জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

২৫ মার্চের গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে করণীয়

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০০: ২৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে বর্বরোচিত সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম সুপরিকল্পিত ও নৃশংস নিধনযজ্ঞ হিসেবে চিহ্নিত। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ছদ্মনামে পরিচালিত এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। এটি কেবল সাধারণ সামরিক হস্তক্ষেপ ছিল না, বরং একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে সমূলে বিনাশ করার এক চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশনায় পরিচালিত এই অভিযানে কোনো সশস্ত্র প্রতিপক্ষ নয়, বরং নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক, ছাত্র-শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ রক্তপাতই বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনিবার্য ঘোষণাকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কে অপরিহার্য করে তুলেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। জগন্নাথ হল এবং তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ জহুরুল হক হল) ছিল এই নৃশংসতার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে ঘুমন্ত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়। লোহমর্ষক বিষয় ছিল এই যে, অনেক শিক্ষার্থীকে বলপূর্বক নিজেদের কবর খুঁড়তে বাধ্য করা হয় এবং পরে সেই কবরের পাশেই তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং ড. ফজলুর রহমানের মতো বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের তাঁদের নিজ বাসভবন থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, যা ছিল বাঙালি জাতিকে মেধা ও মননশূন্য করার এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারের মতো জনবহুল ও সংকীর্ণ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আধুনিক সমরাস্ত্র ও দাহ্য রাসায়নিক (গানপাউডার) ব্যবহার করে। সেখানে ঘরবাড়িতে তালাবদ্ধ অবস্থায় অগ্নিসংযোগ করা হয়, ফলে বহু মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। জীবন বাঁচাতে যারা বাইরে আসার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের ওপর স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ করা হয়। এছাড়া তেজগাঁও ও রমনা সংলগ্ন বস্তি এলাকায় ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান চালিয়ে হাজার হাজার বসতভিটা ধ্বংস করা হয় এবং পলায়নরত ছিন্নমূল নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সাঁজোয়া যানের নিচে পিষ্ট করা হয়।

এই অভিযানের সময় দখলদার বাহিনী যে পরিমাণ অমানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছিল, তা যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে বিরল। নারী ও শিশুদের ওপর চালানো অকথ্য নির্যাতন এবং বেয়োনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ভ্রূণ হত্যার মতো ঘটনাগুলো নিছক হত্যা ছিল না; বরং এটি ছিল জনমনে দীর্ঘস্থায়ী ত্রাস সৃষ্টি করার একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।

রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এবং পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তরে ভারী কামানের গোলা ব্যবহার করে আক্রমণ চালানো হয়। আন্তর্জাতিক সমর আইনের তোয়াক্কা না করে আত্মসমর্পণকারী পুলিশ ও জওয়ানদের হাত-পা বেঁধে সারিবদ্ধভাবে ব্রাশফায়ার করা হয়। এমনকি মৃতদেহের যথাযথ সৎকার করতে না দিয়ে সেগুলোকে গণকবরে নিক্ষেপ বা অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে ফেলা হয়, যা ছিল অত্যন্ত অবমাননাকর এবং অমানবিক।

আজও পাকিস্তান এই নৃশংসতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেনি, যা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বিশ্বশান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ।

১৯৪৮ সালের ৯ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত ‘জেনোসাইড কনভেনশন’-এর ২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জেনোসাইডের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী জেনোসাইড হলো কোনো জাতিগত, জাতিগোষ্ঠীয় বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত যে কোনো এক বা একাধিক নিম্নলিখিত অপরাধমূলক কাজ— ১. কোন জাতি গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা ২. গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি ৩. জীবনযাত্রার মান ধ্বংস করা ৪. জন্মরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ ৫. শিশুদের জোরপূর্বক স্থানান্তর।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে এই পাঁচটি অপরাধই সংঘটিত হয়েছিল। ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, ২ থেকে ৪ লক্ষ নারীর ওপর পরিকল্পিত যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছিল, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং ১ কোটি মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করা, নারীদের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে একটি প্রজন্মের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করা এবং অগণিত শিশুকে তাদের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী হত্যা প্রমাণ করে যে, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ‘এলিটিসাইড’, যার উদ্দেশ্য ছিল জাতিকে মেধাশূন্য করা। সুতরাং, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ২৫শে মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই নিধনযজ্ঞ শতভাগ ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা।

তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাযজ্ঞকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতিসংঘ কর্তৃক এখনো “জেনোসাইড” হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক পরিসরে “জেনোসাইড” হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ার প্রশ্নটি মূলত আইনি নয় বরং গভীরভাবে ভূ-রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে 'গণহত্যা' বা 'জেনোসাইড' বিষয়টি কেবল একটি নৈতিক সংজ্ঞা নয়; বরং এটি ১৯৪৮ সালের 'জেনোসাইড কনভেনশন'-এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো।

এই কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো অপরাধকে 'গণহত্যা' হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য অপরাধ সংগঠনের বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের পাশাপাশি অভিযুক্ত পক্ষের একটি 'সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায়' প্রমাণ করা অপরিহার্য। অর্থাৎ, আইনিভাবে এটি প্রমাণ করতে হয় যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষ একটি নির্দিষ্ট জাতিগত, ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত সত্তাকে আংশিক বা পূর্ণরূপে নির্মূল করার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই উক্ত নৃশংস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে।

এই 'অভিপ্রায়' বা 'উদ্দেশ্য' প্রমাণের বাধ্যবাধকতাই গণহত্যার বিচারিক প্রক্রিয়াকে অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে পৃথক করে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতার ঐতিহাসিক ও দালিলিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই 'উদ্দেশ্য' প্রমাণের প্রশ্নে প্রায়শই কৃত্রিম বিতর্ক জিইয়ে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই আইনি বিতর্ক একটি 'রাজনৈতিক ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই 'উদ্দেশ্য' প্রমাণের দোহাই দিয়ে গণহত্যার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মূলত আইনি এই অজুহাতটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি কৌশলী অবস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা অপরাধের ভয়াবহতাকে আড়াল করে দীর্ঘসূত্রিতার পথ প্রশস্ত করে।

১৯৭১ সালের জেনোসাইড আজও বিশ্বমঞ্চে কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব না পাওয়ার পেছনে জাতিসংঘের কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতাও দায়ী। বিশ্বসংস্থাটি নিজে উদ্যোগী হয়ে কোনো ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে না; এর জন্য প্রয়োজন হয় সদস্য দেশগুলোর জোরালো প্রস্তাব কিংবা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়। কিন্তু জাতিসংঘ মূলত রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি মঞ্চ, যেখানে প্রভাবশালী দেশগুলোর কূটনৈতিক স্বার্থই মূল চালিকাশক্তি।

যদি কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে নেতিবাচক অবস্থান নেয়, তবে ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যা যে আজও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় আটকে আছে, তা এই ক্ষমতার রাজনীতিরই প্রতিফলন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঠাণ্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট অপরিহার্য। সে সময় বিশ্ব দুটি শক্তি বলয়ে বিভক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কৌশলগতভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়, চীন ও পাকিস্তানের পাশে অবস্থান নেয়, অন্যদিকে ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দেয়। এই বিভক্তি জাতিসংঘে কোনো ঐকমত্য গড়ে উঠতে দেয়নি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কূটনৈতিক বিভাজন আজও সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়নি বরং তার প্রভাব নীতিগত অবস্থানে রয়ে গেছে।

বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তার পেছনে একটি প্রধান কারণ হলো 'প্রিসিডেন্ট এংজাইটি' বা নজির তৈরির ভীতি। যদি ১৯৭১ সালের ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'জেনোসাইড' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটা অন্যান্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও সমজাতীয় দাবির পথ প্রশস্ত হবে। অনেক বৃহৎ শক্তির নিজস্ব ইতিহাসের সাথে বিভিন্ন সংঘাতের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।

১৯৭১ সালের সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি প্রদান করলে সেই রাষ্ট্রগুলোও তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। মূলত এই কাঠামোগত ভীতি ও কৌশলগত স্বার্থই ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তিকে দীর্ঘায়িত করছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বয়ান ও অ্যাজেন্ডা নির্ধারণে ক্ষমতার দাপট ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের প্রভাব অনস্বীকার্য। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ইউক্রেন সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেভাবে বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে প্রাধান্য পাচ্ছে, তা মূলত প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের গণহত্যার মতো ঐতিহাসিক সত্যসমূহ সেভাবে দৃশ্যমান নয়। এই বৈষম্য মূলত 'মেমরি পলিটিকস’-এর অংশ, যা নির্দেশ করে যে বিশ্বের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে ইতিহাস নিজেই একরকম বন্দিদশায় রয়েছে। ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়ার ক্ষেত্রে এগুলোই বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।

কিছু রাষ্ট্র, গবেষক এবং মানবাধিকার সংস্থা ১৯৭১ সালের ঘটনাকে “জেনোসাইড” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড স্কলাররা সরব হয়েছেন। জেনোসাইড ওয়াচ, লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন এবং ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর জেনোসাইড স্কলার (আইএজিএস) এর মতো বিশ্বখ্যাত সংস্থাগুলো একাত্তরের নৃশংসতাকে স্পষ্ট ভাষায় ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের মতে, এটি কেবল বাংলাদেশের ইতিহাস নয়, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকারের এক অমীমাংসিত অধ্যায় যা দ্রুত স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।

২০১৭ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫শে মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক ঐকমত্য, অথবা আন্তর্জাতিক আদালতের সুস্পষ্ট রায়। এই দুইয়ের কোনোটি এখনো সম্পূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি। তবে ১৯৭১ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কিছু প্রতিষ্ঠিত পথ আছে, বাংলাদেশ যেগুলো ব্যবহার করে ধাপে ধাপে স্বীকৃতি অর্জন করার পথে অগ্রসর হতে পারে।

একটি বাস্তবসম্মত উপায় হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমে রাষ্ট্রভিত্তিক স্বীকৃতি অর্জন। বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সংসদে প্রস্তাব পাস করাতে পারে, যা পরে জাতিসংঘে বৃহত্তর স্বীকৃতির ভিত্তি গড়ে তুলবে। আর্মেনীয় গণহত্যা (১৯১৫) স্বীকৃতি এভাবে ধাপে ধাপে অর্জিত হয়েছিল। ৩৪টিরও বেশি দেশ (যেমন যুক্তরাষ্ট্র ২০২১, ফ্রান্স, জার্মানি) সংসদে রেজোলিউশন পাস করে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা কূটনৈতিক সম্পর্ক, লবিং এবং ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে।

গণহত্যার স্বীকৃতির আর একটি কার্যকর ধাপ হলো ন্যারেটিভ নির্মাণ। এটি সরাসরি আইনি পথ না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক একাডেমিক গবেষণা ও আর্কাইভ তৈরি, ডকুমেন্টারি, জাদুঘর, এবং গণহত্যা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন, প্রভাবশালী গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা।

ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে সরকারকে একটি শক্তিশালী ‘গ্লোবাল লবিং উইং’ গঠন করতে হবে। প্রতিটি দূতাবাসে ‘জেনোসাইড কর্নার’ স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক পাঠ্যপুস্তকে এই ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা জোরদার করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যেমন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এমনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা, গবেষণা রিপোর্ট, ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও তারা আইনি স্বীকৃতি দেয় না, কিন্তু এজেন্ডা সেটিংয়ে ভূমিকা রাখতে পারে।

সবচেয়ে প্রত্যক্ষ পথ হলো জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশনে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে, অন্যান্য রাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে সেটি পাস করানোর চেষ্টা করতে পারে।ভেটো পাওয়ার সম্পন্ন দেশগুলোসহ অধিকাংশ দেশের সমর্থন পেলে এটি ডি ফ্যাক্টো স্বীকৃতির মতো কাজ করতে পারে। সে জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। তবে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বিরোধিতা করলে প্রস্তাব পাশ কঠিন হয়ে পড়বে। হলোকস্ট (১৯৪১-১৯৪৫) নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের রায় এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়। স্রেব্রেনিকা গণহত্যা (১৯৯৫) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২৪ এ রেজোলিউশন পাস করে (৮৪-১৯ ভোটে) স্বীকৃতি দিয়েছে।

এছাড়াও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করতে পারে, জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী রাষ্ট্রগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনতে পারে, অথবা উভয় রাষ্ট্রই যদি কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা মেনে নেয়, তাহলে মামলা সম্ভব। তবে পাকিস্তান যদি আদালতের এখতিয়ার না মেনে নেয়, প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়বে। রুন্ডান গণহত্যা (১৯৯৪) আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ট্রাইব্যুনালের রায় এবং জাতিসংঘের স্বীকৃতির ফলে বিশ্বব্যাপী মেনে নেওয়া হয়েছে।

এই স্বীকৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শহীদদের ত্যাগের প্রতি সর্বোচ্চ বৈশ্বিক সম্মান। এছাড়া এটি পাকিস্তানকে তাদের অপরাধের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আইনি হাতিয়ার হবে। সর্বোপরি, এটি ভবিষ্যতে যেকোনো প্রান্তে এমন অপরাধ রোধে একটি বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।

২৫শে মার্চের গণহত্যা কেবল বাংলাদেশের ক্ষত নয়, এটি বিশ্ববিবেকের ক্ষত। একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টার পরও বাঙালি আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তবে ন্যায়বিচার ও সত্যের প্রতিষ্ঠায় এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অনিবার্য। ২৫শে মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের দাবি। ইতিহাসের এই রক্তঋণ শোধ করা কেবল বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

ইমেইলঃ [email protected]

সম্পর্কিত