সুমন সুবহান

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি এখন আর খনিজ তেল বা কোনো ভূখণ্ড নয়, বরং চোখের আড়ালে থাকা এক ক্ষুদ্র অণুপ্রযুক্তি—সেমিকনডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। আর এই বৈশ্বিক চিপ বিপ্লবের স্নায়ুকেন্দ্র হলো তাইওয়ান, যার একক একাধিপত্যকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে মার্কিন-চীন ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথ।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সুপারকম্পিউটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই উৎপাদিত হয় তাইওয়ানের টিএসএমসিতে (তাইওয়ান সেমিকনডাক্টর মেনুফ্যাকচারিং কোম্পানি), যা দ্বীপটির অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান রাজনৈতিক ঢাল বা ‘সিলিকন শিল্ড’ হিসেবে পরিচিত।
তবে গত ১২-১৪ মে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন এবং ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি এই সমীকরণকে চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বৈঠকে চীন তাইওয়ানকে তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ‘রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করে সরাসরি সামরিক সংঘাতের হুঁশিয়ারি দিলেও, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাইওয়ানকে বেইজিংয়ের সাথে দরকষাকষির একটি ‘নেগোশিয়েটিং চিপ’ বা বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে ২০২৬ সালের শুরুতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ট্যারিফ ফর ইনভেস্টমেন্ট’ চুক্তির মাধ্যমে তাইওয়ানিজ কোম্পানিগুলো আমেরিকার মাটিতে চিপ উৎপাদনে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার লক্ষ্য ট্রাম্পের চলতি মেয়াদের মধ্যে উন্নত চিপের বৈশ্বিক চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কিন ভূখণ্ডে ফিরিয়ে আনা।
ওয়াশিংটনের এই দ্বিমুখী কৌশল—একদিকে তাইওয়ানের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি খাত সুরক্ষিত করা, অন্যদিকে তাইপেইকে প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার আকাশচুম্বী আর্থিক চাপ দেওয়া এবং পূর্ব-নির্ধারিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজ বিলম্বিত করা—দুই মিত্রের মধ্যে এক গভীর ‘বিশ্বাসের ঘাটতি’ তৈরি করেছে।
বেইজিং শীর্ষ সম্মেলনে শি জিনপিং স্পষ্ট করেন যে, তাইওয়ানের স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক শান্তি একসঙ্গে চলতে পারে না। অন্যদিকে, ট্রাম্প তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক দরকষাকষির একটি ‘নেগোসিয়েটিং চিপ’ বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বেইজিংয়ের সামরিক সংঘাতের প্রচ্ছন্ন হুমকি তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগ ও চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
শীর্ষ সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ এবং তাইওয়ান প্রণালির ‘শান্তি’ কখনো এক সুতোয় বাঁধা সম্ভব নয়। তাইওয়ান বিষয়টি মার্কিন-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমানা বা ‘রেড লাইন’। এই সীমারেখা অতিক্রম করার যেকোনো চেষ্টা দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথ উন্মুক্ত করতে পারে।
চীনের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান প্রমাণ করে যে তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে কোনো প্রকার ছাড় দিতে বা আপস করতে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত নয়।
বেইজিংয়ের মাটিতে শি জিনপিংয়ের সামনে সরাসরি কোনো উসকানিমূলক মন্তব্য না করে কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখলেও, সফর শেষ করেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বেইজিংয়ের সঙ্গে অন্যান্য বড় অর্থনৈতিক দরকষাকষির জন্য একটি চমৎকার ‘নেগোসিয়েটিং চিপ’ বা হাতিয়ার হতে পারে। আমেরিকার এই নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং তাইওয়ানকে দরকষাকষির ঘুঁটি বানানোর আভাস স্বাভাবিকভাবেই তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও চরম নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদিত হয় তাইওয়ানের টিএসএমসিতে, যার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও সামরিক খাত সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। এই অতি-নির্ভরশীলতার কারণেই নিজেদের স্বার্থে তাইওয়ানকে রক্ষা করা ওয়াশিংটনের জন্য একটি ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বেইজিংও ভালো করেই জানে যে, তাইওয়ানে যেকোনো সামরিক আগ্রাসন বৈশ্বিক চিপ সরবরাহ চেইনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে চীনের নিজস্ব অর্থনীতিকেও চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তাইওয়ানের টিএসএমসি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক স্মার্টফোন এবং সুপারকম্পিউটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও ক্ষুদ্রাকৃতির চিপগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই এককভাবে উৎপাদন করে। অ্যাপল, এনভিডিয়া এবং এএমডি-র মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টরা তাদের অত্যাধুনিক ডিভাইসের জন্য সম্পূর্ণভাবে এই তাইওয়ানি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। চিপ উৎপাদনের এই একক নিয়ন্ত্রণ টিএসএমসি-কে কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্যের এক অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই চিপ কারখানার ওপর যেকোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক আঘাত সমগ্র বিশ্বের প্রযুক্তি খাতকে মুহূর্তের মধ্যে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খাত, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং বৈশ্বিক এআই রেস সম্পূর্ণরূপে এই চিপের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নিজেদের স্বার্থেই তাইওয়ানকে রক্ষা করা ওয়াশিংটনের জন্য একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। অন্যদিকে বেইজিংও খুব ভালো করেই জানে যে তাইওয়ানে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালালে বৈশ্বিক চিপ সরবরাহ চেইন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়বে। এই সরবরাহ বিপর্যয় আমেরিকার পাশাপাশি চীনের নিজস্ব উৎপাদন ও অর্থনীতিকেও অবধারিতভাবে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করাবে। এই চিপের নিরাপত্তা উভয় পরাশক্তিকে একটি পরোক্ষ অর্থনৈতিক ভারসাম্যে আটকে রেখেছে, যা তাইওয়ানকে চীনের সম্ভাব্য সরাসরি আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো তাদের চলতি মেয়াদের মধ্যে বিশ্বমানের উন্নত চিপের বৈশ্বিক চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কিন ভূখণ্ডে উৎপাদন করে তাইওয়ানের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা হ্রাস করা। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ‘ট্যারিফ ফর ইনভেস্টমেন্ট’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার অধীনে তাইওয়ানিজ কোম্পানিগুলো আমেরিকার সেমিকনডাক্টর ও এআই খাতে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের ওপর বিশেষ শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা এবং মার্কিন মাটিতে শুল্কমুক্ত চিপ আমদানির বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো তাদের চলতি মেয়াদের মধ্যেই বিশ্বমানের উন্নত ও অত্যাধুনিক চিপের বৈশ্বিক চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কিন ভূখণ্ডে উৎপাদন করা। এই আগ্রাসী অনশোরিং নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তি ও সামরিক খাতে তাইওয়ানের চিপের ওপর আমেরিকার যে একক ও অতি-নির্ভরশীলতা রয়েছে, তা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা।
ওয়াশিংটন মনে করে, ভূরাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তাইওয়ান প্রণালির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরতা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। চিপ উৎপাদনের এই বিশাল অংশ নিজেদের মাটিতে ফিরিয়ে এনে আমেরিকা কেবল তার অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি খাতকে সুরক্ষিত করছে না, বরং তাইওয়ানের ওপর চীনের যেকোনো সম্ভাব্য ব্লকেড বা আগ্রাসনের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকেও নিজেদের মুক্ত রাখার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০২৬ সালের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাইওয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ট্যারিফ ফর ইনভেস্টমেন্ট’ চুক্তিটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তাইওয়ানিজ প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সেমিকনডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগের বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার একটি বড় উদাহরণ হলো অ্যারিজোনায় টিএসএমসির মেগা-ফ্যাক্টরি প্রকল্প।
এই বিশাল পুঁজি বিনিয়োগের বড় ধরণের অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের উৎপাদিত পণ্যের ওপর আরোপিত বিশেষ শুল্কের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ করার আনুষ্ঠানিক আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি যেসব কোম্পানি আমেরিকার মাটিতে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে অবদান রাখবে, তাদের জন্য মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত চিপ আমদানির বিশেষ কোটা বা অনন্য বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি ট্রাম্প প্রশাসনের চিপ অনশোরিং বা স্বনির্ভরতা নীতিকে যেমন গতিশীল করছে, তেমনি বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের বিনিময়ে তাইওয়ানও আমেরিকার বাজারে তার বাণিজ্যিক অবস্থান সুরক্ষিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী চিপ অনশোরিং নীতির কারণে উন্নত সেমিকনডাক্টর উৎপাদন মার্কিন মাটিতে স্থানান্তরিত হতে থাকায় দ্বীপটির ঐতিহাসিক ‘সিলিকন শিল্ড’ বা পরোক্ষ নিরাপত্তা বলয় ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। একইসাথে ওয়াশিংটন থেকে তাইপেই-এর ওপর প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার আকাশচুম্বী আর্থিক চাপ তৈরি করা হয়েছে, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ। এর ওপর বেইজিং সফর শেষে ট্রাম্প কর্তৃক পূর্ব-নির্ধারিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজটি আটকে রাখা বা বিলম্বিত করার ইঙ্গিত দেওয়ায় দুই মিত্রের মধ্যে এক গভীর ‘বিশ্বাসের ঘাটতি’ ও নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে।
মার্কিন মাটিতে উন্নত চিপ উৎপাদন স্থানান্তরিত হওয়ার চলমান প্রক্রিয়াটি তাইওয়ানের ঐতিহ্যবাহী ‘সিলিকন শিল্ড’-এর কার্যকারিতাকে ক্রমান্বয়ে ক্ষয়ের মুখে ফেলছে। তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের প্রধান ভয় হলো, আমেরিকার নিজস্ব বাজারে অত্যাধুনিক সেমিকনডাক্টর উৎপাদন নিশ্চিত হয়ে গেলে ওয়াশিংটনের কাছে তাইওয়ানের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এখন পর্যন্ত এই উন্নত প্রযুক্তির একক একাধিপত্যই তাইওয়ানকে চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকার পরোক্ষ প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক সমর্থনের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছিল। তাই এই চিপ স্থানান্তর প্রযুক্তিগতভাবে ওয়াশিংটনকে স্বনির্ভর করলেও, ভূরাজনৈতিকভাবে তা তাইওয়ানের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসন তাইপেইকে তাদের নিজস্ব সামরিক বাজেট বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ বাড়িয়ে জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার আকাশচুম্বী তাগিদ দিচ্ছে, যা দ্বীপ রাষ্ট্রটির ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর পাশাপাশি, তাইওয়ানের নিরাপত্তার জন্য পূর্বে মার্কিন কংগ্রেসে অনুমোদিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজটি ট্রাম্প কর্তৃক বিলম্বিত বা আটকে রাখার কৌশল ওয়াশিংটনের ভেতরেই তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই দ্বিমুখী নীতি তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, আমেরিকা এখন আর বিনা শর্তে বা নিখরচায় তাদের সামরিক সুরক্ষার গ্যারান্টি দিতে রাজি নয়। এভাবে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকির মুখে একদিকে বিপুল আর্থিক বোঝা এবং অন্যদিকে মার্কিন অস্ত্রের অনিশ্চয়তা তাইওয়ানকে চরম নিরাপত্তা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন মাটিতে চিপ উৎপাদন স্থানান্তরিত হলেও তাইপেইকে অবশ্যই চিপের সবচেয়ে অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তি নিজেদের দ্বীপেই কঠোরভাবে কুক্ষিগত রাখতে হবে, যাতে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো তাদের নিরাপত্তা দিতে সদাপ্রস্তুত থাকে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘লেনদেনমূলক’ নীতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তাইওয়ানকে তাদের বিপুল আর্থিক পুঁজি ও সেমিকনডাক্টর একাধিপত্যকে লিভারেজ বা দরকষাকষির মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
অন্যদিকে, চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসন ও ব্লকেডের ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে মার্কিন অস্ত্রের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য চিপ-নির্ভর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে নতুন কৌশলগত জোট গঠনে জোর দিতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যেহেতু উন্নত মাইক্রোচিপের কোনো বিকল্প নেই তাই তাইওয়ান যদি তাদের এই প্রযুক্তিগত অপরিহার্যতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবে মার্কিন-চীন দ্বৈরথের মাঝেও তারা নিজেদের অস্তিত্ব ও ‘সিলিকন শিল্ড’কে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ক্ষমতার খেলায় তাইওয়ান কেবল একটি নিষ্ক্রিয় 'বাণিজ্যিক ঘুঁটি' হয়ে থাকবে নাকি নিজের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে—তা নির্ধারণ করবে তাদের আগামী দিনগুলোর সুনিপুণ কূটনৈতিক চাল।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি এখন আর খনিজ তেল বা কোনো ভূখণ্ড নয়, বরং চোখের আড়ালে থাকা এক ক্ষুদ্র অণুপ্রযুক্তি—সেমিকনডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। আর এই বৈশ্বিক চিপ বিপ্লবের স্নায়ুকেন্দ্র হলো তাইওয়ান, যার একক একাধিপত্যকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে মার্কিন-চীন ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথ।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সুপারকম্পিউটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই উৎপাদিত হয় তাইওয়ানের টিএসএমসিতে (তাইওয়ান সেমিকনডাক্টর মেনুফ্যাকচারিং কোম্পানি), যা দ্বীপটির অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান রাজনৈতিক ঢাল বা ‘সিলিকন শিল্ড’ হিসেবে পরিচিত।
তবে গত ১২-১৪ মে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন এবং ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি এই সমীকরণকে চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বৈঠকে চীন তাইওয়ানকে তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ‘রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করে সরাসরি সামরিক সংঘাতের হুঁশিয়ারি দিলেও, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাইওয়ানকে বেইজিংয়ের সাথে দরকষাকষির একটি ‘নেগোশিয়েটিং চিপ’ বা বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে ২০২৬ সালের শুরুতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ট্যারিফ ফর ইনভেস্টমেন্ট’ চুক্তির মাধ্যমে তাইওয়ানিজ কোম্পানিগুলো আমেরিকার মাটিতে চিপ উৎপাদনে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার লক্ষ্য ট্রাম্পের চলতি মেয়াদের মধ্যে উন্নত চিপের বৈশ্বিক চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কিন ভূখণ্ডে ফিরিয়ে আনা।
ওয়াশিংটনের এই দ্বিমুখী কৌশল—একদিকে তাইওয়ানের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি খাত সুরক্ষিত করা, অন্যদিকে তাইপেইকে প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার আকাশচুম্বী আর্থিক চাপ দেওয়া এবং পূর্ব-নির্ধারিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজ বিলম্বিত করা—দুই মিত্রের মধ্যে এক গভীর ‘বিশ্বাসের ঘাটতি’ তৈরি করেছে।
বেইজিং শীর্ষ সম্মেলনে শি জিনপিং স্পষ্ট করেন যে, তাইওয়ানের স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক শান্তি একসঙ্গে চলতে পারে না। অন্যদিকে, ট্রাম্প তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক দরকষাকষির একটি ‘নেগোসিয়েটিং চিপ’ বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বেইজিংয়ের সামরিক সংঘাতের প্রচ্ছন্ন হুমকি তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগ ও চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
শীর্ষ সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ এবং তাইওয়ান প্রণালির ‘শান্তি’ কখনো এক সুতোয় বাঁধা সম্ভব নয়। তাইওয়ান বিষয়টি মার্কিন-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমানা বা ‘রেড লাইন’। এই সীমারেখা অতিক্রম করার যেকোনো চেষ্টা দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথ উন্মুক্ত করতে পারে।
চীনের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান প্রমাণ করে যে তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে কোনো প্রকার ছাড় দিতে বা আপস করতে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত নয়।
বেইজিংয়ের মাটিতে শি জিনপিংয়ের সামনে সরাসরি কোনো উসকানিমূলক মন্তব্য না করে কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখলেও, সফর শেষ করেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বেইজিংয়ের সঙ্গে অন্যান্য বড় অর্থনৈতিক দরকষাকষির জন্য একটি চমৎকার ‘নেগোসিয়েটিং চিপ’ বা হাতিয়ার হতে পারে। আমেরিকার এই নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং তাইওয়ানকে দরকষাকষির ঘুঁটি বানানোর আভাস স্বাভাবিকভাবেই তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও চরম নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদিত হয় তাইওয়ানের টিএসএমসিতে, যার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও সামরিক খাত সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। এই অতি-নির্ভরশীলতার কারণেই নিজেদের স্বার্থে তাইওয়ানকে রক্ষা করা ওয়াশিংটনের জন্য একটি ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বেইজিংও ভালো করেই জানে যে, তাইওয়ানে যেকোনো সামরিক আগ্রাসন বৈশ্বিক চিপ সরবরাহ চেইনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে চীনের নিজস্ব অর্থনীতিকেও চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তাইওয়ানের টিএসএমসি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক স্মার্টফোন এবং সুপারকম্পিউটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও ক্ষুদ্রাকৃতির চিপগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই এককভাবে উৎপাদন করে। অ্যাপল, এনভিডিয়া এবং এএমডি-র মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টরা তাদের অত্যাধুনিক ডিভাইসের জন্য সম্পূর্ণভাবে এই তাইওয়ানি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। চিপ উৎপাদনের এই একক নিয়ন্ত্রণ টিএসএমসি-কে কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্যের এক অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই চিপ কারখানার ওপর যেকোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক আঘাত সমগ্র বিশ্বের প্রযুক্তি খাতকে মুহূর্তের মধ্যে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খাত, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং বৈশ্বিক এআই রেস সম্পূর্ণরূপে এই চিপের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নিজেদের স্বার্থেই তাইওয়ানকে রক্ষা করা ওয়াশিংটনের জন্য একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। অন্যদিকে বেইজিংও খুব ভালো করেই জানে যে তাইওয়ানে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালালে বৈশ্বিক চিপ সরবরাহ চেইন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়বে। এই সরবরাহ বিপর্যয় আমেরিকার পাশাপাশি চীনের নিজস্ব উৎপাদন ও অর্থনীতিকেও অবধারিতভাবে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করাবে। এই চিপের নিরাপত্তা উভয় পরাশক্তিকে একটি পরোক্ষ অর্থনৈতিক ভারসাম্যে আটকে রেখেছে, যা তাইওয়ানকে চীনের সম্ভাব্য সরাসরি আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো তাদের চলতি মেয়াদের মধ্যে বিশ্বমানের উন্নত চিপের বৈশ্বিক চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কিন ভূখণ্ডে উৎপাদন করে তাইওয়ানের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা হ্রাস করা। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ‘ট্যারিফ ফর ইনভেস্টমেন্ট’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার অধীনে তাইওয়ানিজ কোম্পানিগুলো আমেরিকার সেমিকনডাক্টর ও এআই খাতে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের ওপর বিশেষ শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা এবং মার্কিন মাটিতে শুল্কমুক্ত চিপ আমদানির বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো তাদের চলতি মেয়াদের মধ্যেই বিশ্বমানের উন্নত ও অত্যাধুনিক চিপের বৈশ্বিক চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কিন ভূখণ্ডে উৎপাদন করা। এই আগ্রাসী অনশোরিং নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তি ও সামরিক খাতে তাইওয়ানের চিপের ওপর আমেরিকার যে একক ও অতি-নির্ভরশীলতা রয়েছে, তা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা।
ওয়াশিংটন মনে করে, ভূরাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তাইওয়ান প্রণালির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরতা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। চিপ উৎপাদনের এই বিশাল অংশ নিজেদের মাটিতে ফিরিয়ে এনে আমেরিকা কেবল তার অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি খাতকে সুরক্ষিত করছে না, বরং তাইওয়ানের ওপর চীনের যেকোনো সম্ভাব্য ব্লকেড বা আগ্রাসনের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকেও নিজেদের মুক্ত রাখার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০২৬ সালের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাইওয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ট্যারিফ ফর ইনভেস্টমেন্ট’ চুক্তিটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তাইওয়ানিজ প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সেমিকনডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগের বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার একটি বড় উদাহরণ হলো অ্যারিজোনায় টিএসএমসির মেগা-ফ্যাক্টরি প্রকল্প।
এই বিশাল পুঁজি বিনিয়োগের বড় ধরণের অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের উৎপাদিত পণ্যের ওপর আরোপিত বিশেষ শুল্কের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ করার আনুষ্ঠানিক আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি যেসব কোম্পানি আমেরিকার মাটিতে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে অবদান রাখবে, তাদের জন্য মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত চিপ আমদানির বিশেষ কোটা বা অনন্য বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি ট্রাম্প প্রশাসনের চিপ অনশোরিং বা স্বনির্ভরতা নীতিকে যেমন গতিশীল করছে, তেমনি বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের বিনিময়ে তাইওয়ানও আমেরিকার বাজারে তার বাণিজ্যিক অবস্থান সুরক্ষিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী চিপ অনশোরিং নীতির কারণে উন্নত সেমিকনডাক্টর উৎপাদন মার্কিন মাটিতে স্থানান্তরিত হতে থাকায় দ্বীপটির ঐতিহাসিক ‘সিলিকন শিল্ড’ বা পরোক্ষ নিরাপত্তা বলয় ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। একইসাথে ওয়াশিংটন থেকে তাইপেই-এর ওপর প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার আকাশচুম্বী আর্থিক চাপ তৈরি করা হয়েছে, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ। এর ওপর বেইজিং সফর শেষে ট্রাম্প কর্তৃক পূর্ব-নির্ধারিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজটি আটকে রাখা বা বিলম্বিত করার ইঙ্গিত দেওয়ায় দুই মিত্রের মধ্যে এক গভীর ‘বিশ্বাসের ঘাটতি’ ও নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে।
মার্কিন মাটিতে উন্নত চিপ উৎপাদন স্থানান্তরিত হওয়ার চলমান প্রক্রিয়াটি তাইওয়ানের ঐতিহ্যবাহী ‘সিলিকন শিল্ড’-এর কার্যকারিতাকে ক্রমান্বয়ে ক্ষয়ের মুখে ফেলছে। তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের প্রধান ভয় হলো, আমেরিকার নিজস্ব বাজারে অত্যাধুনিক সেমিকনডাক্টর উৎপাদন নিশ্চিত হয়ে গেলে ওয়াশিংটনের কাছে তাইওয়ানের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এখন পর্যন্ত এই উন্নত প্রযুক্তির একক একাধিপত্যই তাইওয়ানকে চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকার পরোক্ষ প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক সমর্থনের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছিল। তাই এই চিপ স্থানান্তর প্রযুক্তিগতভাবে ওয়াশিংটনকে স্বনির্ভর করলেও, ভূরাজনৈতিকভাবে তা তাইওয়ানের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসন তাইপেইকে তাদের নিজস্ব সামরিক বাজেট বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ বাড়িয়ে জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার আকাশচুম্বী তাগিদ দিচ্ছে, যা দ্বীপ রাষ্ট্রটির ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর পাশাপাশি, তাইওয়ানের নিরাপত্তার জন্য পূর্বে মার্কিন কংগ্রেসে অনুমোদিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজটি ট্রাম্প কর্তৃক বিলম্বিত বা আটকে রাখার কৌশল ওয়াশিংটনের ভেতরেই তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই দ্বিমুখী নীতি তাইপেই-এর নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, আমেরিকা এখন আর বিনা শর্তে বা নিখরচায় তাদের সামরিক সুরক্ষার গ্যারান্টি দিতে রাজি নয়। এভাবে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকির মুখে একদিকে বিপুল আর্থিক বোঝা এবং অন্যদিকে মার্কিন অস্ত্রের অনিশ্চয়তা তাইওয়ানকে চরম নিরাপত্তা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন মাটিতে চিপ উৎপাদন স্থানান্তরিত হলেও তাইপেইকে অবশ্যই চিপের সবচেয়ে অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তি নিজেদের দ্বীপেই কঠোরভাবে কুক্ষিগত রাখতে হবে, যাতে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো তাদের নিরাপত্তা দিতে সদাপ্রস্তুত থাকে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘লেনদেনমূলক’ নীতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তাইওয়ানকে তাদের বিপুল আর্থিক পুঁজি ও সেমিকনডাক্টর একাধিপত্যকে লিভারেজ বা দরকষাকষির মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
অন্যদিকে, চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসন ও ব্লকেডের ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে মার্কিন অস্ত্রের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য চিপ-নির্ভর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে নতুন কৌশলগত জোট গঠনে জোর দিতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যেহেতু উন্নত মাইক্রোচিপের কোনো বিকল্প নেই তাই তাইওয়ান যদি তাদের এই প্রযুক্তিগত অপরিহার্যতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবে মার্কিন-চীন দ্বৈরথের মাঝেও তারা নিজেদের অস্তিত্ব ও ‘সিলিকন শিল্ড’কে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ক্ষমতার খেলায় তাইওয়ান কেবল একটি নিষ্ক্রিয় 'বাণিজ্যিক ঘুঁটি' হয়ে থাকবে নাকি নিজের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে—তা নির্ধারণ করবে তাদের আগামী দিনগুলোর সুনিপুণ কূটনৈতিক চাল।

কোনো অঞ্চলে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি রোগের প্রাদুর্ভাব উচ্চহারে ছড়িয়ে পড়লে এক সময় তা মহামারিতে পরিণত হয়। মহামারির ইতিহাস বলে, রোগটি শ্রেণি নির্বিশেষে একটি ভৌগোলিক অঞ্চলকে রীতিমতো দিশাহারা ও পাগলপ্রায় বানিয়ে ফেলে।
১৬ ঘণ্টা আগে
আজ ২২ মে, আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী আর অণুজীবের যে মেলবন্ধন এই পৃথিবীকে সচল রেখেছে, তাকে উদযাপনের এবং তা রক্ষায় আত্মদর্শনের দিন আজ। এবারের দিবসে জাতিসংঘের ঘোষিত প্রতিপাদ্য হলো—‘বৈশ্বিক প্রভাব সৃষ্টিতে স্থানীয় স্তরে পদক্ষেপ’।
১ দিন আগে
একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এখন শুধু নির্বাচিত সরকার বা আমলাতন্ত্রই যথেষ্ট নয়। এর জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, গভীর নীতি-বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনায় দক্ষ একটি সংগঠিত ‘রাষ্ট্রীয় মস্তিষ্ক’। এই মস্তিষ্কের একটি দৃশ্যমান অংশ হলো উন্মুক্ত ও গবেষণাধর্মী রাষ্ট্রীয় থিংক ট্যাঙ্ক।
২ দিন আগে
প্রচারণা মতে, গত ১০ মে ছিল বিশ্ব মা দিবস। আর এ দিবসকে ঘিরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এমনকি বাস্তব নাগরিক দেখাসাক্ষাতেও নানামাত্রিক আবেগের প্রকাশ যথেষ্টই দেখা গেছে। তা দেখা যাবেই-বা না কেন!
২ দিন আগে