দিবসের মোড়কে মুনাফা শিকারের কৌশল

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ১৮: ০৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রচারণা মতে, গত ১০ মে ছিল বিশ্ব মা দিবস। আর এ দিবসকে ঘিরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এমনকি বাস্তব নাগরিক দেখাসাক্ষাতেও নানামাত্রিক আবেগের প্রকাশ যথেষ্টই দেখা গেছে। তা দেখা যাবেই-বা না কেন! বিষয়টি যখন মাকে নিয়ে, তখন আবেগের প্রকাশ তো একটু ভিন্ন এবং অধিক মাত্রারই হবে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, বিশ্ব মা দিবস বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো দিবস নেই। জাতিসংঘ বা কোনো স্বীকৃত সংস্থা দ্বারা বিশ্ব মা দিবস পালনের কোনো ঘোষণা বা সিদ্ধান্ত কোথাও নেই। পৃথিবীর খুব বেশি দেশে তা পালিত হচ্ছেও না। উইকিপিডিয়ার দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ৪৬টি দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্বের অপর ১৪৭টি দেশেই তা পালিত হচ্ছে না।

বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে এই যে, মা দিবস বলে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত কোনো দিবস নেই। আসলে এটি পালনের বা অন্যকে দিয়ে এটি পালন করানোর কিংবা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে, বোধের ঘাটতিপীড়িত মানুষকে এটি পালনের ব্যাপারে উৎসাহিত করার পেছনে রয়েছে পুঁজিপতি শ্রেণির এক ধরনের ব্যবসায়িক কৌশল। বিষয়টি গভীর থেকে জানলে বা বুঝতে পারলে মাতৃবৎসল ওই মানুষেরা আর এ নিয়ে আলাদা আবেগ প্রকাশে আগ্রহী হবেন বলে মনে হয় না। আসলে মা তো নিত্যদিনের এমন এক সত্তা, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বের উৎস ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। ফলে তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও পরম মমতায় তাঁকে আগলে রাখা প্রতিটি মানুষেরই প্রতিদিনের অপরিহার্য আপন কর্তব্য।

কিন্তু সেটি ঠিকমতো না করে, যেটি পশ্চিমের পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং বাংলাদেশের সমাজেও যা ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করছে—হঠাৎ করেই বছরের কোনো বিশেষ দিনে লৌকিক আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠার বিষয়টি আসলে বছরের বাকি দিনগুলোতে মাকে ভুলে থাকার অজুহাত উপস্থাপনের সুযোগ খোঁজা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের অনেক দেশেই এটি মোটামুটি ঘটা করে পালিত হয়। কারণ বিচ্ছিন্নতাপীড়িত পুঁজিবাদী সমাজে সারাবছর মাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার কিংবা নিজের সাথে তাঁকে যুক্ত রাখার কিংবা নিরন্তর তাঁকে অবিচ্ছিন্ন ভাবার শিক্ষা বা ফুসরৎ কোনোটাই তেমন একটা নেই। আর তা নেই বলেই ঐ ধরনের বিচ্ছিন্নতাপূর্ণ সমাজ থেকে উঠে আসা মানবিক বোধহীন ডোনাল্ড ট্রাম্পেরা যখন-তখন যে কাউকে আক্রমণ করতে পারে, শিশু হত্যা করতে পারে এবং যেকোনো সময় আবার শান্তি প্রতিষ্ঠার ভানও করতে পারে। এবং এর সঙ্গে প্রচণ্ড মিল রয়েছে সারা বছর মাকে ভুলে থেকে হঠাৎ মা দিবসে তাঁকে অনেক উপহার পাঠিয়ে কিংবা মায়ের সঙ্গে দেখা করে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাকে উদ্দেশ্য করে আবেগঘন পোস্ট দিয়ে বছরের অন্য সময় তাঁকে ভুলে থাকার কৈফিয়ত হাজির করার।

শুধু দায়মুক্তির অজুহাত খোঁজার জন্যই যে মা দিবস পালনের উদ্যোগ, তা নয়। দায়মুক্তির চেষ্টা একটি কারণ অবশ্যই; তবে মূল কারণ নয়। এসবকে ছাড়িয়ে মূল কারণ হচ্ছে পুঁজির বিস্তার ঘটিয়ে বর্ধিত মুনাফা অর্জনের গোপন প্রচেষ্টা। পুঁজির মালিকেরা জানেন, পণ্য বিক্রির জন্য পৃথিবীতে যত কৌশল আছে, তার মধ্যে সেরা হচ্ছে আবেগকে কাজে লাগিয়ে পণ্য গছানো। ফলে মা দিবস, বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি সবই হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের আবেগ কাজে লাগিয়ে বেশি বেশি পণ্য বিক্রির মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পুঁজি বিনিয়োগকারীদের ফন্দি। আর সে ফন্দির প্রয়োগ এত বেশি কৌশলপূর্ণ যে, ক্রেতা বা ভোক্তা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না– কীভাবে তিনি সেসব ফন্দির শিকার হচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বলি: মা কিংবা বাবা দিবসে সন্তানেরা যখন বা-মার জন্য এবং ভালোবাসা দিবসে সংশ্লিষ্টরা যখন পরস্পরের জন্য উপহার কেনেন; উদ্দীষ্ট জনের সঙ্গে দেখা করার জন্য তারা যখন বাসে, ট্রেনে কিংবা বিমানে চড়েন এবং দীর্ঘ সময় পরস্পরের সাথে কথা বলার জন্য যখন মুঠোফোন হাতে তুলে নেন, তখন কার্যত তারা পণ্যের উৎপাদক ও বিক্রেতা, যানবাহন পরিচালনাকারী কোম্পানির মালিক এবং ফোন অপারেটর বহুজাতিকদের মুনাফাই বাড়িয়ে তুলছেন।

এসব দিবস ঘিরে পুঁজিবাদী সমাজের মালিক শ্রেণির তৎপরতার প্রভাবে এবং ওইসব সমাজের মানুষদের অভ্যস্ত জীবনাচরণের দেখাদেখিসুলভ আসক্তিতে পড়ে বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ দেশগুলোতেও হালে এটি বেশি করে পালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা এটি নির্দোষ চিন্তা থেকে পালন করলেও তাদের অধিকাংশ বুঝতেই পারছেন না, তাদের সুপ্ত পবিত্র আবেগ কাজে লাগিয়ে তাদের অজান্তে পুঁজির মালিকেরা মুনাফার পরিমাণই শুধু বাড়িয়ে তুলছেন না; এসব সম্পর্কের আওতাধীন মানুষদের বন্ধনটিও নানা কৃত্রিমতার প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন। এমনি পরি স্থিতিতে সমাজের শিক্ষিত সচেতন মানুষদের উচিৎ হবে এসব দিবসকেন্দ্রিক ফাঁকির আচ্ছাদন থেকে নিজেদের মুক্ত করে বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জন ইত্যাদি সকলের সাথে এমন এক দায়িত্বপূর্ণ, মমতাময় সম্পর্ক গড়ে তোলা– যার আওতায় হঠাৎ করে কোনো দিবসে নয়; বরং বছর জুড়েই তারা পরস্পরের কাছের ও মমতার মানুষ হয়ে থাকবেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মতো বৈষম্যপীড়িত সমাজগুলোতে সাম্প্রতিককালে এ ধরনের হুজুগে প্রবণতা ক্রমে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, এসব হুজুগেপনা উস্কে দিয়ে পুঁজির মালিকেরা নিজেদের বিত্তের ভাণ্ডারকে অধিকতর স্ফীত করে তোলার পাশাপাশি সমাজের সংস্কৃতিকেও সেভাবেই গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রকে তাদের অধীন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে রাষ্ট্রও তাদেরকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। কারণ এ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাদের হাতে ন্যস্ত, তারাও পুঁজিপতি শ্রেণিরই প্রতিনিধি। এমনি পরিস্থিতিতে ওইসব দিবসকেন্দ্রিক শোষণ থেকে দেশ, সমাজ ও সমাজের মানুষকে বাঁচাতে চাইলে সর্বাগ্রে নিজ নিজ সমাজের মধ্যকার সম্পর্কের ঐতিহ্যিক বন্ধন ও সংহতির শক্তিকে জোরদার করতে হবে। কিন্তু সমাজের শিক্ষিত সচেতন মানুষজন যেভাবে ক্রমে আপসকামিতা ও সুবিধাবাদিতার ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত কতোটা কী হয়, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।

  • আবু তাহের খান: আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক

সম্পর্কিত