ভোলায় ৩ ট্রাক ইলিশ জব্দ, উৎস নিয়ে বিতর্ক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ভোলা

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১৩: ০৭
অভিযানে জব্দ করা হয় কোটি টাকার ইলিশ

ভোলায় তিন ট্রাক ইলিশ জব্দকে কেন্দ্র করে কোস্ট গার্ড, মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে দ্বন্দ্ব। জেলেদের ধরা নদীর ইলিশ সাগরের বলে জব্দ হয়েছে, নাকি নদী থেকে ধরার কাগজ দেখিয়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সাগরের ইলিশ বাজারে ঢুকছিল, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এর পেছনে ‘ভিন্ন কারণও’ দেখছেন ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ।

কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগের একটি অংশের দাবি, সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আহরিত ইলিশ বাজারজাত করা হচ্ছিল।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, জব্দ হওয়া মাছগুলো নদীর। এজন্য তাঁদের কাছে মৎস্য বিভাগের অনুমতিপত্রও আছে। কিন্তু সেই মাছই সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রের মাছ বলে জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড।

এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবার বলেছেন, চোখে দেখে মাছ সাগরের নাকি নদীর, তা নির্ণয় করা ‘জটিল’।

জব্দ হওয়া ইলিশ। স্ট্রিম ছবি
জব্দ হওয়া ইলিশ। স্ট্রিম ছবি

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ৪৭৫ প্রজাতির মাছের অবাধ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিতে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এর আগে জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস নদীর নির্ধারিত এলাকাতে সব ধরনের জাল ফেলা ও মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এখন নদীতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা উঠলেও সাগরেরটি চলছে।

এর মধ্যে মঙ্গলবার (১২ মে) নদীর ইলিশ হিসেবে ওই মাছ পরিবহনে চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে উপজেলার সামরাজ মাছঘাটের ব্যবসায়ী মোশারেফ হোসেন বাশার ও নতুন স্লুইজঘাটের ব্যবসায়ী কামাল হোসেনকে অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সেই অনুমতিপত্র নিয়ে ট্রাকে করে ঢাকায় নেওয়ার পথে রাতেই কোস্ট গার্ড মাছগুলো জব্দ করেন। পরে ভোলা সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাছগুলো ‘সামুদ্রিক ইলিশ’ হিসেবে শনাক্ত করলে বুধবার দুপুরে সেগুলো স্থানীয় এতিমখানা ও অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

দুই ট্রাক ইলিশ জব্দ করা হয়। স্ট্রিম ছবি
দুই ট্রাক ইলিশ জব্দ করা হয়। স্ট্রিম ছবি

বুধবার রাতে এ নিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় কোস্টগার্ড। এতে জানানো হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার মধ্যরাতে কোস্টগার্ড ও সদর উপজেলা মৎস্য অফিস ভোলা শহরের পান বাজার এলাকা থেকে তিন ট্রাক মাছ জব্দ করা হয়। পরে মাছের ট্রাকগুলো তল্লাশি করে দুটি ট্রাকে প্রায় ১০ হাজার ১৪০ কেজি সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। বাকি একটি ট্রাকে সামুদ্রিক মাছ না থাকায় সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে ভোলা সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভুইয়া জানান, জব্দ করা মাছের বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

মাছ পরিবহনের অনুমতিপত্র
মাছ পরিবহনের অনুমতিপত্র

মাছগুলো সামুদ্রিক হয়ে থাকলে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পরিবহনের জন্য চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কীভাবে ছাড়পত্র দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো অবৈধ মাছের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। ছাড়পত্রে উল্লেখ আছে, এরমধ্যে কোনো অবৈধ মাছ থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এজন্যই আমরা মাছগুলো জব্দ করেছি।’

চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ ঘাটের মাছ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সেখানে এখনও অভিযানের রেশ কাটেনি। আড়তজুড়ে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তারা বলছে, মঙ্গলবার রাতের অভিযানের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা একেবারে পথে বসে গেছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী কামাল হোসেন জানান, তারা নিয়ম মেনেই নদী থেকে আহরিত ইলিশ সংগ্রহ করেছিলেন। মাছ পরিবহনের জন্য উপজেলা মৎস্য বিভাগের কাছ থেকে অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। এরপরও কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে মাছ জব্দ করেছে।

ব্যবসায়ী মোশারেফ হোসেন বলেন, ‘আমরা নদীর মাছ কিনেছি। মৎস্য অফিস থেকে কাগজ নিয়েই পরিবহন করছিলাম। তারপরও মাছ জব্দ করা হয়েছে। এতে আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি।’

তল্লাশির পর মাছগুলো ‘সাগরের ইলিশ’ বলে শনাক্ত করেন সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা
তল্লাশির পর মাছগুলো ‘সাগরের ইলিশ’ বলে শনাক্ত করেন সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা

চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ‘যে মাছগুলো আটক করেছে, এগুলো ইলিশ। নদীর ইলিশ দেখেই আমরা এই মাছ পরিবহনের জন্য ছাড়পত্র দিয়েছি। যারা মাছগুলো আটক করেছে, তারা কী দেখে বুঝল এগুলো সামুদ্রিক মাছ? আমি ১৪ বছর উপকূলীয় এলাকায় চাকরি করেও মাঝে মধ্যে সাগর ও নদীর ইলিশ চিনতে কষ্ট হয়।’

একই সুরে কথা বলেন ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, সাগরের কাছাকাছি নদীগুলোতে ধরা মাছ নদীর নাকি সাগরের—তা নির্ধারণ করা কঠিন। তাঁর মতে, মাছগুলো ঘাটে জব্দ করা হলে বিষয়টি যাচাইয়ের সুযোগ থাকত। কিন্তু ঘাট থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে সড়কে আটক করলে সেগুলো সাগরের নাকি নদীর, তা নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এত দূরে এসে মাছের উৎস নির্ণয়ের বাস্তব সুযোগ থাকে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, স্থানীয় কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় কিছু তথাকথিত ‘তথ্যদাতা’ (সোর্স) কোস্টগার্ডের নাম ব্যবহার করে জেলে ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় চাঁদা দাবি করেন। তাদের চাঁদা দেওয়া না হলে প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে মাছ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করেন।

এসব সোর্সের কারণেই এমন ‘অসামঞ্জস্য অভিযান’ চালানো হয় বলে দাবি জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত