দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। স্বাধীনতার সমবয়সী বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় গৌরব ও ঐতিহ্যের ৫৫ বছর পেরিয়ে ৫৬ বছরে পদার্পণ করল সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত জাবি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এক শিক্ষার্থীর স্মৃতিচারণ।
নাহিদা নাহিদ

দুই যুগ—শুনে মনে হয় কত যে দীর্ঘ পথ, কত যে ক্লান্তি, কত যে সংগ্রাম! কিন্তু না, জাহাঙ্গীরনগর শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, প্রেয়সী বিচ্ছেদের মতো এক প্রগাঢ় বেদনা। ২০০২ সাল, ৩১ ব্যাচের পরিচয়ে জাহাঙ্গীরনগরে প্রথম পদার্পণ আমার। বাংলা বিভাগের করিডোরে অপেক্ষমাণ এক তরুণীর চোখে যা কিছু স্পষ্ট হয়েছে, সবই ছিল এক অনন্য বিস্ময়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাচমেট, অগ্রজ-অনুজ, শিক্ষক, আবাসিক হলসমূহ, প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক সেই পুরনো ধাঁচের লাল ইটের ভবন, সবুজ বাস, হলুদ জিনিয়া আর লাল মাটির অভাবনীয় সুন্দরের ঘোরে বিভোর হয়েছি, পূজারি হয়েছি, হয়েছি প্রেমাচ্ছন্ন। হ্যাঁ, লিঙ্গভেদে জাবিয়ান সকলেই আসলে প্রেমিক হয়ে ওঠে। অ্যাকাডেমিক অধ্যয়ন সমাপনে সেই প্রেয়সীকে বিদায় জানাতে হয়েছে ২০০৮-এ। জীবনের পরবর্তী ধাপে পেয়েছি অজস্র পথ ও মত; উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণে পুনরায় তার বুকে ফিরে গেলেও পাইনি সদ্য কৈশোর পেরুনো সেই রূপবতী প্রেয়সীকে। বিষাদের ডানায় ভর করে তাকে দেখেছি বদলে যাওয়া এক নতুন অবয়বে। জনতার কোলাহলে নির্জনতা ফুরিয়েছে তার, চকচকে পলিশ করা গালে যেন নেই চিরচেনা সবুজ। চোখে নেই বিস্মৃতির অনুতাপ। আমার স্মৃতির জাহাঙ্গীরনগর, আমার নস্টালজিক অনুভূতির এক প্রগাঢ় ও গহীন বেদনা। তাকে নিয়ে বলা যায় অজস্র, ফুরোয় না কথা।
যে জাহাঙ্গীরনগর সত্তায় এমনভাবে মিশে আছে, সেখানে কি শুধু অধ্যয়নের জন্যই গিয়েছিলাম? হয়তো না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অজস্র মিথ—কিছু সত্য, কিছুটা আবার কল্পনাপ্রসূত। এখানে আছে র্যাগিং ও গেস্টরুম কালচার, গণরুমের সীমাহীন সংকট, ছাত্র রাজনীতি ও দখলদারিত্বের লড়াই, মাদকের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ, সেশনজট, বহিরাগতদের উপদ্রব, নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং অসতর্ক যানবাহনের চলাচল। তবু এসবের মাঝে অন্য এক সমান্তরাল জীবন বহমান থাকে এখানে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য, বিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চা, পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুবিধা, প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশ, বটতলার খাবারের ঐতিহ্য, ব্যাচভিত্তিক সংহতি, কোলাহলহীন শান্তিপূর্ণ আবহাওয়া, দূষণমুক্ত পরিবেশ, ধর্ম-বর্ণের একাত্মবোধ ও সংহতি নিয়েই জাহাঙ্গীরনগর।
৭০০ একরের জাহাঙ্গীরনগর একটা বড় গ্রাম যেন, ঘরগুলো সব পুরনো; জ্যামিতিক নকশার সে ঘরে আলো আসে, আসে দমকা বাতাস। এর উঠোনে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে অমর একুশে, শহীদ মিনার, সংশপ্তক। শুনেছি এখানে পড়লেই নাকি মানুষ পচে যায়; অথচ প্রিজারভেটিভ না থাকলেও জাহাঙ্গীরনগরে কেউ কোনোদিন বৃদ্ধ হয় না। কেন হয় না? কারণ প্রকৃতি এখানে এতই উদার যে, মানুষ তো বটেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, জলাশয়, বন ও জঙ্গলে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে নানা জাতের পাখি, পতঙ্গ ও সরীসৃপ। পানকৌড়ি, জলময়ূর, ছোট সরালি, গার্গিনি, চিতা টুপি, শামুকভাঙা ও খোঁপাডুবুরির মতো অসংখ্য শীতের পাখির আনাগোনা নভেম্বরের শুরু থেকেই আমন্ত্রিত অতিথির মতো বাড়তে থাকে, থেকে যায় মার্চ অবধি। আমাদের সময় থেকেই দেখে আসছি প্রাণিবিদ্যা বিভাগসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন পাখি শনাক্তকরণ প্রতিযোগিতা, পরিবেশ বিষয়ক বিতর্ক ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। প্রতি শীতে কত মানুষকে দেখেছি এই নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে ক্যাম্পাসে ছুটে আসতে। তবে প্রকৃতি এখানে শুধু আনন্দই দেয় না, মাঝে মাঝে ভিন্ন আতঙ্কও দেয়। নির্জন ও জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে কত যে বিষধর সাপ; গুইসাপের আধিপত্যও এখানে কম নয়। আর সন্ধ্যা হতেই শেয়ালের সেই 'হুক্কাহুয়া' ডাক ক্যাম্পাসে এক রহস্যময় ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
ঋতুভেদে এখানে ফুল, ফল ও ফসলের সৌন্দর্য উপভোগ করার বিষয়টি অনন্য। গ্রীষ্মের দাবদাহে কালবোশেখী ঝড়ের তাণ্ডব দেখার জন্য যেমন হ্রদের পাড় আছে, তেমনি বর্ষার কূল প্লাবিত রূপ দেখার জন্য আছে পিচঢালা কালো পথ। এই আঙিনায় কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সোনালু, কনকচূড়া আর ক্যাশিয়া জাভানিকার বর্ণিল মেলা বসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, শহিদ মিনার কিংবা লেকের পাড়—সবখানেই লাল, বেগুনি ও হলুদ ফুলের শোভা। বিশেষ করে ক্যাশিয়া রেনিজেরার গোলাপি আভা আর বাতাসে দোল খাওয়া জারুলের বেগুনি রং ক্যাম্পাসে এক নৈসর্গিক পরিবেশ তৈরি করে। শীতের সকালে কুয়াশায় মোড়ানো বড় বড় মেজেন্টা রঙের শাপলাগুলো যেন সবার আয়ু বাড়িয়ে দেয়। বসন্তে বাহারি ফুল ছাড়াও প্রজাপতির অজস্র রঙিন পাখার সঙ্গে পরিচয় হয় সবার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রজাপতি সংরক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছরই 'প্রজাপতি মেলা'র আয়োজন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের আয়োজনের শ্লোগান ছিল সম্ভবত—'উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি'। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই ক্যাম্পাসেই পাওয়া যায় শরতের শুভ্র নীল আকাশ; হেমন্তও এখানে আসে উৎসবের সাজে। জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট প্রতি বছর নবান্ন ও ঋতু উৎসবের মাধ্যমে নতুন চালের গন্ধ, শিশিরভেজা ঘাস আর কাশফুলের বিদায়কে উদযাপন করে।
এ যেন এক আনন্দনগর। বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণে এর সঙ্গে রক্ত-মাংস আর অস্থিতে মিশে যাওয়ার সুযোগ মেলে এখানে অধ্যয়নরত শীক্ষার্থীদের। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন একদম মিশে গিয়েছিলাম। পুরাতন কলা ভবন, ট্রান্সপোর্ট, প্রান্তিক আর বটতলা—এই ছিল আমাদের বিচরণক্ষেত্র। সান্ধ্যকালীন প্রণয়ী-প্রণয়িনীর কাছে স্টেট বিল্ডিং বা সেন্ট্রাল মাঠের আবেদন কিঞ্চিৎ বেশি থাকলেও আড্ডাবাজ আমজনতার কাছে আদরণীয় ছিল মুক্তমঞ্চ। ক্যাফেটেরিয়ায় বেজে চলা জেমস, হাসান, বাচ্চু বা বাপ্পা মজুমদারের গানের সঙ্গে কফির মগ হাতে আড্ডা। কেউ কেউ গিটার নিয়ে আসত, ছোট ছোট জটলায় শোনা যেত সঞ্জীব, তাহসান কিংবা আনুশেহ আনাদিলের গান। প্রতি শীতে হতো বড় বড় কনসার্ট। সাংস্কৃতিক রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরে গানের পাশাপাশি নাটক ও আবৃত্তিও চলত সমানতালে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল নাট্য উৎসবগুলো। সেলিম আল দীন স্যার তখন বেঁচে ছিলেন; তাঁর নির্দেশনায় 'কিত্তনখোলা', 'কেরামতমঙ্গল', 'চাকা', 'যৈবতী কন্যার মন', 'হাতহদাই', 'হরগজ' কিংবা 'নিমজ্জন'-এর মতো মঞ্চনাটক দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। ঢাকা থিয়েটার, আরণ্যক, নাগরিক নাট্যাঙ্গন বা পদাতিক নাট্য সংসদের নাম আমরা জাহাঙ্গীরনগরে পড়েই জেনেছি। 'ধ্বনি' আর 'জলসিঁড়ি' ছিল আমাদের সময়ের ভীষণ জনপ্রিয় সংগঠন। জলসিঁড়ির প্রযোজনায় 'চন্দ্রাবতী' দেখে মুগ্ধ হওয়ার বোধ এখনো কাটেনি। চারুকলা তখন না থাকলেও এখন তাদের শিল্পপ্রয়াসে ক্যাম্পাসের দেয়ালগুলো আলপনা আর গ্রাফিতিতে সেজে থাকে। আমাদের সময়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির আবেদন ছিল অন্যরকম; কারণ বিসিএসের আগ্রাসন তখনও শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ করালভাবে গ্রাস করেনি। নানা বিষয়ের বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে সেই গ্রন্থাগারে বসে থাকা ছিল প্রশান্তির অংশ। বর্তমানে প্রযুক্তির আলো ছড়াতে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন আইটি গবেষণা সেল, যা শিক্ষার্থীদের নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ করে তুলছে কিন্তু আমাদের যুগে আমরা ছিলাম পুরোপুরিই এনালগের। এমনকি ইন্টারনেটের সঙ্গেও পরিচয় হয়নি তেমন। প্রান্তিক-ডেইরিতে গিয়ে কম্পিউটারের দোকান থেকে দু একটা পেজ কম্পোজ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আমাদের প্রযুক্তি জ্ঞান। হলে ইন্টারকমে ফোন আসতো। হলের খালা-মামারা উঁচু গলায় ডেকে দিতেন ওপাশের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটিকে। এছাড়া কার্ড কিনে বুথ থেকে ফোন করার সুযোগও ছিল। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোন এলে ডাকাডাকির পর্বটা গতি হারায়। আমরা হয়ে উঠি ডিজিটাল।
দুই যুগ আগের সেইসব দিনে জাহাঙ্গীরনগরে আমরা সরল জীবন দেখেছি। দেখেছি সাংস্কৃতিক সাম্যের সঙ্গে রাজনৈতিক সাম্যাবস্থা। জাহানারা ইমাম হলের আবাসিক ছাত্রী হিসেবে দেখেছি পাশাপাশি রুমে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। বাম আন্দোলনের নেত্রীদের সঙ্গেও ছিল প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক। যদিও ভয়ের রাজনীতি বা হল দখলের বিবাদ একদলীয় গোত্রের মধ্যে হর-হামেশাই হতো কিন্তু এখনকার মতো অসহনীয় একতরফা আধিপত্য ছিল কম। জাহাঙ্গীরনগরে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কটির কথা সবাই বলে। র্যাগিংয়ের মতো বিকৃত মানসিকতা তখন যে একদম ছিল না তা বলব না, তবে তা ছিল কেবল ফাই-ফরমাশ খাটা বা নেচে-গেয়ে দেখানোর মতো সাধারণ বিষয়। বর্তমান সময়ের অবস্থা হয়তো ভিন্ন। এখন যখন সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখতে পাই নেক্কারজনক র্যাগিং; তখন বিব্রত লাগে। মনে হয় জাবিয়ান হিসেবে আমরা যে সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ধারণ করি তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সম্প্রীতির এই বন্ধনটুকুই আমাদের পুঁজি। জাবিয়ানরা তার শেকড়ের পরিচর্যা করে, ভুলে যায় না জঠরের টান। এর জন্য কত যুদ্ধ আমাদের। বলা হয় 'জাবিয়ান সিন্ডিকেট' ভয়ংকর! যেখানে আপন ভাই ভাইকে পিতা পুত্রকে স্বার্থের জন্য এক কানাকড়ি ছাড়ে না সেখানে এক জাবিয়ান আরেক জাবিয়ানকে কী বা ছেড়ে দেয় আত্মিক প্রেমটুকু ছাড়া; অথচ ওইটুকু নিয়েই আমাদের বিরূপ সমালোচনা সইতে হয়। আদতেই 'ব্যাধিই সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়'।
প্রচলিত ভাষ্যে জাহাঙ্গীরনগরের সাবেক শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্ক খুব শক্ত থাকে এবং তাদের অ্যালামনাইরা দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে একে অন্যকে টানে। এই টানাটানির প্রথাটা যেভাবে দেখা হয় বাস্তবতা তেমন নয়। যেহেতু বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর তাই পরিবারের বাইরে বিভাগ ছাড়াও হলে তারা একে অন্যের সঙ্গে দীর্ঘসময় সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির সময় পায়। যে সম্পর্কটাকে পরবর্তী জীবনেও তারা বহন করে কেউ কেউ। নিজ ব্যাচমেটদের সঙ্গেও গণরুম কালচারের মধ্য দিয়ে এ ধরনের জাবিয়ান কালচারের চর্চা করে তারা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চুরির ঘটনা, পোকামাকড়ের উপদ্রব সয়ে তারা পরস্পরের কাছাকাছি হয়, আফসোস অসাধারণ এই মানবিক সম্প্রীতিটুকু র্যাগিংয়ের আগ্রাসনে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
বাক-স্বাধীনতার প্রশ্নে জাহাঙ্গীরনগরকে সবসময় সাহসী ও স্পষ্টবাদী হিসেবে দেখেছি। রাষ্ট্রের যেকোনো নাজুক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন তুলেছে এখানকার ছাত্রসমাজ। যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্র অধিকারের প্রশ্নে তারা সবসময় আপসহীন। আমাদের সময়ে অধিকাংশ জাবিয়ানই ছিল প্রগতিশীল ঘরানার। সকল ধর্মীয় উৎসব এখানে জাঁকজমকভাবে পালিত হতো, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে রক্ষার উদাহরণও বলা যায়। ক্যাফেটেরিয়া ও টিএসসির আড্ডাগুলোতে একসময় গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক আলোচনা হতো; যা এখন হয়তো টারজান পয়েন্ট বা ক্যাফেটেরিয়ার চায়ের আসরে নতুন রূপে চর্চিত হয়। এখানকার পরিবেশ একজন শিক্ষার্থীকে আত্মনির্ভরশীল ও সাহসী করে তোলে বলেই হয়তো তারা স্বতন্ত্র হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থের কাছে সেইসব পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ক্যাম্পাসের অন্ধকার পথগুলো—ডেইরি গেট থেকে জাহানারা ইমাম হল পর্যন্ত আসার সময় ছিনতাইকারী বা অশরীরী ভূতের যে ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরো নতুন নতুন ভয়। ভিন্নমত গ্রহণ না করার ভয় আমাদের দিনকে দিন সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর করে দিচ্ছে মনে হয়।
প্রগতির চাকায় চড়ে অনেক কিছুই বদলেছে বদলাবে আরো। দুই যুগ পর আজকের জাহাঙ্গীরনগর অনেক বেশি যান্ত্রিক। 'অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের' বিশাল সব অট্টালিকা আবাসন সংকট মেটানোর আশ্বাস দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই কংক্রিটের ভিড়ে হারিয়ে গেছে আমাদের আঁতুড়ের উষ্ণ আরাম। গাছ কমছে, পাখি কমছে, প্রাণীদের অবাধ বিচরণ আজ সীমিত। শীতে আগত পাখি শিকারে আজ মানুষের উল্লাস দেখা যায়। হ্রদের স্বচ্ছ জলে শাপলার বদলে ভাসে প্লাস্টিকের বোতল আর চিপসের প্যাকেট। প্রজাপতির রঙিন পাখা খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় মাদকের তীব্র গন্ধ। যত্রতত্র খাবারের দোকান আর শাড়ির মেলার ভিড়ে নিজেকে আজ ভীষণভাবে 'আউটসাইডার' মনে হয়। শঙ্কা জাগে, হয়তো একদিন পাখি উৎসব বা প্রজাপতি মেলা নামগুলো টিকে থাকবে, কিন্তু যাদের নিয়ে উৎসব—সেই পাখি বা প্রজাপতিরাই আর থাকবে না। আসবে না আর ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়া কোনো প্রাক্তন। অভিমানে এমন করে হয়তো লিখবে না বিষাদগাথা। এটাই হয়তো ভবিতব্য।

দুই যুগ—শুনে মনে হয় কত যে দীর্ঘ পথ, কত যে ক্লান্তি, কত যে সংগ্রাম! কিন্তু না, জাহাঙ্গীরনগর শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, প্রেয়সী বিচ্ছেদের মতো এক প্রগাঢ় বেদনা। ২০০২ সাল, ৩১ ব্যাচের পরিচয়ে জাহাঙ্গীরনগরে প্রথম পদার্পণ আমার। বাংলা বিভাগের করিডোরে অপেক্ষমাণ এক তরুণীর চোখে যা কিছু স্পষ্ট হয়েছে, সবই ছিল এক অনন্য বিস্ময়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাচমেট, অগ্রজ-অনুজ, শিক্ষক, আবাসিক হলসমূহ, প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক সেই পুরনো ধাঁচের লাল ইটের ভবন, সবুজ বাস, হলুদ জিনিয়া আর লাল মাটির অভাবনীয় সুন্দরের ঘোরে বিভোর হয়েছি, পূজারি হয়েছি, হয়েছি প্রেমাচ্ছন্ন। হ্যাঁ, লিঙ্গভেদে জাবিয়ান সকলেই আসলে প্রেমিক হয়ে ওঠে। অ্যাকাডেমিক অধ্যয়ন সমাপনে সেই প্রেয়সীকে বিদায় জানাতে হয়েছে ২০০৮-এ। জীবনের পরবর্তী ধাপে পেয়েছি অজস্র পথ ও মত; উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণে পুনরায় তার বুকে ফিরে গেলেও পাইনি সদ্য কৈশোর পেরুনো সেই রূপবতী প্রেয়সীকে। বিষাদের ডানায় ভর করে তাকে দেখেছি বদলে যাওয়া এক নতুন অবয়বে। জনতার কোলাহলে নির্জনতা ফুরিয়েছে তার, চকচকে পলিশ করা গালে যেন নেই চিরচেনা সবুজ। চোখে নেই বিস্মৃতির অনুতাপ। আমার স্মৃতির জাহাঙ্গীরনগর, আমার নস্টালজিক অনুভূতির এক প্রগাঢ় ও গহীন বেদনা। তাকে নিয়ে বলা যায় অজস্র, ফুরোয় না কথা।
যে জাহাঙ্গীরনগর সত্তায় এমনভাবে মিশে আছে, সেখানে কি শুধু অধ্যয়নের জন্যই গিয়েছিলাম? হয়তো না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অজস্র মিথ—কিছু সত্য, কিছুটা আবার কল্পনাপ্রসূত। এখানে আছে র্যাগিং ও গেস্টরুম কালচার, গণরুমের সীমাহীন সংকট, ছাত্র রাজনীতি ও দখলদারিত্বের লড়াই, মাদকের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ, সেশনজট, বহিরাগতদের উপদ্রব, নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং অসতর্ক যানবাহনের চলাচল। তবু এসবের মাঝে অন্য এক সমান্তরাল জীবন বহমান থাকে এখানে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য, বিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চা, পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুবিধা, প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশ, বটতলার খাবারের ঐতিহ্য, ব্যাচভিত্তিক সংহতি, কোলাহলহীন শান্তিপূর্ণ আবহাওয়া, দূষণমুক্ত পরিবেশ, ধর্ম-বর্ণের একাত্মবোধ ও সংহতি নিয়েই জাহাঙ্গীরনগর।
৭০০ একরের জাহাঙ্গীরনগর একটা বড় গ্রাম যেন, ঘরগুলো সব পুরনো; জ্যামিতিক নকশার সে ঘরে আলো আসে, আসে দমকা বাতাস। এর উঠোনে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে অমর একুশে, শহীদ মিনার, সংশপ্তক। শুনেছি এখানে পড়লেই নাকি মানুষ পচে যায়; অথচ প্রিজারভেটিভ না থাকলেও জাহাঙ্গীরনগরে কেউ কোনোদিন বৃদ্ধ হয় না। কেন হয় না? কারণ প্রকৃতি এখানে এতই উদার যে, মানুষ তো বটেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, জলাশয়, বন ও জঙ্গলে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে নানা জাতের পাখি, পতঙ্গ ও সরীসৃপ। পানকৌড়ি, জলময়ূর, ছোট সরালি, গার্গিনি, চিতা টুপি, শামুকভাঙা ও খোঁপাডুবুরির মতো অসংখ্য শীতের পাখির আনাগোনা নভেম্বরের শুরু থেকেই আমন্ত্রিত অতিথির মতো বাড়তে থাকে, থেকে যায় মার্চ অবধি। আমাদের সময় থেকেই দেখে আসছি প্রাণিবিদ্যা বিভাগসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন পাখি শনাক্তকরণ প্রতিযোগিতা, পরিবেশ বিষয়ক বিতর্ক ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। প্রতি শীতে কত মানুষকে দেখেছি এই নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে ক্যাম্পাসে ছুটে আসতে। তবে প্রকৃতি এখানে শুধু আনন্দই দেয় না, মাঝে মাঝে ভিন্ন আতঙ্কও দেয়। নির্জন ও জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে কত যে বিষধর সাপ; গুইসাপের আধিপত্যও এখানে কম নয়। আর সন্ধ্যা হতেই শেয়ালের সেই 'হুক্কাহুয়া' ডাক ক্যাম্পাসে এক রহস্যময় ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
ঋতুভেদে এখানে ফুল, ফল ও ফসলের সৌন্দর্য উপভোগ করার বিষয়টি অনন্য। গ্রীষ্মের দাবদাহে কালবোশেখী ঝড়ের তাণ্ডব দেখার জন্য যেমন হ্রদের পাড় আছে, তেমনি বর্ষার কূল প্লাবিত রূপ দেখার জন্য আছে পিচঢালা কালো পথ। এই আঙিনায় কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সোনালু, কনকচূড়া আর ক্যাশিয়া জাভানিকার বর্ণিল মেলা বসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, শহিদ মিনার কিংবা লেকের পাড়—সবখানেই লাল, বেগুনি ও হলুদ ফুলের শোভা। বিশেষ করে ক্যাশিয়া রেনিজেরার গোলাপি আভা আর বাতাসে দোল খাওয়া জারুলের বেগুনি রং ক্যাম্পাসে এক নৈসর্গিক পরিবেশ তৈরি করে। শীতের সকালে কুয়াশায় মোড়ানো বড় বড় মেজেন্টা রঙের শাপলাগুলো যেন সবার আয়ু বাড়িয়ে দেয়। বসন্তে বাহারি ফুল ছাড়াও প্রজাপতির অজস্র রঙিন পাখার সঙ্গে পরিচয় হয় সবার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রজাপতি সংরক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছরই 'প্রজাপতি মেলা'র আয়োজন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের আয়োজনের শ্লোগান ছিল সম্ভবত—'উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি'। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই ক্যাম্পাসেই পাওয়া যায় শরতের শুভ্র নীল আকাশ; হেমন্তও এখানে আসে উৎসবের সাজে। জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট প্রতি বছর নবান্ন ও ঋতু উৎসবের মাধ্যমে নতুন চালের গন্ধ, শিশিরভেজা ঘাস আর কাশফুলের বিদায়কে উদযাপন করে।
এ যেন এক আনন্দনগর। বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণে এর সঙ্গে রক্ত-মাংস আর অস্থিতে মিশে যাওয়ার সুযোগ মেলে এখানে অধ্যয়নরত শীক্ষার্থীদের। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন একদম মিশে গিয়েছিলাম। পুরাতন কলা ভবন, ট্রান্সপোর্ট, প্রান্তিক আর বটতলা—এই ছিল আমাদের বিচরণক্ষেত্র। সান্ধ্যকালীন প্রণয়ী-প্রণয়িনীর কাছে স্টেট বিল্ডিং বা সেন্ট্রাল মাঠের আবেদন কিঞ্চিৎ বেশি থাকলেও আড্ডাবাজ আমজনতার কাছে আদরণীয় ছিল মুক্তমঞ্চ। ক্যাফেটেরিয়ায় বেজে চলা জেমস, হাসান, বাচ্চু বা বাপ্পা মজুমদারের গানের সঙ্গে কফির মগ হাতে আড্ডা। কেউ কেউ গিটার নিয়ে আসত, ছোট ছোট জটলায় শোনা যেত সঞ্জীব, তাহসান কিংবা আনুশেহ আনাদিলের গান। প্রতি শীতে হতো বড় বড় কনসার্ট। সাংস্কৃতিক রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরে গানের পাশাপাশি নাটক ও আবৃত্তিও চলত সমানতালে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল নাট্য উৎসবগুলো। সেলিম আল দীন স্যার তখন বেঁচে ছিলেন; তাঁর নির্দেশনায় 'কিত্তনখোলা', 'কেরামতমঙ্গল', 'চাকা', 'যৈবতী কন্যার মন', 'হাতহদাই', 'হরগজ' কিংবা 'নিমজ্জন'-এর মতো মঞ্চনাটক দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। ঢাকা থিয়েটার, আরণ্যক, নাগরিক নাট্যাঙ্গন বা পদাতিক নাট্য সংসদের নাম আমরা জাহাঙ্গীরনগরে পড়েই জেনেছি। 'ধ্বনি' আর 'জলসিঁড়ি' ছিল আমাদের সময়ের ভীষণ জনপ্রিয় সংগঠন। জলসিঁড়ির প্রযোজনায় 'চন্দ্রাবতী' দেখে মুগ্ধ হওয়ার বোধ এখনো কাটেনি। চারুকলা তখন না থাকলেও এখন তাদের শিল্পপ্রয়াসে ক্যাম্পাসের দেয়ালগুলো আলপনা আর গ্রাফিতিতে সেজে থাকে। আমাদের সময়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির আবেদন ছিল অন্যরকম; কারণ বিসিএসের আগ্রাসন তখনও শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ করালভাবে গ্রাস করেনি। নানা বিষয়ের বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে সেই গ্রন্থাগারে বসে থাকা ছিল প্রশান্তির অংশ। বর্তমানে প্রযুক্তির আলো ছড়াতে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন আইটি গবেষণা সেল, যা শিক্ষার্থীদের নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ করে তুলছে কিন্তু আমাদের যুগে আমরা ছিলাম পুরোপুরিই এনালগের। এমনকি ইন্টারনেটের সঙ্গেও পরিচয় হয়নি তেমন। প্রান্তিক-ডেইরিতে গিয়ে কম্পিউটারের দোকান থেকে দু একটা পেজ কম্পোজ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আমাদের প্রযুক্তি জ্ঞান। হলে ইন্টারকমে ফোন আসতো। হলের খালা-মামারা উঁচু গলায় ডেকে দিতেন ওপাশের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটিকে। এছাড়া কার্ড কিনে বুথ থেকে ফোন করার সুযোগও ছিল। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোন এলে ডাকাডাকির পর্বটা গতি হারায়। আমরা হয়ে উঠি ডিজিটাল।
দুই যুগ আগের সেইসব দিনে জাহাঙ্গীরনগরে আমরা সরল জীবন দেখেছি। দেখেছি সাংস্কৃতিক সাম্যের সঙ্গে রাজনৈতিক সাম্যাবস্থা। জাহানারা ইমাম হলের আবাসিক ছাত্রী হিসেবে দেখেছি পাশাপাশি রুমে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। বাম আন্দোলনের নেত্রীদের সঙ্গেও ছিল প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক। যদিও ভয়ের রাজনীতি বা হল দখলের বিবাদ একদলীয় গোত্রের মধ্যে হর-হামেশাই হতো কিন্তু এখনকার মতো অসহনীয় একতরফা আধিপত্য ছিল কম। জাহাঙ্গীরনগরে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কটির কথা সবাই বলে। র্যাগিংয়ের মতো বিকৃত মানসিকতা তখন যে একদম ছিল না তা বলব না, তবে তা ছিল কেবল ফাই-ফরমাশ খাটা বা নেচে-গেয়ে দেখানোর মতো সাধারণ বিষয়। বর্তমান সময়ের অবস্থা হয়তো ভিন্ন। এখন যখন সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখতে পাই নেক্কারজনক র্যাগিং; তখন বিব্রত লাগে। মনে হয় জাবিয়ান হিসেবে আমরা যে সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ধারণ করি তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সম্প্রীতির এই বন্ধনটুকুই আমাদের পুঁজি। জাবিয়ানরা তার শেকড়ের পরিচর্যা করে, ভুলে যায় না জঠরের টান। এর জন্য কত যুদ্ধ আমাদের। বলা হয় 'জাবিয়ান সিন্ডিকেট' ভয়ংকর! যেখানে আপন ভাই ভাইকে পিতা পুত্রকে স্বার্থের জন্য এক কানাকড়ি ছাড়ে না সেখানে এক জাবিয়ান আরেক জাবিয়ানকে কী বা ছেড়ে দেয় আত্মিক প্রেমটুকু ছাড়া; অথচ ওইটুকু নিয়েই আমাদের বিরূপ সমালোচনা সইতে হয়। আদতেই 'ব্যাধিই সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়'।
প্রচলিত ভাষ্যে জাহাঙ্গীরনগরের সাবেক শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্ক খুব শক্ত থাকে এবং তাদের অ্যালামনাইরা দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে একে অন্যকে টানে। এই টানাটানির প্রথাটা যেভাবে দেখা হয় বাস্তবতা তেমন নয়। যেহেতু বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর তাই পরিবারের বাইরে বিভাগ ছাড়াও হলে তারা একে অন্যের সঙ্গে দীর্ঘসময় সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির সময় পায়। যে সম্পর্কটাকে পরবর্তী জীবনেও তারা বহন করে কেউ কেউ। নিজ ব্যাচমেটদের সঙ্গেও গণরুম কালচারের মধ্য দিয়ে এ ধরনের জাবিয়ান কালচারের চর্চা করে তারা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চুরির ঘটনা, পোকামাকড়ের উপদ্রব সয়ে তারা পরস্পরের কাছাকাছি হয়, আফসোস অসাধারণ এই মানবিক সম্প্রীতিটুকু র্যাগিংয়ের আগ্রাসনে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
বাক-স্বাধীনতার প্রশ্নে জাহাঙ্গীরনগরকে সবসময় সাহসী ও স্পষ্টবাদী হিসেবে দেখেছি। রাষ্ট্রের যেকোনো নাজুক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন তুলেছে এখানকার ছাত্রসমাজ। যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্র অধিকারের প্রশ্নে তারা সবসময় আপসহীন। আমাদের সময়ে অধিকাংশ জাবিয়ানই ছিল প্রগতিশীল ঘরানার। সকল ধর্মীয় উৎসব এখানে জাঁকজমকভাবে পালিত হতো, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে রক্ষার উদাহরণও বলা যায়। ক্যাফেটেরিয়া ও টিএসসির আড্ডাগুলোতে একসময় গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক আলোচনা হতো; যা এখন হয়তো টারজান পয়েন্ট বা ক্যাফেটেরিয়ার চায়ের আসরে নতুন রূপে চর্চিত হয়। এখানকার পরিবেশ একজন শিক্ষার্থীকে আত্মনির্ভরশীল ও সাহসী করে তোলে বলেই হয়তো তারা স্বতন্ত্র হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থের কাছে সেইসব পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ক্যাম্পাসের অন্ধকার পথগুলো—ডেইরি গেট থেকে জাহানারা ইমাম হল পর্যন্ত আসার সময় ছিনতাইকারী বা অশরীরী ভূতের যে ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরো নতুন নতুন ভয়। ভিন্নমত গ্রহণ না করার ভয় আমাদের দিনকে দিন সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর করে দিচ্ছে মনে হয়।
প্রগতির চাকায় চড়ে অনেক কিছুই বদলেছে বদলাবে আরো। দুই যুগ পর আজকের জাহাঙ্গীরনগর অনেক বেশি যান্ত্রিক। 'অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের' বিশাল সব অট্টালিকা আবাসন সংকট মেটানোর আশ্বাস দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই কংক্রিটের ভিড়ে হারিয়ে গেছে আমাদের আঁতুড়ের উষ্ণ আরাম। গাছ কমছে, পাখি কমছে, প্রাণীদের অবাধ বিচরণ আজ সীমিত। শীতে আগত পাখি শিকারে আজ মানুষের উল্লাস দেখা যায়। হ্রদের স্বচ্ছ জলে শাপলার বদলে ভাসে প্লাস্টিকের বোতল আর চিপসের প্যাকেট। প্রজাপতির রঙিন পাখা খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় মাদকের তীব্র গন্ধ। যত্রতত্র খাবারের দোকান আর শাড়ির মেলার ভিড়ে নিজেকে আজ ভীষণভাবে 'আউটসাইডার' মনে হয়। শঙ্কা জাগে, হয়তো একদিন পাখি উৎসব বা প্রজাপতি মেলা নামগুলো টিকে থাকবে, কিন্তু যাদের নিয়ে উৎসব—সেই পাখি বা প্রজাপতিরাই আর থাকবে না। আসবে না আর ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়া কোনো প্রাক্তন। অভিমানে এমন করে হয়তো লিখবে না বিষাদগাথা। এটাই হয়তো ভবিতব্য।

১২ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) দিবস। দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬ বছরে পদার্পণ করল। স্বাধীনতার প্রায় সমবয়সী এ বিশ্ববিদ্যালয় ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নানা পরিবর্তন এসেছে। সেসব নিয়ে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
১০ ঘণ্টা আগে
২০২৪ সালে ডুম্বুর বাঁধ ছেড়ে দেওয়া পানিতে ফেনীসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে, তা আমাদের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর মতে, এই বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
১৬ ঘণ্টা আগে
ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। আগামী এপ্রিলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা।
১ দিন আগে
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সাথে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় যুক্ত হয়েছেন। তার দল গোটা আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত ছিলো এবং সেভাবেই বক্তব্য-বিবৃতি রাখতেন। তিনি বিএনপি সর
২ দিন আগে