বাংলাদেশ থেকে একটি পরাশক্তিকে পর্যবেক্ষণ

ইন্দো-প্যাসিফিক দাবার ছক: আমেরিকা, চীন এবং বঙ্গোপসাগর

আমেরিকার আড়াইশত বছর পূর্তি শুধু একটি মাইলফলক নয়—এটি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি কৌশলগত মুহূর্ত। পাঁচ পর্বের এই ধারাবাহিক স্ট্র্যাটেজিক নিবন্ধে America at 250: At Home and Beyond গ্রন্থে উত্থাপিত কৌশলগত শিক্ষাগুলো বিশ্লেষণ করা হবে এবং সেসব শিক্ষার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য তাৎপর্য অন্বেষণ করা হবে। এক অনিশ্চিত শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ধারাবাহিকটির বিভিন্ন পর্বে আলোচিত হবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিভাজন, পরিবর্তনশীল ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তির ভারসাম্য, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত সংকট, এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সামুদ্রিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব। ধারাবাহিকটির তৃতীয় পর্ব প্রকাশ করা হলো।

সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১৪: ২১
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরকে প্রায়ই একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দেখা হয়েছে। তা হলো- ঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে এক ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে উপেক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চল। এর গুরুত্ব প্রধানত জাতীয় পর্যায়ে অতি সীমিত পরিসরে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু America at 250: At Home and Beyond গ্রন্থ থেকে উদ্ভূত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা হলো—যে সাগর মহাসাগরগুলো একসময় আঞ্চলিক বলে বিবেচিত হতো, সেগুলো এখন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর প্রতিযোগিতা থেকে আর বিচ্ছিন্ন নয়।

এই রূপান্তর সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে। ইন্দো-প্যাসিফিক এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান ক্ষেত্র। যা শুরু হয়েছিল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে, তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে পরিণত হয়েছে বাণিজ্যপথ, প্রযুক্তি, সামরিক উপস্থিতি, কূটনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে এক বৃহত্তর প্রতিযোগিতায়। বইটির বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে, ওয়াশিংটন এখন এই অঞ্চলকে বহু কৌশলগত মঞ্চের একটি হিসেবে নয়; বরং এমন একটি কেন্দ্রীয় ভৌগোলিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে, যেখানে এই শতাব্দীর শক্তির ভারসাম্য নির্ধারিত হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা কৌশলগত চিন্তায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের দাবি রাখে। বঙ্গোপসাগরকে আর কেবল বাংলাদেশের সামুদ্রিক পশ্চাদভূমি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। আমাদের নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, এটি ক্রমেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দাবার ছকের অংশ হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইন্দো-প্যাসিফিক কেবল একটি আঞ্চলিক নীতি নয়। এটি সেই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার সামুদ্রিক অভিব্যক্তি, যা বহু দশক ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভিত্তি হয়ে আছে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা, উন্মুক্ত সমুদ্রপথ এবং নিরাপদ বাণিজ্য করিডর তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। চীন যখন তার নৌ-সামর্থ্য বাড়াচ্ছে এবং এশিয়া জুড়ে অর্থনৈতিক প্রভাব গভীরতর করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারিত্ব জোরদার, সামুদ্রিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে উপস্থিতি অধিকতর শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত উত্তর প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ এমন একটি সামুদ্রিক অবস্থানে রয়েছে, যার গুরুত্ব নীরবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের জলসীমার নিকট দিয়ে অতিক্রমকারী সমুদ্রপথ পূর্ব এশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত করে। জ্বালানি সরবরাহ, কনটেইনার পরিবহন এবং ডিজিটাল যোগাযোগের সাবমেরিন কেবল এসব পথ দিয়েই অতিক্রম করে।

চীনের কাছে একই জলরাশির অর্থ ভিন্ন। বেইজিং ইন্দো-প্যাসিফিককে এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখে, যেখানে অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা ধীরে ধীরে কৌশলগত প্রভাবে রূপ নিতে পারে। অবকাঠামো বিনিয়োগ, বন্দর উন্নয়ন, শিল্প অর্থায়ন এবং সামুদ্রিক সংযোগের মাধ্যমে চীন সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে না গিয়েও আঞ্চলিক পরিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তার ক্রমবর্ধমান নৌ-সামর্থ্য এবং বাণিজ্যিক উপস্থিতি এই উপলব্ধির প্রতিফলন যে সামুদ্রিক প্রভাব কেবল যুদ্ধজাহাজ দিয়ে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রবেশাধিকারের মাধ্যমেও।

এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে রয়েছে এমন একটি অঞ্চল, যা ক্রমেই উপলব্ধি করছে যে ভৌগলিক অবস্থান নিজেই এখন কৌশলগত মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের নেতৃত্বকে অনুধাবন করা উচিত যে বাংলাদেশের সেই রাষ্ট্রগুলোর একটি হওয়া অবশ্যই উচিত।

বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত উত্তর প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ এমন একটি সামুদ্রিক অবস্থানে রয়েছে, যার গুরুত্ব নীরবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের জলসীমার নিকট দিয়ে অতিক্রমকারী সমুদ্রপথ পূর্ব এশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত করে। জ্বালানি সরবরাহ, কনটেইনার পরিবহন এবং ডিজিটাল যোগাযোগের সাবমেরিন কেবল এসব পথ দিয়েই অতিক্রম করে। হরমুজ থেকে মালাক্কা পর্যন্ত ভারত মহাসাগরের বৃহত্তর কৌশলগত সংকীর্ণ পথগুলো মানচিত্রে দূরের মনে হলেও, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। আমদানিকৃত জ্বালানি ও কাঁচামালের বড় অংশ নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন সামুদ্রিক প্রবাহের ওপর। আমাদের সুনীল অর্থনীতির স্বপ্নও নির্ভর করে নিরাপদ সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর। এমন এক বিশ্ব, যেখানে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ক্রমশ সামুদ্রিক রূপ নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ কেবল স্থলকেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে ভাবার সুযোগ হারিয়েছে।

তবে America at 250: At Home and Beyond বইটি পরোক্ষভাবে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি অস্বস্তিকর সত্যও স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমন কোনো রাষ্ট্র চাইলেই শুধু ভৌগলিক অবস্থানের কারণে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকতে পারেনা। বঙ্গোপসাগর তাই পরাশক্তি সমুহের প্রতিযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নৌ-মহড়া বাড়ছে। সামুদ্রিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। বন্দর অবকাঠামোকে এখন আর শুধু বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগত দৃষ্টিতেও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পানির নিচের নজরদারি—সারফেস, সাবসারফেস, সাব সয়েল, তথ্য-নেটওয়ার্ক এবং সামুদ্রিক পরিস্থিতি-সচেতনতা আঞ্চলিক প্রভাবের কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হচ্ছে। যে প্রকল্পগুলো একসময় কেবল উন্নয়নমূলক মনে হতো, সেগুলো এখন কৌশলগত অর্থও বহন করতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে কারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হতে হবে। বরং ছোট সামুদ্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য মূল শিক্ষা হলো—কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব আত্মস্থ করা, অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখা—জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্যই কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ায় নয়, বরং কৌশলগত চালচলনের জন্য নিজের পরিসর ধরে রাখায়। এর জন্য প্রয়োজন সূক্ষ্ম ভারসাম্য—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো, ভারত, পাকিস্তান এবং আসিয়ান অংশীদারদের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং একই সঙ্গে নিজস্ব জাতীয় সামুদ্রিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা নয়; এটি জাতীয় কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সম্পর্কগুলোর সক্রিয় ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্যই কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ায় নয়, বরং কৌশলগত চালচলনের জন্য নিজের পরিসর ধরে রাখায়। এর জন্য প্রয়োজন সূক্ষ্ম ভারসাম্য—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো, ভারত, পাকিস্তান এবং আসিয়ান অংশীদারদের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং একই সঙ্গে নিজস্ব জাতীয় সামুদ্রিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা।

স্ট্রাটেজিক ইকুইডিসট্যান্স অর্জনের জন্য বাংলাদেশের জাতীয় সামুদ্রিক নীতিকে অন্তত তিনভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে—

প্রথমত, সামুদ্রিক পরিস্থিতি-সচেতনতা কৌশলগত অগ্রাধিকার হতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সমুদ্রে কোনো রাষ্ট্র যা দেখতে পারে না, তা রক্ষা করতেও পারে না। নজরদারি ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময় এবং সামুদ্রিক ডোমেইন সচেতনতা এখন আর শুধু বড় শক্তির বিলাসিতা নয়; ছোট রাষ্ট্রগুলোরও তাদের জলসীমা ও তার আশপাশে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, নৌ-সামর্থ্যকে কেবল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেখা যাবে না। আধুনিক নৌ-শক্তির মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধ, মানবিক সহায়তা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক বার্তা প্রেরণ। একটি সক্ষম নৌবাহিনী ছোট রাষ্ট্রকে শুধু ভূখণ্ড রক্ষার সুযোগ দেয় না; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপেও বিশ্বাসযোগ্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

তৃতীয়ত, বন্দরগুলোকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক জুড়ে বন্দরগুলো ক্রমেই প্রভাব বিস্তারের উপকরণে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবকাঠামো কেবল বাণিজ্যিক দক্ষতার জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় রেখেই উন্নত করতে হবে। বাণিজ্যিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত দূরদৃষ্টি একসঙ্গে এগোতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো—ইন্দো-প্যাসিফিক কেবল পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার থিয়েটার নয়; একই সঙ্গে ছোট রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় কতটা কৌশলগতভাবে চিন্তা করতে পারে, তারও পরীক্ষা।

অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলো প্রায়ই ভূরাজনীতিকে এমন কিছু হিসেবে দেখেছে, যা দূরবর্তী অঞ্চলে, অন্য কোথাও ঘটে। অথচ বঙ্গোপসাগর আর বৈশ্বিক কৌশলের প্রান্তে নেই। ক্রমেই এমন এক জলরাশিতে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক ব্যবস্থার রূপ নীরবে নির্ধারিত হতে পারে।

তাই, America at 250 আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই অঞ্চলে আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভূমিকা এখনও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গভীর শিক্ষা সম্ভবত এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশ্ন এখন আর এই নয় যে বঙ্গোপসাগর গুরুত্বপূর্ণ কি না! বরং প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি সেই গুরুত্ব অনুযায়ী আচরণ করার জন্য প্রস্তুত?

কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত