ফজিলাতুন নেসা শাপলা

আজকে সামনে কিশোর-কিশোরীদের আচরণের বিচ্যুতি ও উগ্রতা দৃশ্যমান হচ্ছে। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব মূলত কাঠামোগত সামাজিক ধসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এককভাবে তরুণ প্রজন্মকে দোষারোপ না করে এর পেছনে কাজ করা সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কারণগুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এই কিশোররা চব্বিশের গণআন্দোলনে অভাবনীয় সাহসিকতার উদাহরণ তৈরি করেছিল। তারা আজ অনেক ক্ষেত্রেই সস্তা মিডিয়া ট্রাফিক, রাজনৈতিক ইন্ধন এবং জবাবদিহিহীন সোশ্যালমিডিয়ার অ্যালগরিদমের ফাঁদে বন্দি। নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে তাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বর্তমানের কিশোর কিশোরীদের প্রতিবাদে সহিংস আচরণ মাঝে মাঝে ডিজিটাল পারফরম্যান্স আর্টে পরিণত হতে দেখা যায়। কিশোর-কিশোরীরা পথে-ঘাটে, স্কুল-কলেজে যা করছে তার ওপর মিডিয়ার প্রভাব রয়েছে। কিশোররা দেখছে যে শিক্ষকের কলার চেপে ধরা বা অশ্রাব্য ভাষায় বড়দের গালি দেওয়ার ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিলিয়ন ভিউ এনে দিচ্ছে। তখন তার মস্তিষ্ক এই ঘটনাকে ভুলভাবে এক ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি বলে গ্রহণ করছে। সে তখন উত্তেজনায় হিরোইজমে ভোগে। তখন সে এসব করতে আরো অনেক বেশি উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এই প্রবণটা রোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা জরুরি।
স্ক্রিনে সারাদিন নিষ্ঠুরতা ও মারামারির ভিডিও দেখার ফলে কিছু কিশোরদের মস্তিষ্ক সহমর্মিতা ও অপরাধবোধের অনুভূতি হারিয়ে ফেলছে বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিসেনসিটাইজেশন’। অন্যের কষ্ট ও অপমান দেখে দুঃখ জাগার বদলে জায়গা করে নিচ্ছে রোমাঞ্চ। দেশের একপ্রান্ত থেকে নিষ্ঠুরতা ভাইরাল হলে অন্য প্রান্তে তারচেয়েও বড় হিংস্রতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাচ্ছে। আরও বেশি লাইক ও শেয়ার পাওয়ার উদ্দেশ্য আসলে বাহ্যিক কার্য মাত্র। সচেতনতার অভাব ও অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এর পেছনে কাজ করছে।
সাংবাদিকতার নীতি- নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিছু ক্ষেত্রে একশ্রেণির ভুঁইফোড় পোর্টাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এখন কিশোরদের যে কোনো ক্ষোভকে সরাসরি উস্কে দিচ্ছে। ক্যামেরার লেন্স আর বুম যখন কোনো কাঁচা বয়সের কিশোরের মুখের সামনে ধরা হচ্ছে, তখন সে নিজেকে অতিমানব ভাবতে শুরু করে দিচ্ছে। সাংবাদিকরা নিজেদের টিআরপি আর ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন সব উস্কানিমূলক প্রশ্ন করছে। আর তা এই কিশোরদের আর ও নোংরা ও উগ্র আচরণে প্ররোচিত করছে। গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পায়।
এই ফাঁদে পড়ছে অপরিপক্ব কিশোর-কিশোরীরা। তারা বুঝতেও পারছেনা যে ক্যামেরার সামনে তাদের এই তথাকথিত ‘বাহাদুরি’ অথবা নোংরা ভাষা মিডিয়া হাউজগুলোর জন্য সস্তা ব্যবসার উপাদান। কিন্তু তা তাদের নিজেদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। মুহূর্তের উত্তেজনায় ক্যামেরার সামনে করা তাদের এই অসামাজিক ও অশালীন আচরণগুলো ইন্টারনেটের আর্কাইভে স্থায়ীভাবে জমা হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের অজান্তেই এই কিশোর মুখগুলো সামাজিক মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে। এসব থেকে উত্তরণে কাউন্সেলিং ও সংশোধনামূলক পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
আজকের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পেছনে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করা তথাকথিত মিডিয়া ট্রায়াল কিশোরদের মনস্তত্ত্বে মারাত্মক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। দেশে যে কোনো ঘটনা ঘটার পর আইনি তদন্ত অথবা বিচার করে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই বুম ও ক্যামেরা নিয়ে লতাপাতার মতো গজানো ফেসবুক ও ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সাররা ঝাঁপিয়ে পড়ছে অভিযোগকারীদের ওপর। তারা এমনভাবে ইন্ধন যোগায় যে অভিযোগকারীরা বেশিরভাগ সময়ে হুজুগে পড়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক একই রকম ঘটনা ঘটাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা রোধে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অল্পবয়সীদের সাথে সাথে পুরো সমাজ মূল বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকৃতই দোষী কিনা তা খতিয়ে দেখার আগেই জনতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এই ঘটনাগুলো কিশোরদের মানসিকতাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যে ওরা এখন বিশ্বাস করে—আইন অথবা প্রমাণ কোনো বিষয় নয়, ক্যামেরার সামনে কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়াই আসল জাস্টিস।
চব্বিশের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অরাজকতা যথাযথভাবে দমন করতে ভয় পাওয়ায় পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এমনকি প্রশাসনও সত্যতা খতিয়ে দেখার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরালিটি অথবা জনতার ক্ষোভের ওপর ভিত্তি করে কোনো তদন্ত ছাড়াই তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি, গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রশাসনের এমন জনরোষ-নির্ভরশীলতা কিশোরদের মধ্যে ভুল বার্তা দিচ্ছে। তারা দেখছে যে আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে ক্যামেরার সামনে হেনস্তা করলে প্রশাসন মাথা নত করতে বাধ্য। এভাবে তারা আরও বেশি আইন অমান্যকারী ও হিংস্র হয়ে উঠছে।প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া এই বিশৃঙ্খলা রোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে।
রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো কিশোরদের আইনি শিথিলতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাকে ব্যবহার করে আসছে। চব্বিশের সরকার পতনের অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে অনেকে ভাবছেন যে কিশোরদের দিয়ে যে কোনো দাবি আদায়ে প্রশাসনকে বাধ্য করা সম্ভব। ফলে সন্তানের অশালীন ভাষা ও উগ্র আচরণকে ‘অধিকার আদায়ের লড়াই’ ভেবে বাহবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন এই স্বীকৃতি কিশোরদেরকে আরো বেশি উগ্র ও অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। এর ফলে ওরা যে শুধু বাইরে ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে তাই নয়, ওরা আর পরিবারকেও পরোয়া করছে না। অল্পবয়সীদের এমন সামগ্রিক অরাজকতা সমাজকে দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। তা থেকে উত্তরণে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন ও সঠিক দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
সুস্থ সমাজ টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অনুশাসনের ওপর। অথচ বর্তমানের অবমাননাকর আচরণ সেই শ্রদ্ধাবোধের ধারণাকে উপড়ে ফেলছে যা দূর করতে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। আজ যে কিশোর শিক্ষকের গায়ে হাত তুলছে, জনসমক্ষে যে কোন সম্মানিত ও বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তিকে অশ্রাব্য ভাষায় বুলি করছে, সে ভবিষ্যতে পরিবারে নিয়ম অমান্য ও সহিংস হতে যেমন দ্বিধা করবে না, তেমনি কর্মক্ষেত্রে গিয়েও একই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। আমরা মূলত এমন প্রজন্ম তৈরি করছি যারা নিয়ম-শৃঙ্খলা অস্বীকার করা ও অবাধ্যতাকে কৃতিত্ব হিসেবে ভাবতে শিখছে। এর ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে শান্ত কিশোরটিও পীয়ার গ্রুপের সাথে দলবদ্ধ হয়ে হুজুগে পড়ে নানা ধরণের অপরাধ করছে অথবা সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলের ক্রীড়নকে পরিণত হচ্ছে। কিশোর-তরুণদের সামাজিক অনুশাসনকে অগ্রাহ্য করার এই মানসিকতা ভবিষ্যৎ সমাজকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে উঠছে। এর প্রতিকারে সামষ্টিক সচেতনতা অপরিহার্য।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কিশোর-তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আজ কেউই ভাবছে না। আন্দোলন যখন শেষ হবে এবং রাজপথ শান্ত হবে, তখন এই কিশোর-তরুণরা চরম সংকটে পড়বে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আখের গুছিয়ে নেবে। সস্তা ভিউ শিকারিরা নতুন কোনো মসলাদার টপিকের খোঁজে ক্যামেরা সরিয়ে নেবে। অথচ মাঝখান থেকে এই কিশোরদের স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা উগ্র ও নোংরা আচরণের ভিডিওগুলোর কারণে ভবিষ্যতে তারা হয়তো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না। মর্যাদাপূর্ণ চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে দাঁড়াতে অসুবিধায় পড়বে। তাদের কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারে দীর্ঘমেয়াদী বাধা সৃষ্টি হবে।
অল্পবয়সে ক্ষণিকের কৃত্রিম হিরোইজম কেটে গেলে এবং চারপাশের মানুষ এড়িয়ে চলতে শুরু করলে এই কিশোর-কিশোরীরা চরম হতাশা, একাকীত্ব ও তীব্র আত্মগ্লানিতে ভুগবে। ফলে তারা আরও বড় অপরাধ, মাদকের ছোবল অথবা স্থায়ী মানসিক বিকারগ্রস্ততার দিকে ধাবিত হবে। কোনো সমাজ অথবা রাষ্ট্র যদি তার কিশোরদের নৈতিক মেরুদণ্ড ও মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে সাহায্য করলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন তখন বৃথা হবে। এই অবস্থা সামাল দিতে না পারলে আদর্শহীন স্বেচ্ছাচারী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে অবক্ষয়ের চরম শিখরে পৌঁছাবে—এতে কোনো সংশয় নেই। সস্তা মিডিয়ার দাপট, প্রশাসনের মিডিয়া ট্রায়াল প্রীতি এবং স্বার্থান্বেষী রাজনীতির হাততালি—আজকের কিশোর সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্দোলনের উন্মাদনা আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বন্ধ হওয়ার পর স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মুখগুলোর দায় কে নেবে—সেই নির্মম সত্যটি সামনে এসেছে। আর তার সমাধানে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে।

আজকে সামনে কিশোর-কিশোরীদের আচরণের বিচ্যুতি ও উগ্রতা দৃশ্যমান হচ্ছে। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব মূলত কাঠামোগত সামাজিক ধসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এককভাবে তরুণ প্রজন্মকে দোষারোপ না করে এর পেছনে কাজ করা সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কারণগুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এই কিশোররা চব্বিশের গণআন্দোলনে অভাবনীয় সাহসিকতার উদাহরণ তৈরি করেছিল। তারা আজ অনেক ক্ষেত্রেই সস্তা মিডিয়া ট্রাফিক, রাজনৈতিক ইন্ধন এবং জবাবদিহিহীন সোশ্যালমিডিয়ার অ্যালগরিদমের ফাঁদে বন্দি। নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে তাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বর্তমানের কিশোর কিশোরীদের প্রতিবাদে সহিংস আচরণ মাঝে মাঝে ডিজিটাল পারফরম্যান্স আর্টে পরিণত হতে দেখা যায়। কিশোর-কিশোরীরা পথে-ঘাটে, স্কুল-কলেজে যা করছে তার ওপর মিডিয়ার প্রভাব রয়েছে। কিশোররা দেখছে যে শিক্ষকের কলার চেপে ধরা বা অশ্রাব্য ভাষায় বড়দের গালি দেওয়ার ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিলিয়ন ভিউ এনে দিচ্ছে। তখন তার মস্তিষ্ক এই ঘটনাকে ভুলভাবে এক ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি বলে গ্রহণ করছে। সে তখন উত্তেজনায় হিরোইজমে ভোগে। তখন সে এসব করতে আরো অনেক বেশি উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এই প্রবণটা রোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা জরুরি।
স্ক্রিনে সারাদিন নিষ্ঠুরতা ও মারামারির ভিডিও দেখার ফলে কিছু কিশোরদের মস্তিষ্ক সহমর্মিতা ও অপরাধবোধের অনুভূতি হারিয়ে ফেলছে বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিসেনসিটাইজেশন’। অন্যের কষ্ট ও অপমান দেখে দুঃখ জাগার বদলে জায়গা করে নিচ্ছে রোমাঞ্চ। দেশের একপ্রান্ত থেকে নিষ্ঠুরতা ভাইরাল হলে অন্য প্রান্তে তারচেয়েও বড় হিংস্রতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাচ্ছে। আরও বেশি লাইক ও শেয়ার পাওয়ার উদ্দেশ্য আসলে বাহ্যিক কার্য মাত্র। সচেতনতার অভাব ও অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এর পেছনে কাজ করছে।
সাংবাদিকতার নীতি- নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিছু ক্ষেত্রে একশ্রেণির ভুঁইফোড় পোর্টাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এখন কিশোরদের যে কোনো ক্ষোভকে সরাসরি উস্কে দিচ্ছে। ক্যামেরার লেন্স আর বুম যখন কোনো কাঁচা বয়সের কিশোরের মুখের সামনে ধরা হচ্ছে, তখন সে নিজেকে অতিমানব ভাবতে শুরু করে দিচ্ছে। সাংবাদিকরা নিজেদের টিআরপি আর ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন সব উস্কানিমূলক প্রশ্ন করছে। আর তা এই কিশোরদের আর ও নোংরা ও উগ্র আচরণে প্ররোচিত করছে। গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পায়।
এই ফাঁদে পড়ছে অপরিপক্ব কিশোর-কিশোরীরা। তারা বুঝতেও পারছেনা যে ক্যামেরার সামনে তাদের এই তথাকথিত ‘বাহাদুরি’ অথবা নোংরা ভাষা মিডিয়া হাউজগুলোর জন্য সস্তা ব্যবসার উপাদান। কিন্তু তা তাদের নিজেদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। মুহূর্তের উত্তেজনায় ক্যামেরার সামনে করা তাদের এই অসামাজিক ও অশালীন আচরণগুলো ইন্টারনেটের আর্কাইভে স্থায়ীভাবে জমা হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের অজান্তেই এই কিশোর মুখগুলো সামাজিক মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে। এসব থেকে উত্তরণে কাউন্সেলিং ও সংশোধনামূলক পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
আজকের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পেছনে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করা তথাকথিত মিডিয়া ট্রায়াল কিশোরদের মনস্তত্ত্বে মারাত্মক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। দেশে যে কোনো ঘটনা ঘটার পর আইনি তদন্ত অথবা বিচার করে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই বুম ও ক্যামেরা নিয়ে লতাপাতার মতো গজানো ফেসবুক ও ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সাররা ঝাঁপিয়ে পড়ছে অভিযোগকারীদের ওপর। তারা এমনভাবে ইন্ধন যোগায় যে অভিযোগকারীরা বেশিরভাগ সময়ে হুজুগে পড়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক একই রকম ঘটনা ঘটাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা রোধে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অল্পবয়সীদের সাথে সাথে পুরো সমাজ মূল বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকৃতই দোষী কিনা তা খতিয়ে দেখার আগেই জনতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এই ঘটনাগুলো কিশোরদের মানসিকতাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যে ওরা এখন বিশ্বাস করে—আইন অথবা প্রমাণ কোনো বিষয় নয়, ক্যামেরার সামনে কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়াই আসল জাস্টিস।
চব্বিশের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অরাজকতা যথাযথভাবে দমন করতে ভয় পাওয়ায় পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এমনকি প্রশাসনও সত্যতা খতিয়ে দেখার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরালিটি অথবা জনতার ক্ষোভের ওপর ভিত্তি করে কোনো তদন্ত ছাড়াই তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি, গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রশাসনের এমন জনরোষ-নির্ভরশীলতা কিশোরদের মধ্যে ভুল বার্তা দিচ্ছে। তারা দেখছে যে আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে ক্যামেরার সামনে হেনস্তা করলে প্রশাসন মাথা নত করতে বাধ্য। এভাবে তারা আরও বেশি আইন অমান্যকারী ও হিংস্র হয়ে উঠছে।প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া এই বিশৃঙ্খলা রোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে।
রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো কিশোরদের আইনি শিথিলতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাকে ব্যবহার করে আসছে। চব্বিশের সরকার পতনের অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে অনেকে ভাবছেন যে কিশোরদের দিয়ে যে কোনো দাবি আদায়ে প্রশাসনকে বাধ্য করা সম্ভব। ফলে সন্তানের অশালীন ভাষা ও উগ্র আচরণকে ‘অধিকার আদায়ের লড়াই’ ভেবে বাহবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন এই স্বীকৃতি কিশোরদেরকে আরো বেশি উগ্র ও অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। এর ফলে ওরা যে শুধু বাইরে ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে তাই নয়, ওরা আর পরিবারকেও পরোয়া করছে না। অল্পবয়সীদের এমন সামগ্রিক অরাজকতা সমাজকে দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। তা থেকে উত্তরণে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন ও সঠিক দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
সুস্থ সমাজ টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অনুশাসনের ওপর। অথচ বর্তমানের অবমাননাকর আচরণ সেই শ্রদ্ধাবোধের ধারণাকে উপড়ে ফেলছে যা দূর করতে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। আজ যে কিশোর শিক্ষকের গায়ে হাত তুলছে, জনসমক্ষে যে কোন সম্মানিত ও বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তিকে অশ্রাব্য ভাষায় বুলি করছে, সে ভবিষ্যতে পরিবারে নিয়ম অমান্য ও সহিংস হতে যেমন দ্বিধা করবে না, তেমনি কর্মক্ষেত্রে গিয়েও একই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। আমরা মূলত এমন প্রজন্ম তৈরি করছি যারা নিয়ম-শৃঙ্খলা অস্বীকার করা ও অবাধ্যতাকে কৃতিত্ব হিসেবে ভাবতে শিখছে। এর ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে শান্ত কিশোরটিও পীয়ার গ্রুপের সাথে দলবদ্ধ হয়ে হুজুগে পড়ে নানা ধরণের অপরাধ করছে অথবা সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলের ক্রীড়নকে পরিণত হচ্ছে। কিশোর-তরুণদের সামাজিক অনুশাসনকে অগ্রাহ্য করার এই মানসিকতা ভবিষ্যৎ সমাজকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে উঠছে। এর প্রতিকারে সামষ্টিক সচেতনতা অপরিহার্য।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কিশোর-তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আজ কেউই ভাবছে না। আন্দোলন যখন শেষ হবে এবং রাজপথ শান্ত হবে, তখন এই কিশোর-তরুণরা চরম সংকটে পড়বে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আখের গুছিয়ে নেবে। সস্তা ভিউ শিকারিরা নতুন কোনো মসলাদার টপিকের খোঁজে ক্যামেরা সরিয়ে নেবে। অথচ মাঝখান থেকে এই কিশোরদের স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা উগ্র ও নোংরা আচরণের ভিডিওগুলোর কারণে ভবিষ্যতে তারা হয়তো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না। মর্যাদাপূর্ণ চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে দাঁড়াতে অসুবিধায় পড়বে। তাদের কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারে দীর্ঘমেয়াদী বাধা সৃষ্টি হবে।
অল্পবয়সে ক্ষণিকের কৃত্রিম হিরোইজম কেটে গেলে এবং চারপাশের মানুষ এড়িয়ে চলতে শুরু করলে এই কিশোর-কিশোরীরা চরম হতাশা, একাকীত্ব ও তীব্র আত্মগ্লানিতে ভুগবে। ফলে তারা আরও বড় অপরাধ, মাদকের ছোবল অথবা স্থায়ী মানসিক বিকারগ্রস্ততার দিকে ধাবিত হবে। কোনো সমাজ অথবা রাষ্ট্র যদি তার কিশোরদের নৈতিক মেরুদণ্ড ও মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে সাহায্য করলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন তখন বৃথা হবে। এই অবস্থা সামাল দিতে না পারলে আদর্শহীন স্বেচ্ছাচারী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে অবক্ষয়ের চরম শিখরে পৌঁছাবে—এতে কোনো সংশয় নেই। সস্তা মিডিয়ার দাপট, প্রশাসনের মিডিয়া ট্রায়াল প্রীতি এবং স্বার্থান্বেষী রাজনীতির হাততালি—আজকের কিশোর সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্দোলনের উন্মাদনা আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বন্ধ হওয়ার পর স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মুখগুলোর দায় কে নেবে—সেই নির্মম সত্যটি সামনে এসেছে। আর তার সমাধানে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে।
.png)

একটি রাজনৈতিক তুলনা তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন দুই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতার অবস্থান, দেশত্যাগের কারণ এবং জন-প্রতিক্রিয়া সমমানের হয়। সাম্প্রতিক সময়ে একটি যুক্তি সামনে আনা হয় যে, এক-এগারোর সময় তারেক রহমানের দেশত্যাগ এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগ একই প্রকৃতির ঘটনা।
২ ঘণ্টা আগে
লিথুয়ানিয়ায় কাজের আশায় নেপাল ঘুরে দেশে ফিরে এসেছেন ছয় তরুণ। এই কাহিনী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি এই ছয় তরুণ। দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের বাইরে গিয়ে এই জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রবল বাসনাকে পুঁজি করে প্রতিনিয়ত সক্র
২ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ ও ক্ষমতার রদবদল দেখা যচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি গভীর অর্থনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক আন্তঃসীমান্ত ‘ডমিনো ইফেক্ট’।
৩ ঘণ্টা আগে
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু চিরতরে নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তারা হয়ে ওঠেন অন্যের জীবনের অনন্ত আলোকবর্তিকা। মৃত্যু তাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এমনই এক নির্লোভ ও মহীয়সী নারী ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী। পেশায় ছিলেন শিক্ষিক, কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে গেছেন—তিনি কেবল শ্রেণি
১১ ঘণ্টা আগে