বারুইপুরে শিশু ধর্ষণ ইস্যু

পশ্চিমবঙ্গেও কি এনকাউন্টার সংস্কৃতির শুরু হলো

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৩: ০৯
এআই জেনারেটেড ছবি

পশ্চিমবঙ্গেও কি উত্তরপ্রদেশের মতো পুলিশি এনকাউন্টারের নতুন সংস্কৃতির সূচনা হলো? বারুইপুরের ১১ বছরের নাবালিকা যৌন নির্যাতন ও খুন মামলার অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।

পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থল পুনর্গঠনের সময় অভিযুক্ত অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল। অন্যদিকে, তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ এক অভিযুক্তের মৃত্যু তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশে গত নয় বছরে ১৭ হাজারেরও বেশি পুলিশি এনকাউন্টারের সরকারি পরিসংখ্যান এবং সেই মডেলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক রয়েছে। বারুইপুরের ঘটনার পর তাই প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমবঙ্গেও কি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় উত্তরপ্রদেশের মতো এনকাউন্টার-কেন্দ্রিক কৌশলের সূচনা হলো?

বারুইপুর জেলার পুলিশ সুপারের দাবি, মঙ্গলবার রাত প্রায় ১২টা ৪৫ মিনিটে তদন্তকারী দল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে সূর্য্যপুর এলাকায় ঘটনাস্থল পুনর্গঠনের জন্য যায়। পুলিশের বক্তব্য, সেখানে পৌঁছানোর পর প্রভাস এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেয় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে একটি গুলি চালায়। এরপর সে পালানোর চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। সেই গুলিতেই আহত হয় প্রভাস।

আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং গোটা বিষয়টির তদন্তও চলছে।

প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন নাবালিকার যৌন নির্যাতন ও খুনের মামলার তদন্তে একের পর এক তথ্য সামনে আসছিল। তদন্তকারীদের দাবি, যে পুকুর থেকে নাবালিকার মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল, তার পাশের একটি ঝুপড়িতে বসে নেশা করছিল আনন্দ সর্দার ও দিবাকর সর্দার। সেই সময় প্রভাস মণ্ডলকে ১০ হাজার টাকার প্রলোভন দেখিয়ে নাবালিকাকে সেখানে নিয়ে আসতে বলা হয়।

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, নাবালিকাকে সেখানে নিয়ে আসার পর সে পালানোর চেষ্টা করেছিল। এরপর তার ওপর অত্যাচার চালানো হয়। অত্যাচারের ফলে একসময় সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তদন্তকারীদের দাবি, এরপর তাকে একটি বস্তার মধ্যে ভরে পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। দেহ ফেলার সময় বস্তাটি ছিঁড়ে যায়। তারপর অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়।

এই মামলায় এখনও পর্যন্ত মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যৌন নির্যাতন ও খুনের অভিযোগে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দার এবং প্রভাস মণ্ডলকে। পরে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনার পর ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মণ্ডল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তদন্তকারীদের দাবি, প্রভাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই মামলার বাকি অভিযুক্তদের খোঁজ পাওয়া যায়। যদিও পুলিশ আরও জানিয়েছে, জেরার সময় প্রভাস বারবার নিজের বয়ান বদল করছিল এবং তদন্তকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিল। এই দাবিগুলোর স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি।

বারুইপুরে নাবালিকার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই উত্তেজনা ছড়িয়ে রয়েছে। এলাকায় বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক তরজায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নাবালিকার পরিবারের জন্য দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে এখনো সরব স্থানীয় মানুষ।

এই ঘটনার পর প্রভাসের স্ত্রীও সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেন। তাঁর বক্তব্য—‘ও বরাবরই নোংরা। তাই এ কাজ ও করেনি এমন দাবি করতে পারব না। ও করতেই পারে। দোষ করেছে তাই গুলি খেয়েছে।’

এই মন্তব্যের পর ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে। তবে কোনো অভিযুক্তের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হওয়ায় আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

এদিকে বারুইপুরে নাবালিকার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই উত্তেজনা ছড়িয়ে রয়েছে। এলাকায় বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক তরজায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নাবালিকার পরিবারের জন্য দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে এখনো সরব স্থানীয় মানুষ।

নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তদের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রাখা হবে না। বারুইপুরের ঘটনার পর তিনি বলেন, এই মামলায় কোনো অপরাধীকে রেয়াত করা হবে না। তিনি বারুইপুরে গিয়ে রাজ্যের ডিজিপিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির নির্দেশ দেন এবং তদন্তে পুলিশের কোনো গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামনে আসে প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টারে মৃত্যুর খবর।

অন্যদিকে, বারুইপুরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায়ও প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হামলার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আরও অভিযুক্তদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

বারুইপুরের এই ঘটনাকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই উত্তরপ্রদেশের পুলিশি এনকাউন্টার মডেলের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। কারণ ২০১৭ সালে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই উত্তরপ্রদেশ সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলে আসছে। সেই নীতির অন্যতম আলোচিত দিক হলো পুলিশি এনকাউন্টার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত নয় বছরে উত্তরপ্রদেশে মোট ১৭ হাজার ৪৩টি এনকাউন্টার অভিযান চালানো হয়েছে। এই অভিযানে ২৮৯ জন অভিযুক্ত বা অপরাধীর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৪ হাজার ২৫৩ জনকে। আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৮৩৪ জন অভিযুক্ত। এই অভিযানে ১৮ জন পুলিশকর্মীর মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৮৫২ জন পুলিশ সদস্য।

যোগীরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে মিরাট জোনে সবচেয়ে বেশি ৪ হাজার ৮১৩টি এনকাউন্টার হয়েছে। সেখানে ৯৭ জন অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৮ হাজার ৯২১ জনকে এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৫১৩ জন। বারাণসী জোনে ১ হাজার ২৯২টি অভিযানে ২৯ জন এবং আগ্রা জোনে ২ হাজার ৪৯৪টি অভিযানে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেরেলি, লখনউ, প্রয়াগরাজ, গোরখপুর, কানপুর, গাজিয়াবাদ, গৌতম বুদ্ধ নগর-সহ বিভিন্ন জোন ও কমিশনারেটেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এনকাউন্টার হয়েছে।

এনকাউন্টারের পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ সরকার গ্যাংস্টার আইন, জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ) এবং অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো ব্যবস্থাও নিয়মিত ব্যবহার করেছে। সরকারের দাবি, এই নীতির ফলে সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা গিয়েছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল মিলেছে।

তবে এই নীতি নিয়ে বিতর্কও কম নয়। মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই এনকাউন্টার নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হয় না। অভিযোগ রয়েছে, সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে জবাবদিহির ঘটনা খুবই সীমিত। সমালোচকদের আরও দাবি, আইনের শাসনে কোনো অভিযুক্তের অপরাধ আদালতেই প্রমাণিত হওয়া উচিত; পুলিশের গুলিতে মৃত্যু বিচার প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।

বুলডোজার নীতির কথাও সামনে আসছে। অভিযোগ, আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ ছাড়াই অভিযুক্তদের সম্পত্তি ভাঙার প্রবণতা উত্তরপ্রদেশ থেকেই শুরু হয় এবং পরে অন্য কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যেও দেখা যায়। কুইন্টের ২৬ ফেব্রুয়ারির একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ক্ষমতায় আসার পর পূর্ববর্তী সময়ের প্রায় ২০ হাজার ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। যদিও উত্তরপ্রদেশ সরকার এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আইনের মধ্যেই থেকে এবং অপরাধ দমনের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।

বারুইপুরের ঘটনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, তদন্তের শুরুতে স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মণ্ডলই প্রভাস মণ্ডলকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরে পুলিশ দাবি করে, প্রভাসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। ফলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রদাতা হিসেবে যাকে তুলে ধরা হচ্ছিল, সেই অভিযুক্তেরই এনকাউন্টারে মৃত্যু হওয়ায় তদন্তের ভবিষ্যৎ দিক নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রতিটি এনকাউন্টারের পরই দুটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, পুলিশের দাবি অনুযায়ী ঘটনাটি সত্যিই আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর পরিস্থিতি ছিল কি না। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত জীবিত থাকলে তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়ায় আরও কী তথ্য সামনে আসতে পারত। এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই তদন্তকারী সংস্থা এবং বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব।

বারুইপুরের ঘটনাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে পুলিশ বলছে, অভিযুক্ত অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালিয়েছিল। অন্যদিকে, তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ এক অভিযুক্তের মৃত্যু হওয়ায় নানা প্রশ্নও উঠছে। একই সঙ্গে নাবালিকার পরিবারের একটিই দাবি, দ্রুত বিচার হোক এবং এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

  • তনভিয়া বড়ুয়া: ভারতীয় লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত