তেলের দাম বাড়ে পাম্পে, ধাক্কা লাগে মাছের বাজারে

ড. মো. শরীফুল ইসলাম
ড. মো. শরীফুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ২৩
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছ পরিবহণে ব্যয় বেড়েছে। স্ট্রিম ছবি
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছ পরিবহণে ব্যয় বেড়েছে। স্ট্রিম ছবি

সকালে জেলে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরলেন। আড়তদার সেই মাছ পাঠাবেন শহরে। মাছ টাটকা রাখতে লাগবে বরফ, পৌঁছাতে লাগবে গাড়ি। শেষ পর্যন্ত ক্রেতা যখন বাজারে মাছটি দেখবেন, তার দামে মাছ ধরার খরচের পাশাপাশি যোগ হয়ে গেছে পথের নানা ব্যয়। তাই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর শুধু পরিবহন খাতের খবর নয়; এটি মাছের বাজারেরও খবর।

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে দেশে ডিজেলের দাম লিটারে ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা হয়েছে। পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। প্রতিটি জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে; ডিজেলের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ও পরিবহন ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপকে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে জানিয়েছে।

এই ২০ টাকার হিসাব মাছের ক্ষেত্রে বড় হয় কীভাবে? ধরা যাক, একটি মাছ ধরার অভিযানে ইঞ্জিনচালিত নৌকার ১০০ লিটার ডিজেল লাগে। আগের তুলনায় শুধু জ্বালানিতেই খরচ বাড়বে ২ হাজার টাকা। এটি একটি উদাহরণ। সব নৌকার জ্বালানি ব্যবহার এক নয়। কিন্তু হিসাবটি জেলের সমস্যার জায়গাটি দেখায়। নদী বা সমুদ্রে যাওয়ার খরচ আগে থেকেই করতে হয়, অথচ কত মাছ পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত নয়। মাছ কম পাওয়া গেলে বাড়তি খরচ পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগও কমে যায়।

মৎস্য খাতের আকার বিবেচনা করলে এই চাপকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বদ্ধ জলাশয়ে চাষের মাছ ২৯ দশমিক ৭৮ লাখ টন, উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছ প্রায় ১৪ দশমিক ১১ লাখ টন এবং সামুদ্রিক মাছ ৬ দশমিক ২৯ লাখ টন। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৯ শতাংশ আসে মাছ চাষ থেকে। একই অর্থবছরে জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনে মৎস্য খাতের অবদান ছিল ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

চাষের মাছের খরচও কয়েকভাবে বাড়তে পারে। পুকুরে পানি তোলা, বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালানো, পোনা ও খাদ্য আনা এবং উৎপাদিত মাছ বাজারে পাঠানো—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি বা পরিবহনের ভূমিকা আছে। সব খামারের পরিস্থিতি অবশ্য এক নয়। যে খামার ডিজেলচালিত পানির পাম্পের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তার ওপর সরাসরি চাপ বেশি পড়বে। অন্য খামারে চাপ আসতে পারে খাদ্য, পোনা বা মাছ পরিবহনের বাড়তি খরচের মাধ্যমে।

মাছ পরিবহনের একটি যাত্রায় যদি ২০০ লিটার ডিজেল লাগে, নতুন দামে জ্বালানি ব্যয় বাড়বে ৪ হাজার টাকা। সেই গাড়িতে দুই টন মাছ থাকলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় দাঁড়ায় কেজিপ্রতি ২ টাকা। গাড়িতে মাছ কম থাকলে কেজিপ্রতি ব্যয় আরও বাড়বে।

পরিবহন ভাড়ার বিষয়টি আরও সতর্কভাবে দেখা দরকার। ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়লেই মাছবাহী গাড়ির ভাড়া বা মাছের খুচরা দাম একই হারে বাড়তে হবে—এমন কোনো হিসাব নেই। গাড়ির মোট ব্যয়ে চালকের মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণ, টোলসহ আরও খরচ থাকে। আবার মাছবাহী গাড়ি পূর্ণ বোঝাই যাচ্ছে কি না, ফিরতি পথে পণ্য পাচ্ছে কি না, সেটিও ভাড়ায় প্রভাব ফেলে।

একটি সরল উদাহরণ নেওয়া যাক। মাছ পরিবহনের একটি যাত্রায় যদি ২০০ লিটার ডিজেল লাগে, নতুন দামে জ্বালানি ব্যয় বাড়বে ৪ হাজার টাকা। সেই গাড়িতে দুই টন মাছ থাকলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় দাঁড়ায় কেজিপ্রতি ২ টাকা। গাড়িতে মাছ কম থাকলে কেজিপ্রতি ব্যয় আরও বাড়বে। এটি বাস্তব বাজারভাড়া বা মাছের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস নয়; কেন পরিবহনের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, তার একটি হিসাব।

মাছের ক্ষেত্রে সময়ও টাকা। পচনশীল এই পণ্য ঘাট থেকে আড়ত হয়ে বাজারে পৌঁছাতে দেরি হলে বেশি বরফ লাগতে পারে, মান কমতে পারে, এমনকি কিছু মাছ বিক্রির অনুপযোগীও হতে পারে। তখন বাড়তি ক্ষতি সামলাতে ব্যবসায়ী বেশি দাম চাইতে পারেন। কিন্তু বাজারে সেই দাম না পেলে তিনি ঘাটে কম দামে মাছ কিনতে চাইবেন। ফলে শহরের ক্রেতা বেশি দাম দিলেও জেলে বা খামারি যে বেশি আয় করবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

এ অবস্থায় স্বল্প আয়ের পরিবার সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে। মাছের দাম নাগালের বাইরে গেলে তারা কেনার পরিমাণ কমান বা পছন্দের মাছের বদলে সস্তা মাছ খোঁজেন। মাছের বাজারদর তাই শুধু ব্যবসার প্রশ্ন নয়; পরিবারের খাবার ও পুষ্টির প্রশ্নও।

করণীয় শুরু হতে পারে ঘাট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের হিসাব প্রকাশ দিয়ে। প্রধান অবতরণকেন্দ্রে জেলে কত দাম পেলেন, আড়তে কত দামে বিক্রি হলো এবং ক্রেতা কত দিলেন—এই তথ্য নিয়মিত জানানো হলে প্রকৃত ব্যয়বৃদ্ধি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির পার্থক্য বোঝা সহজ হবে। মাছবাহী যানবাহনের ভাড়া পর্যবেক্ষণ এবং আড়ত ও বাজারে বরফ ও সংরক্ষণসুবিধা বাড়ানোও জরুরি। মাছ নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমানো গেলে বাড়তি খরচের কিছুটা সামলানো সম্ভব।

ক্ষুদ্র জেলে ও খামারিদের সহায়তার প্রয়োজন হলে তা প্রকৃত ব্যয় ও প্রয়োজন যাচাই করে দিতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ ইঞ্জিন, একসঙ্গে মাছ পরিবহন, স্থানীয় পর্যায়ে ভালো সংরক্ষণব্যবস্থা এবং উপযোগী স্থানে সৌরশক্তিচালিত সেচের ব্যবহার বাড়ালে ভবিষ্যতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কমবে।

পাম্পে ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারে ২০ টাকা। কিন্তু মাছের বাজারে এর শেষ হিসাব নির্ভর করবে নৌকা কতটা দক্ষতার সঙ্গে চলল, গাড়িতে কত মাছ গেল, পথে কত মাছের মান নষ্ট হলো এবং বাড়তি খরচ কে বহন করল—তার ওপর। সেই হিসাব সামনে আনতে পারলেই জেলে ও খামারির আয়, ক্রেতার সামর্থ্য এবং মাছের ন্যায্য দাম—তিনটিই ভালোভাবে রক্ষা করা সম্ভব।

  • ড. মো. শরীফুল ইসলাম: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত