হরমুজের নিয়ন্ত্রণ: ইরানের হাতে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের লটারি তুলে দিলেন ট্রাম্প

লেখা:
লেখা:
হুগো ডিক্সন

স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানে হামলার সিদ্ধান্তের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি, তাঁর এই পদক্ষেপ উল্টো তেহরানের হাতে বিশাল ‘আর্থিক লটারি’ তুলে দিতে পারে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তবে আগামী চার বছরে ইরানের পকেটে প্রায় ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) ডলার অনায়াসেই ঢুকে যেতে পারে।

পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির ওপর। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বা আলোচনার মাধ্যমে এই পথটি খোলা রাখতে পারে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা রাখাটা আমেরিকার জনগণের কাছে বেশ অজনপ্রিয়। ট্রাম্প নিজেও কিছুদিন আগে বলেছিলেন যে, তিনি দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করবেন। যদিও তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে প্রায়ই অমিল থাকে এবং সম্প্রতি তিনি সেখানে আরও সেনা পাঠিয়েছেন। তবে ট্রাম্প যদি সত্যিই একতরফাভাবে সেনা প্রত্যাহার করে নেন, তবে হরমুজ প্রণালির পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ইরানের হাতে।

টোল আদায়: ইরানের নতুন ব্যবসার ছক

মার্কিন সেনা সরে গেলে তেহরান এই জলপথে তাঁদের নিজস্ব 'টোল ব্যবস্থা' পাকাপোক্ত করার সুযোগ পাবে। আরব দেশগুলো এই পথ দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন করে বিপুল মুনাফা করে। বিকল্প কোনো পথ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত, ইরান এই টোল থেকে বছরে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার আদায় করতে পারে।

জাহাজ চলাচল ও নৌবাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্টের তথ্য বলছে, ইরান ইতিমধ্যে একটি জাহাজের কাছ থেকে হরমুজ পার হওয়ার জন্য ২০ লাখ ডলার টোল আদায় করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৫০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যেত। প্রতিটি জাহাজ থেকে এই পরিমাণ টোল নিলে বছরে তেহরানের আয় হবে ১১০ বিলিয়ন ডলার।

মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি।
মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি।

তবে সব জাহাজের টোল সমান হওয়া যৌক্তিক নয়। তুরস্ক যেমন বসফরাস প্রণালিতে জাহাজের ওজন অনুযায়ী ফি নেয়, ইরানও তেমনটি করতে পারে। এমনকি আরব দেশগুলোর তেল-গ্যাস বিক্রির বিশাল মুনাফার ওপর ভিত্তি করেও তারা টোলের হার নির্ধারণ করতে পারে।

লাভের অঙ্ক ও দরকষাকষি

হিসাবটা একটু মিলিয়ে দেখা যাক। যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পার হতো। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইন দিয়ে কিছু তেল পাঠাতে পারে। ইরানের নিজস্ব রপ্তানিও আছে। এসব বাদ দিলেও প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগরে আটকে থাকার কথা।

হরমুজ বন্ধ থাকলে আরব দেশগুলো প্রতি বছর তেলের জন্য প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা হারাবে। অন্যদিকে কাতার হারাবে গ্যাসে পাওয়া প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের মুনাফা।

হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরান নিশ্চিতভাবেই এই ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক মুনাফার একটি বড় অংশ নিজেদের পকেটে নিতে চাইবে। অন্যদিকে সৌদি আরব বা কাতার চাইবে যত কম দেওয়া যায়। আরব দেশগুলোর হাতে তেল-গ্যাস রপ্তানি থেকে অর্জিত বিশাল রিজার্ভ আছে, তাই তারা হয়তো অপেক্ষা করার নীতি নেবে। কিন্তু ইরান ভুগছে নগদ অর্থের সংকটে। তারপরও প্রণালি যত বেশি দিন বন্ধ থাকবে, রিয়াদ, দুবাই বা দোহার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি ততই বাড়বে।

বিকল্প পথের খোঁজ ও ইরানের মেগা মুনাফা

এই পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলো চাইবে দ্রুত বিকল্প পাইপলাইন বানাতে। সবচেয়ে সহজ উপায় লোহিত সাগর পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরি করা। কিন্তু সেখানে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলার ভয় রয়েছে।

ইরান ইতিমধ্যে একটি জাহাজের কাছ থেকে হরমুজ পার হওয়ার জন্য ২০ লাখ ডলার টোল আদায় করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৫০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যেত। প্রতিটি জাহাজ থেকে এই পরিমাণ টোল নিলে বছরে তেহরানের আয় হবে ১১০ বিলিয়ন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন তেলের পাইপলাইন বানাতে ৩ থেকে ৪ বছর সময় লাগতে পারে। গ্যাসের অবকাঠামো তৈরিতে সময় লাগবে আরও বেশি। এই মধ্যবর্তী সময়ে বিকল্প ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগেই তেহরান প্রায় ৪৯০ বিলিয়ন ডলার টোল আদায় করে নিতে পারে।

বিশ্ববাজার ও ইরানের সতর্কতা

এই পুরো হিসাবটি করা হয়েছে তেল ও গ্যাসের দাম স্বাভাবিক থাকার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু ইরান যদি ইচ্ছে করে সরবরাহ কমিয়ে তেলের দাম চড়া রাখে, তখন কী হবে?

আরব দেশগুলো ভয় পায়, দাম খুব বাড়লে ক্রেতারা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকবে। কিন্তু ইরানের ভাবনা ভিন্ন হতে পারে। কারণ এই টোল আদায়ের সুযোগ চিরকাল থাকবে না। তাই তারা চাইবে অল্প সময়ে বেশি মুনাফা তুলে নিতে।

তবে ইরানকেও সতর্ক থাকতে হবে। তেলের দাম মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে আমেরিকা ও ইউরোপের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলো খেপে যেতে পারে। তখন তারা বাধ্য হয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করবে। আর এমন পরিস্থিতি নিশ্চয়ই ইরানের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না।

লেখক: ব্রিটিশ সাংবাদিক ও সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের ধারাভাষ্যকার।

রয়টার্স থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম

সম্পর্কিত