নির্বাচনের আর মাত্র ১১ দিন বাকি। এই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের একাউন্ট থেকে দেওয়া একটি এক্স পোস্ট ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় জামায়াত আমিরের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের নিয়ে একটি অত্যন্ত অপত্তিকর পোস্ট করা হয়। এরপর খুব স্বাভাবিক কারণেই ওই পোস্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
ছাত্রদল আজ রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এবং জামায়াত আমিরকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেছেন, জামায়াত আমিরের আইডি নয়, মাথা হ্যাকড হয়েছে। তিনি মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন।
নারীবিদ্বেষী পোস্টের ৯ ঘণ্টা পর আইডি হ্যাকের দাবি কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নও তুলেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জামায়াত আমিরের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল করেছে।
আজ রোববার জামায়াতের পক্ষ থেকে অ্যাকাউন্টটি ‘হ্যাক’ হওয়ার দাবি করা হয়েছে এবং জিডি করা হয়েছে। জামায়াত জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘটনাকে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ হিসেবেও উল্লেখ করেছে।
কিন্তু দাবির পেছনে জামায়াত কোনো যথাযথ প্রমাণ এখনো জনগণের সামনে হাজির করেনি। ফলে এই ঘটনাটি ডিজিটাল যুগের রাজনীতিতে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এটি কি কেবলই একটি সাইবার অপরাধ, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ? জামায়াতের দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে এটি হবে সাইবার প্রোপাগান্ডার ক্ল্যাসিক উদাহরণ।
ডিজিটাল রাজনীতিতে ‘ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা’ বা নেতিবাচক প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষকে এমনভাবে আঘাত করা যা তাদের জনসমর্থনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। হ্যাকাররা এমন বিষয়ই বেছে নেয় যা সাধারণ মানুষের আবেগকে সবচেয়ে দ্রুত উত্তেজিত করতে পারে।
আর যদি এটি হ্যাকিংয়ের ঘটনা না হয়ে থাকে, তবে পোস্টটি জামায়াত আমির ও তাঁর দলের আদর্শিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে ধরে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। এর আগেও জামায়াত নারী প্রশ্নে তাদের কট্টর মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। মাত্রই কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘নারীরা কখনোই জামায়াতে ইসলামীর আমির হতে পারবে না।’
এমনকি এই আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত একজন নারী সদস্যকেও এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি। এ ছাড়া মাত্র আটদিন আগে ‘ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল’ বলে মন্তব্য করেছেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শামীম আহসান। জামায়াত অবশ্য পরে তাঁকে দল থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
ডিজিটাল যুগে একজন নেতার ব্যক্তিগত বা অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা রক্ষা করা কেবল কারিগরি কাজ নয়, এটি এখন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ। কোনো নেতার অ্যাকাউন্ট থেকে আসা বক্তব্য যদি সমাজের কোনো বড় গোষ্ঠীকে আঘাত করে, তবে ‘হ্যাক হয়েছে’ বলে বিবৃতি দেওয়াটি কেবল একটি প্রাথমিক অজুহাত হতে পারে।
এর আগে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে অন্তবর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের কিছু প্রস্তাবের বিরোধীতা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছিলেন, কমিশনের সুপারিশগুলো কোরআন সুন্নাহর পরিপন্থী ও পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের ষড়যন্ত্র।
অনেকে মনে করেন যে এমন প্রেক্ষাপটে কোনো নারী বিদ্বেষী মন্তব্য নিয়ে ডিজিটাল প্রমাণের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর হ্যাকিংয়ের দাবিকে সত্য বলে মেনে নেওয়া কঠিন।
তবে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জাতীয় নেতাদের বিতর্কিত করা বা তাদের ব্যক্তিগত ডিজিটাল তথ্য ফাঁস করা এখন আর নতুন কিছু নয়। এটি এখন বৈশ্বিক ট্রেন্ড। বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে এ ধরনের অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়।
২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান জন পোডেস্টার ইমেইল হ্যাক এবং তা উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া নির্বাচনের ফলাফল বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ২০১৭ সালের ফরাসি নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর প্রচারণা শিবিরের হাজার হাজার ইমেইল ও নথি ভোটের মাত্র দুই দিন আগে ফাঁস করা হয়েছিল, যা ‘মাখোঁলিকস’ নামে পরিচিতি পায়। একইভাবে ২০২১ সালে জার্মানির সাধারণ নির্বাচনের সময় শত শত রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত তথ্য ও চ্যাট হিস্ট্রি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে ব্যালট বক্সের চেয়েও ‘বট’ এবং ‘হ্যাক’ বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামায়াত আমিরের এই ঘটনাটি কি তবে সেই বৃহত্তর সাইবার যুদ্ধেরই অংশ? সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বড় দলের নেতাদের ওপর কি এমন হামলার ঝুঁকি বাড়ছে? যদি তাই হয়, তবে আমাদের নির্বাচনকালীন ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বঙ্গভবনের ইমেইল ঠিকানার আদলে তৈরি একটি ভুয়া ফিশিং ইমেইল ব্যবহার করে এই হ্যাকিং করা হয়েছে। এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ববহ। যদি হ্যাকাররা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক নেতার অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করতে পারে, তবে তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এই ঘটনার মাধ্যমে একটি স্পর্শকাতর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উসকানি ছড়িয়ে সমাজে দাঙ্গা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা উচিত।
ডিজিটাল যুগে একজন নেতার ব্যক্তিগত বা অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা রক্ষা করা কেবল কারিগরি কাজ নয়, এটি এখন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ। কোনো নেতার অ্যাকাউন্ট থেকে আসা বক্তব্য যদি সমাজের কোনো বড় গোষ্ঠীকে আঘাত করে, তবে ‘হ্যাক হয়েছে’ বলে বিবৃতি দেওয়াটি কেবল একটি প্রাথমিক অজুহাত হতে পারে। এরকম অভিযোগ প্রমাণের কিছু স্বীকৃত মানদন্ড আছে। দাবিকারীর উচিত সেই মানদন্ড অনুযায়ী তাদের দাবী প্রমাণ করা। সেই দাবী প্রমাণের সঙ্গে ডিজিটাল হাইজিন বা নিরাপত্তা সচেতনতা নিশ্চিত করা দরকার হবে। নির্বাচনের আগে দলগুলোকে তাদের আইটি উইং এবং নেতাদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় ও তাদের একাউন্ট থেকে যেকোনো তথ্য প্রচার ও তার সত্যতা প্রমাণে আরও পেশাদার হতে হবে।
জামায়াত আমিরের এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের রাজনীতি আর কেবল রাজপথের স্লোগান বা জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সার্ভার আর কোডিংয়ের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সত্যতা নিরূপণের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রবিশেষে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপেরও প্রয়োজন হতে পারে।
নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভোটারদের প্রভাবিত করতে অনেক 'ডিপফেক' ভিডিও বা 'ফেক পোস্ট' আসতে পারে। তাই জনগণের যেমন উচিত তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে আবেগতাড়িত না হওয়া, তেমনি রাজনীতিবিদদেরও উচিত ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজেদের নিরাপত্তা এবং নৈতিকতা নিশ্চিত করা।
- মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক