দুর্নীতি ও উন্নয়ন: পুরোনো ভুল নাকি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশ এখন একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা সীমাহীন। মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তনে খুশি নয়; তারা অপশাসনেরও স্থায়ী সমাধান চায়।

এই বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, বরং এমন একটি উন্নয়ন মডেল প্রতিষ্ঠা করা, যা টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো, উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই চমকপ্রদ হোক, যদি তার ভিত্তি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠান হয়, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উন্নয়নই সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হয়।

এই বিষয়টি নতুন কোনো পর্যবেক্ষণ নয়। আমার ‘এশিয়া গ্লোবাল’-এ প্রকাশিত "The Interplay Between Corruption and Development in Bangladesh's LDC Graduation" শীর্ষক নিবন্ধে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছিলাম যে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সাফল্যের পেছনে যেমন অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছিল, তেমনি এর সমান্তরালে চলেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহির সংকট। অর্থাৎ উন্নয়ন ও দুর্নীতি একই সঙ্গে এগিয়েছে। তখন প্রশ্ন ছিল—এই দ্বৈত বাস্তবতা কতদিন টিকে থাকবে? আজও সেই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক।

গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন বলতে মূলত বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পকে বোঝানো হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র—এসব প্রকল্প নিঃসন্দেহে দেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু উন্নয়নকে যদি কেবল দৃশ্যমান নির্মাণকাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অবকাঠামো প্রয়োজন, কিন্তু তা উন্নয়নের একমাত্র সূচক নয়। বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন গবেষণায় এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি নির্ভর করে শুধু সেতু বা মহাসড়কের ওপর নয়; বরং নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সুশাসনের ওপর।

বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য মূল্যায়িত হয়েছে ব্যয়ের পরিমাণ, প্রকল্পের আকার কিংবা উদ্বোধনের রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে। অথচ প্রকল্পের প্রকৃত সামাজিক উপযোগিতা, ব্যয়-সাশ্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা কিংবা দুর্নীতির ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রেই আলোচনার বাইরে থেকেছে।

দুর্নীতিকে অনেক সময় কেবল আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি একটি উন্নয়নগত সমস্যা। যখন সরকারি প্রকল্প রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়, যখন দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়, যখন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যখন জবাবদিহির প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকে না, তখন দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম থাকে না; বরং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয় না; উন্নয়নের চরিত্রই বদলে যায়। সরকারি সম্পদের বড় অংশ চলে যায় রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, আমলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা স্থানীয় সরকার—যেসব খাতে সাধারণ মানুষের জীবনের সরাসরি উন্নতি হওয়ার কথা—সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। ফলে উন্নয়ন হয়, কিন্তু তার সুফল সবার কাছে পৌঁছায় না।

দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটায় না; এটি উন্নয়নের সুফল বণ্টনের ধরনও বদলে দেয়। যে সম্পদ জনস্বার্থে ব্যয় হওয়ার কথা, যে বরাদ্দ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ বা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হওয়ার কথা, তার বড় অংশ চলে যায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। ফলে উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়ে হয়ে ওঠে বৈষম্যমূলক।

এই প্রবণতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো একটি 'সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত' শ্রেণির সৃষ্টি। এদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন বা উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে নয়; বরং রাজনৈতিক সংযোগ, সরকারি প্রকল্প, বিশেষ সুবিধা কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদে প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভরশীল। এই শ্রেণি ধীরে ধীরে বিদ্যমান পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থার অন্যতম রক্ষক হয়ে ওঠে। ফলে দুর্নীতিকে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। অন্যদিকে, যাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ নেই, তারা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সামনে এখন নতুনভাবে উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ রয়েছে। উন্নয়নকে শুধু কতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে তা দিয়ে নয়; বরং তা বৈষম্য কমিয়েছে কি না, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছে কি না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে কি না এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে কি না—এসব মানদণ্ডে মূল্যায়ন করতে হবে।

ফলাফল স্পষ্ট। আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। শিক্ষিত তরুণেরা মেধার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ হারায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। গ্রামীণ জনগণ পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনসেবা থেকে বঞ্চিত থাকে। মূল্যস্ফীতির চাপ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানে উন্নয়ন হলেও বাস্তবে তা সমাজের বড় অংশকে বাদ দিয়ে এগিয়ে যায়।

রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সরকার কেবল কম প্রবৃদ্ধির কারণে ক্ষমতা হারায় না। বরং যখন জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে উন্নয়নের সুফল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, দুর্নীতি বিচারহীন হয়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করছে, তখন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও সে কথাই বলে। পূর্ববর্তী সরকার বারবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মেগা প্রকল্পের সাফল্যের কথা বলেছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংক খাতের অনিয়ম, অর্থপাচার, সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম, প্রশাসনিক দলীয়করণ এবং জবাবদিহির সংকট জনগণের মধ্যে ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা তৈরি করেছে। ফলে উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারেনি। এখানেই বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিহিত রয়েছে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের উচিত অতীত ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি নীতিগত সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা। যদি কেবল নেতৃত্ব বদলায় কিন্তু উন্নয়নের দর্শন একই থাকে, তবে একই ধরনের কাঠামোগত সংকট আবারও ফিরে আসবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও বেশি অবকাঠামো নয়; প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়নের সুশাসন।

বর্তমান সরকারের অধীনে প্রতিটি সরকারি বিনিয়োগের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার সামাজিক প্রভাব, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে—রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার ভিত্তিতে নয়। স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রকল্পের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে গবেষক, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ কার্যকরভাবে নজরদারি করতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, ডিজিটাল প্রশাসন, গবেষণা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে সফলভাবে বেরিয়ে আসা দেশগুলো মূলত মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছে—শুধু কংক্রিটের অবকাঠামো নয়।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে কম সুদে বিদেশি ঋণের সুযোগ ক্রমশ কমে আসবে। ফলে সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার কার্যকর ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রকল্প ব্যয়ের অপচয়, দুর্নীতি এবং অনিয়ম তখন অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে উন্নয়ন নীতির বাইরে আলাদা কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখা যাবে না। দুর্নীতি শুধু নৈতিক বা আইনি সমস্যা নয়; এটি একটি উন্নয়নগত সংকট। দুর্নীতির প্রতিটি ঘটনা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উদ্ভাবন, পরিবেশ এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য নির্ধারিত সম্পদকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়। এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমায়, জনগণের বিশ্বাস নষ্ট করে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতাকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশের সামনে এখন নতুনভাবে উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ রয়েছে। উন্নয়নকে শুধু কতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে তা দিয়ে নয়; বরং তা বৈষম্য কমিয়েছে কি না, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছে কি না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে কি না এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে কি না—এসব মানদণ্ডে মূল্যায়ন করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই—তারা কি আগের সরকারের মতোই কেবল আরও বেশি অবকাঠামো নির্মাণেই জোর দেবে, নাকি আরও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই অর্জন করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই সমৃদ্ধির পথেও এগোবে। দুর্নীতিনির্ভর উন্নয়ন একসময় তার রাজনৈতিক সীমায় পৌঁছে যায়। কিন্তু সততা, জবাবদিহি ও সুশাসনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হয়।

  • ড. নুরুল হুদা সাকিব: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত