সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আর বিঘ্ন নয়

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৯: ২৪
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকাটাই ছিল প্রত্যাশিত। মাঠে থাকা রাজনৈতিক দল আর নাগরিক সমাজও এ বিষয়ে একমত। আপিল বিভাগ এ সংক্রান্ত কিছু বিষয়ের নিষ্পত্তি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। সংসদ জনগণ প্রদত্ত সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সেখানে ওইসব বিষয়ের গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি হবে, সেটাও প্রত্যাশা।

সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় যেতে হতো না—স্বাধীনতা উত্তরকালে শুরু থেকেই নির্বাচনকে কলুষিত করার কাজে ক্ষমতাসীনরা জড়িয়ে না পড়লে। পরে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ধারায় দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও সেটাকে আবারও বিনষ্ট করা হয় ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে বলা হয়েছিল, নির্বাচনব্যবস্থা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। পরে এতেও ঘটে ছন্দপতন।

সংবিধানে ধারিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের নামে ব্যবস্থাটি বাতিল করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিচার বিভাগও এ কাজে ব্যবহৃত হয়, যেটা আদতে ছিল স্বৈরতন্ত্রের দিকে যাওয়ার বিপজ্জনক পদক্ষেপ। অতঃপর তিনটি নির্বাচন কত অগ্রহণযোগ্যভাবে করা হয়েছিল, তা সবারই জানা। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ওইসব নির্বাচনের মাধ্যমে জেঁকে বসা কর্তৃত্ববাদী শাসনে সিংহভাগ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্গতিও চরমে পৌঁছে।

অতঃপর সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাজারের অধিক মানুষ অকাতরে জীবন দেয়। পঙ্গুত্ব বরণ করে অনেকে। আন্দোলনের পরিণতিতে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার, যা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরই আরেক রূপ। সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ও সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার আগে চলা সংস্কার আলোচনায় অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও একমত হয় রাজনৈতিক দলগুলো। এর পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে এ প্রশ্নে নিষ্পত্তি টানার প্রক্রিয়াটিও গুরুত্ববহ।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। সেটাই স্বাভাবিক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হয়েছে। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ধারা থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসাটাও জরুরি। এক্ষেত্রে তাই কোনো ঘাটতি বা ঝুঁকি রাখা যাবে না। পাশাপাশি নির্বাচনী আইন ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংস্কারের যে প্রক্রিয়া চলমান, সেটাকেও জোরদার করতে হবে। গণতন্ত্র মানে কেবল সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর নয়। এর মানে আরও অনেক কিছু এবং সেইসব উপাদানের অব্যাহত চর্চা। তবে গণতন্ত্রের প্রাথমিক ভিত্তি নিশ্চয় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন। যে কোনো মূল্যে এ ধারাটি তাই রক্ষা করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকলেও উপনির্বাচন আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন কিন্তু হবে দলীয় সরকারের অধীনেই। কয়েক মাস পরেই স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করতে হবে ইসিকে। আর এতে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে জোগাতে হবে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা। এর ভেতর দিয়ে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার একটা পরীক্ষাও হয়ে যাবে। স্থানীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে নতুন রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার শংকাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আমরা আশা করব, স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার গণতন্ত্রবোধ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দেবে। সেটা হবে উদাহরণ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংসদীয় কার্যক্রমও দ্রুত সম্পন্ন হবে বলে আমাদের আশা।

Ad 300x250

সম্পর্কিত