মুজাহিদুল ইসলাম

নির্বাচন সামনে এলেই সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচিত হয় সেটি হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি। একইভাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে তাদের প্রচার এবং জনগণের জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরতে শুরু করেছে। তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শুধু কথার ফুলঝুরি আর গতানুগতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নির্বাচন এক অনন্য গুরুত্ব বহন করছে। এ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একাত্তরের অপূর্ণ অঙ্গীকার অর্জন ও চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্নিপরীক্ষা।
দীর্ঘ দেড় দশকের একরৈখিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ধস এবং জবাবদিহিহীনতার দেয়াল ভেঙে তরুণ প্রজন্ম যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছে, তার আইনগত ও রাজনৈতিক বাস্তবায়ন ঘটবে এই নির্বাচনের ইশতেহারে। প্রশ্ন উঠেছে—রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের এই পুঞ্জীভূত প্রত্যাশাকে ধারণ করতে প্রস্তুত? নাগরিক সমাজ ও তরুণরা যে ‘নতুন সামাজিক চুক্তির’ কথা বলছেন, তার প্রতিফলন ইশতেহারে কতটা থাকবে?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
নাগরিকদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ গত দেড় দশকে শাসনব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। সংসদ সদস্যদের ভূমিকা কেবল জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নে সীমাবদ্ধ রাখা এবং স্থানীয় উন্নয়নের পূর্ণ দায়িত্ব নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করার দাবি আজ সর্বজনীন। এতে স্থানীয় সরকারগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাবে।
প্রান্তিক ও ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ‘দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের’ কাঠামো নিয়ে জনআলোচনা জরুরি। এতে বিশেষজ্ঞ নাগরিক, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকবে, যা এককক্ষবিশিষ্ট সংসদে প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। এছাড়া সংবিধানে উল্লিখিত ‘ন্যায়পাল’ পদটি অবিলম্বে কার্যকর করে তাকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে থাকতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অনিয়মের বিরুদ্ধে নাগরিকরা সরাসরি প্রতিকার পায়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাঠামোগত লড়াই
দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। নাগরিকরা এখন আর কেবল ‘জিরো টলারেন্স’-এর মতো চটকদার স্লোগান শুনতে চায় না, তারা চায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত লড়াই। নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করার আইনি বাধ্যবাধকতার ঘোষণা থাকতে হবে। সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ‘মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য রিয়েল-টাইম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত রাখা এবং একটি ‘কেন্দ্রীয় জবাবদিহিতা পোর্টাল’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। মানুষ চায় এমন এক জনবান্ধব প্রশাসন, যেখানে সাধারণ নাগরিককে ন্যায্য সেবার জন্য কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দ্বারস্থ হতে হবে না। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক সংস্থায় রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারের অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। তাই আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির কাগুজে হিসাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন সচল রাখা এবং রাজস্ব খাতের আমূল সংস্কারের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করার অঙ্গীকার থাকতে হবে।
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে টেকসই উত্তরণের জন্য বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি দূর করতে একটি ‘স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন’ গঠন করার দাবি ইশতেহারে যুক্ত করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ‘ভালো অর্থনীতিই ভালো রাজনীতি’—এই দর্শনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা ও আর্থিক খাতের লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়টি ইশতেহারে গুরুত্বের সাথে স্থান পেতে হবে।
শোভন কর্মসংস্থান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
২০২৪-এর বিপ্লবের মূল কারিগর ছিল এ দেশের তরুণ সমাজ। তাদের প্রধান দাবি হলো ‘শোভন কর্মসংস্থান’ (ডিসেন্ট ওয়ার্ক)। বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই নির্বাচনী ইশতেহারে কেবল ‘বেকারত্ব দূর করা’র মতো গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক শ্রমবাজারের সংযোগ ঘটানোর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।
কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ‘ইয়ুথ প্রসেসিং জোন’ বা যুব শিল্পাঞ্চল তৈরির প্রস্তাবটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। এছাড়া তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করবে। একইসঙ্গে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনের কোনো অস্তিত্ব যেন নতুন বাংলাদেশে না থাকে, সেই গ্যারান্টি দিতে হবে। ভয়হীন চিত্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নাগরিক পরিসরে মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের আমূল সংস্কার
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান বেহাল দশা নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আলোকে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে কমপক্ষে ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করার দাবি এখন জোরালো। ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বর্ধিতকরণ, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার বদলে সৃজনশীল ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করার রূপরেখা থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে নাগরিকদের নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয়ের বোঝা কমানোর জন্য ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করা আজ সময়ের দাবি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও ওষুধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্তত ৭৫ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদানের অঙ্গীকার থাকতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ওষুধ, প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবগুলোর সেবার মান ও ফির ওপর কঠোর নজরদারি এবং পরীক্ষা নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নির্মূল করার আইনি কাঠামো তৈরির প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে যুক্ত করা প্রয়োজন।
অর্থনীতির লাইফলাইন
কৃষি খাত আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও কৃষকরা বরাবরই নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অবহেলিত। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নারী কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী ‘কৃষি পণ্য-মূল্য কমিশন’ গঠন এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষকদের সুরক্ষায় ‘জলবায়ু বীমা’ প্রবর্তন করা জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও ট্রান্সপোর্টেশন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ ইশতেহারে স্থান পাওয়া উচিত। কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সার-বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও বৈষম্য নিরসন
একটি প্রকৃত বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র গড়তে হলে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারকে ইশতেহারের মূলধারায় আনতে হবে। সমতলের উপজাতিদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, উত্তরাধিকার আইনে নারীদের সমান অধিকার এবং তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক কমিশন বা বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার ইশতেহারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।
আঞ্চলিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা
উন্নয়ন কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে অঞ্চলভিত্তিক হওয়া উচিত। উত্তরাঞ্চলের খরা ও তিস্তা-নির্ভর কৃষি বাস্তবতা, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাস এবং হাওর ও চরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাকে বিবেচনায় রেখে পৃথক আঞ্চলিক উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ করে আন্তঃদেশীয় নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ও সাহসী কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ার অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকা আবশ্যক।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও জলাধার ভরাট বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার অঙ্গীকার থাকা জরুরি। সবার জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা ২০২৬-এর উত্তরণকালীন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রাধিকার দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি খাতের বিতর্কিত ‘কালো আইন’গুলো বাতিলের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
প্রতিহিংসামুক্ত বাংলাদেশ
৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ আর প্রতিহিংসার রাজনীতি দেখতে চায় না। রাজনৈতিক সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা হতে হবে আগামীর রাজনীতির ভিত্তি। রাজনৈতিক বিরোধীরা যেন রাষ্ট্রীয় শত্রু হিসেবে বিবেচিত না হয় এবং কোনো গণমাধ্যম যেন রাজনৈতিক চাপে বন্ধ বা সেন্সরশিপের শিকার না হয়, সেই নিশ্চয়তা নাগরিকরা চান। জাতীয় ঐক্য ও ন্যায়পরায়ণতা গড়ে তোলার জন্য একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ (সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে, যাতে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথ চলা সুগম হয়।
পরিশেষে, আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভোট প্রদানের উৎসব নয়, এটি রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের স্পৃহা এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার লড়াইয়ের নির্যাস হলো—একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং একটি মর্যাদাভিত্তিক জীবন। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রত্যাশাগুলোর প্রতিফলন না ঘটায় এবং বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ না দেয়, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় তারা আবারও ব্যর্থ হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, জনগণ আর অন্ধভাবে কোনো প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করতে চায় না; তারা চায় জবাবদিহিমূলক শাসন। আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হতে হলে দলগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা শুধু ক্ষমতার জন্য নয় বরং একটি বৈষম্যহীন, স্বৈরাচারমুক্ত এবং মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দর্শনই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।
লেখক: সংবাদকর্মী

নির্বাচন সামনে এলেই সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচিত হয় সেটি হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি। একইভাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে তাদের প্রচার এবং জনগণের জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরতে শুরু করেছে। তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শুধু কথার ফুলঝুরি আর গতানুগতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নির্বাচন এক অনন্য গুরুত্ব বহন করছে। এ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একাত্তরের অপূর্ণ অঙ্গীকার অর্জন ও চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্নিপরীক্ষা।
দীর্ঘ দেড় দশকের একরৈখিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ধস এবং জবাবদিহিহীনতার দেয়াল ভেঙে তরুণ প্রজন্ম যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছে, তার আইনগত ও রাজনৈতিক বাস্তবায়ন ঘটবে এই নির্বাচনের ইশতেহারে। প্রশ্ন উঠেছে—রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের এই পুঞ্জীভূত প্রত্যাশাকে ধারণ করতে প্রস্তুত? নাগরিক সমাজ ও তরুণরা যে ‘নতুন সামাজিক চুক্তির’ কথা বলছেন, তার প্রতিফলন ইশতেহারে কতটা থাকবে?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
নাগরিকদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ গত দেড় দশকে শাসনব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। সংসদ সদস্যদের ভূমিকা কেবল জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নে সীমাবদ্ধ রাখা এবং স্থানীয় উন্নয়নের পূর্ণ দায়িত্ব নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করার দাবি আজ সর্বজনীন। এতে স্থানীয় সরকারগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাবে।
প্রান্তিক ও ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ‘দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের’ কাঠামো নিয়ে জনআলোচনা জরুরি। এতে বিশেষজ্ঞ নাগরিক, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকবে, যা এককক্ষবিশিষ্ট সংসদে প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। এছাড়া সংবিধানে উল্লিখিত ‘ন্যায়পাল’ পদটি অবিলম্বে কার্যকর করে তাকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে থাকতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অনিয়মের বিরুদ্ধে নাগরিকরা সরাসরি প্রতিকার পায়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাঠামোগত লড়াই
দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। নাগরিকরা এখন আর কেবল ‘জিরো টলারেন্স’-এর মতো চটকদার স্লোগান শুনতে চায় না, তারা চায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত লড়াই। নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করার আইনি বাধ্যবাধকতার ঘোষণা থাকতে হবে। সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ‘মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য রিয়েল-টাইম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত রাখা এবং একটি ‘কেন্দ্রীয় জবাবদিহিতা পোর্টাল’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। মানুষ চায় এমন এক জনবান্ধব প্রশাসন, যেখানে সাধারণ নাগরিককে ন্যায্য সেবার জন্য কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দ্বারস্থ হতে হবে না। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক সংস্থায় রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারের অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। তাই আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির কাগুজে হিসাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন সচল রাখা এবং রাজস্ব খাতের আমূল সংস্কারের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করার অঙ্গীকার থাকতে হবে।
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে টেকসই উত্তরণের জন্য বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি দূর করতে একটি ‘স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন’ গঠন করার দাবি ইশতেহারে যুক্ত করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ‘ভালো অর্থনীতিই ভালো রাজনীতি’—এই দর্শনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা ও আর্থিক খাতের লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়টি ইশতেহারে গুরুত্বের সাথে স্থান পেতে হবে।
শোভন কর্মসংস্থান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
২০২৪-এর বিপ্লবের মূল কারিগর ছিল এ দেশের তরুণ সমাজ। তাদের প্রধান দাবি হলো ‘শোভন কর্মসংস্থান’ (ডিসেন্ট ওয়ার্ক)। বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই নির্বাচনী ইশতেহারে কেবল ‘বেকারত্ব দূর করা’র মতো গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক শ্রমবাজারের সংযোগ ঘটানোর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।
কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ‘ইয়ুথ প্রসেসিং জোন’ বা যুব শিল্পাঞ্চল তৈরির প্রস্তাবটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। এছাড়া তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করবে। একইসঙ্গে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনের কোনো অস্তিত্ব যেন নতুন বাংলাদেশে না থাকে, সেই গ্যারান্টি দিতে হবে। ভয়হীন চিত্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নাগরিক পরিসরে মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের আমূল সংস্কার
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান বেহাল দশা নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আলোকে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে কমপক্ষে ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করার দাবি এখন জোরালো। ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বর্ধিতকরণ, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার বদলে সৃজনশীল ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করার রূপরেখা থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে নাগরিকদের নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয়ের বোঝা কমানোর জন্য ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করা আজ সময়ের দাবি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও ওষুধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্তত ৭৫ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদানের অঙ্গীকার থাকতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ওষুধ, প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবগুলোর সেবার মান ও ফির ওপর কঠোর নজরদারি এবং পরীক্ষা নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নির্মূল করার আইনি কাঠামো তৈরির প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে যুক্ত করা প্রয়োজন।
অর্থনীতির লাইফলাইন
কৃষি খাত আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও কৃষকরা বরাবরই নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অবহেলিত। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নারী কৃষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী ‘কৃষি পণ্য-মূল্য কমিশন’ গঠন এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষকদের সুরক্ষায় ‘জলবায়ু বীমা’ প্রবর্তন করা জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও ট্রান্সপোর্টেশন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ ইশতেহারে স্থান পাওয়া উচিত। কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সার-বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও বৈষম্য নিরসন
একটি প্রকৃত বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র গড়তে হলে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারকে ইশতেহারের মূলধারায় আনতে হবে। সমতলের উপজাতিদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, উত্তরাধিকার আইনে নারীদের সমান অধিকার এবং তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক কমিশন বা বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার ইশতেহারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।
আঞ্চলিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা
উন্নয়ন কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে অঞ্চলভিত্তিক হওয়া উচিত। উত্তরাঞ্চলের খরা ও তিস্তা-নির্ভর কৃষি বাস্তবতা, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাস এবং হাওর ও চরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাকে বিবেচনায় রেখে পৃথক আঞ্চলিক উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ করে আন্তঃদেশীয় নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ও সাহসী কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ার অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকা আবশ্যক।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও জলাধার ভরাট বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার অঙ্গীকার থাকা জরুরি। সবার জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা ২০২৬-এর উত্তরণকালীন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রাধিকার দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি খাতের বিতর্কিত ‘কালো আইন’গুলো বাতিলের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
প্রতিহিংসামুক্ত বাংলাদেশ
৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ আর প্রতিহিংসার রাজনীতি দেখতে চায় না। রাজনৈতিক সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা হতে হবে আগামীর রাজনীতির ভিত্তি। রাজনৈতিক বিরোধীরা যেন রাষ্ট্রীয় শত্রু হিসেবে বিবেচিত না হয় এবং কোনো গণমাধ্যম যেন রাজনৈতিক চাপে বন্ধ বা সেন্সরশিপের শিকার না হয়, সেই নিশ্চয়তা নাগরিকরা চান। জাতীয় ঐক্য ও ন্যায়পরায়ণতা গড়ে তোলার জন্য একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ (সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে, যাতে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথ চলা সুগম হয়।
পরিশেষে, আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভোট প্রদানের উৎসব নয়, এটি রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের স্পৃহা এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার লড়াইয়ের নির্যাস হলো—একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং একটি মর্যাদাভিত্তিক জীবন। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রত্যাশাগুলোর প্রতিফলন না ঘটায় এবং বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ না দেয়, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় তারা আবারও ব্যর্থ হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, জনগণ আর অন্ধভাবে কোনো প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করতে চায় না; তারা চায় জবাবদিহিমূলক শাসন। আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হতে হলে দলগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা শুধু ক্ষমতার জন্য নয় বরং একটি বৈষম্যহীন, স্বৈরাচারমুক্ত এবং মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দর্শনই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।
লেখক: সংবাদকর্মী

আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারী প্রসঙ্গ এখন সবচেয়ে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ বা ‘নারীর কাজ ঘর সামলানো’র মতো বহুচর্চিত বিষয়গুলো এখন আরও বিস্তৃত হয়ে ‘কর্মজীবী নারীরা বেশ্যা’ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
অনেকে মনে করেন যে এমন প্রেক্ষাপটে কোনো নারী বিদ্বেষী মন্তব্য নিয়ে ডিজিটাল প্রমাণের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর হ্যাকিংয়ের দাবিকে সত্য বলে মেনে নেওয়া কঠিন।
৪ ঘণ্টা আগে
অবশেষে সাদ্দাম ফিরলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে। ফিরলেন ৯ মাস বয়সী পুত্র সেজানের কাছে। কিন্তু ফিরতে হলো তাদের কবরের কাছে। দেশবাসীকে ছুঁয়েছে তাঁর মায়ের আক্ষেপ—‘এখন জামিন হওয়া আর না হওয়া সমান। বাড়ি এসে দেখবে ছেলে–বউয়ের কবর। তাহলে এই জামিন দিয়ে কী হবে?’
১ দিন আগে
বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা—স
১ দিন আগে