বিষ, দারিদ্র্য ও বিচারহীনতা: বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ত্রিমাত্রিক সংকট
রাফাত হাসান

বাংলাদেশে সমাজ শুধু যে শিশুদের অবহেলা করছে তা নয়, বরং কাঠামোগতভাবে তাদেরকে চরম ক্ষতির মুখেও ঠেলে দিচ্ছে। এই ক্ষতিকর চিত্র আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই—যখন শিশুরা সিসার মতো মারাত্মক বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে আসে, জীবনের সঠিক সুযোগটি পাওয়ার আগেই অকালে প্রাণ হারায়, কিংবা দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যের কারণে ভালোভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে ঘরে, কর্মক্ষেত্রে বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সহিংসতার শিকার হওয়া অগণিত শিশু।
এই ক্ষতি ও নির্যাতন কেন যুগের পর যুগ টিকে আছে, তা বুঝতে আমরা প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জোহান গালতুংয়ের ১৯৬৯ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধ থেকে ‘সহিংসতার ত্রিভুজ’ তত্ত্বটির সাহায্য নিতে পারি। তিনি সমাজকাঠামোতে সহিংসতাকে মূলত তিনটি রূপে সংজ্ঞায়িত করেছেন। প্রথমটি হলো প্রত্যক্ষ বা সরাসরি সহিংসতা, যার মধ্যে শারীরিক ও যৌন নিপীড়ন অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়টি হলো কাঠামোগত সহিংসতা, যা আমাদের শাসনব্যবস্থা এবং সম্পদের অসম বণ্টনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। আর তৃতীয়টি হলো সাংস্কৃতিক সহিংসতা, যেখানে সমাজের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতি শিশুদের প্রতি ক্ষতিকর আচরণকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করায়। বাংলাদেশে প্রতিদিন শিশুরা এই তিন ধরনের সহিংসতারই শিকার হচ্ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক দশকের পরিসংখ্যান থেকে দেশে শিশুদের ওপর প্রত্যক্ষ সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ১১,৭৩৫টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫,৫৩৭টিই ছিল ধর্ষণের ঘটনা। সাম্প্রতিক চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসেই আসক ৬০৬টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে ২৪১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে অপরাধীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছে ২১৩ জন শিশু।
অন্যদিকে, কাঠামোগত সহিংসতা বাইরে থেকে ততটা সহজে চোখে পড়ে না। কিন্তু এর ক্ষতিকর প্রভাব প্রত্যক্ষ সহিংসতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সিসা, আর্সেনিক ও বায়ুদূষণের মতো পরিবেশগত সমস্যা থেকে শুরু করে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা—সবই কাঠামোগত সহিংসতার অংশ। এগুলোই নির্ধারণ করে দেয় সমাজের কোন শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক সহিংসতা। শাসন করার নামে শিশুদের গায়ে হাত তোলাকে আমাদের সমাজ বৈধতা দেয়। ভুক্তভোগীদেরই উল্টো দোষারোপ করার প্রবণতা রয়েছে। এই ধরনের সামাজিক প্রথা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতা মিলে সহিংসতার ত্রিভুজটি পূর্ণ হয়। এটি শিশুদের মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পল ফার্মার তাঁর একটি বইয়ে বলেছেন, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন কোনো দুর্ঘটনা বা নিছক দুর্ভাগ্য নয়। বরং এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের এমন এক গভীর লক্ষণ, যা নির্ধারণ করে কে কষ্ট ভোগ করবে আর কে সুরক্ষা পাবে।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন কোনো নতুন বিষয় নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। ২০২৪ সালের ইউনিসেফের একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি মাসে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন শিশুই (১ থেকে ১৪ বছর বয়সী) লালনপালনকারীদের দ্বারা সহিংস শাসনের শিকার হয়। এর ফলে দেশের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২৬ সালেও এই পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
এসব সহিংসতার বেশিরভাগই ঘটে ঘরের চার দেয়ালে। তাই এগুলো নিয়ে কখনো খবর হয় না। অনেকেই এই তথাকথিত ‘কঠোর শাসন’কে নির্যাতন বলে মানতেই চান না। শিশুদের গায়ে হাত তোলা, বকাঝকা করা বা অপমান করাকে বড়রা শৈশবের একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক অংশ বলে মনে করেন।
কিন্তু বারবার এমন মানসিক ও শারীরিক আঘাত শিশুর বেড়ে ওঠাকে গভীরভাবে বাধাগ্রস্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতার শিকার শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাদের আইকিউ কমে যায়, ভাষা ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয় এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। বড় হওয়ার পর নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কেও তারা এই নেতিবাচক প্রভাব বয়ে বেড়ায়।
এই তীব্র সামাজিক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে এক বিশাল জনস্বাস্থ্য সংকট। পরিবেশদূষণ শিশুদের মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সিসা দূষণে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা রয়েছে।
এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। কারণ, গবেষণায় দেখা যায়, শৈশবে সিসার সংস্পর্শে এলে ভবিষ্যতে শিশুদের মধ্যে আগ্রাসী ও অপরাধমূলক আচরণ দেখা দিতে পারে। সিসা সরাসরি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং আবেগের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে। যখন বিপুলসংখ্যক শিশু এমন স্নায়বিক ক্ষতির শিকার হয়, তখন পুরো সমাজেই একধরনের অস্থিরতা, খামখেয়ালি ও আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়ে। সিসা দূষণ আজ কেবল কারখানা বা ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নেই। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, পুরনো ব্যাটারির যত্রতত্র রিসাইক্লিং এবং ভেজাল খাবার ও মসলার মাধ্যমে শিশুরা প্রতিদিন নীরবে সিসার সংস্পর্শে আসছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বায়ুদূষণ এবং আর্সেনিকের মতো পরিবেশগত নীরব ঘাতক। ২০১৯ সালের একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে দূষণকারী কণা বাড়লে মানুষের মধ্যে সহিংস ও আক্রমণাত্মক আচরণ, বিশেষ করে হামলার ঘটনা বেড়ে যায়। দূষিত বাতাস মানুষের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। অন্য দেশে যা হয়তো সাময়িক সমস্যা, বাংলাদেশে তা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও নিয়মিত জনস্বাস্থ্য সংকট। পাশাপাশি, দূষিত পানির মাধ্যমে আর্সেনিকের সংস্পর্শে এলে গ্রামীণ শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা কমে যায়। এতে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দক্ষতাগুলোই মানুষকে যেকোনো পরিস্থিতিতে সহিংস আচরণ থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে।
পরিবেশগত এই ঝুঁকিগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো দারিদ্র্য ও আর্থসামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ২০২২ সালের নাফিল্ড ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থিক অনটন শিশু নির্যাতন ও অবহেলার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, পরিবারের আয় বাড়লে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। এর ওপর শিশুশ্রম পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী শিশুরা ঘরে ও বাইরে সব জায়গাতেই সাধারণ শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে।
মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ (মিকস ২০২৫)-এর পরিসংখ্যানে এই বহুমুখী ঝুঁকির চিত্র আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকায় এই হার রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো—প্রায় ৬৫ শতাংশ। এছাড়া ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রম ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, নতুন করে আরও ১২ লাখ শিশু শ্রমে নিযুক্ত হতে বাধ্য হয়েছে। জরিপে এও দেখা যায়, ৮৬ শতাংশ শিশু বড়দের হাতে কঠোর শাসনের নামে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
সমাজ ও পরিবেশের এই চরম ব্যর্থতার মুখে বিচারব্যবস্থার উচিত ছিল শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে এই আইনি ব্যবস্থা উল্টো অপরাধীদের বিচারহীনতার সুযোগ করে দিচ্ছে। আমাদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু শুধু কেতাবি আইন দিয়ে কখনো সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না। তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, ভুক্তভোগীদের সহায়তার অভাব এবং আইনি জটিলতা পদে পদে ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়।
বছরে হাজার হাজার মামলার রেকর্ড থাকলেও পাঁচ বছর পরও অনেক মামলার বিচার শুরু হয় না। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে সাজা পাওয়ার হার এতই কম যে, তা অপরাধীদের মনে বিন্দুমাত্র ভয় তৈরি করতে পারে না। সামাজিক অপবাদ ও আইনি জটিলতা ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বাইরের অনেক জায়গায় চিকিৎসকরা এখনো নিষিদ্ধ এবং অবৈজ্ঞানিক ‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’ বা দুই আঙুলের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটি বিজ্ঞানসম্মত নয়, তবুও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে এটি চলছে এবং ভুক্তভোগী শিশুদের নতুন করে মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণে বিচার চাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি নিজেই যেন এক নতুন নির্যাতনে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে বিষাক্ত দূষণ, দারিদ্র্য এবং বিচারহীনতা মিলে একটি ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। সরকার ও কর্তৃপক্ষ চাইলে এগুলো আলাদাভাবে সমাধান করতে পারবে না। আমাদের একযোগে এই ত্রিভুজের তিনটি দিক নিয়েই কাজ করতে হবে।
প্রথমত, সিসা ও আর্সেনিক দূষণ রোধকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর জন্য শিল্প খাত, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমন সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা সহিংসতা প্রতিরোধ করবে এবং বাবা-মায়েদের ইতিবাচক শাসনপদ্ধতি শেখাতে সাহায্য করবে। তৃতীয়ত, বিচারব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং সব ধরনের ক্ষতিকর ডাক্তারি পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ করা জরুরি।
পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে বাতাসে, পানিতে ও খাবারে মেশা বিষ দূর করার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। কমাতে হবে দারিদ্র্যের চাপ। সর্বোপরি, এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়তে হবে, যা হবে শিশুদের সত্যিকারের আশ্রয়। যখনই কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হয় বা সিসা দূষণে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়—তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থাকে না। এটি মূলত আমাদের শিশুদের সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে আমাদের চরম ও সামষ্টিক ব্যর্থতারই এক করুণ রায়।
লেখক: আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য গবেষক
.png)







