লেখা:

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তার উত্তর অনেককেই বিস্মিত করেছে। আশিক চৌধুরী বলেন, ‘অনেক বিষয়ই আলোচনায় আসবে। তালিকার শুরুতেই থাকবে প্রতিরক্ষা।’
আগামী ২৩ জুন চার দিনের সরকারি সফরে চীনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে তিনি দুই দিনের জন্য মালয়েশিয়া সফর করবেন। সরকারিভাবে সফরটিকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসাকেন্দ্রিক হিসেবে তুলে ধরা হলেও আশিক চৌধুরীর এই মন্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে, বেইজিংয়ে ঢাকার জন্য অপেক্ষা করছে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত এক এজেন্ডা।
নতুন সরকার তাদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে এই সফরকে তুলে ধরলেও বাস্তবে বেইজিংয়ে আলোচনার পরিধি শুধু অর্থনীতি ও বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ কোন কৌশলগত পথে এগোবে, সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে যাচ্ছে।
চীন সফরের প্রথম গন্তব্য হবে ডালিয়ান। সেখানে তারেক রহমান অংশ নেবেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোস সম্মেলনে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ‘১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’, যা ২৩ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত চলবে। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলোইস জুইঙ্গির সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর তিনি বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
অর্থনৈতিক ফোরাম দিয়ে সফর শুরু করার ফলে ঢাকা সফরটিকে প্রথমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। এরপরই শুরু হবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত আলোচনা।
তবে বাংলাদেশের জন্য এই সফরের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। বর্তমানে চীনা সরকার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশের প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রস্তাব ঝুলে আছে। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে সরাসরি ৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার চাচ্ছে ঢাকা। এই অর্থায়নের আওতায় রয়েছে বহুদিন ধরে আলোচিত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ ইতোমধ্যে দ্রুত এগোচ্ছে। গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এই অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে ৪১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
এই প্রকল্পের আওতায় চার লেনের সড়ক, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বহুমুখী জেটি, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ স্থাপন করা হবে। প্রায় ৮০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের জন্য চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে মনোনীত করা হয়েছে।
সফরকালে প্রায় এক ডজন সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। এসব চুক্তির মধ্যে থাকতে পারে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তি হস্তান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাংকিং সহযোগিতা এবং দুই দেশের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি। এ ছাড়া বেইজিংয়ে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তারেক রহমান। সেখানে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হবে।
তবে শুধু অর্থনীতি দিয়ে এই সফরের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা যায় না। আর সে কারণেই বিডার চেয়ারম্যান আলোচনার তালিকায় প্রতিরক্ষাকে সবার ওপরে রেখেছেন।
বাংলাদেশ এখন চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে রয়েছে। প্রতি বিমানের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে ২০টি বিমানের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। বাকি ৮২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা, খুচরা যন্ত্রাংশ, পরিবহন, বীমা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে।
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জে-১০সিই যুদ্ধবিমান পাবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে চীনা সামরিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণগুলোর একটি হবে এটি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সামরিক পর্যায়ের দীর্ঘ পর্যালোচনার পর নীতিগতভাবে এই ক্রয় অনুমোদন করেছিল। বর্তমান সরকার চুক্তিটি চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে।
চীনা যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ বেড়ে যায় ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে চার দিনের সংঘাতের পর। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত ওই সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করেছিল, তাদের জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের রাডার ব্যবস্থা ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
ভারত পাকিস্তানের দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও ঢাকার সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফরাসি যুদ্ধবিমানের উচ্চমূল্যের তুলনায় জে-১০সিই তুলনামূলক কম খরচে বেশি সামরিক সক্ষমতা দিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চীনের ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের রপ্তানি শাখা সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার চুক্তি সই করেছে। এর আওতায় ঢাকায় ড্রোন তৈরি ও সংযোজনের একটি কারখানা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি হস্তান্তরও করা হবে। এটিকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও চীনের ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ইতোমধ্যে চীনের ওপর অতিরিক্ত কৌশলগত নির্ভরতার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন। এর বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও একটি বড় সামরিক প্রস্তাব দিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান, অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার, নাসামস আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। চীনের প্রস্তাবের সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো করেই এই প্যাকেজ সাজানো হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একই সময়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা জিসোমিয়া ও আকসা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঠানো একটি অভিনন্দনপত্র। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি আশা করি, আপনারা দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো সম্পন্ন করবেন, যাতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী অত্যাধুনিক মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পায়।’
তবে তারেক রহমানের সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা না গেলে কোনো নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করা হবে না।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ বা ঋণ আনা নয়। বরং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের উদ্বেগ সামাল দিয়ে নিজের কৌশলগত অবস্থান ঠিক রাখা। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন বাণিজ্য সুবিধাকে ক্রমেই নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করছে। ফলে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি এখন আর আলাদা কোনো বিষয় নয়।
২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়, সেখানে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তও যুক্ত করা হয়। চুক্তির একটি ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি মনে করে।
এই শর্ত ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে গম, সয়াবিন ও তুলা।
চুক্তির আগে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ছিল ৩৭ শতাংশ। প্রথম দফার আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে এই হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয়। তবে এখানেও কিছু শর্ত রয়েছে। চুক্তির ৫.৩ ধারায় বলা হয়েছে, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করা হবে না। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল শুল্ক বহাল থাকায় এই সুবিধা বাস্তবে শিরোনামে যতটা বড় মনে হয়, ততটা নয়।
ঢাকা খুব ভালো করেই জানে, এই ধরনের চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা। তার একটি বড় উদাহরণ হলো বিমানের অর্ডার। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। এর মধ্যে রয়েছে আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স।
কূটনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়, ফেব্রুয়ারির বাণিজ্য চুক্তির সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিরই বাণিজ্যিক বাস্তবায়ন ছিল এই ক্রয়াদেশ। অনেকের মতে, এটি ছিল মূলত একটি ভূরাজনৈতিক বার্তা, যা বেসামরিক বিমান ক্রয়ের আড়ালে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বেইজিংও বিষয়টি নীরবে দেখেনি। গত বছরের জুলাইয়ে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীন শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের অন্যতম স্বল্পোন্নত দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপকে ‘যৌক্তিকও নয়, নৈতিকও নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের চীনমুখী হওয়ার প্রবণতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন দেশগুলোর একটি ভারত।
গত বছরের জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান বলেন, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বার্থ যদি এক জায়গায় এসে মিলে যায়, তাহলে তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এখন ভারতের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা সম্ভবত তিস্তা প্রকল্প। বাংলাদেশ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলারের ঋণ চেয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৪ কোটি ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হবে। পুনরুদ্ধার করা হবে ১৭১ বর্গকিলোমিটার জমি। উত্তরাঞ্চলে শত শত কিলোমিটার বাঁধও পুনর্নির্মাণ করা হবে।
কিন্তু ভারতের উদ্বেগ শুধু নদী বা পানিব্যবস্থাপনা নিয়ে নয়। প্রকল্প এলাকা ভারতের সিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৌশলগত অঞ্চলগুলোর একটি। তাই ভারত মনে করে, এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়লে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভারতের উদ্বেগ আরও বেড়েছে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে ঘিরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত এই বিমানঘাঁটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। বাংলাদেশ চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ঘাঁটিটি আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করছে বলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতও দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছরের মে মাসে ভারতের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ত্রিপুরার উনাকোটি জেলার কৈলাশহর বিমানঘাঁটি পরিদর্শনে একটি দল পাঠায়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে অচল থাকা এই ঘাঁটিকে পুনরায় চালু করার এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তিস্তা প্রকল্প হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ। আর বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন একটি স্বাভাবিক জাতীয় প্রয়োজন। কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। তারা এটিকে নিজেদের সবচেয়ে দুর্বল কৌশলগত অঞ্চলের দিকে চীনের প্রভাব বিস্তারের আরেকটি ধাপ হিসেবে দেখছে।
এই সফরের ওপর আরেকটি ছায়া ফেলছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের একটি ঘটনা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন চীনে গিয়েছিলেন। গুঞ্জন ছিল, তিনি ৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চাইবেন। কিন্তু সফর শেষে তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসেন। শেষ পর্যন্ত চীন মাত্র ১০০ কোটি ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের অনুদান দেয়।
তাই এবার তারেক রহমান ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে চীনে যাচ্ছেন। তার হাতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত সুসংগঠিত প্রকল্প তালিকা। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য একনেকের অনুমোদনও ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। সংসদেও তার শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও কম নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এখনো শিল্পকারখানাকে ভোগাচ্ছে। অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরের পর বছর লেগে যাওয়ার নজিরও রয়েছে।
সবশেষে, বেইজিং থেকে কতগুলো সমঝোতা স্মারক নিয়ে ফিরলেন, সেটিই তারেক রহমানের সফরের একমাত্র মাপকাঠি হবে না।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি চীনের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতা নিতে পারবে? আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও ঢাকা সামাল দিতে পারবে? এই দুই ঝুঁকিই বাস্তব। আর চীনের দিকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঝোঁকের মধ্যে এই সমীকরণ সামলানো সহজ হবে না।
(এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন মাহবুবুল আলম তারেক)

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তার উত্তর অনেককেই বিস্মিত করেছে। আশিক চৌধুরী বলেন, ‘অনেক বিষয়ই আলোচনায় আসবে। তালিকার শুরুতেই থাকবে প্রতিরক্ষা।’
আগামী ২৩ জুন চার দিনের সরকারি সফরে চীনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে তিনি দুই দিনের জন্য মালয়েশিয়া সফর করবেন। সরকারিভাবে সফরটিকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসাকেন্দ্রিক হিসেবে তুলে ধরা হলেও আশিক চৌধুরীর এই মন্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে, বেইজিংয়ে ঢাকার জন্য অপেক্ষা করছে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত এক এজেন্ডা।
নতুন সরকার তাদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে এই সফরকে তুলে ধরলেও বাস্তবে বেইজিংয়ে আলোচনার পরিধি শুধু অর্থনীতি ও বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ কোন কৌশলগত পথে এগোবে, সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে যাচ্ছে।
চীন সফরের প্রথম গন্তব্য হবে ডালিয়ান। সেখানে তারেক রহমান অংশ নেবেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোস সম্মেলনে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ‘১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’, যা ২৩ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত চলবে। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলোইস জুইঙ্গির সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর তিনি বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
অর্থনৈতিক ফোরাম দিয়ে সফর শুরু করার ফলে ঢাকা সফরটিকে প্রথমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। এরপরই শুরু হবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত আলোচনা।
তবে বাংলাদেশের জন্য এই সফরের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। বর্তমানে চীনা সরকার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশের প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রস্তাব ঝুলে আছে। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে সরাসরি ৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার চাচ্ছে ঢাকা। এই অর্থায়নের আওতায় রয়েছে বহুদিন ধরে আলোচিত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ ইতোমধ্যে দ্রুত এগোচ্ছে। গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এই অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে ৪১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
এই প্রকল্পের আওতায় চার লেনের সড়ক, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বহুমুখী জেটি, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ স্থাপন করা হবে। প্রায় ৮০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের জন্য চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে মনোনীত করা হয়েছে।
সফরকালে প্রায় এক ডজন সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। এসব চুক্তির মধ্যে থাকতে পারে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তি হস্তান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাংকিং সহযোগিতা এবং দুই দেশের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি। এ ছাড়া বেইজিংয়ে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তারেক রহমান। সেখানে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হবে।
তবে শুধু অর্থনীতি দিয়ে এই সফরের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা যায় না। আর সে কারণেই বিডার চেয়ারম্যান আলোচনার তালিকায় প্রতিরক্ষাকে সবার ওপরে রেখেছেন।
বাংলাদেশ এখন চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে রয়েছে। প্রতি বিমানের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে ২০টি বিমানের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। বাকি ৮২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা, খুচরা যন্ত্রাংশ, পরিবহন, বীমা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে।
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জে-১০সিই যুদ্ধবিমান পাবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে চীনা সামরিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণগুলোর একটি হবে এটি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সামরিক পর্যায়ের দীর্ঘ পর্যালোচনার পর নীতিগতভাবে এই ক্রয় অনুমোদন করেছিল। বর্তমান সরকার চুক্তিটি চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে।
চীনা যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ বেড়ে যায় ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে চার দিনের সংঘাতের পর। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত ওই সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করেছিল, তাদের জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের রাডার ব্যবস্থা ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
ভারত পাকিস্তানের দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও ঢাকার সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফরাসি যুদ্ধবিমানের উচ্চমূল্যের তুলনায় জে-১০সিই তুলনামূলক কম খরচে বেশি সামরিক সক্ষমতা দিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চীনের ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের রপ্তানি শাখা সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার চুক্তি সই করেছে। এর আওতায় ঢাকায় ড্রোন তৈরি ও সংযোজনের একটি কারখানা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি হস্তান্তরও করা হবে। এটিকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও চীনের ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ইতোমধ্যে চীনের ওপর অতিরিক্ত কৌশলগত নির্ভরতার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন। এর বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও একটি বড় সামরিক প্রস্তাব দিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান, অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার, নাসামস আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। চীনের প্রস্তাবের সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো করেই এই প্যাকেজ সাজানো হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একই সময়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা জিসোমিয়া ও আকসা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঠানো একটি অভিনন্দনপত্র। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি আশা করি, আপনারা দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো সম্পন্ন করবেন, যাতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী অত্যাধুনিক মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পায়।’
তবে তারেক রহমানের সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা না গেলে কোনো নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করা হবে না।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ বা ঋণ আনা নয়। বরং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের উদ্বেগ সামাল দিয়ে নিজের কৌশলগত অবস্থান ঠিক রাখা। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন বাণিজ্য সুবিধাকে ক্রমেই নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করছে। ফলে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি এখন আর আলাদা কোনো বিষয় নয়।
২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়, সেখানে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তও যুক্ত করা হয়। চুক্তির একটি ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি মনে করে।
এই শর্ত ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে গম, সয়াবিন ও তুলা।
চুক্তির আগে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ছিল ৩৭ শতাংশ। প্রথম দফার আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে এই হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয়। তবে এখানেও কিছু শর্ত রয়েছে। চুক্তির ৫.৩ ধারায় বলা হয়েছে, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করা হবে না। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল শুল্ক বহাল থাকায় এই সুবিধা বাস্তবে শিরোনামে যতটা বড় মনে হয়, ততটা নয়।
ঢাকা খুব ভালো করেই জানে, এই ধরনের চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা। তার একটি বড় উদাহরণ হলো বিমানের অর্ডার। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। এর মধ্যে রয়েছে আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স।
কূটনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়, ফেব্রুয়ারির বাণিজ্য চুক্তির সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিরই বাণিজ্যিক বাস্তবায়ন ছিল এই ক্রয়াদেশ। অনেকের মতে, এটি ছিল মূলত একটি ভূরাজনৈতিক বার্তা, যা বেসামরিক বিমান ক্রয়ের আড়ালে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বেইজিংও বিষয়টি নীরবে দেখেনি। গত বছরের জুলাইয়ে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীন শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের অন্যতম স্বল্পোন্নত দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপকে ‘যৌক্তিকও নয়, নৈতিকও নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের চীনমুখী হওয়ার প্রবণতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন দেশগুলোর একটি ভারত।
গত বছরের জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান বলেন, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বার্থ যদি এক জায়গায় এসে মিলে যায়, তাহলে তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এখন ভারতের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা সম্ভবত তিস্তা প্রকল্প। বাংলাদেশ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলারের ঋণ চেয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৪ কোটি ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হবে। পুনরুদ্ধার করা হবে ১৭১ বর্গকিলোমিটার জমি। উত্তরাঞ্চলে শত শত কিলোমিটার বাঁধও পুনর্নির্মাণ করা হবে।
কিন্তু ভারতের উদ্বেগ শুধু নদী বা পানিব্যবস্থাপনা নিয়ে নয়। প্রকল্প এলাকা ভারতের সিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৌশলগত অঞ্চলগুলোর একটি। তাই ভারত মনে করে, এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়লে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভারতের উদ্বেগ আরও বেড়েছে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে ঘিরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত এই বিমানঘাঁটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। বাংলাদেশ চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ঘাঁটিটি আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করছে বলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতও দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছরের মে মাসে ভারতের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ত্রিপুরার উনাকোটি জেলার কৈলাশহর বিমানঘাঁটি পরিদর্শনে একটি দল পাঠায়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে অচল থাকা এই ঘাঁটিকে পুনরায় চালু করার এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তিস্তা প্রকল্প হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ। আর বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন একটি স্বাভাবিক জাতীয় প্রয়োজন। কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। তারা এটিকে নিজেদের সবচেয়ে দুর্বল কৌশলগত অঞ্চলের দিকে চীনের প্রভাব বিস্তারের আরেকটি ধাপ হিসেবে দেখছে।
এই সফরের ওপর আরেকটি ছায়া ফেলছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের একটি ঘটনা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন চীনে গিয়েছিলেন। গুঞ্জন ছিল, তিনি ৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চাইবেন। কিন্তু সফর শেষে তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসেন। শেষ পর্যন্ত চীন মাত্র ১০০ কোটি ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের অনুদান দেয়।
তাই এবার তারেক রহমান ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে চীনে যাচ্ছেন। তার হাতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত সুসংগঠিত প্রকল্প তালিকা। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য একনেকের অনুমোদনও ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। সংসদেও তার শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও কম নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এখনো শিল্পকারখানাকে ভোগাচ্ছে। অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরের পর বছর লেগে যাওয়ার নজিরও রয়েছে।
সবশেষে, বেইজিং থেকে কতগুলো সমঝোতা স্মারক নিয়ে ফিরলেন, সেটিই তারেক রহমানের সফরের একমাত্র মাপকাঠি হবে না।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি চীনের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতা নিতে পারবে? আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও ঢাকা সামাল দিতে পারবে? এই দুই ঝুঁকিই বাস্তব। আর চীনের দিকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঝোঁকের মধ্যে এই সমীকরণ সামলানো সহজ হবে না।
(এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন মাহবুবুল আলম তারেক)
.png)

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
১০ ঘণ্টা আগে
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।
১২ আগস্ট ২০২৬