জ্বালানির দাম বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষ এই ধাক্কা সামলাবে কীভাবে

গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, এখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো।
সরকারের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর পেছনে সেই পরিচিত পুরোনো যুক্তিটিই তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং জাহাজ ভাড়া বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারে দাম না বাড়ানোর ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিঃসন্দেহে বিশাল অঙ্কের চাপ। কিন্তু এই বাড়তি খরচের যে বিশাল চাপ সাধারণ নাগরিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো, তাদের জন্য প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—এই আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা তারা কীভাবে সামলাবেন?
প্রথম ধাক্কা: যাতায়াত ও দৈনন্দিন পরিবহন
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রথম প্রভাবটি সরাসরি পড়ে আমাদের দৈনন্দিন যাতায়াতের ওপর। ধরি, একজন মোটরসাইকেল চালক, যিনি সপ্তাহে ১০ লিটার অকটেন কেনেন। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ার ফলে তার সাপ্তাহিক খরচ বেড়ে গেল ২০০ টাকা, যার মানে হলো মাসে প্রায় ৮০০ টাকার অতিরিক্ত ধাক্কা। সীমিত আয়ের একজন মানুষের জন্য এটি মোটেও ছোট কোনো বিষয় নয়।
অন্যদিকে, যারা নিয়মিত বাসে যাতায়াত করেন, তাদের দুর্গতি আসে অন্য পথে। জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচের অজুহাত দেখিয়ে বাস মালিকরা অনিবার্যভাবেই ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন। ফলস্বরূপ, প্রতিদিন অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বা জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষ মাস শেষে এক বিরাট আর্থিক চাপের মুখে পড়বেন।
কৃষি ও বৃহত্তর বাজারের সংকট
এরপর আসে বৃহত্তর বাজার ও কৃষিখাতের কথা। ডিজেলের দাম বাড়ার অর্থ হলো কৃষকের সেচ খরচ বেড়ে যাওয়া। এর পাশাপাশি কৃষি পণ্য পরিবহনে ট্রাক ভাড়া বাড়ে। এই বাড়তি খরচের প্রভাব ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ে খুচরা বাজারে। চাল, ডাল, সবজি, ডিম থেকে শুরু করে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
সিপিডিও একইভাবে পরিবহন ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে। আমাদের মতো দেশে নিম্ন আয় ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকেই এই চাপের সবচেয়ে বড় শিকার হতে হয়। কৃষকদের বাস্তবতা আরও কঠিন। অনেক কৃষকই সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। সেচ খরচ বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়ে।
কৃষক যদি সেই বাড়তি খরচ ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করতে পারেন, তবে ভোক্তাকে বেশি দাম গুনতে হয়। আর যদি না পারেন, তবে কৃষকের নিজস্ব আয় কমে যায়। যেভাবেই হোক না কেন, চূড়ান্ত বোঝাটি গিয়ে চাপে সাধারণ মানুষের পকেটেই।
মূল্যস্ফীতির মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে এল, যখন দেশের মানুষ আগে থেকেই নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণে দিশেহারা। যদিও আগস্ট মাসে সামগ্রিক জাতীয় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের তুলনায় পণ্যের দাম এখনো আকাশছোঁয়া। মূল্যস্ফীতির হার কমার মানে এই নয় যে পণ্যের দাম কমছে; এর অর্থ হলো দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র।
আগে থেকেই টিকে থাকা উচ্চমূল্যের ওপর যখন নতুন করে এই বাড়তি খরচের বোঝা চাপে, তখন পরিবারগুলোর সামনে অন্য খাতের খরচ কমানো ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। অনেকেই বাধ্য হয়ে যাতায়াত কমাবেন, কেউ বাজারের ফর্দ ছোট করবেন, আবার কেউ হয়তো সন্তানদের লেখাপড়া বা পরিবারের জরুরি চিকিৎসায় কাটছাঁট করতে বাধ্য হবেন।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক চিত্র ও জনরোষ
জ্বালানির এই দাম বাড়ার পর জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা যথেষ্ট যৌক্তিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যেদিন দেশে নতুন দাম কার্যকর হলো, ঠিক সেদিনই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে নেমে আসে এবং ডব্লিউটিআই-এর দাম ২ শতাংশের বেশি কমে ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে দাঁড়ায়, যা ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন।
অবশ্যই, বিশ্ববাজারে একদিন তেলের দাম কমলেই দেশে রাতারাতি দাম কমানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ বিদেশ থেকে যে তেল আমদানি করে, তার দাম নির্ধারিত হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের গড় দাম, জাহাজ ভাড়া, ইনস্যুরেন্স, ডলারের বিনিময় হার এবং শুল্কের ওপর ভিত্তি করে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জাহাজ ভাড়াও অস্বাভাবিক রকমের বেশি। তবুও সাধারণ মানুষের প্রশ্নটি অত্যন্ত সহজ ও সোজা—বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশে যদি এত দ্রুত দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে বিশ্ববাজারে যখন দাম কমে, তখন কেন সাধারণ মানুষ সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হয়?
মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতার দাবি
নাগরিকদের মূল জিজ্ঞাসার জায়গা ঠিক এখানেই। কর্তৃপক্ষ যখন বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে দেশে দাম বাড়ায়, তখন বিশ্ববাজারে দাম কমলে সেই সুফল কবে জনগণের কাছে পৌঁছাবে, তার কোনো সুস্পষ্ট উত্তর থাকে না। কর্তৃপক্ষের উচিত শুধু খরচের হিসাব তুলে না ধরে, বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশে কীভাবে দাম কমানো হবে, তার একটি স্বচ্ছ মেকানিজম বা পদ্ধতি জনগণের সামনে পরিষ্কার করা।
তাছাড়া, জ্বালানির দাম বাড়ার পর বাজারে কী ধরনের নৈরাজ্য তৈরি হয়, তা সবারই জানা। লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা যখন পরিবহন ভাড়া বা নিত্যপণ্যের দাম এর চেয়ে বহুগুণ বেশি বাড়িয়ে দেন, তখন সেই অতিরিক্ত মুনাফা কার পকেটে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ তা জানতে পারে না।
পারিবারিক বাজেটের রূঢ় বাস্তবতা
এই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরা। মাস শেষে তাদের বেতন বাড়ে না, কিন্তু যাতায়াত, বাজার ও সংসারের খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা বাজারের থলি ছোট করেন, সন্তানের শখ পূরণ থেকে বিরত থাকেন অথবা নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দেন।
বিপিসির আর্থিক ক্ষতির হিসাবটি যেমন বাস্তব, দেশের কোটি কোটি সাধারণ পরিবারের মাসের বাজেটে তৈরি হওয়া ঘাটতিও ঠিক ততটাই বাস্তব। বিপিসির লোকসান কমানোর হয়তো প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেই লোকসানের পুরো ভার যখন সাধারণ মানুষের দুর্বল কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—মানুষ আর কত ভার সইবে? বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তখন সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে—কবে তারা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে?
• মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
.png)






