাল জাস্টিস’ বা সামাজিক বিচারের শিকার হচ্ছেন। মাত্রা ছাড়িয়ে প্রায়ই প্রবণতাটি বিকার হিসেবে হাজির হচ্ছে। পুরোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে নেতিবাচক চর্চাগুলো ছিল, নতুন এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এসে সেগুলোই যেন আরও ভিন্ন, আগ্রাসী এবং বিবর্ধিত চেহারা ধারণ করেছে। আর এর নির্মম শিকার হচ্ছেন সাধারণ ও অসহায় মানুষেরা।

এই যে মানুষের ব্যক্তিগত ভিডিও বা কল রেকর্ড ফাঁস করে দেওয়া এবং সামাজিকভাবে কাউকে হেনস্থা করা—এটি যে চূড়ান্ত মাত্রার প্রাইভেসি বা গোপনীয়তার লঙ্ঘন, সেই বোধটুকু আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি পরস্পরের ব্যক্তিগত পরিসরকে শ্রদ্ধা করতে না শিখি, তবে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তবে এই চর্চাটি কিন্তু একদিনে বা হঠাৎ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর পেছনের ইতিহাসটা আমাদের একটু খতিয়ে দেখা দরকার।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় থেকে আমরা এই চর্চার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখতে পাই। সেসময় তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার তাদের বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিরোধী পক্ষের কল রেকর্ড ফাঁস করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। হয়তো বিরোধী পক্ষের লোকজন নিজেদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক আলাপ বা ভাঙচুরের পরিকল্পনা করছিল, এজেন্সির লোকজন আড়িপেতে সেগুলো রেকর্ড করে জনসমক্ষে ছেড়ে দিত। উদ্দেশ্য ছিল, বিরোধী দলকে ধ্বংসাত্মক হিসেবে প্রমাণ করা। আড়িপাতার এই প্রযুক্তিগত ক্ষমতা তখন কেবল সরকারের বা এজেন্সির হাতেই ছিল। কিন্তু সেই এজেন্সি তো আর প্রকাশ করত না যে সরকার কীভাবে গুম, খুন বা গায়েবি মামলার মাধ্যমে বিরোধীদের দমনের আলাপ বা পরিকল্পনা করছে! প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এই কৌশলটি তখন কিছু কিছু মূলধারার গণমাধ্যম তাদের প্রাইম টাইমে ফলাও করে প্রচার করত।

মূলত সেখান থেকেই এই চর্চাটির শুরু এবং কালক্রমে এটি একটি স্বাভাবিকীকরণের জায়গায় চলে গেছে। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের ব্যক্তিগত আড়ি পাতা রেকর্ড মিডিয়াতে প্রচার করে স্বাভাবিকতা দেয়, তখন সাধারণ মানুষও ধরে নেয় যে, প্রতিশোধ বা রাগের বশবর্তী হয়ে যে কারও গোপন ভিডিও ফাঁস করে দেওয়াটা হয়তো দোষের কিছু নয়। এভাবেই আমাদের সমাজে গোপনীয়তার প্রতি পারস্পরিক যে শ্রদ্ধা থাকা উচিত, তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

সম্প্রতি এমপি গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁসের ঘটনাটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে এর পেছনের দৃশ্যটি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এই ভিডিও প্রকাশের পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে শুরু করে প্রগতিশীল সমাজের অনেকেই—যারা জামায়াতের রাজনীতি অপছন্দ করেন—তারা এটিকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল হইচই করেছেন। ফলে তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সেই ভিডিওতে থাকা মেয়েটির কথা কি কেউ ভেবেছেন?

এই পুরো প্রক্রিয়ায় মেয়েটির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল—তার সামাজিক সম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াল, পরিবারের সদস্যরা তাকে ঘিরে কী বন্দোবস্তে গেল, ওই ভিডিওর পরে কী ভীষণ মানসিক পীড়নের মধ্যে ছিল—সেসব নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল না। পরে জানা গেল, মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। মূল রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকল, কিন্তু এর মধ্যে যে একজন নারীর জীবনীশক্তি ক্ষয়ে একেবারে শূন্যের কোঠায় চলে এল এবং সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিল, সেই ‘কোল্যাটেরাল ড্যামেজ’ বা পার্শ্বিক ক্ষতির দিকটি আমরা কেউ খেয়ালই করলাম না।

রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের ব্যক্তিগত আড়ি পাতা রেকর্ড মিডিয়াতে প্রচার করে স্বাভাবিকতা দেয়, তখন সাধারণ মানুষও ধরে নেয় যে, প্রতিশোধ বা রাগের বশবর্তী হয়ে যে কারও গোপন ভিডিও ফাঁস করে দেওয়াটা হয়তো দোষের কিছু নয়। এভাবেই আমাদের সমাজে গোপনীয়তার প্রতি পারস্পরিক যে শ্রদ্ধা থাকা উচিত, তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

ভিডিও ফাঁসকারীর শাস্তির চেয়ে, ভিডিওতে যার উপস্থিতি তাকেই সমাজ বেশি আক্রমণ করে। ভিক্টিমকে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। রাজনৈতিক ফায়দা লোটা বা নিছক বিকৃত আনন্দের ঘোরে আমরা ভুলে যাই যে, এটি একটি সাইবার ক্রাইম এবং একটি মানুষের জীবন এখানে বিপন্ন।

প্রশ্ন জাগতে পারে, ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে মানুষ কেন তা শেয়ার করে আনন্দ পায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের অবদমিত সমাজ মনস্তত্ত্বের মধ্যে। বাঙালি সমাজ দীর্ঘদিনের একটি পিতৃতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল সমাজ। এখানে পদে পদে মানুষকে অবদমনের শিকার হতে হয়। আজকাল আবার আমাদের সমাজব্যবস্থায় সুস্থ বিনোদন, স্বাভাবিক মেলামেশা, সংগীত-সাহিত্য-সিনেমা, নৌকাবাইচ-বাউলগান ইত্যাদির প্রতি সহজাত আগ্রহের ওপর পদে পদে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যখন সমাজে অকারণে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করা হয়, তখন সেই চাপা পড়া বিষয়গুলো ক্ষতের পুঁজ হয়ে ভিন্ন ও বিকৃত উপায়ে বেরিয়ে আসে।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, যারা সমাজে সবচেয়ে বেশি নৈতিকতার বয়ান দেয়, তারাই অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে অনৈতিক কাজগুলো করছে। মাদ্রাসায় বলাৎকার, মসজিদের ইমাম কর্তৃক শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো এর জ্বলন্ত প্রমাণ। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যারা এসব ব্যক্তিগত ভিডিও শেয়ার করে উল্লাস করে, তাদের ব্যক্তিগত জীবনে হয়তো রয়েছে চরম অপ্রাপ্তি ও হতাশা। অন্যের বিপদ দেখলে, অন্যের অনৈতিক অবস্থা দেখলে তারা একধরনের বিকৃত আনন্দ বা ‘প্লেজার’ পায়। যেহেতু আমাদের সমাজে আইনের শাসন নেই, নিজের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার সুযোগ নেই, তাই অনৈতিকতার দিকেই মানুষের আগ্রহ বেশি। অবিরাম অবদমনের ফল হলো—অন্যের বিপর্যয়ে আনন্দ খোঁজার মানসিকতা।

অন্যদিকে, আমরা এখন এমন একটি নজরদারি সমাজে বসবাস করছি, যেখানে সর্বত্র সিসিটিভি ক্যামেরা। এগুলো অপরাধ দমনে পুলিশের কাজে লাগলেও, সমাজের কদর্য দিকগুলোও এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে আসছে। কিন্তু এই নজরদারিই তো সুস্থ সমাজের মাপকাঠি হতে পারে না!

এই সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়বদ্ধতাও কম নয়। সোশ্যাল মিডিয়া এখন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় লঙ্ঘনের এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের নীতিমালায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা প্রাইভেসি লঙ্ঘন নিষিদ্ধ থাকলেও, তারা কখনোই যথাযথ ব্যবস্থা নেয় না। এর কারণ হলো তাদের ‘বিজনেস মডেল’। সোশ্যাল মিডিয়া চলে মানুষের ‘এনগেজমেন্ট’ বা যুক্ত থাকার ওপর ভিত্তি করে। প্লাটফর্মগুলো চায় ব্যবহারকারীদের ‘ইমারসিভ ইনভলভমেন্ট’ বা নিমগ্নতা। ব্যবহারকারীরা যত বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে কাটাবে, যত বেশি লাইক-শেয়ার-কমেন্ট করবে, প্ল্যাটফর্মগুলোর তত বেশি লাভ। সোসানা জুবফের ভাষায় এই ‘বিহেভিয়ারাল সারপ্লাস’ কাজে লাগিয়ে তারা মানুষের ডেটা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে।

তারা চায় তাদের প্ল্যাটফর্ম সবসময় সচল থাকুক, ভাইরাল কন্টেন্টে ভরপুর থাকুক। এর জন্য তাদের অ্যালগরিদমই এমনভাবে সাজানো যে, বিতর্কিত বা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বিষয়গুলো দ্রুত ভাইরাল হয়। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মেসিডোনিয়ার কিছু তরুণ নিছক ডলার উপার্জনের জন্য ট্রাম্প ও হিলারিকে নিয়ে ভুয়া খবর তৈরি করেছিল। তাদের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল কেবল এনগেজমেন্ট বাড়িয়ে টাকা আয় করা। অনবধানতাবশত ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন) বা ইচ্ছাকৃত অপতথ্য (ডিজইনফরমেশন) নয়, কেবল টাকা কামাবার জন্য এধরনের ভুয়া খবর বানানোকে বলা হয় ‘বুলশিট’। বাংলা সাইবারস্পেসেও অহরহ তৈরি হচ্ছে বুলশিট। দেখলে মনে হবে, ওই কন্টেন্ট বানিয়ে ওই আইডির বিশেষ রাজনৈতিক বা সামাজিক লাভ নেই? তবু কেন লোকে এগুলো বানায়? ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর বন্যার সময় এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি, বন্যার পানিতে ভাসমান একটি শিশুর ছবি ভাইরাল হয়। পরে জানা যায় এটি প্রকৃত কোনো ছবি নয়। এর পেছনে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল স্রেফ মানুষের আবেগ পুঁজি করে এনগেজমেন্ট বাড়ানো। মানুষ এখন এআই ব্যবহার করে প্রচুর অর্থহীন ও ভুয়া জিনিস বানায়, কেবল আইডির রিচ বাড়িয়ে দু-পয়সা আয়ের আশায়।

প্রশ্ন জাগতে পারে, ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে মানুষ কেন তা শেয়ার করে আনন্দ পায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের অবদমিত সমাজ মনস্তত্ত্বের মধ্যে। বাঙালি সমাজ দীর্ঘদিনের একটি পিতৃতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল সমাজ। এখানে পদে পদে মানুষকে অবদমনের শিকার হতে হয়।

এই প্রক্রিয়ায় সাংবাদিকতারও চরম অবক্ষয় ঘটেছে। পাঁচ-সাত বছর আগে ‘মোবাইল জার্নালিজম’ বা মোজো নিয়ে অনেক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। মনে করা হয়েছিল, এটি সাংবাদিকতাকে আরও তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছে। জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে অন্যের ব্যক্তিগত স্পেসে ঢুকে যাওয়া, ভিড়ের মধ্যে নারীদের শরীরের ওপর ফোকাস করে ভিডিও বানানো, মাদক অভিযানের সময় পুলিশের সাথে গ্রথিত (এমবেডেড) থাকা—এগুলো পুরোটাই সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থি। এরা ফেসবুকের এনগেজমেন্ট বাড়িয়ে টাকা উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। উন্নত বিশ্বে পাবলিক প্লেসে ভিডিও করার চল থাকলেও, কারও ঘরের ভেতর ঢুকে যাওয়ার বা ব্যক্তিগত স্পেস নষ্ট করার কোনো রেওয়াজ নেই। কিন্তু আমাদের দেশে এই অপেশাদার ও অনৈতিক সাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? এটি একদিনের কাজ নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমি মূলত চারটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে চাই:

প্রথমত, সামাজিক চুক্তির পুনর্নির্মাণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ: একটি সমাজ টিকে থাকে ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির ওপর ভিত্তি করে। আমি আপনাকে অকারণে আঘাত করব না, আপনিও আমার ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশ করবেন না—এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই সমাজের মূল ভিত্তি। আমাদের এই জায়গায় বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে, সংলাপ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে আমাদের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটি পুনরায় গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা: আমাদের দেশে প্রাইভেসি সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান দণ্ডবিধি বা আইনই যথেষ্ট। নতুন করে আইন বানানোর দরকার নেই। সমস্যা হলো আইনের প্রয়োগে। যখন কোনো অপরাধী সরকারি দলের বা ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন সে পার পেয়ে যায়। আইন ও আদালত যতক্ষণ পর্যন্ত নিরপেক্ষ না হবে, সুশাসন যতক্ষণ পর্যন্ত জবাবদিহিমূলক না হবে, ততক্ষণ এই হয়রানি বন্ধ হবে না। আবার যাবতীয় ডিএসএ, সিএসএর লক্ষ্য হলো সরকারপ্রধানের উদ্দেশ্যে কেউ কটূক্তি করছে কিনা, তাকে গ্রেফতার করা।

তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়া লিটারেসি বা ডিজিটাল শিক্ষা: দেশের শিক্ষিত সমাজকেও অনেক সময় না বুঝে গুজব বা ভুল তথ্য ছড়াতে দেখা যায়। এর ফলে ভুক্তভোগী আরও বেশি ভিকটিমাইজড হন। আমাদের ডিজিটাল সেলফ-কন্ট্রোল বা আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখতে হবে। কোনটি শেয়ার করা উচিত আর কোনটি উচিত নয়—সে বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আবার এআইনির্ভর অনেক ফটো বা ভিডিও দেখে বিশ্বাস করেন বয়স্ক ও কম শিক্ষিত লোকেরা। সর্বস্তরে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো দরকার।

চতুর্থত, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি: ফেসবুক বা মেটার মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মডারেশন পলিসিতে বড় ধরনের গলদ রয়েছে। আমেরিকা থেকে সৃষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর সিংহভাগ ইউজার আমেরিকার বাইরে হলেও, মডারেটরদের বেশিরভাগই আমেরিকায় বসে কাজ করেন। আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি বোঝেন এমন পর্যাপ্ত মডারেটর তাদের নেই, নানান দেশে নিযুক্ত তাদের মডারেটরের সংখ্যা খুবই কম। ফলে কোথাও কোনো দাঙ্গা বা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে না। এনগেজমেন্টের লোভে তারা অনেক সময় ক্ষতিকর কন্টেন্ট ওভারলুক করে। রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এসব টেক জায়ান্টদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী সময়ের যে ‘কেওটিক’ বা বিশৃঙ্খল অবস্থা, তারও একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সমাজের ওপর পড়েছে। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের ফলে মানুষের ভেতরে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল, আইনের অনুপস্থিতিতে তা নানা বিকৃত রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। সামান্য কারণে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো বিকারগ্রস্ত আচরণ আমরা দেখছি। এই গণবিকার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে রাষ্ট্র, আইনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে একটি সুস্থ, সহনশীল ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে কাজ করতে হবে। গোপনীয়তা মানুষের মৌলিক অধিকার, একে সস্তা বিনোদনের উপাদানে পরিণত করার এই অসুস্থ চর্চা রুখে দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলেরই এবিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে।

  • ফাহমিদুল হক: গণমাধ্যম গবেষক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত