
১৯ বছর বয়সী একটি মেয়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হলো। সে কি আত্মহত্যা করেছে? নাকি তাকে আত্মহননের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে? অথবা তাকে কি পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর প্রকৃত উত্তর হয়তো আমরা কখনোই জানতে পারব না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—তার নাম ‘গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী’ ছিল না।
মরিয়ম তখনও কেবল একজন কিশোরী। কেউ কেউ বলছেন তার বয়স ১৮। বিয়ের কাবিননামা অনুযায়ী, তার জন্ম ২০০৮ সালে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যাদের সামান্যতম ধারণাও আছে, তারা ভালো করেই জানেন, এখানে সার্টিফিকেটে মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে লেখাটা কতটা স্বাভাবিক একটি বিষয়। হয়তো বয়স্ক ও ক্ষমতাবান পুরুষের লালসা চরিতার্থ করার জন্যই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ দেখানো হয়। যাই হোক না কেন, বয়সে সে আমাদের বেশিরভাগেরই চেয়ে অনেক ছোট ছিল।
সাবেক এমপি গাজী নজরুলের সঙ্গে তার তথাকথিত ‘স্ক্যান্ডাল’ বা কেলেঙ্কারির ঘটনাটি যখন সামনে আসে, তখন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওটির পুরোটা দেখতে পারিনি। তবে যতটুকু দেখেছি, তাতে একজন বয়স্ক পুরুষের আগ্রাসী যৌন আচরণের বিপরীতে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীর চরম অস্বস্তিই আমার চোখে পড়েছে। অনেকের কাছেই এই সম্পর্কটি কোনোভাবেই পারস্পরিক সম্মতিভিত্তিক বলে মনে হয়নি।
মরিয়মের শরীরটিকে একটি মাধ্যম বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—অর্থ, ক্ষমতা, রাজনৈতিক আক্রমণ এবং চাঁদাবাজির জন্য।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, গোপন ক্যামেরায় সেই ভিডিওটি ধারণ করেছিল তার আপন মামা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তার নিজের পরিবারই তাকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতাবান এক শিকারিকে ফাঁদে ফেলার টোপ হিসেবে।
তবে সোনার হাঁসের পেট কেউ চিরে ফেলেছে। মরিয়মের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী এবং এমনকি মরিয়মের বাবাও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দাবি করেন যে, মরিয়ম নাকি গাজীর বিবাহিত স্ত্রী। এখানে কোনো আইনি নথিপত্রের বা যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন পড়েনি। কারণ এমপি গাজী নজরুল চরম প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই ঘটনাটি আমাদের হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের সেই বিখ্যাত ‘৫০১ নম্বর কক্ষের’ ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। রিসোর্টে ধরা পড়ার পর তিনিও ওই নারীকে তার ‘স্ত্রী’ বলে দাবি করেছিলেন।
পুরো ঘটনাপ্রবাহে মরিয়মের নিজস্ব কোনো অবস্থান ছিল না, কোনো পছন্দ-অপছন্দের সুযোগ ছিল না। সে এই পরিস্থিতি নিয়ে টুঁ শব্দটিও করতে পারেনি। আমরা কখনোই তার কথা শুনিনি, কিংবা সে কীভাবে এই ভয়াবহ মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তা জানার চেষ্টাও করিনি। অথচ, তার সেই ‘অন্তরঙ্গ’ ভিডিওটি পুরো দুনিয়ার সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো; বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম তার মুখমণ্ডলটি ঝাপসা করার ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও বোধ করেনি। এরপর তাকে এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো, যে তার চেয়ে ৫৭ বছরের বড়।
মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এমপি গাজী নজরুল সম্পর্কে তার আপন খালু হন। সেই হিসাবে তিনি মরিয়মের নানা। নিজের মেয়ের সঙ্গে নানার সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমরা প্রথমে কিছু বুঝিনি, অনেক পরে জেনেছি। কিন্তু মেয়ের মামা ভিডিওটি করার কারণেই সব শেষ হয়ে গেছে।’
খেয়াল করার মতো বিষয় হলো, কোনো সাক্ষাৎকারেই বাবা মাসুম বিল্লাহ তার মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারী গাজী নজরুলের প্রতি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। উল্টো তিনি বলেছেন, মেয়ের সঙ্গে তার খুব একটা কথা না হলেও গাজী নজরুলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। যখন কথা হতো, মেয়ে নাকি পাশে থাকত! তিনি হয়তো কখনোই মেয়ের মনের অবস্থা জানার তাগিদ অনুভব করেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কিছু চিঠি ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেগুলোকে মরিয়মের সুইসাইড নোট বলা হচ্ছে। কিন্তু এই হাতের লেখা তার মেয়ের কি না, সে বিষয়ে বাবা নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারেননি। আসলে ওই পরিবারের চারদেয়ালের ভেতর কী ঘটছিল, তা আমরা কেউই জানি না। মরিয়ম কি বাবার স্নেহ পেত? সে কি নিজেকে অবরুদ্ধ মনে করত, নাকি সুরক্ষিত? শোষিত, নাকি পরিত্যক্ত? এই বাইরের পৃথিবী থেকে কেউই তা জানে না।
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মরিয়ম সম্পর্কে খুব সামান্যই জানি। তার প্রিয় রঙ কী ছিল, বড় হয়ে সে কী হতে চেয়েছিল, তার প্রিয় খাবার কী ছিল—এসব আমরা কখনোই জানতে পারব না। সে কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছে, নাকি রাজনৈতিক খেলা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ফাঁদে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে তাকে খুন করা হয়েছে? সে কি হৃদয়ঘটিত কারণেই মারা গেছে, নাকি সেই ‘স্ক্যান্ডাল’ ভিডিওটির কারণে মানসিক চাপে মারা গেছে?
তার মৃত্যুর খবরে কিছু মানুষের মধ্যে শোক ও উদ্বেগ দেখা গেলেও, অন্যদিকে তার ঝুলন্ত লাশের ছবি দিয়ে মিম বানিয়ে ইন্টারনেটে ছড়ানো হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর পরও তার শরীরটিকে ভিউ, রিঅ্যাকশন আর ক্লিকের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এই মেয়েটি আসলে কে ছিল, তা চেনানোর জন্য গণমাধ্যমে তার সেই স্ক্যান্ডাল ভিডিওর অংশবিশেষ জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, স্রেফ একটি জীবনের অপমৃত্যু ভিউ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়; সংবাদের কাটতি বাড়াতে হলে তাকে একজন ক্ষমতাবান পুরুষের সঙ্গে যুক্ত করেই দেখাতে হবে। সেই ঘটনাটির বৃত্তেই তার জীবন আটকে থাকবে। এভাবেই এলগরিদম চলে, ভিডিওতে ভিউ হয়।
মৃত্যুর পরও মরিয়ম এই পুরো ঘটনার প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতে পারল না। আমরা বারবার টিভি আর মিডিয়ায় তার ছবি দেখছি, স্ক্যান্ডালের খবর পড়ছি, কিন্তু কোনো শিরোনামেই তার নামটি উচ্চারিত হচ্ছে না। মৃত্যুর পরও আমরা তাকে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছি। যে পরিচয়টি হয়তো নিছক একটি আবরণ বা ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল ছিল, সেই পরিচয়টি নিয়েই সে চিরতরে কবরে শুয়ে আছে—‘গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী’।
অথচ, তার একটি নাম ছিল। তার নাম ছিল মরিয়ম খাতুন।
- নিকি জামান: সংবাদকর্মী
.png)






