এখনো দৃশ্যমানভাবে খুব বেশি কিছু উলটপালট হয়ে যায়নি। তবুও আমরা এক অনিবার্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি, যা আমাদের জীবদ্দশায় আগে দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগে ভরা, যেন সবাই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছে কী ঘটতে যাচ্ছে তা দেখার জন্য। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, একটি গুরুতর জ্বালানি সংকট এখন প্রায় নিশ্চিত। এই সংকট ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের তেল সংকট এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের সম্মিলিত প্রভাবের সমান হতে পারে।
সংস্থাটি আরও বলছে, এই আসন্ন সংকট ঠেকানোর সময় ইতোমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাস স্থাপনার ব্যাপক ধ্বংস কিছুটা এড়াতে সক্ষম হলেও তা আর যথেষ্ট নয়। তার যুদ্ধের ফলে যে গভীর অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্য এ আঘাতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আশা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণই তাদের নিয়ন্ত্রণহীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। কারণ তার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই এবং শুরু থেকেই তার উদ্দেশ্যও পরিষ্কার ছিল না। এই বিশ্ব-পরিবর্তনকারী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। তাকে যুদ্ধ থেকে সরাতে জনঅসন্তোষই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পুরোনো মিত্রদের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একাধিকবার এমন একজন নেতাকে নির্বাচিত করায় অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। “মুক্ত বিশ্বের নেতা” হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের মতো দেখা কঠিন হয়ে পড়বে। ট্রাম্পের রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতি, ইউক্রেনের প্রতি অবিশ্বস্ত আচরণ, ইউরোপের প্রতি বিরূপ মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল রিচার্ড হারমারের বক্তব্য এই প্রেক্ষাপটে আইনের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হবে।
যুক্তরাজ্যে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক করেছে। প্রধানমন্ত্রী স্টারমার জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সদস্য দেশগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে, যেন তারা ভোক্তাদের এই সংকটের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখে। এজন্য গতি সীমা কমানো, গাড়ি ভাগাভাগি করা, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, গণপরিবহন ব্যবহার, বাসা থেকে কাজ করা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল সতর্ক করেছেন, জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতির ওপর এই সংকটের প্রভাব আরও তীব্র হবে।
২০০০ সালে যুক্তরাজ্যে জ্বালানি সংকটের সময় তেল শোধনাগার অবরোধের প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির সারি দেখা গিয়েছিল এবং আতঙ্কে মানুষ জ্বালানি মজুত করতে শুরু করেছিল। প্রায় ৩ হাজার পেট্রোল স্টেশন জ্বালানিশূন্য হয়ে পড়েছিল এবং সুপারমার্কেটের তাক খালি হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালগুলো জরুরি অবস্থায় পরিচালিত হয়েছিল এবং অনেক স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। যদিও এই অবরোধ মাত্র এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল, তবুও এর প্রভাব ছিল গভীর ও বিস্তৃত।
পরিস্থিতি আরও তিক্ত, কারণ অর্থনীতিতে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দেখা দেওয়ার সময়েই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস তাঁর বিবৃতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কিছু ইতিবাচক লক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে রেশনিংয়ের মতো ব্যবস্থা জনপ্রিয় নাও হতে পারে। মানুষের কষ্ট লাঘবে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, কিন্তু ঋণ নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় কর বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকট সরকারকে তাদের পূর্বঘোষিত নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।
ইতিহাস বলে, বড় সংকটের পর সরকারগুলো প্রায়ই জনসমর্থন হারায়। এমনকি তারা ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলেও ভোটাররা তা সবসময় স্বীকার করে না। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখার পরও নেতারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হননি। ১৯৭৩ সালের তেল সংকট বা কোভিড-১৯ মহামারির পরও অনেক সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে। বর্তমান সংকটও সেই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
লেবার পার্টি এবং এর নেতা আগেই রাজনৈতিকভাবে বেশ দুর্বল অবস্থানে নেমে গিয়েছিলেন। তবে এই যুদ্ধ এবং স্টারমারের ব্যবস্থাপনা তাদের জন্য কিছুটা ইতিবাচক প্রভাবও আনতে পারে। ট্রাম্পের সমালোচনা বরং এক ধরনের সম্মানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তিনি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠান থেকে স্টারমারকে নিয়ে করা একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যা খুব একটা সফল হয়নি। এর কিছুক্ষণ পরই হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপ হয়। ট্রাম্পের নানা অপমানজনক মন্তব্য, যেমন দুর্বল, অযোগ্য বা দেরিতে প্রতিক্রিয়া দেওয়া, স্টারমারের ওপর তেমন প্রভাব ফেলেনি। বরং এসব আক্রমণ যুক্তরাজ্যের সেই ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যারা ট্রাম্পকে অপছন্দ করেন এবং যারা চান দেশটি এই যুদ্ধে না জড়াক। টনি ব্লেয়ারের সমালোচনাও উল্টো স্টারমারের সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী করেছে, কারণ তিনি ইরাক যুদ্ধের মতো ভুলের পুনরাবৃত্তি করেননি।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ লন্ডনের ল্যামবেথ এলাকায় লেবার দলের প্রচারণায় অংশ নিয়ে বোঝা গেছে, এখনো অনেক দৃঢ় লেবার সমর্থক রয়েছেন। যদিও প্রায়ই বলা হয় এই সমর্থকরা হারিয়ে গেছেন, বাস্তবে তা পুরোপুরি সত্য নয়। লন্ডন লেবার পার্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই তাদের বেশিরভাগ আসন রয়েছে। তবে স্থানীয় পরিষদগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কাও প্রবল, এবং স্টারমারের নিজস্ব এলাকা ক্যামডেনও ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে অনেকে গ্রিন পার্টির দিকে ঝুঁকছেন, আবার কেউ কেউ স্টারমারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করছেন। তবুও দুই দলের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা এখনো স্পষ্ট। লেবার কর্মীরা গ্রিন পার্টির প্রচারণার সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে তারা বলছেন, গ্রিনদের প্রচারপত্রে গাজা ইস্যু বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, কিন্তু জলবায়ু বা অর্থনীতি নিয়ে কম আলোচনা রয়েছে। যদিও এই সমালোচনা আছে, তবুও লেবার পার্টির অনেক কাউন্সিলর হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তাদের সংগঠনকে দুর্বল করতে পারে।
স্টারমারের নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় নির্ধারিত হয়েছে আগামী ৭ মে। এই সময়ের মধ্যে দলের অনেক সংসদ সদস্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারেন, কারণ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে তাৎক্ষণিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের ব্যাপারে সবাই একমত নন। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নেতৃত্ব বদল করা কতটা যুক্তিযুক্ত, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। সম্ভাব্য বিকল্প নেতার ক্ষেত্রেও এখনো কোনো স্পষ্ট ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
ল্যামবেথ এলাকার অনেক বামঘেঁষা ভোটারের মতামত থেকে বোঝা যায়, লেবার কীভাবে তাদের সমর্থন ফিরে পেতে পারে। ব্রেক্সিট এখনো অনেকের কাছে কষ্টের বিষয় এবং তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পক্ষে। জন মেজরের বক্তব্যে বলা হয়েছিল, ব্রেক্সিটের ফলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হচ্ছে, যার বড় অংশ কর হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আসতে পারত। এই অর্থ বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বড় সহায়তা হতে পারত। র্যাচেল রিভস ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগের চেয়ে কিছুটা বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন, তবে আরও সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ট্রাম্পের প্রতি জনসাধারণের বিরূপ মনোভাব স্টারমারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে। তবে দলের নীতিগত পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখাতে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসন নীতির কিছু কঠোর অবস্থান পরিবর্তন করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান সংকট দলকে তাদের পুরোনো নীতিমালা পুনর্বিবেচনার সুযোগও এনে দিয়েছে। একটি ছোট সান্ত্বনা হলো, সাম্প্রতিক জরিপে রিফর্ম পার্টির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে এবং তারা এখন সবচেয়ে অজনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছে।
- পলি টয়েনবি: দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক
(দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহবুব তারেক)