রাজশাহী—বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদটি দীর্ঘদিন ধরেই খরার ঝুঁকিতে। বারিন্দ ভূপ্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত এই অঞ্চলে বৃষ্টি কম, তাপমাত্রা বেশি, আর কৃষি ব্যাপকভাবে সেচনির্ভর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষকেরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন—বৃষ্টি কমছে—তা এবার পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ বলছে, রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত শুধু কমছেই না, ধারাবাহিকভাবে কমছে; আর এই প্রবণতা কৃষি ও পানি নিরাপত্তার জন্য এক নীরব কিন্তু গভীর সংকেত।
১৯৯০ থেকে ২০২৩—এই ৩৪ বছরের বার্ষিক বৃষ্টিপাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে বৃষ্টির একটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নিম্নমুখী ধারা রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ দশমিক ৮ মিলিমিটার করে বৃষ্টি কমছে। এক বছরে এই হ্রাস তেমন চোখে পড়ে না। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময়ে যোগফল করলে বোঝা যায়—কতটা বড় ক্ষতি জমে উঠেছে। এই ধীর কিন্তু ধারাবাহিক হ্রাসই খরাকে বারিন্দে সাময়িক দুর্যোগের গণ্ডি ছাড়িয়ে কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত করছে।
বৃষ্টি কমার প্রথম প্রভাব পড়ে আবহাওয়াজনিত খরায়। বৃষ্টি দেরিতে আসে, আসে কম, কখনো অনিয়মিত। এরপর শুরু হয় কৃষি খরা—মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, বপন পিছিয়ে যায়, ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজশাহীর কৃষিতে এর অর্থ আরও গভীর। কারণ এখানে ধানসহ প্রধান ফসলগুলো বড় অংশে সেচনির্ভর, বিশেষ করে বোরো মৌসুমে। বৃষ্টি কমলে সেচের চাপ বাড়ে, আর সেচ মানেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা।
এই নির্ভরতার ফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। অনেক এলাকায় নলকূপে পানি তুলতে আগের চেয়ে বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে। সেচের খরচ বেড়েছে—ডিজেল, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি সবকিছুর ব্যয় যোগ হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য এই খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বৃষ্টি কমার এই ধারা চলতে থাকলে শুধু উৎপাদন নয়, কৃষকের আয় ও জীবিকাও বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
অনেকে বলেন, ‘আগেও তো খরা ছিল।’ সত্যি, বারিন্দে খরা নতুন নয়। কিন্তু পার্থক্য হলো—আগে খরা আসত কিছু বছর পরপর, এখন তা যেন নিয়মে পরিণত হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এটি আর কয়েকটি খারাপ বছরের ফল নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু প্রবণতার অংশ। যখন ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে বৃষ্টি কমার হার শূন্যের নিচে, তখন এটিকে কাকতালীয় বলা যায় না। এটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
এই বাস্তবতায় কৃষি নীতিতে পরিবর্তন জরুরি। শুধু ক্ষতির পর ক্ষতিপূরণ বা ত্রাণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি ও অভিযোজন। প্রথমত, ফসল নির্বাচন ও জাত উন্নয়নে খরা-সহনশীলতা অগ্রাধিকার পেতে হবে। রাজশাহীর জন্য স্বল্পমেয়াদি ও কম পানিতে টিকে থাকতে পারে—এমন জাতের সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে ধাননির্ভরতা কমিয়ে ডাল, তেলবীজ ও অন্যান্য কম পানির ফসলের দিকে ধীরে ধীরে যেতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা দরকার। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহার এবং পুনঃভরণ (রিচার্জ) উদ্যোগ বাড়াতে হবে। ধান চাষে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (AWD) পদ্ধতির মতো পানি-সাশ্রয়ী কৌশল কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এগুলো শুধু পানির সাশ্রয়ই করে না, খরচও কমায়।
তৃতীয়ত, কৃষকের হাতে সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছানো জরুরি। কখন বৃষ্টি কম হতে পারে, কখন বপন নিরাপদ—এই তথ্য যদি কৃষক আগেই পান, তাহলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি বৃষ্টিপাতের প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী খরা পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
সবশেষে, কৃষকের ঝুঁকি মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা দরকার। ফসল বীমা, অভিযোজন সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ—এসব উদ্যোগ খরার সময় কৃষককে টিকে থাকতে সাহায্য করে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কৃষকের একার নয়, অথচ ক্ষতি সবচেয়ে বেশি তাঁরই হয়।
রাজশাহীর বারিন্দ অঞ্চল আমাদের চোখের সামনেই বদলে যাচ্ছে। বৃষ্টি কমছে ধীরে, কিন্তু প্রভাব জমছে দ্রুত। আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, তার মূল্য দিতে হবে আগামী বছরগুলোতে—কম ফলন, বাড়তি খরচ আর অনিশ্চিত জীবিকার মাধ্যমে। পরিসংখ্যান আমাদের সতর্ক করেছে। এখন প্রশ্ন—আমরা কি সময় থাকতে প্রস্তুতি নেব, নাকি সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানাব?
বারিন্দের আকাশ হয়তো নীরবে কম বৃষ্টি ঝরাচ্ছে, কিন্তু সেই নীরবতাই সবচেয়ে জোরালো বার্তা দিচ্ছে যে- কৃষি নীতিতে এখনই পরিবর্তন আনতে হবে।
মো. তানজিল হোসেন: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক