শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

বাংলাদেশের সরকারি অর্থায়নের গল্পে দীর্ঘদিনের একটি চিরচেনা চরিত্র ছিল সঞ্চয়পত্র। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, স্বামী হারানো বিধবা নারী, ছোট সরকারি কর্মচারী, সবাই জীবনের সঞ্চিত অর্থ এই একটি জায়গায় রাখতেন বিশ্বাস করে। বিনিময়ে রাষ্ট্র বলত, আপনার টাকা নিরাপদ, মুনাফা নিশ্চিত। এই সম্পর্কটা প্রায় নৈতিক একটা চুক্তির মতো ছিল। সরকার ঘাটতি বাজেটের একটা বড় অংশ পূরণ করত এই সঞ্চয় থেকেই, আর মানুষ পেত নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
কিন্তু সেই সম্পর্কে এখন স্পষ্ট ফাটল। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে টানা চার অর্থবছর সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক। ২০২২-২৩ এ নিট বিক্রি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ৩,২৯৫ কোটি টাকায়, ২০২৩-২৪ এ তা বেড়ে ২১,১২৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়, ২০২৪-২৫ এ কিছুটা কমে হয় ৬,০৬৩ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ এই নয় মাসেও নিট বিক্রি ঋণাত্মক ২,০৬৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ এ বছরও পুরো বছর ধরে ঋণাত্মক থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
নিট বিক্রি ঋণাত্মক হওয়ার মানে সহজ, নতুন সঞ্চয়পত্র যত বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে বেশি টাকা পরিপক্ব সঞ্চয়পত্রের আসল হিসেবে মানুষকে ফেরত দিতে হচ্ছে। পুরনো বিনিয়োগ শেষ হয়ে যাচ্ছে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বেশি গতিতে।
এই পতনের পেছনের কারণটা আসলে কোনো একটি আর্থিক পণ্যের ব্যর্থতা নয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি বলে দিচ্ছে যে সাধারণ মানুষের হাতে সঞ্চয়ের টাকা কতটা কমে গেছে। গত দুই বছরে চাল ডালের দাম বেড়েছে অভাবনীয় হারে, একটি সাধারণ পরিবারকে এখন আয়ের ৬০-৭০ শতাংশ শুধু খাবারের পেছনেই খরচ করতে হচ্ছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে, যারা আগে স্থায়ী চাকরিতে ছিলেন তারা এখন দিনমজুরির মতো অনিয়মিত কাজে ঢুকে পড়েছেন।
তাহলে একজন পরিবারের কর্তা, যিনি বাজারের ব্যাগ ভরাতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তিনি কোন টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনবেন? উত্তরটা সহজ, তিনি কিনবেন না বরং পুরনো সঞ্চয়পত্রই ভেঙে সংসার চালাবেন। এখানেই সরকারের অর্থায়নের আসল সমস্যাটা ধরা পড়ে।
সঞ্চয়পত্রের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে সরকার স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকেছে ব্যাংক খাতের দিকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক খাতের অংশ ৮৫ শতাংশের বেশি, আর আগামী তিন অর্থবছরে এই নির্ভরতা গড়ে ৮৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস।
ধারণা করা যায়, বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এটাকেই অর্থনীতিতে বলা হয় ক্রাউডিং আউট। সরকার যত বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, উদ্যোক্তারা তত কম পান, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি শ্লথ হয়, রাজস্ব সংগ্রহ কমে, একইসঙ্গে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ে। একবার এই পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে যায়। ব্যাংকগুলোর তারল্য কমে যায়, বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঠেলে যান অনানুষ্ঠানিক বাজারের দিকে যেখানে সুদের হার অনেক বেশি, আর সবমিলিয়ে পুরো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিই মন্থর হয়ে পড়ে।
শুধু নতুন আর্থিক পণ্য চালু করে এই সংকটের সমাধান হবে না যদি মানুষের সঞ্চয়শক্তি ক্ষয়ের মূল কারণ অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়ের অস্থিরতা নিয়ে কাজ করা না হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই সামনে এসেছে সুকুক। সুকুক হলো ইসলামি শরিয়াহ নীতিমালা অনুসরণকারী একটি আর্থিক যন্ত্র, যা সুদের বদলে সম্পদ বা প্রকল্পের প্রকৃত আয় থেকে মুনাফা দেয়। ঐতিহ্যবাহী বন্ড সুদভিত্তিক হওয়ায় তা ইসলামে নিষিদ্ধ রিবা হিসেবে গণ্য হয়, ফলে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এতদিন সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারত না।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম সার্বভৌম সুকুক চালু করে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের অর্থায়নে। সেখান থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জুন নাগাদ নবম সুকুক পর্যন্ত ইস্যু করা হয়েছে, মোট সংগৃহীত হয়েছে ৪২,৪০০ কোটি টাকা। আর এই জুনেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো নয় মাস মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি সুকুক ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অর্থায়নকে আরও নমনীয় করবে।
সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয় এই পণ্যের প্রতি আগ্রহ কতটা। অষ্টম সুকুকে ৫,৯০০ কোটি টাকা ইস্যুর বিপরীতে বিড এসেছিল ৭২,৫৯৮ কোটি টাকার, অর্থাৎ ঘোষিত পরিমাণের ১২.৩০ গুণ বেশি। নবম সুকুকেও একই ধরনের চিত্র, ৫,৬০০ কোটি টাকার বিপরীতে বিড পড়েছে ৪৭,৪৯১ কোটি টাকার, প্রায় ৮.৫ গুণ বেশি। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই বিপুল চাহিদার রহস্য কী? কারণটা আসলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গঠনেই লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় ২৭ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের, এবং এতদিন এই বিশাল তহবিল সুদভিত্তিক বিল-বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় কার্যত নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকত। সুকুক সেই দরজাটা খুলে দিয়েছে, আর তাই শরিয়াহ ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা প্রতিষ্ঠান সবাই একই নিলামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আর পাকিস্তান এই পথে অনেক আগেই এগিয়ে গেছে। মালয়েশিয়ার সুকুক বাজার তো এখন বিশ্বের বৃহত্তম। বাংলাদেশও সেই পথ ধরেই এগোচ্ছে, এবং সরকার এখন আরও একধাপ এগিয়ে শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর কথা ভাবছে, যার মুনাফার হার নির্ধারণ করবে একটি কারিগরি কমিটি। এটা বাস্তবায়িত হলে ইসলামী অর্থায়ন প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে, যেটা একসময় সঞ্চয়পত্রের মূল শক্তি ছিল।
তবে এত সাফল্যের গল্পের মধ্যেও কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়। অষ্টম সুকুকে যে ৭২ হাজার কোটি টাকার বিড জমা পড়েছিল তার বিপরীতে ইস্যু হয়েছে মাত্র ৫,৯০০ কোটি, মানে বিনিয়োগকারীদের ৯২ শতাংশের বেশি টাকা ফেরত গেছে। পুঁজিবাজারে যেমন বারবার আবেদন করে বরাদ্দ না পেলে একসময় মানুষ আবেদন করাই বন্ধ করে দেয়, সুকুকেও এই অপূর্ণ চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে একই হতাশা তৈরি করতে পারে।
আর বরাদ্দের হিসাব দেখলে বোঝা যায় এই বাজারে এখনও কার আধিপত্য বেশি। শরিয়াহ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মোট বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো ১০ শতাংশ, আর ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও প্রভিডেন্ট ফান্ড মিলে মাত্র ৫ শতাংশ। তাহলে সঞ্চয়পত্রের সেই চিরচেনা ক্রেতা, সাধারণ মানুষ, তিনি কোথায়? উত্তর হলো তিনি এই ৫ শতাংশের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে, কিন্তু তার জন্য চাই বিস্তৃত প্রচার, সহজ পদ্ধতি আর ব্যাংক শাখা পর্যায়ে সঠিক প্রশিক্ষণ।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা থেকে যায় শেষেই। সঞ্চয়পত্রের পতনের মূল কারণ মানুষের সঞ্চয়শক্তির ক্ষয়, সেই সমস্যার সমাধান সুকুক বা শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র একা দিতে পারবে না। যিনি একসময় নিয়মিত সঞ্চয়পত্র কিনতেন, মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে আর কর্মসংস্থান অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় তিনি নতুন পণ্য এলেই ফিরে আসবেন না। এভাবে চলতে থাকলে যা ঘটতে পারে তা হলো নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর টাকায় পুরনো সাধারণ বিনিয়োগকারীর দায় মেটানো, যা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মতো কোনো কাঠামো নয়।
সুকুক বা ইসলামী অর্থায়ন খারাপ নয় বরং প্রয়োজনীয় এবং উদ্ভাবনী একটি পদক্ষেপ। কিন্তু মানুষের আয় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন শুধু নতুন নতুন আর্থিক পণ্য চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
আসল কাজটা হলো অর্থনীতিকে চাঙা করা, মানুষের আয় বাড়ানো আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। তা হলেই কেবল সুকুকের মতো যেকোনো ভালো পণ্য সফল হবে, আর সাধারণ মানুষও আবার সঞ্চয় করার সামর্থ্য ফিরে পাবে। সঞ্চয়পত্র আগের সেই জায়গাটা হারাচ্ছে, এটা এখন স্পষ্ট। কিন্তু সুকুকের নতুন যুগ যদি শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্য নিয়েই উদযাপিত হয় আর মানুষের বাস্তবতা আমলে না নেওয়া হয়, তাহলে নতুন মোড়কে পুরনো সমস্যাই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের সরকারি অর্থায়নের গল্পে দীর্ঘদিনের একটি চিরচেনা চরিত্র ছিল সঞ্চয়পত্র। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, স্বামী হারানো বিধবা নারী, ছোট সরকারি কর্মচারী, সবাই জীবনের সঞ্চিত অর্থ এই একটি জায়গায় রাখতেন বিশ্বাস করে। বিনিময়ে রাষ্ট্র বলত, আপনার টাকা নিরাপদ, মুনাফা নিশ্চিত। এই সম্পর্কটা প্রায় নৈতিক একটা চুক্তির মতো ছিল। সরকার ঘাটতি বাজেটের একটা বড় অংশ পূরণ করত এই সঞ্চয় থেকেই, আর মানুষ পেত নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
কিন্তু সেই সম্পর্কে এখন স্পষ্ট ফাটল। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে টানা চার অর্থবছর সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক। ২০২২-২৩ এ নিট বিক্রি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ৩,২৯৫ কোটি টাকায়, ২০২৩-২৪ এ তা বেড়ে ২১,১২৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়, ২০২৪-২৫ এ কিছুটা কমে হয় ৬,০৬৩ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ এই নয় মাসেও নিট বিক্রি ঋণাত্মক ২,০৬৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ এ বছরও পুরো বছর ধরে ঋণাত্মক থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
নিট বিক্রি ঋণাত্মক হওয়ার মানে সহজ, নতুন সঞ্চয়পত্র যত বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে বেশি টাকা পরিপক্ব সঞ্চয়পত্রের আসল হিসেবে মানুষকে ফেরত দিতে হচ্ছে। পুরনো বিনিয়োগ শেষ হয়ে যাচ্ছে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বেশি গতিতে।
এই পতনের পেছনের কারণটা আসলে কোনো একটি আর্থিক পণ্যের ব্যর্থতা নয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি বলে দিচ্ছে যে সাধারণ মানুষের হাতে সঞ্চয়ের টাকা কতটা কমে গেছে। গত দুই বছরে চাল ডালের দাম বেড়েছে অভাবনীয় হারে, একটি সাধারণ পরিবারকে এখন আয়ের ৬০-৭০ শতাংশ শুধু খাবারের পেছনেই খরচ করতে হচ্ছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে, যারা আগে স্থায়ী চাকরিতে ছিলেন তারা এখন দিনমজুরির মতো অনিয়মিত কাজে ঢুকে পড়েছেন।
তাহলে একজন পরিবারের কর্তা, যিনি বাজারের ব্যাগ ভরাতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তিনি কোন টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনবেন? উত্তরটা সহজ, তিনি কিনবেন না বরং পুরনো সঞ্চয়পত্রই ভেঙে সংসার চালাবেন। এখানেই সরকারের অর্থায়নের আসল সমস্যাটা ধরা পড়ে।
সঞ্চয়পত্রের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে সরকার স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকেছে ব্যাংক খাতের দিকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক খাতের অংশ ৮৫ শতাংশের বেশি, আর আগামী তিন অর্থবছরে এই নির্ভরতা গড়ে ৮৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস।
ধারণা করা যায়, বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এটাকেই অর্থনীতিতে বলা হয় ক্রাউডিং আউট। সরকার যত বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, উদ্যোক্তারা তত কম পান, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি শ্লথ হয়, রাজস্ব সংগ্রহ কমে, একইসঙ্গে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ে। একবার এই পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে যায়। ব্যাংকগুলোর তারল্য কমে যায়, বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঠেলে যান অনানুষ্ঠানিক বাজারের দিকে যেখানে সুদের হার অনেক বেশি, আর সবমিলিয়ে পুরো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিই মন্থর হয়ে পড়ে।
শুধু নতুন আর্থিক পণ্য চালু করে এই সংকটের সমাধান হবে না যদি মানুষের সঞ্চয়শক্তি ক্ষয়ের মূল কারণ অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়ের অস্থিরতা নিয়ে কাজ করা না হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই সামনে এসেছে সুকুক। সুকুক হলো ইসলামি শরিয়াহ নীতিমালা অনুসরণকারী একটি আর্থিক যন্ত্র, যা সুদের বদলে সম্পদ বা প্রকল্পের প্রকৃত আয় থেকে মুনাফা দেয়। ঐতিহ্যবাহী বন্ড সুদভিত্তিক হওয়ায় তা ইসলামে নিষিদ্ধ রিবা হিসেবে গণ্য হয়, ফলে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এতদিন সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারত না।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম সার্বভৌম সুকুক চালু করে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের অর্থায়নে। সেখান থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জুন নাগাদ নবম সুকুক পর্যন্ত ইস্যু করা হয়েছে, মোট সংগৃহীত হয়েছে ৪২,৪০০ কোটি টাকা। আর এই জুনেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো নয় মাস মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি সুকুক ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অর্থায়নকে আরও নমনীয় করবে।
সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয় এই পণ্যের প্রতি আগ্রহ কতটা। অষ্টম সুকুকে ৫,৯০০ কোটি টাকা ইস্যুর বিপরীতে বিড এসেছিল ৭২,৫৯৮ কোটি টাকার, অর্থাৎ ঘোষিত পরিমাণের ১২.৩০ গুণ বেশি। নবম সুকুকেও একই ধরনের চিত্র, ৫,৬০০ কোটি টাকার বিপরীতে বিড পড়েছে ৪৭,৪৯১ কোটি টাকার, প্রায় ৮.৫ গুণ বেশি। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই বিপুল চাহিদার রহস্য কী? কারণটা আসলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গঠনেই লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় ২৭ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের, এবং এতদিন এই বিশাল তহবিল সুদভিত্তিক বিল-বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় কার্যত নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকত। সুকুক সেই দরজাটা খুলে দিয়েছে, আর তাই শরিয়াহ ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা প্রতিষ্ঠান সবাই একই নিলামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আর পাকিস্তান এই পথে অনেক আগেই এগিয়ে গেছে। মালয়েশিয়ার সুকুক বাজার তো এখন বিশ্বের বৃহত্তম। বাংলাদেশও সেই পথ ধরেই এগোচ্ছে, এবং সরকার এখন আরও একধাপ এগিয়ে শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর কথা ভাবছে, যার মুনাফার হার নির্ধারণ করবে একটি কারিগরি কমিটি। এটা বাস্তবায়িত হলে ইসলামী অর্থায়ন প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে, যেটা একসময় সঞ্চয়পত্রের মূল শক্তি ছিল।
তবে এত সাফল্যের গল্পের মধ্যেও কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়। অষ্টম সুকুকে যে ৭২ হাজার কোটি টাকার বিড জমা পড়েছিল তার বিপরীতে ইস্যু হয়েছে মাত্র ৫,৯০০ কোটি, মানে বিনিয়োগকারীদের ৯২ শতাংশের বেশি টাকা ফেরত গেছে। পুঁজিবাজারে যেমন বারবার আবেদন করে বরাদ্দ না পেলে একসময় মানুষ আবেদন করাই বন্ধ করে দেয়, সুকুকেও এই অপূর্ণ চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে একই হতাশা তৈরি করতে পারে।
আর বরাদ্দের হিসাব দেখলে বোঝা যায় এই বাজারে এখনও কার আধিপত্য বেশি। শরিয়াহ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মোট বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো ১০ শতাংশ, আর ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও প্রভিডেন্ট ফান্ড মিলে মাত্র ৫ শতাংশ। তাহলে সঞ্চয়পত্রের সেই চিরচেনা ক্রেতা, সাধারণ মানুষ, তিনি কোথায়? উত্তর হলো তিনি এই ৫ শতাংশের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে, কিন্তু তার জন্য চাই বিস্তৃত প্রচার, সহজ পদ্ধতি আর ব্যাংক শাখা পর্যায়ে সঠিক প্রশিক্ষণ।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা থেকে যায় শেষেই। সঞ্চয়পত্রের পতনের মূল কারণ মানুষের সঞ্চয়শক্তির ক্ষয়, সেই সমস্যার সমাধান সুকুক বা শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র একা দিতে পারবে না। যিনি একসময় নিয়মিত সঞ্চয়পত্র কিনতেন, মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে আর কর্মসংস্থান অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় তিনি নতুন পণ্য এলেই ফিরে আসবেন না। এভাবে চলতে থাকলে যা ঘটতে পারে তা হলো নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর টাকায় পুরনো সাধারণ বিনিয়োগকারীর দায় মেটানো, যা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মতো কোনো কাঠামো নয়।
সুকুক বা ইসলামী অর্থায়ন খারাপ নয় বরং প্রয়োজনীয় এবং উদ্ভাবনী একটি পদক্ষেপ। কিন্তু মানুষের আয় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন শুধু নতুন নতুন আর্থিক পণ্য চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
আসল কাজটা হলো অর্থনীতিকে চাঙা করা, মানুষের আয় বাড়ানো আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। তা হলেই কেবল সুকুকের মতো যেকোনো ভালো পণ্য সফল হবে, আর সাধারণ মানুষও আবার সঞ্চয় করার সামর্থ্য ফিরে পাবে। সঞ্চয়পত্র আগের সেই জায়গাটা হারাচ্ছে, এটা এখন স্পষ্ট। কিন্তু সুকুকের নতুন যুগ যদি শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্য নিয়েই উদযাপিত হয় আর মানুষের বাস্তবতা আমলে না নেওয়া হয়, তাহলে নতুন মোড়কে পুরনো সমস্যাই থেকে যাবে।
.png)

এম হুমায়ুন কবীর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত। ছিলেন কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশনার। সেপ্টেম্বর-২০১০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি। বাংলাদেশের সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কূটনী
৯ মিনিট আগে
বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়নি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তাতে সত্যতা থাকলেও ভোক্তাসাধারণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ রয়ে গেছে বলতে হবে। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চমাত্রার মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণকে। এর চেয়ে নিচে রয়েছে মজুরি বৃদ্ধির হার।
১৬ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশকে কেবল মানচিত্র দেখে বোঝা যায় না। বাংলাদেশকে বুঝতে হলে জানতে হবে নদীর ভাষা। শুনতে হবে সুন্দরবনের নীরবতা। অনুভব করতে হবে ধানের গন্ধ। ভিজতে হবে বর্ষার বৃষ্টিতে। শুনতে হবে বাউলের গান।
১৮ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ঐতিহ্য আছে। আমরা বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছি। আঞ্চলিক বিরোধে সংযম দেখিয়েছি। কিন্তু সামনের কৌশলগত পরিবেশ হয়তো এই ভারসাম্যকে আরও সুপরিকল্পিত রূপ দেওয়ার দাবি জানাবে।
১৯ ঘণ্টা আগে