স্বাধীনতা উত্তর একটি দেশের জন্য উন্নয়নের পথে হাঁটা এবং তার দেশের সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে কাজ করা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশকেও সেই চ্যালেঞ্জ এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে, ৭৫ পরবর্তী সংকট মোকাবেলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি জরুরী বিষয় ছিল। সেই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি প্রচলনের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের একটি বড় অবদান রয়েছে। সেই সময় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন, সেটি হলো কোনো পররাষ্ট্রনীতি কারণে একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেন তৈরি না হয়। সেই লক্ষ্যে তিনি যেমন পশ্চিম দেশগুলোর সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্কের বিস্তৃতি ঘটান, ঠিক তেমনিভাবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পদক্ষেপ হাতে নেন। চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাউথ-সাউথ সহযোগিতার যে ধারার কথা আমরা এখন পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলে দেখি, সেই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ।
ফলে চীনের মতো একটি দেশের সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ছিল বাংলাদেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি প্রকাশ। তাঁর এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে যে যুক্তি কাজ করেছে তা হলো, এই ধরনের দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক মিলের জায়গা অনেক বেশি থাকে। তাদের জীবনাচরণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও অনেক মিল থাকার ফলে কিছু কিছু উন্নয়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতেও মিলের জায়গা তৈরি হয়। ৭০ এর দশকে চীনও একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ তথা উন্নয়নশীল দেশের কাতারেই পড়ত। চীনের অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ সমাজের উন্নয়নে কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে, চীন যে সেচ ব্যবস্থার প্রচলণ করে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরবর্তীকালের খাল খনন কর্মসূচির অনেক মিল দেখতে পাওয়া যায়।
এই উদাহরণ থেকেও আমরা সাউথ-সাউথ সহযোগিতার যৌক্তিকতা এবং কার্যকারিতা দেখতে পাই। এরপরে যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে জিয়াউর রহমান তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে সম্মিলন ঘটান, সেটি হল গ্রামীণ উন্নয়নকে মাথায় রেখে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সাজানো এবং সেই লক্ষ্যে বন্ধু প্রতিম প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে স্থানান্তরযোগ্য উন্নয়নের মডেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
দুই
আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক যোগাযোগ রয়েছে। সেই যোগাযোগটি বেশ পুরনো এবং প্রাচীনকাল থেকে চীনের সঙ্গে বাংলা অঞ্চলের বন্ধুত্বের সম্পর্কের কথা আমরা জানি। কিন্তু আধুনিক সময়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ শুরু হয় মূলত ৭৫ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সে দিক দিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিসরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শুরু এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত প্রদানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই স্বীকৃতিকে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে নিয়ে আসার শুরু হয় মূলত জিয়াউর রহমানের চীন ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। জিয়াউর রহমান প্রথম চীন ভ্রমণ করেন ১৯৭৭ সালের জানুয়ারির দুই থেকে পাঁচ তারিখে। জিয়াউর রহমান তখন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটিই প্রথম চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের অন্যতম প্রধান একটি রাষ্ট্রীয় সফর। যদিও আমরা জানি শেখ মুজিবুর রহমান এবং মাওলানা ভাসানী বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে চীন ভ্রমণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের চীন ভ্রমণ ছিল মূলত রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ১৯৭৭ সালের একুশে এপ্রিল। বাংলাদেশ তখন একটি সংকটকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। পুরো সত্তরের দশক ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি ভাঙ্গা গড়ার সময়, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ির’ তকমা ছাপিয়ে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ফেরত আসার প্রচেষ্টায় দিশেহারা। ঠিক সেই সময় জিয়াউর রহমানের চীন সফর ছিল বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যেকার সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করার একটি বিষয়। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে দেখতে পারি। এবং চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে একটি গ্রহণযোগ্যতাও দিতে শুরু করে।
এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। সেটি হচ্ছে, ১৯৭৮ সালকে চীনের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে দেখা হয়। চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা সেই সময় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মেলে ধরে। এই সময়টাতে চীন বিশ্ব দরবারে নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে তুলে ধরে এবং একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসেবে নিজেদের সাফল্যকে একটি কাম্য ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা হাতে নিতে শুরু করে। ঠিক এই সময়টাতে তারা নিজেদেরকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য ব্যবসা ও বানিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে বিশ্বজুড়ে চীন সম্পর্কে যে ধরনের মিথ প্রচলিত ছিল, সেগুলো ভাঙতে শুরু করে এবং মানুষ আরো বেশি করে চীন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়। চীনের সমাজ, সংস্কৃতি এবং আর্থ-রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা শুরু হয়।
তিন
জিয়াউর রহমান তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চীন ভ্রমণ করেন। ফলে এই ভ্রমণ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে একটু নতুনভাবে সাজানোর বিষয় যেমন ছিল ঠিক তেমনি ভাবে চীনও তাদের নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের দ্বার উন্মোচন করতে চাইল।
উল্লেখ্য, জিয়াউর রহমানের চীন সফরের কিছু সময় আগেই একটি চীনা বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় আসেন, যাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ক্ষুদ্র সেচ ও অন্যান্য প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা। অর্থাৎ কৃষি খাতে চীন কি করে বৈপ্লবিক বদল নিয়ে আসলো সেই বিষয়ের অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান ও বাংলাদেশ কী করে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে তা ছিল সেই বিশেষজ্ঞ দলের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
জিয়াউর রহমানের চীন সফরের একটি অন্যতম প্রধান কার্যক্রম ছিল ‘তাচাই‘ থেকে শিক্ষা গ্রহণ প্রদর্শনী পর্যবেক্ষণ করা। তাচাই চীনের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত একটি গণ-কমিউন যা তাচাই নামক একটি অনুর্বর আর মরুর মতো একটি পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। তাচাই প্রকল্পটি চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তিনি সবসয় পরামর্শ দিতেন, ‘কৃষিতে তাচাই থেকে শিক্ষা নাও’। এই শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টি ছিল মূলত চীনের জন্য যাতে চীনের অন্যান্য দরিদ্র, অনুর্বর এবং মরুময় এলাকা ধীরে ধীরে উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কৃষিতে বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে।
জিয়াউর রহমানের চীন সফরের এসব বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় তৎকালীন সময়ের (১৪ই জানুয়ারী ১৯৭৭) সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত ‘জেনারেল জিয়ার চীন সফর’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে। পরবর্তী সময়ে তাঁর এই চীন সফরের সঙ্গী প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য সুস্পষ্ট করে বলেন, তাচাই আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়েছে।
চীনের সেচ প্রকল্প দেখছেন জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীতএরপর জিয়াউর রহমান চীন সফরের শেষ দিকে চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের নিজস্ব চিন্তাধারায় প্রতিষ্ঠিত একটি আদর্শ গণ-কমিউন দেখতে যান। সেই সময়ের একটি ভিডিওতে জিয়াউর রহমানকে সেখানকার সেচ ব্যবস্থা কী করে তাদের কৃষিতে বিপ্লব নিয়ে আসে সে বিষয়ে জানতে গণ-কমিউনে চীনা দলের সঙ্গে ঘুরতে দেখা যায়।
চার
এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, সেটি হলো, তাচাই ভ্রমণের পর আসলে জিয়াউর রহমান চীন থেকে কি শিখতে পেরেছিলেন? আমরা তাচাইয়ের কৃষি বিপ্লবের দিকে নজর দিলে দেখতে পাই, সেই অঞ্চলে যেহেতু সেচের পানির অভাব ছিল এবং এটি একটি মরুময় এলাকা ছিল। ফলে মাও সেতুংয়ের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কী করে সেখানে সেচের পানি নিয়ে আসা যায়। খাল খনন কর্মসূচি ছিল তাচাইয়ের কৃষি বিপ্লবের একটি অন্যতম প্রধান বিষয়। এক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের বিখ্যাত খাল কাটা কর্মসূচির সঙ্গে চীনের তাচাই অঞ্চলের সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া যায়। তবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না, জিয়াউর রহমান কি তাচাই থেকেই এই খালকাটা কর্মসূচি প্রচলনের কোন ধরনের উদ্দীপনা পেয়েছেন কিনা কিংবা তিনি চীনের এই প্রকল্প দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন কিনা। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে এটি নিশ্চিত করেই বলা যায় যে চীনের কৃষিতে সাফল্যের বিষয়টি জিয়াউর রহমানকে বেশ ভালোভাবেই অনুপ্রাণিত করে, যার প্রভাব আমরা দেখতে পাই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবে তার অবদানের ক্ষেত্রে।
বিচিত্রায় প্রকাশিত সেই নিবন্ধে দেখা যায়, দেশে ফেরার পর অপেক্ষমান সাংবাদিকদের কাছে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে জিয়াউর রহমান বলেন,
‘তাঁদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার রয়েছে। দুটি দেশই কৃষির উপর জোর দিয়েছে। সেচ ব্যবস্থা, পল্লী উন্নয়ন, আবাসিক সমস্যার সমাধান ও বিশেষ করে আত্মনির্ভরশীলতার ক্ষেত্রে চীনের সাফল্য লক্ষণীয়‘
।
জিয়াউর রহমানের চীন নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কূটনৈতিক সম্পর্ককে একটি সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে দেখা। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা দেশের সাথে যখন আমাদের মতো একটি দুর্বল দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে দেখি, তা গড়ে উঠে মূলত এক ধরনের হেজেমনিক কিংবা ক্ষমতার সম্পর্কের ভিত্তিতে, জিয়াউর রহমান সেখানে চীনের সাথে তার কূটনৈতিক নীতির মৌলিক ক্ষেত্রকে নির্ধারণ করেন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং মর্যাদা সম্পর্কের ভিত্তিতে যেখানে হেজেমনি বা ক্ষমতার সম্পর্ক প্রধান নিয়ামক ছিল না।
পাঁচ.
জিয়াউর রহমানের চীন ভ্রমণের শেষ দিকে একটি যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করা হয় যেখানে বলা হয় যে ‘চীন কোন দেশের রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেনা। সেদিক থেকে এই নিরাপদ বন্ধুত্ব বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী অর্থনীতির সোপানে আরোহনে প্রভূত সহায়তা করতে পারে। অথচ রুশ ভারত এই দুই পরাশক্তির বন্ধুত্বের নামে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য রাজনীতির কর্মকাণ্ডে দাবার গুটি চালাতো ইচ্ছে মত। তার প্রমাণ বাংলাদেশের মতো আর কোন দেশ পেয়েছে কিনা সন্দেহ‘। এই বক্তব্য থেকে তৎকালীন সময়ে ভারত বিষয়ক বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল সে বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্য দিয়ে যে জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে যে মর্যাদাশীল এবং স্বাধীনচেতা দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয় সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবার প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই।
একটি পোস্ট কলোনিয়াল সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে আমরা যদি জিয়াউর রহমানের এই অবস্থানকে মূল্যায়ন করতে চাই তাহলে বলা যায়, সত্তরের দশকের শেষের দিকে দাঁড়িয়ে এই ধরনের একটি বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতিতে অবস্থান, একটি সদ্য স্বাধীন এবং ভঙ্গুর রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে কতটা সাহসী এবং দৃঢ়তার পরিচয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের কুটনৈতিক সংলাপের দিকে নজর দেই তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা মর্যাদার সম্পর্ককে খুঁজে পাই না বরং পশ্চিমা হেজেমনি কিংবা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদই যেন আমাদের কূটনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ এবং সংজ্ঞায়িত করে। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য হতাশার।
ছয়.
জিয়াউর রহমানের চীনের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্কের বিস্তারিত আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে পারি। প্রথমত, কূটনৈতিক সম্পর্ক হতে হবে বন্ধুত্বের এবং মর্যাদার, হেজেমনিক নয়। তিনি তার এই মৌলিক বিষয়গুলো চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সব সময় মাথায় রেখেছেন।
দ্বিতীয়ত, জিয়াউর রহমানের চীন বিষয়ক পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা পরবর্তীতে যাকে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই সম্পর্ক চীনের সমাজতন্ত্র কিংবা মাওবাদী ধারার প্রতি আদর্শিক কোন সম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। তার চীন নীতির মৌলিক ভিত্তি ছিল কৌশলগত এবং বাংলাদেশের স্বাবলম্বী হবার স্বার্থকে মাথায় রেখে। তিনি চীনের রাজনৈতিক কাঠামোকে বাংলাদেশের জন্য একটি মডেল হিসেবে চিহ্নিত করতে চাননি। কেবলমাত্র বাংলাদেশের উন্নয়নে কৃষিকে প্রাধান্য দিয়ে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।
তৃতীয়ত, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও প্রসারিত করেন এবং অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করার ইতিবাচক প্রচেষ্টা হাতে নেন। সে দিক দিয়ে জিয়াউর রহমানের চীন ভ্রমন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ঢেলে সাজানোর জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি কারণে সেটি হল এই ভ্রমণের মধ্য দিয়ে যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয় সেখানে ভারতকে চিহ্নিত করা হয়েছে একটি সম্প্রসারণবাদী ও উপবৃহৎ শক্তি, যে শক্তি আশেপাশের ছোট দেশগুলোর জন্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ থেকে জিয়াউর রহমানের ভারতনীতির কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন যা অন্য দিক দিয়ে তৎকালীন বাংলাদেশকে চীনের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে। যার অগ্রদূত ছিলেন জিয়াউর রহমান।
বাংলাদেশের জন্য একটি ভারসাম্য এবং মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে স্থাপিত চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন খুব জরুরী একটি বিষয় ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই মূলত চীনের সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পথচলা। তিনি এমন একটি সময়ে চীনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের হাত বাড়িয়ে দেন যে সময়ে বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ফলে কৌশলগতভাবে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন বাংলাদেশের জন্য সেই সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। কেননা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি স্বাবলম্বী এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তার অন্যতম আগ্রহ। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, শৃঙ্খলা এবং উন্নয়নই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে তিনি সাজিয়েছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং তার চীন নীতি।
বুলবুল সিদ্দিকী: নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক