উত্তেজনা, বাণিজ্য ও বিতর্ক মিলিয়ে স্মরণীয় বিশ্বকাপ

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৩৮
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

পর্দা নামল ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ষোলোটি শহরে এক মাস ধরে চলা এই মহাযজ্ঞ এখন স্মৃতি। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও ছিল এই আনন্দের অংশীদার। তারা রাত জেগে খেলা দেখেছে, প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়েছে, গলা ফাটিয়ে উল্লাস করেছে, আবার কখনো প্রিয় দলের পরাজয়ে কান্না লুকিয়েছে। এ এমনই এক দেশ, যেখানে আর্জেন্টিনা সমর্থকের সংখ্যা খোদ আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি। অথচ বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে নেই; কখনো ছিলও না। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) নামে প্রতিষ্ঠান আছে বটে, তবে ফুটবলের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা কতটুকু, তার সদুত্তর মেলে না।

মাঠের বাইরে বিশ্বকাপটি ছিল অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন বলছে, এই বিশ্বকাপ বৈশ্বিক জিডিপিতে ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার যোগ করেছে এবং ৮ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পানীয় শিল্প, সম্প্রচার—সব খাতেই উৎসবের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। ফিফার আয় ছাড়িয়েছে ১৩ বিলিয়ন ডলার। এই বিশ্বকাপকে বলা হচ্ছে আর্থিকভাবে সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ। বাংলাদেশেও এতে লাভবান হয়েছে। জার্সি-ক্রীড়াসামগ্রীর রপ্তানি বেড়েছে, দেশে বেড়েছে টেলিভিশন বিক্রি, রেস্তোরাঁ আর চায়ের দোকানগুলোয় রাতভর ছিল ভিড়।

এবারের বিশ্বকাপ শুধু উৎসবের কারণে স্মরণীয় নয়, বিতর্কের কারণেও মনে থাকবে। ফিফা প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁকে ফোন করেছিলেন এবং এর পরই যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়। এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় আইনপ্রণেতা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তের দাবি জানায়।

এই বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণও বিশেষ তাৎপর্যবহ। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চলমান থাকার মধ্যেই ইরান এবার বিশ্বকাপ খেলতে আমেরিকায় গিয়েছিল। ইরান দল মেক্সিকোয় ঘাঁটি গেড়ে শুধু ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে এবং ম্যাচ শেষে ফিরে গেছে। এই ঘটনাও ফুটবল ইতিহাস মনে রাখবে।

বিশ্বকাপের ফাইনালটি হয়ে উঠেছে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। স্পেনের ২০টি শটের বিপরীতে আর্জেন্টিনা গোলপোস্টে মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছে আর নব্বই মিনিটে আর্জেন্টিনার শট ছিল শূন্য। এনজো ফার্নান্দেজের দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে দশজনে নেমে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনা আরও দুর্বল হয়ে যায়। ফাইনালে আর্জেন্টিনা বলা যায় নির্বিচারে ফাউল করেছে। খেলা শেষেও স্পেনের খেলোয়াড়দের প্রতি তাদের আচরণ ছিল দৃষ্টিকটু।

ফাইনালে একটি স্মরণীয় অধ্যায়ও রচিত হলো। ৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য এটিই সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। ফাইনালের আগ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ম্যাচে তিনি জাদুকরি ক্ষমতা দেখিয়েছেন। তবে ফাইনালে নিষ্প্রভ ছিলেন। এতে এটাও প্রমাণ হলো, মেসি না জ্বলে উঠলে আর্জেন্টিনার উপস্থিতি দুর্বল হয়ে যায়।

এই বিশ্বকাপ এক নতুন নক্ষত্রের আগমনবার্তাও দিয়ে গেছে—লামিন ইয়ামাল। স্পেনের এই তরুণ প্রতিভা যেভাবে আলো ছড়িয়েছেন টুর্নামেন্টে, তা অসাধারণ। মেসি-পরবর্তী ফুটবল জমানায় ইয়ামাল কেমন তারকা হয়ে ওঠেন, সেটিও দেখার বিষয়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত