পশ্চিমা বিশ্ব তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি তথা নজরদারির জন্য বড়ই অহংকার করে। তাদের কৃত্রিম উপগ্রহগুলো চোখের পলক ফেলার আগেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ছবি তুলে নেয়। কম্পিউটারের অ্যালগরিদমগুলো সাগরের ঢেউয়ের মতো তথ্য টেনে নেয়। সাংবাদিকরা মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে দেন আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাতাসের অক্সিজেনের মতোই শুষে নেয় প্রতিটি মেটাডেটা। আমাদের বারবার বলা হয়—পশ্চিমাদের নজর এড়িয়ে কিছুই করা সম্ভব নয়। তাদের চোখ সর্বত্র।
অথচ অদ্ভুত ব্যাপার, গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের বুকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণআন্দোলন গড়ে উঠল, কিন্তু পশ্চিমাদের কানে তা নিছক গুজব হয়েই রইল। এই বিক্ষোভ এক অভাবনীয়, সুশৃঙ্খল এবং অহিংস আন্দোলন। লাখ লাখ মানুষ দিনের পর দিন মিছিল করেছে। দেশের বিচার ব্যবস্থাকে কাগজের খেলনার মতো দুমড়ে-মুচড়ে ফেলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরে তাদের শেখানো বুলি বলতে বাধ্য করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি দিনের আলোয় ভোট জালিয়াতি করা হয়েছে। অথচ বিশ্ব বিবেক নিশ্চুপ।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে জেলে ভরা হয়েছে। তাঁকে জনবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে এবং আইনি মারপ্যাঁচে একটু একটু করে চূর্ণবিচূর্ণ করা হয়েছে। পশ্চিমারা এর কিছুই দেখেনি। বা বলা ভালো, তারা সবই দেখেছে, কিন্তু জেনেশুনেই চোখ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই নীরবতা কেবল চোখ এড়িয়ে যাওয়া বা অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়। কিংবা কোনো ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা দেখার সীমাবদ্ধতা নয়। এটি ঠান্ডা মাথায় নেওয়া পশ্চিমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত। পাকিস্তানের শাসকরা যেমন পেশাদার নিপুণতার সঙ্গে দমনপীড়ন চালাচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্বও ঠিক তেমন শীতলতার সঙ্গে তাদের এই নীরবতার নীতি প্রয়োগ করছে। এই দমন প্রক্রিয়া প্রশাসনিক এবং আইনি মোড়কে মোড়ানো। আর ঠিক একারণেই তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্য একঘেয়ে। সেখানে কোনো জাঁকজমক নেই, তাই সেখানে কোনো ক্যামেরাও নেই।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানএবার দৃশ্যপটটা একটু ঘোরানো যাক ইরানের দিকে। সেখানে যখনই কোনো অস্থিরতা তৈরি হয়, পশ্চিমারা তা লুফে নেয়। ইরানের রাজপথে পোড়ানো প্রতিটি ময়লার ঝুড়িকে তারা বিপ্লবের অমোঘ বাণী হিসেবে প্রচার করে। প্রতিটি ছোটখাটো হাতাহাতিকে তারা মহাকাব্যিক রূপ দেয়। টকশোতে প্যানেল আলোচনা জমে ওঠে, সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ ঝড় তোলে। নৈতিকতার দোহাই দিয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমনকি ইরানে বোমা ফেলার পরিকল্পনাকেও তখন ‘মানবতা’ বা ‘সহমর্মিতা’র মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। আমাদের গেলানো হয়, পশ্চিমাদের নৈতিক বিবেক সদা জাগ্রত।
কিন্তু পাকিস্তানের দমনপীড়নের গল্পে কোনো সিনেম্যাটিক মশলা নেই। সেখানে কোনো জ্বলন্ত দৃশ্য নেই, নেই কোনো নায়কের রোমহর্ষক প্রত্যাবর্তনের গল্প। আছে কেবল ফাইলের পর ফাইল আর আমলাতান্ত্রিক নির্দেশের খেলা। এখানে পুলিশের লাঠিপেটা চলে আদালতের আদেশের আড়ালে। ইন্টারনেট বন্ধ করা, গুম করা বা বেছে বেছে হত্যা—সবকিছুই ঘটে পরিমিত মাত্রায়। ভদ্রস্থ এবং হজমযোগ্য। কোনো নাটক নেই, কোনো ভাইরাল ক্লিপ নেই, তাই কোনো বৈশ্বিক ক্ষোভও নেই।
এই হলো আসল দ্বিচারিতা। লড়াইটা আসলে গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্রের নয়। লড়াইটা হলো ‘দৃশ্যপট’ বনাম ‘শৃঙ্খলার’। পশ্চিমারা অন্যায়ের বিচার করে না, বিচার করে অন্যায়ের দৃশ্যমানতার। তাদের নীতি পরিচালিত হয় নান্দনিকতার বিচারে, ন্যায়ের বিচারে নয়। ইরান উদ্ধত, তারা কথা শোনে না। আদর্শিকভাবে তারা বিরক্তিকর। তাই ইরান শত্রু। অন্যদিকে পাকিস্তান খাকি পোশাকের আড়ালে থাকা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে। তারা বাধ্যগত, অর্থের বিনিময়ে ভাড়া খাটে এবং সর্বোপরি—তারা কাজের।
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে সরকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন যা চেয়েছিল তা তো পেয়েই গেছে। তাহলে এখন আর সাফসুতর করার ঝামেলায় কেন যাবে তারা? তাই ইরানে দমন চললে তা হয় ‘সভ্যতার সংকট’, আর পাকিস্তানে চললে তা হয়ে যায় ‘জটিল অভ্যন্তরীণ সমীকরণ’। নব্য রক্ষণশীল বা নিওকনরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। সাম্রাজ্যবাদী উদারপন্থীরা হঠাৎ করেই পাকিস্তানের পরিস্থিতিতে জটিলতা বা ‘নুয়্যান্স’ খুঁজে পায়। তাদের কাছে স্থিতিশীলতাই আসল। গণতন্ত্র বরাবরের মতোই ফাঁপা স্লোগান। যা শত্রুর বিরুদ্ধে চিৎকার করে বলা হয় আর বন্ধুর কানে ফিসফিস করে শোনানো হয়।
শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ার অঙ্গীকার ইরানের। ছবি: সংগৃহীতপাকিস্তানের শাসকদের অবশ্য তাদের কারিগরি দক্ষতার জন্য কিছুটা বাহবা দেওয়াই যায়। দাতা সংস্থাদের আতঙ্কিত না করেই তারা দমনের নিখুঁত শিল্প তৈরি করেছে। টিভিতে কোনো ট্যাংক দেখা যায় না। গণফাঁসির কোনো দৃশ্য নেই। আছে কেবল আগাম আটকাদেশ, আদালতের সাজানো নাটক আর মেপে মেপে প্রয়োগ করা সহিংসতা। তাদের লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো নয়। তারা ধীরে ধীরে জনগণকে এমনভাবে হতাশ করতে চায় যাতে তারা হাল ছেড়ে দেয়। এই শিক্ষা তারা পেয়েছে তাদের পশ্চিমা প্রভুদের কাছ থেকেই। সীমাহীন বলপ্রয়োগকে ‘নিরাপত্তা’ আর দমনপীড়নকে ‘স্থিতিশীলতা’ বলে চালানো যায়। বিদেশের সাথে তাল মেলাও, আর দেশের ভেতরে স্থানীয়দের শায়েস্তা করো। তখন মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়ে দাঁড়ায় কেবল ঘরোয়া সমস্যা।
ইমরান খানের পরিস্থিতি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর আকাশচুম্বী জনসমর্থনকে তারা খারাপ আবহাওয়ার মতো দেখে। খানের কারাবাসকে দেখানো হচ্ছে আইনের শাসন হিসেবে। অথচ এটি আসলে পদ্ধতিগতভাবে তাকে নিষ্ক্রিয় করার এক প্রক্রিয়া। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই সামরিক-মাফিয়া তন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে এক করতে পারেন।
পশ্চিমের কর্মকর্তারা এসবই জানেন। সাংবাদিকরাও জানেন। তাদের নীরবতা অজ্ঞতা নয়, বিশুদ্ধ স্বার্থের হিসাব। পাকিস্তান এমন কোনো রোগী নয় যাকে তারা বাঁচাতে চায়। পাকিস্তান হলো সেই ঠিকাদার যাকে তারা টিকিয়ে রাখতে চায়। কেন এই প্রশ্রয়? কারণ পাকিস্তান কাজের।
পাকিস্তান নিষেধাজ্ঞার আড়ালে অস্ত্র বিক্রি করে। যখন প্রয়োজন হয় আফগানিস্তানের ওপর চাপ দেয়। বার্তা আদান-প্রদানে তারা ফিসফিস করে কাজ সারে। চীনকে ঠেকাতে তারা ঠিক ততটুকুই করে যতটুকু দরকার। আবার ভারতের সঙ্গেও তারা এক ধরণের প্রতিযোগিতার নাটক জিইয়ে রাখে। এর ফলে পশ্চিমারা উভয় দেশের ওপরেই প্রভাব খাটানোর সুযোগ পায়। আর এই সবকিছুই পাকিস্তান করে সস্তায়। আইএমএফের কিছু ঋণ আর একটু কূটনৈতিক তোষামোদ পেলেই তারা খুশি।
অন্যদিকে ইরান নিজের উপকারিতা প্রমাণে পরীক্ষা দিতে নারাজ। তারা সার্বভৌমত্ব বন্ধক দেয় না। অনুমোদনের ভিক্ষা চায় না। তাই তাদের সামান্য অস্থিরতাও মহাকাব্য হয়ে ওঠে। আর পাকিস্তানের সুশৃঙ্খল বিদ্রোহ ঢাকা পড়ে যায়।
লড়াইটা আসলে গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্রের নয়। লড়াইটা হলো ‘দৃশ্যপট’ বনাম ‘শৃঙ্খলার’। পশ্চিমারা অন্যায়ের বিচার করে না, বিচার করে অন্যায়ের দৃশ্যমানতার। তাদের নীতি পরিচালিত হয় নান্দনিকতার বিচারে, ন্যায়ের বিচারে নয়।
এখানেই সেই নির্মম শিক্ষা লুকিয়ে আছে। অহিংসা অদৃশ্য, সংঘবদ্ধ হওয়া অপরাধ এবং জনপ্রিয়তা বিপজ্জনক। যদি দমনপীড়ন নীরবে এবং পশ্চিমাদের স্বার্থের সঙ্গে তাল মিলিয়ে করা হয়, তবে তা সফল। বিশ্বের এই মনোযোগের অর্থনীতি মোটেও দৈবক্রমে চলে না। এটি পুরোপুরি পেশাদার হাতে সাজানো।
পাকিস্তানের শাসকরা ভণ্ডামির শিকার নয়, তারা এর সুবিধাভোগী। তারা শিখে নিয়েছে দেশে দাপট বজায় রাখতে হলে কতটুকু স্বৈরাচারী হতে হবে। আর বিদেশে নজরদারি এড়াতে হলে কতটুকু সহযোগিতা করতে হবে। কিন্তু ভণ্ডামি আর দমনপীড়ন—উভয়ই সুদের মতো বাড়ে।
যে বিশ্ব ইরানের অস্থিরতাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখায় আর পাকিস্তানের গণদমনকে উপেক্ষা করে, সেই বিশ্ব গণতন্ত্র প্রচার করে না। তারা প্রচার করে স্বার্থপরতা। যে মিডিয়া বিশৃঙ্খলাকে রোমাঞ্চকর বানায় আর সুশৃঙ্খল আন্দোলনকে তুচ্ছ করে, তারা মানুষকে সত্য জানায় না। তারা শেখায় হট্টগোল মানে সাহস, আর শৃঙ্খলা মানে উদাসীনতা। যে পররাষ্ট্রনীতি বৈধতার চেয়ে ব্যবহারযোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়, তা অঞ্চলকে স্থিতিশীল করে না। বরং ভবিষ্যতের বড় সংঘাতের বীজ বপন করে।
লেখক: শিক্ষক এবং সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশনের পরিচালক।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ।