স্বাধীনতার ২৫০ বছরে প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কতদূর এগিয়েছে আমেরিকা

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ২০: ১৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ফিলাডেলফিয়ার ফিজিক্যাল বাউন্ডারি পেরিয়ে তেরোটি ব্রিটিশ উপনিবেশ যখন এক ঐতিহাসিক ইশতেহারের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীন ও সার্বভৌম হিসেবে ঘোষণা করে, তখন আধুনিক মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরীক্ষার সূচনা হয়েছিল। টমাস জেফারসনের ক্ষুরধার লেখায় ফুটে ওঠা সেই অমোঘ বাণী, ‘সকল মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট এবং তাদের সৃষ্টিকর্তা তাদের কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার দান করেছেন’— কেবল একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের ঘোষণাপত্র ছিল না, বরং তা ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচার ও সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ।

২০২৬ সালে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি বা সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল উদযাপন করছে, তখন এই আড়াই শতকের যাত্রাপথকে কেবল একটি ভূ-খণ্ডের অর্থনৈতিক বা সামরিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার খতিয়ান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত এক অবিরাম এবং জটিল গণতান্ত্রিক পরীক্ষার বিবর্তনের দলিল।

বিশ্ব ইতিহাসে আমেরিকার এই অগ্রযাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক তাৎপর্য সুগভীর। ফরাসি সমাজচিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস ডি টকভিল তাঁর কালজয়ী ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’ গ্রন্থে মার্কিন সমাজকাঠামোকে একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যেখানে সামাজিক সমতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং নাগরিক সক্রিয়তা এক অভূতপূর্ব রসায়ন তৈরি করেছে।

১৭৮৭ সালে ফিলাডেলফিয়া কনভেনশনে যখন মার্কিন সংবিধানের খসড়া তৈরি হচ্ছিল, তখন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে এক নারী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনারা আমাদের কী দিলেন, একটি প্রজাতন্ত্র নাকি একটি রাজতন্ত্র?’ ফ্রাঙ্কলিন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘একটি প্রজাতন্ত্র, যদি আপনারা তা ধরে রাখতে পারেন।’

তবে এই পথচলা কোনো সরলরেখায় অগ্রসর হয়নি। আমেরিকার ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বা প্রতিষ্ঠাতা জনকগণ যে ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তা শুরু থেকেই ছিল চরম নৈতিক বৈপরীত্য ও অমিত সম্ভাবনার এক জটিল সংমিশ্রণ। যে সংবিধানে ব্যক্তি স্বাধীনতার জয়গান গাওয়া হয়েছিল, সেখানেই দাসপ্রথাকে টিকিয়ে রাখার আইনি আপস করা হয়েছিল। ফলে, গত ২৫০ বছর ধরে মার্কিন গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তিই ছিল এর নিজস্ব উচ্চাভিলাষী আদর্শ এবং রূঢ় বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানকে কমিয়ে আনার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

রাষ্ট্রগঠনে প্রতিষ্ঠাতাদের মূল স্বপ্ন ও দর্শন

আমেরিকা রাষ্ট্রগঠনের নেপথ্যে যে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি কাজ করেছিল, তা ছিল ইউরোপীয় ‘আলোকায়ন যুগ’-এর প্রগতিশীল চিন্তাধারার সরাসরি ফসল। টমাস জেফারসন, জর্জ ওয়াশিংটন, জেমস ম্যাডিসন, জন অ্যাডামস এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনদের মতো ফাউন্ডিং ফাদার্স বা প্রতিষ্ঠাতা জনকগণ যখন একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর নকশা করছিলেন, তখন তাঁদের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক অনুপ্রেরণা ছিলেন ব্রিটিশ দার্শনিক জন লক এবং ফরাসি চিন্তাবিদ মন্টেস্কু। জন লকের ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব’ এবং মানুষের প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা বিশেষ করে জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার, মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। জেফারসন লকের ‘সম্পত্তি’ শব্দটিকে পরিমার্জিত করে যুক্ত করেছিলেন ‘সুখের সন্ধান’ (দ্য পারসুইট অব হ্যাপিনেস), যা মার্কিন রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম মূলস্তম্ভে পরিণত হয়।

প্রতিষ্ঠাতাদের রাষ্ট্রচিন্তার মূল লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় স্টাইলের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র এবং স্বৈরাচারীব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত এক রাজনৈতিক আদর্শ দাঁড় করানো। তাঁরা এমন একটি ‘সীমিত সরকার’ গঠন করতে চেয়েছিলেন, যা নাগরিকদের মৌলিক স্বাধীনতায় অন্যায্য হস্তক্ষেপ করবে না। জেমস ম্যাডিসন তাঁর বিখ্যাত ফেডারেলিস্ট নম্বর ৫১ নিবন্ধে সরকারের ভেতরের মানবীয় প্রবৃত্তির এক নিখুঁত বিশ্লেষণ দিয়ে লিখেছিলেন, ‘যদি মানুষেরা ফেরেশতা হতো, তবে কোনো সরকারের প্রয়োজন হতো না।’ এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কুর ‘ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি’কে অত্যন্ত কঠোরভাবে মার্কিন শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়।

সাম্যবাদ ঠেকানোর নামে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কিংবা একবিংশ শতাব্দীতে এসে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ’-এর ছদ্মাবরণে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ ও দুই দশকের আফগানিস্তান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে চরম ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, নজিরবিহীন বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং উগ্রপন্থার জন্ম দিয়েছে।

আইনসভা (কংগ্রেস), নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ এর মধ্যে ক্ষমতা এমনভাবে ভাগ করে দেওয়া হয় যাতে প্রতিটি বিভাগ অন্য বিভাগের ওপর নজরদারি বা ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বজায় রাখতে পারে। প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন ছিল একটি নিখুঁত ‘প্রজাতন্ত্র’ বিনির্মাণ, যা কোনো একক মেজরিটি বা ডেমোক্র্যাটিক মব এর আবেগ দ্বারা চালিত হবে না, বরং চালিত হবে আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সদ্গুণের মাধ্যমে। তাঁরা একটি সুষম ফেডারেল কাঠামো চেয়েছিলেন, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট থাকবে এবং অবশিষ্ট ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে, যা সামগ্রিকভাবে একটি টেকসই এবং ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

আড়াই শতকের অভ্যন্তরীণ অর্জন ও গণতান্ত্রিক বিবর্তন

বিগত ২৫০ বছর ধরে মার্কিন গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তিই ছিল এর নিজস্ব উচ্চাভিলাষী আদর্শ এবং রূঢ় বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানকে কমিয়ে আনার এক নিরন্তর সংগ্রাম। এই বিবর্তন মূলত তিনটি ঐতিহাসিক মাইলফলকের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।

দাসপ্রথার বিলোপ ও গৃহযুদ্ধ

আমেরিকার প্রথম শতাব্দীর সবচেয়ে বড় নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট ছিল দাসপ্রথা। ১৭৮৭ সালের সংবিধানে কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের পরিবর্তে ‘তিন-পঞ্চমাংশ’ হিসেবে গণনা করার যে ঐতিহাসিক আপস করা হয়েছিল, তা ছিল মার্কিন প্রজাতন্ত্রের মূল দর্শনের পরিপন্থী। এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের চূড়ান্ত ও সহিংস বিস্ফোরণ ঘটে ১৮৬১ সালের মার্কিন গৃহযুদ্ধে।

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন এই চরম জাতীয় সংকটে অসামান্য দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। ১৮৬৩ সালের ‘এমানসিপেশন প্রোক্লেমেশন’ বা দাসমুক্তি ঘোষণা এবং পরে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথার আইনি অবসান ঘটানো হয়। ১৮৬৩ সালের নভেম্বরে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক গেটিসবার্গ বক্তৃতায় লিংকন আমেরিকার নতুন জন্ম ও গণতন্ত্রের সর্বকালের সেরা সংজ্ঞা প্রদান করেন ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার’। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকা কেবল ভৌগোলিক অখণ্ডতাই রক্ষা করেনি, বরং এটি নিশ্চিত করেছিল যে মার্কিন ইউনিয়ন স্বাধীনতার একটি নতুন যুগের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও লিঙ্গ সমতা

দাসপ্রথার অবসান ঘটলেও কৃষ্ণাঙ্গদের পূর্ণ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পেতে আরও এক শতাব্দী লেগে যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রবর্তিত বর্ণবাদী ‘জিম ক্রো আইন’ কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার এবং মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘নাগরিক অধিকার আন্দোলন’ মার্কিন গণতন্ত্রকে তার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির মুখোমুখি দাঁড় করায়। অহিংস গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৬৪ সালের সিভিল রাইটস অ্যাক্ট এবং ১৯৬৫ সালের ভোটাধিকার আইন পাস হয়, যা আইনিভাবে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন একচেটিয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তারা একটি নতুন বিশ্বকাঠামোর জন্ম দেয় যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। সান ফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ গঠন, ব্রিটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৪৯ সালে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট (ন্যাটো) গঠনের পেছনে মূল কারিগর ছিল আমেরিকা।

অনুরূপভাবে, নারীদের ভোটাধিকারের সংগ্রামও ছিল দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯২০ সালে সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে নারীরা ভোটাধিকার লাভ করেন। এই আন্দোলনগুলো প্রমাণ করে যে মার্কিন গণতন্ত্র কোনো স্থবির বিষয় নয়, বরং এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া যা নাগরিক আন্দোলনের চাপে নিজেকে প্রসারিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে বাধ্য হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা

আমেরিকান রাজনৈতিকব্যবস্থার স্থায়িত্বের মূল চাবিকাঠি হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন। ১৮০৩ সালের ঐতিহাসিক ‘মারবারি বনাম ম্যাডিসন’ মামলার রায়ের মাধ্যমে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘জুডিশিয়াল রিভিউ’ বা বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা অর্জন করে। এই ক্ষমতার ফলে বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইনসভার যেকোনো অসাংবিধানিক আইন বাতিল করার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব পায়, যা ফাউন্ডিং ফাদার্সদের ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নীতিকে আরও শক্তিশালী করে। ১৯৫৪ সালের ‘ব্রাউন বনাম বোর্ড অব এডুকেশন’ মামলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ণবৈষম্যকে অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট সামাজিক রূপান্তরে নেতৃত্ব দেয়, যা আইনের শাসনকে আরও সুসংহত করে।

মার্কিন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো

আমেরিকান গণতন্ত্রের আড়াই শ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত শক্তির ইতিহাস খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে বিশ্বের বহু দেশে কয়েক দশক পরপরই সংবিধান পরিবর্তন হয় বা শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সেখানে আমেরিকার এই দীর্ঘস্থায়ী স্থায়িত্বের রহস্য লুকিয়ে আছে এর অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক নকশার মধ্যে। মার্কিন গণতন্ত্রের শক্তির মূল ভিত্তিগুলো হলো—

প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা

আমেরিকান গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অবিশ্বাস্য প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা। ১৭৮৯ সালে প্রথম মার্কিন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই দীর্ঘ আড়াই শ বছরে দেশটিতে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেনি, কিংবা কখনো সম্পূর্ণ সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

আমেরিকা কিন্তু সবসময় শান্ত ছিল না। গত ২৫০ বছরে এই রাষ্ট্রটিকে অনেক বড় বড় ঝড়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৮৬০-এর দশকের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, ১৯৩০-এর দশকের ভয়াবহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকট এবং ১৯৬০-এর দশকের তীব্র সামাজিক ও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, এসব কিছুর মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও দেশটির শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। এর কারণ হলো, সংকটের সময়েও ব্যক্তি বা শাসক নয়, বরং ‘প্রতিষ্ঠান’ ও ‘আইনের শাসন’ শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। এই দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসই মার্কিন রাষ্ট্রকে যেকোনো বড় ধাক্কা সামলে ওঠার এক অনন্য ক্ষমতা বা সহনশীলতা দিয়েছে।

ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ নীতি

আমেরিকা কোনো একক কেন্দ্রশাসিত রাষ্ট্র নয়, এটি ৫০টি স্বাধীন অঙ্গরাজ্যের একটি জটিল ইউনিয়ন বা জোট। এই ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে সীমাবদ্ধ করা আছে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব গভর্নর, নিজস্ব আইনসভা এবং নিজস্ব পুলিশি ও আইনিব্যবস্থা রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমেরিকার জাতীয় নির্বাচন কোনো একক কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করে না; বরং প্রতিটি অঙ্গরাজ্য সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের নিজস্ব নিয়ম ও আইন অনুযায়ী ভোট গ্রহণ ও গণনা সম্পন্ন করে। ক্ষমতার এই ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে ওয়াশিংটনে বসা কোনো একনায়কতান্ত্রিক শাসক যদি পুরো দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতেও চান, তবে তা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ প্রতিটি অঙ্গরাজ্য নিজেই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক একটি শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে কাজ করে।

শক্তিশালী নাগরিক সমাজ

আইন ও আদালতের পাশাপাশি মার্কিন গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে সে দেশের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, সচেতন ও স্বাধীন নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটি। এর মধ্যে রয়েছে মুক্ত থিংক-ট্যাংক, মানবাধিকার সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠন এবং স্বাধীন জনমত। আমেরিকার নাগরিকরা ঐতিহাসিকভাবেই সরকারের অতিরিক্ত ক্ষমতার প্রতি সন্দিহান এবং নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। সরকার যখনই কোনো অন্যায্য সিদ্ধান্ত নেয়, এই নাগরিক সমাজ তা প্রতিরোধে জনমত গঠন করে। নাগরিক সমাজের এই সদা-জাগ্রত ভূমিকাই আড়াই শ বছর ধরে মার্কিন গণতন্ত্রের ভেতরের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাগুলোকে রুখে দিয়েছে।

মার্কিন গণতন্ত্রের সমকালীন সংকট

স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রে এসে মার্কিন গণতন্ত্র এমন কিছু নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যা এই ব্যবস্থার শক্তির ভিত্তিমূলেই কুঠারাঘাত করছে। সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নগুলো দীর্ঘকাল ধরে অনুচ্চারিত ছিল, তা এখন প্রকাশ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।

চরম দলীয় মেরুকরণ

আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জনক জেমস ম্যাডিসন ১৭৮৭ সালে তাঁর বিখ্যাত ফেডারেলিস্ট নম্বর ১০ নিবন্ধে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, চরম দলাদলি বা উপদলীয় কোন্দল একটি সুস্থ প্রজাতন্ত্রকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বর্তমান মার্কিন রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান এই দুই প্রধান শিবিরের আচরণ ম্যাডিসনের সেই আশঙ্কাকেই অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করছে।

আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদার্স বা প্রতিষ্ঠাতা জনকগণ। সংগৃহীত ছবি
আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদার্স বা প্রতিষ্ঠাতা জনকগণ। সংগৃহীত ছবি

বর্তমান আমেরিকায় রাজনীতি কেবল দুটি দলের ভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন রূপ নিয়েছে এক অন্ধ ও মারমুখী রাজনৈতিক উপজাতীয়বাদে। আজ একজন ডেমোক্র্যাট বা একজন রিপাবলিকান কেবল নিজের দলের নীতিকে সমর্থন করেন না, বরং বিপরীত দলকে দেশের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করেন। এই চরম মানসিকতার কারণে রাজনৈতিক সমঝোতা, যা মার্কিন আইনসভার মূল চালিকাশক্তি ছিল, তা আজ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। বাজেট পাস করা থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রতিটি জাতীয় বিষয়ে দুই দল এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়, যার ফলে সরকার পরিচালনায় একধরনের অচলাবস্থা বা ‘গ্রিডলক’ তৈরি হয়।

ক্যাপিটল হিল হাঙ্গামা ও নির্বাচনীব্যবস্থার সংকট

আমেরিকান গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও অহংকার ছিল নির্বাচনে যে দলই জিতুক না কেন, পরাজিত দল তা মেনে নিত এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হতো। আড়াই শ বছর ধরে চলে আসা এই অলিখিত পবিত্র নিয়মটি ভেঙে চুরমার হয়ে যায় ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি। ওই দিন ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে (মার্কিন সংসদ ভবন) তৎকালীন বিদায়ী প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের নজিরবিহীন ও সহিংস হামলা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দেয়।

এই ঘটনাটি কেবল একটি দাঙ্গা ছিল না, বরং এটি ছিল আমেরিকার নির্বাচনীব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশের মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ নয় এবং জালিয়াতি সম্ভব। যখন একটি গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকরা ভোটের ফলাফলের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন সেই গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিটিই ধসে পড়ে। আজ স্বাধীনতার ২৫০ বছরে এসেও মার্কিন নির্বাচনব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে এই অভ্যন্তরীণ অবিশ্বাস ও সংশয় দূর করা সম্ভব হয়নি, যা তাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।

কর্পোরেট পুঁজির ব্যাপক প্রভাব

আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদার্সরা চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজ, যেখানে সাধারণ মানুষের ভোটের মূল্য থাকবে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ২০১০ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায় এই স্বপ্নকে চিরতরে বদলে দেয়। সিটিজেন্স ইউনাইটেড বনাম এফইসি নামক ওই মামলার রায়ে আদালত ঘোষণা করে যে নির্বাচনে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে কর্পোরেশন বা বড় বড় কোম্পানিগুলোর অর্থ দেওয়া মূলত তাদের বাক-স্বাধীনতার অংশ।

১৮০৩ সালের ঐতিহাসিক ‘মারবারি বনাম ম্যাডিসন’ মামলার রায়ের মাধ্যমে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘জুডিশিয়াল রিভিউ’ বা বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা অর্জন করে। এই ক্ষমতার ফলে বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইনসভার যেকোনো অসাংবিধানিক আইন বাতিল করার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব পায়, যা ফাউন্ডিং ফাদার্সদের ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নীতিকে আরও শক্তিশালী করে।

এই রায়ের পর জন্ম নেয় সুপার প্যাক বা বিশেষ রাজনৈতিক তহবিল, যার মাধ্যমে বিলিয়নেয়ার বা ধনকুবেররা এবং বড় বড় কোম্পানিগুলো নামপরিচয় গোপন রেখেও মার্কিন নির্বাচনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালতে শুরু করে। আমেরিকায় এখন একজন সাধারণ নাগরিকের একটি ভোটের চেয়ে একজন ধনকুবেরের কোটি ডলারের তহবিল নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে বেশি ভূমিকা রাখছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ট্যাক্স বা জনকল্যাণের চেয়ে বড় বড় লবিস্ট গ্রুপ ও বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে আইন তৈরি করা হচ্ছে। তাই বর্তমান আমেরিকাকে একটি 'ছদ্ম-অলিগার্কি' বা ধনকুবের শাসিত রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করলে সেটি অত্যুক্তি হবে না।

গণমাধ্যমের মেরুকরণ ও অপতথ্যের সামাজিক বিস্তার

একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, যে কারণে গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কিন্তু বর্তমান আমেরিকার মূলধারার গণমাধ্যমগুলো (যেমন ফক্স নিউজ কিংবা সিএনএন) নিজেই তীব্রভাবে আদর্শিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তথ্য পরিবেশনের চেয়ে দর্শক ধরে রেখে মুনাফা অর্জন করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব ইত্যাদি)। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যা একজন ব্যবহারকারীকে কেবল তাঁর নিজের পছন্দের রাজনৈতিক মতাদর্শের কনটেন্টই বারবার দেখায়। একে বলা হয় ‘ইকো চেম্বার’ বা প্রতিধ্বনি ঘর। এর ফলে মানুষ অন্য পক্ষের যুক্তি বা সত্যটা দেখার সুযোগই পায় না। এই সুযোগে সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে সুপরিকল্পিত অপতথ্য এবং ‘ফেক নিউজ’। সত্য ও মিথ্যার এই কৃত্রিম যুদ্ধ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যকার পারস্পরিক সামাজিক বিশ্বাস, সহনশীলতা এবং বহুত্ববাদী চেতনার প্রাচীরকে দিন দিন ধসিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রভাব

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবর্তন কেবল তার ভৌগোলিক মানচিত্রের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বিগত আড়াই শ বছরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তবে বিশ্বমঞ্চে ওয়াশিংটনের এই ভূমিকার মূল্যায়ন করতে গেলে আমাদের উদারনীতিবাদ এবং বাস্তববাদ এই দুই প্রধান তত্ত্বের আলোকেই দেখতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন একচেটিয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তারা একটি নতুন বিশ্বকাঠামোর জন্ম দেয় যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। সান ফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ গঠন, ব্রিটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৪৯ সালে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট (ন্যাটো) গঠনের পেছনে মূল কারিগর ছিল আমেরিকা।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তাত্ত্বিক লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে মুক্তবাজার অর্থনীতি, বহুপাক্ষিক কূটনীতি, সার্বজনীন মানবাধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যা মূলত মার্কিন লিবারেল ডেমোক্রেসিরই বৈশ্বিক সম্প্রসারণ।

আমেরিকা রাষ্ট্রগঠনের নেপথ্যে যে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি কাজ করেছিল, তা ছিল ইউরোপীয় ‘আলোকায়ন যুগ’-এর প্রগতিশীল চিন্তাধারার সরাসরি ফসল। টমাস জেফারসন, জর্জ ওয়াশিংটন, জেমস ম্যাডিসন, জন অ্যাডামস এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনদের মতো ফাউন্ডিং ফাদার্স বা প্রতিষ্ঠাতা জনকগণ যখন একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর নকশা করছিলেন, তখন তাঁদের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক অনুপ্রেরণা ছিলেন ব্রিটিশ দার্শনিক জন লক এবং ফরাসি চিন্তাবিদ মন্টেস্কু।

স্নায়ুযুদ্ধের দীর্ঘ চার দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্যবাদের বিপরীতে ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তাঁর বিখ্যাত থিসিসে ঘোষণা করেছিলেন ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ (দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি), যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রই মানবজাতির আদর্শিক বিবর্তনের চূড়ান্ত ও সর্বজনীন রূপ।

বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন ভূমিকার অন্ধকার দিক

এই উজ্জ্বল আদর্শিক ইতিহাসের আড়ালে রয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক নগ্ন বাস্তববাদী ও সুবিধাবাদী রূপ, যা প্রায়ই ফাউন্ডিং ফাদার্সদের নৈতিক দর্শনের পরিপন্থী। আমেরিকা তার নিজের স্বার্থে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বা ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’-এর নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে।

১৯৫৩ সালে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক সরকারকে সিআইএর ‘অপারেশন এজাক্স’-এর মাধ্যমে উৎখাত করে শাহের স্বৈরাচারী শাসন পুনরুত্থিত করা এবং ১৯৭৩ সালে চিলির নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দেকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরিয়ে জেনারেল পিনোশের মতো নিষ্ঠুর একনায়ককে সমর্থন দেওয়া ছিল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আদর্শিক দেউলিয়াত্বের নিকৃষ্টতম উদাহরণ।

সাম্যবাদ ঠেকানোর নামে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কিংবা একবিংশ শতাব্দীতে এসে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ’-এর ছদ্মাবরণে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ ও দুই দশকের আফগানিস্তান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে চরম ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, নজিরবিহীন বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং উগ্রপন্থার জন্ম দিয়েছে।

এই যে নিজের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের সঙ্গে গভীর কৌশলগত বন্ধুত্ব রক্ষা করা এবং প্রতিপক্ষ দেশের মানবাধিকার নিয়ে তীব্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এই নীতি বিশ্বজুড়ে মার্কিন সফট পাওয়ার বা আদর্শিক আকর্ষণকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে।

প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন থেকে কতদূরে বর্তমান আমেরিকা

১৭৮৭ সালে ফিলাডেলফিয়া কনভেনশনে যখন মার্কিন সংবিধানের খসড়া তৈরি হচ্ছিল, তখন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে এক নারী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনারা আমাদের কী দিলেন, একটি প্রজাতন্ত্র নাকি একটি রাজতন্ত্র?’ ফ্রাঙ্কলিন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘একটি প্রজাতন্ত্র, যদি আপনারা তা ধরে রাখতে পারেন।’ স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আজ এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক যে, টমাস জেফারসন, জর্জ ওয়াশিংটন বা জেমস ম্যাডিসনের মতো ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বা প্রতিষ্ঠাতা জনকগণ যে আমেরিকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, বর্তমান আমেরিকা তা থেকে কতখানি দূরে সরে গেছে?

এই প্রশ্নের উত্তরটি কোনো একক সমীকরণে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি একই সাথে একাধারে অসামান্য সাফল্য এবং গভীরতম বিচ্যুতির এক মহাকাব্যিক খতিয়ান। ১৭৭৬ সালের ফিলাডেলফিয়ার সেই তেরোটি উপনিবেশের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি আজ অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সামরিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠাতাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। জেমস ম্যাডিসন বা টমাস জেফারসন যে সাংবিধানিক কাঠামোর রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, তার সহনশীলতা ও নমনীয়তার প্রমাণ হলো এটি আড়াই শ বছর ধরে একের পর এক গৃহযুদ্ধ, মহামন্দা ও বিশ্বযুদ্ধ মোকাবিলা করেও নিজের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখেছে।

২০২৬ সালে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি বা সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল উদযাপন করছে, তখন এই আড়াই শতকের যাত্রাপথকে কেবল একটি ভূ-খণ্ডের অর্থনৈতিক বা সামরিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার খতিয়ান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত এক অবিরাম এবং জটিল গণতান্ত্রিক পরীক্ষার বিবর্তনের দলিল।

তবে এই বাহ্যিক পরাক্রমের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এর নৈতিক সংকটের বীজ। বর্তমান আমেরিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, ফাউন্ডিং ফাদার্সরা যে দলহীন জাতীয় ঐক্য এবং সদ্গুণের প্রজাতন্ত্র চেয়েছিলেন, তা আজ চরম রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং কর্পোরেট পুঁজির অলিগার্কিক থাবায় ক্ষতবিক্ষত। জেমস ম্যাডিসনের সেই ‘দলাদলি নিয়ে শঙ্কা’ আজ মার্কিন ক্যাপিটল হিলের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীর এই বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং গ্লোবাল সাউথের নিজস্ব এজেন্ডা অত্যন্ত সক্রিয়, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক আধিপত্য দিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারবে না। আমেরিকার ভবিষ্যৎ এবং তার স্বাধীনতার আড়াই শ বছরের লিগ্যাসি রক্ষা পাবে তখনই, যখন সে তার ঘরের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক ফাটলগুলো মেরামত করতে পারবে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে প্রকৃত অর্থেই প্রতিষ্ঠাতাদের সেই আদি নৈতিক দর্শনে ফিরে যেতে পারবে। এই অবিরত আত্মশুদ্ধি, সংস্কার এবং নিজের ভুল থেকে শেখার প্রক্রিয়াই হবে সেমিকুইনসেন্টেনিয়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রকৃত উত্তরণের পথরেখা।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত