leadT1ad

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ‘সিলিং’ ভাঙার লড়াই

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ‘সিলিং’ ভাঙার লড়াই। স্ট্রিম গ্রাফিক

আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারী প্রসঙ্গ এখন সবচেয়ে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ বা ‘নারীর কাজ ঘর সামলানো’র মতো বহুচর্চিত বিষয়গুলো এখন আরও বিস্তৃত হয়ে ‘কর্মজীবী নারীরা বেশ্যা’ পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বয়ানগুলো এখন কেন এত বেশি চর্চিত, নিন্দিত এবং প্রচারিত? এর উত্তর একটাই—ভোট।

নারী ও পুরুষকে বাইনারি পদ্ধতিতে বিচার করে কাকে ভাগে নিয়ে ক্ষমতায়ন কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তার ‘লিটমাস টেস্ট’ হচ্ছে এসব বয়ান। রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতির লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে নারীকে কোন অবস্থায় রাখলে তাদের ভোটও জুটবে আবার পুরুষও তুষ্ট থাকবে, এই নিয়ে একটি নিরীক্ষা চালিয়ে দেখছে। যেহেতু ধর্মীয় শাসন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ডান-বাম ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থান পরিষ্কার, তাই এখন দরকার কেবল নারী প্রশ্নের সুরাহা।

বাংলাদেশে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের প্রায় সমান; কিন্তু আসনের লড়াইয়ে তারা এক-তৃতীয়াংশও নয়। কারণ, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলই নারীকে কেবল ‘ভোটদাতা’ হিসেবে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের কাছে নারী হচ্ছে একটি ‘নিরাপদ ভোটব্যাংক’। নারীদের অনুকূলে কিছু জনতুষ্টিমূলক প্রকল্প—যেমন: বিধবা ভাতা, উপবৃত্তি, বেকার ভাতা এবং আট ঘণ্টা থেকে পাঁচ ঘণ্টা কর্মঘণ্টায় নামিয়ে আনার সঙ্গে নারীকে কে কত সম্মান ও সহানুভূতি দিতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করছে বিভিন্ন মতাদর্শিক জনগোষ্ঠীর ভোট। এই এজেন্ডাগুলো নারী উন্নয়নমূলক নয়, বরং আদতে নারী দমনেরই প্রকল্প। প্রকল্পগুলো দেখাতে চায় নারী কেবল গ্রহীতা। নারীকে ‘দাতা’ হওয়ার রাস্তা সহজ করে দিলে আমাদের এই পুরুষশাসিত রাজনৈতিক কাঠামো বা নীতিনির্ধারণী শক্তির বিরাট পরিবর্তন ঘটবে।

নারী সরাসরি বাজেট ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য সুবিধাজনক না-ও হয়ে উঠতে পারে। তার চেয়ে ভালো, তাদের শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি দিয়েই তুষ্ট রাখা। তাই যখনই নীতিনির্ধারণী পর্যায় বা দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর স্থান দেওয়ার প্রশ্ন আসে, তখনই পিতৃতান্ত্রিক অজুহাত সামনে রেখে পুরুষ হয়ে ওঠে যোগ্য প্রার্থী। আর এই প্যারাডক্সের গ্যাঁড়াকলে পড়ে নারীর ভাগ্য যায় বদলে। এ কারণে ছোট-বড় বিভিন্ন দলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করার হিড়িকও বাড়ছে।

কিন্তু যদি বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ সময় শীর্ষ দুই নেত্রীর শাসন দেখেছেন—শাসন বা অপশাসন যেদিক থেকেই ব্যাখ্যা করা হোক—এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও কেন তাঁরা পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির মাঠ পরিবর্তন করতে পারেননি? কারণ হচ্ছে, প্রতিটি দলের নীতিনির্ধারকরাই তৃণমূল বা মধ্যম সারির রাজনীতিতে নারীদের জন্য একটি ‘অদৃশ্য ছাদ’ বা সিলিং তৈরি করে নামমাত্র কয়েকজনকে সামনে রেখে রাজনীতি করেছেন। তাঁরাও অংশীজন না বাড়িয়ে কেবল প্রকল্প বাড়িয়েই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে তাঁরা নারীবান্ধব; কিন্তু প্রকৃত সমতার রাজনীতি করেননি। অন্যদিকে পুরুষশাসিত ক্ষমতাচর্চায় আগ্রহী দল নারীকে কর্মী হিসেবে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক হলেও নারী নেতৃত্বে একেবারেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। দীর্ঘ সময় নারী শাসনের পর বলা যায়, বর্তমানে এটিই আমাদের ‘রাজনৈতিক অর্জন’।

মূলত সংকটটা সমাজতাত্ত্বিক। আমরা ক্ষমতার ধারণাকে পুরুষালি গুণাবলি যেমন: পেশিশক্তি বা কঠোরতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। নারী যখন ভোটার হন, তখন তাঁকে ‘প্রার্থিনী’ বা ‘অনুরোধের পাত্রী’ হিসেবে দেখি। নারী তখন অধীন, নারী তখন হীনম্মন্য। কিন্তু নারী যখন সর্বোচ্চ পদে বসেন, তখন তাঁকে ‘আদেশদাতা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। তাঁর এই সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন অনেক পুরুষ সহকর্মী বা ভোটারের পছন্দ হয় না। তাঁরা তাঁকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না বলেই অদৃশ্য এক প্রাচীর দিয়ে রাখা হয় তাঁর মসনদ আরোহণের পথে। এছাড়া মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর অর্থনৈতিক সামর্থ্য বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে সম্পত্তির মালিকানায় নারীর হিস্যা এখনো কম থাকায়, সরাসরি নির্বাচনে লড়াই করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা জোগাড় করা নারী প্রার্থীদের জন্য কঠিন হয়। দলগুলো যখন দেখে নারী প্রার্থীর নিজস্ব তহবিল কম, তখন তারা সহজেই তাঁকে বাদ দিয়ে অর্থবিত্তশালী পুরুষ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। এটি নারীর জন্য একটি শক্তিশালী ‘অর্থনৈতিক সিলিং’।

তবে এও একটি দৃশ্যমান প্রক্রিয়া যে নারীদের দেওয়া হয় কিছু সংরক্ষিত আসন। এই আসনগুলো এক প্রকার অনুগ্রহই; কারণ এতে নারীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার পড়ে ঝুঁকির মুখে। সংরক্ষিত নারী নেতারা সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিশেষ সুবিধায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন বলে তাঁকে মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। ফলে সংসদে অনেক সময় তাঁকে ‘সেকেন্ড ক্লাস মেম্বার’ হিসেবেও দেখার হীনপ্রয়াস থাকে। আবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে আজও একটি ‘বয়েজ ক্লাব’ সংস্কৃতি বিদ্যমান। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলাপ, লবিং বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সময় গভীর রাতে বা এমন পরিবেশে হয়, যেখানে নারীর প্রবেশাধিকার সীমিত। ফলে নারীর সক্ষমতা থাকলেও ওই অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা তাঁদের পিছিয়ে রাখে অনেকটাই। এ সমস্ত প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে অনেক পদক্ষেপই নেওয়া যায় কিন্তু নেওয়া হয় না নারীর প্রতি সত্যিকারের ইতিবাচক মনোভাবের অভাবে।

জাতীয় রাজনীতিতে নারীর সিলিং ভাঙার প্রধান শক্তি হতে পারত ছাত্র রাজনীতি। কিন্তু বর্তমান ছাত্র রাজনীতির যে সহিংস রূপ এবং ‘পৌরুষিক’ সংস্কৃতি, তাতে সাধারণ ছাত্রীরা রাজনীতিতে যুক্ত হতে ভয় পায়। ফলে একটি সুস্থ ‘লিডারশিপ পাইপলাইন’ তৈরি হচ্ছে না। নিচ থেকে নেতৃত্ব উঠে না এলে ওপরের সিলিং ভাঙা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়াও বাংলাদেশে শীর্ষ পদে নারীর উপস্থিতি অনেকটা উত্তরাধিকার-নির্ভর। এর বাইরে রাজপথ থেকে উঠে আসা সাধারণ নারীর জন্য সর্বোচ্চ পদে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

৫ আগস্ট অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই অবস্থা কিছুটা বদলেছে কিন্তু পুরনো দলগুলোতে এই চর্চা অব্যহত থাকবে বলেই মনে হয়। তবে যে উৎস হতে আসুক যখন একজন নারী নিজের যোগ্যতায় ও সংগ্রামে উপরে উঠতে চান, তখন সমাজ ও ভিন্নমতের দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসিত প্রচারণা চালিয়ে তাঁর চরিত্রহনন করে নীতিনির্ধারণী পদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। বাংলাদেশে এটি দৃশ্যমান যে একজন নারী নেতাকে যতটা ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়, একজন পুরুষ নেতার ক্ষেত্রে তা নগণ্য। এই ভীতিকর পরিবেশ সচেতনভাবেই তৈরি রাখা হয় যাতে নারীরা চ্যালেঞ্জিং পদের দাবি না তোলেন।

তা ছাড়া একজন নারী নেতাকে সব সময় প্রমাণ করতে হয় যে তিনি ‘ভদ্র’ এবং ‘পারিবারিক’। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া এই ‘মর্যাদার রাজনীতি’র কারণে নারীরা অনেক সময় কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন না বা নিলেও তাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। অন্যদিকে, পুরুষ রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজ যতটা না ভাবেন, নারীর ক্ষেত্রে তার তিলকে তাল করা হয়। এই সামাজিক চাপ নারীর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়।

আবার অনেক ক্ষেত্রে ভোটের স্বার্থে বা সমঝোতার প্রয়োজনে চরম রক্ষণশীল গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করে নারী নিজেও তাঁর অগ্রযাত্রার পথে তৈরি করেন অদৃশ্য বাধা। এটি মূলত এক পক্ষের রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, যেখানে নারীকে ক্ষমতায়নের ‘শো-পিস’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা তাঁদের না দিয়ে নিজেরা ভোগ করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এই বিধানগুলো কিতাবে যতটা আছে, নারীর ক্ষমতায়নের ধাপে তা কখনোই সমতায় থাকে না। বাংলাদেশের দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা কম। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা বাস্তবায়ন হয় না কেবল জবাবদিহিতার অভাবে। জবাব চাইবে কে?

পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে যেহেতু নারীর শ্রম বা অবদানকে ঐতিহাসিকভাবে ‘অদৃশ্য’ করে রাখার প্রয়াস থাকে, সুতরাং তাঁর শক্তিমান অংশকে লুকিয়ে রাখা রাজনৈতিক কৌশল হবে—এটাই স্বাভাবিক। নারী দেশ গঠন করলে তিনি প্রাইভেট থেকে পাবলিক স্পেসে আসবেন—এই চিরাচরিত বিভাজনই নারীর রাজনৈতিক সিলিং। একে চ্যালেঞ্জ করে এগোতে পারলেই তাঁকে আর সহানুভূতি দেখিয়ে ‘সম্মান দান’-এর কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় আটকে রেখে ভোটের রাজনীতি সম্ভব হবে না। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই আশাবাদ কতটা বাস্তবসম্মত, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত